জিএম আমিনুল হক: পবিত্র ঈদুল আজহার টানা ছুটিতে সাতক্ষীরার প্রধান পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে দর্শনার্থীদের ঢল নামছে। সুন্দরবন, দেবহাটার রূপসী ম্যানগ্রোভ, মোজাফফর গার্ডেন, ভোমরা স্থলবন্দর ও ঐতিহাসিক শ্যামনগর জমিদারবাড়িসহ জেলার বিনোদনকেন্দ্রগুলোতে এখন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরে বেড়ানো মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে পুরো জেলা।
বিশ্ব ঐতিহ্য ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনের কলাগাছি, দোবেকি ও আকাশলীনা ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্রে ঈদের পর থেকেই পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। পশ্চিম সুন্দরবন বিভাগ জানায়, ঈদের গত তিন দিনে শুধু মুন্সিগঞ্জ রেঞ্জ দিয়েই আট হাজারের বেশি পর্যটক সুন্দরবনে প্রবেশ করেছেন। নৌকা ও লঞ্চে করে হরিণ, কুমির ও বানর দেখতে ভিড় করছেন সবাই।
খুলনা থেকে আসা দর্শনার্থী রায়হান কবির বলেন, “কোরবানির পর ছুটি পেয়ে ছেলে-মেয়েদের নিয়ে এসেছি। সুন্দরবনের নীরবতা ও নদীর ঢেউ মন ভালো করে দেয়।”
অন্যদিকে, ইছামতী নদীর পাড়ে দেবহাটার রূপসী ম্যানগ্রোভ পর্যটনকেন্দ্রেও প্রতিদিন গড়ে দুই হাজার মানুষ আসছেন। এখানকার ঝুলন্ত সেতু ও ওয়াচ টাওয়ারে তরুণ-তরুণীদের সেলফি তোলার হিড়িক দেখা গেছে। স্থানীয় চায়ের দোকানি মনিরুল বলেন, ঈদের পর বিক্রি তিন গুণ বেড়েছে।
সাতক্ষীরা শহরের কোল ঘেঁষে শতাধিক বিঘা জমির ওপর গড়ে ওঠা মোজাফফর গার্ডেন অ্যান্ড রিসোর্টে তিল ধারণের জায়গা নেই। এখানকার রাইড, চিড়িয়াখানা আর লেকের প্যাডেল বোটে চড়তে দর্শনার্থীদের লম্বা লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। রিসোর্টের ব্যবস্থাপক জানান, ঈদের ছুটিতে প্রতিদিন ৫ থেকে ৬ হাজার দর্শনার্থী আসছেন। ভিড় সামলাতে অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ভোমরা স্থলবন্দর, শ্যামনগরের যশোরেশ্বরী কালীমন্দির ও প্রবাজপুর শাহী মসজিদেও গতবারের চেয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ দর্শনার্থী বেড়েছে বলে জানিয়েছে প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তর।
হঠাৎ পর্যটকের চাপে সাতক্ষীরা শহরের প্রায় সব আবাসিক হোটেল ও রিসোর্ট অগ্রিম বুকড হয়ে গেছে।
রেস্তোরাঁগুলোতে স্থানীয় গলদা, বাগদা ও কাঁকড়ার চাহিদা বেড়েছে। ডাব বিক্রেতা থেকে শুরু করে নৌকার মাঝি, ভ্যানচালক ও স্থানীয় ফটোগ্রাফারদের আয় বেড়েছে দ্বিগুণ।
ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জানান, শুধু ঈদের এই ছুটিতেই জেলায় প্রায় ১২ কোটি টাকার ব্যবসা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। মুন্সিগঞ্জ ঘাট থেকে প্রতিদিন শতাধিক ট্রলার সুন্দরবনে যাচ্ছে। দর্শনার্থীরা গোলপাতা, মধু ও বেতের তৈরি নানা স্যুভেনির কিনছেন।
পর্যটকদের বাড়তি ভিড়ে কিছু অব্যবস্থাপনার অভিযোগও উঠেছে। গাড়ি পার্কিং সংকট, অপর্যাপ্ত টয়লেট ও বসার জায়গার অভাবে অনেক দর্শনার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। পাশাপাশি প্লাস্টিকের বোতল ও চিপসের প্যাকেট যেখানে-সেখানে ফেলায় সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় পরিবেশ দূষণ বাড়ছে।
সাতক্ষীরা জেলা নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও চ্যানেল আইয়ের জেলা প্রতিনিধি অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ বলেন, “সড়কপথে সুন্দরবন সাতক্ষীরাকে ব্র্যান্ডিং করেছে। কিন্তু অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে এই খাতের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। উপযুক্ত পরিবেশ, ভালো সড়ক ও মানসম্মত হোটেল নিশ্চিত করতে পারলে এখান থেকে বিপুল রাজস্ব আয় সম্ভব।”
পর্যটকদের নিরাপত্তায় ট্যুরিস্ট পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের মোবাইল টিম দায়িত্ব পালন করছে। সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক জানান, পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে সিসি ক্যামেরা মনিটরিং ও মেডিকেল টিম রাখা হয়েছে। কোথাও যেন অতিরিক্ত ভাড়া আদায় না হয়, সে জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালত কাজ করছে। এ ছাড়া কালিগঞ্জে নতুন ইকো-পার্ক ও শ্যামনগরে ট্যুরিজম জোন করার প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে জেলা প্রশাসন জানিয়েছে।