সিসিটিভি-পুলিশি নজরদারিতে পঞ্চম দিনেও উৎসবমুখর পরিবেশ
মিলন বিশ্বাস: দুই বছর পর ফিরে আসা সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী গুড়পুকুর মেলার আজ পঞ্চম দিন। সোমবার (৫ অক্টোবর) বিকেল থেকে সন্ধ্যার পর মেলা প্রাঙ্গণে বাড়তে থাকে দর্শনার্থীদের ভিড়। পরিবার-পরিজন নিয়ে আসা মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্ক। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মেলায় জোরদার করা হয়েছে সিসিটিভি ও পুলিশি নজরদারি।
মেলা ঘুরে দেখা যায়, গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে দায়িত্ব পালন করছেন পুলিশ সদস্যরা। পুরো মেলার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রয়েছে সিসিটিভি কন্ট্রোল রুম। পাশাপাশি পিকেটে থাকা পুলিশ সদস্য ও সাদা পোশাকের গোয়েন্দা সদস্যদের মাধ্যমে মেলার বিভিন্ন অংশে নজরদারি করা হচ্ছে। ওয়াচ টাওয়ার থেকেও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে সার্বিক পরিস্থিতি।
সাতক্ষীরা সদরের কুশখালী থেকে মেলায় আসা মরিয়ম বেগম বলেন, “মেলায় এসে সিসিটিভি ক্যামেরা, পুলিশের ওয়াচ টাওয়ার এবং প্রশাসনের লোকজনকে ঘোরাফেরা করতে দেখে মনে স্বস্তি পেয়েছি। নিরাপত্তা নিয়ে এখন কিছুটা নিশ্চিন্ত বোধ করছি।”
মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়ির পাশের এলাকা থেকে আসা সাগর ও আছিয়া দম্পতি মেলার পরিবেশে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। তাঁরা বলেন, দীর্ঘদিন পর মেলা হওয়ায় পরিবার নিয়ে ঘুরতে এসে ভালো লাগছে। চারপাশে পুলিশের উপস্থিতি থাকায় নিরাপত্তা নিয়েও স্বস্তি নিয়ে মেলায় ঘুরতে পারছেন।
নারকেলতলা থেকে মেয়েকে নিয়ে মেলায় আসা কৃষ্ণা রানী বলেন, “মেলার পরিবেশ ভালো। মেয়েকে নিয়ে বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখছি, বেশ ভালো লাগছে।”
মিলবাজার থেকে মা ও বোনকে নিয়ে আসা খুশবু আক্তার মুক্তি বলেন, “মেলায় মানুষের ভিড় থাকায় একটু ঠেলাঠেলি হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো অসুবিধায় পড়তে হয়নি।”
মেলায় অংশ নেওয়া ব্যবসায়ীদের মধ্যেও রয়েছে মিশ্র অভিজ্ঞতা। ঢাকা থেকে শিশুদের খেলনা নিয়ে আসা জাহাঙ্গীর জানান, তাঁর বেচাকেনা এখনো আশানুরূপ হয়নি। তবে মেলায় দর্শনার্থীর উপস্থিতি রয়েছে, সামনে বিক্রি বাড়বে বলে আশা করছেন তিনি।
অন্যদিকে পাবনা থেকে আসা আকাশ মনি জানান, তাঁর বেচাকেনা ভালো হচ্ছে। মেলার নিরাপত্তা ব্যবস্থাও তাঁর কাছে সন্তোষজনক। তবে মেলার সময়সীমা আরও কিছুটা বাড়ানো হলে ব্যবসায়ীদের জন্য ভালো হতো বলে মনে করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, অনেকে সন্ধ্যার দিকে মেলায় এসে প্রবেশের পরই জানতে পারেন রাত ৮টার মধ্যে মেলা শেষ হবে।
শালখালী থেকে মেলায় ঘুরতে আসা পলাশ সরকার বলেন, “মেলায় ঘুরতে ভালো লাগছে। তবে পুরুষদের কেনাকাটার জন্য তেমন বৈচিত্র্যময় পণ্য চোখে পড়েনি।”
দর্শনার্থীদের কেউ কেউ মনে করেন, এত বড় একটি মেলায় বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ঘটলেও সেটিকে কেন্দ্র করে পুরো আয়োজনের মূল্যায়ন করা উচিত নয়। বরং নিরাপত্তা আরও জোরদার করে মেলার ঐতিহ্য ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
মেলায় আসা দর্শনার্থী নাজমুল হাসান বলেন, “এত বড় একটি মেলা চললে দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটতেই পারে। তাই দিয়ে পুরো মেলাকে বিচার করা ঠিক হবে না। গুড়পুকুর মেলা সাতক্ষীরাবাসীর মেলা, এই ঐতিহ্য থামিয়ে রাখা যাবে না। নিরাপত্তা আরও জোরদার করে মেলাটি সুন্দরভাবে চালিয়ে যাওয়া দরকার।”
সাতক্ষীরা সদর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ শরিফুল ইসলাম বলেন, “মেলার সিসিটিভি কন্ট্রোল রুম থেকে পুরো মেলার সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সিসিটিভির মাধ্যমে কোথাও কোনো ধরনের অপরাধ বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে দেখা গেলে দ্রুত তা শনাক্ত করে সংশ্লিষ্ট পিকেটে থাকা পুলিশ সদস্যদের জানানো হচ্ছে।”
তিনি বলেন, “মেলায় পিকেট-১, পিকেট-২, পিকেট-৩, পিকেট-৪, পিকেট-৫ এবং কন্ট্রোল রুমের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা হচ্ছে।”
এসআই শরিফুল ইসলাম আরও বলেন, মেলায় যাতে কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বা দুষ্কৃতিকারী কোনো ধরনের অপরাধমূলক কর্মকা- ঘটাতে না পারে, সে জন্য সদর থানা, পুলিশ লাইন থেকে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য এবং অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। দর্শনার্থীরা যাতে নির্বিঘেœ মেলায় আসা-যাওয়া ও কেনাকাটা করতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সার্বক্ষণিক নজরদারি করছে। এখন পর্যন্ত মেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো রয়েছে।
সিসিটিভি মনিটরিংয়ে কোনো অপরাধ ধরা পড়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি আজকে কন্ট্রোল রুমে দায়িত্বে আছি। আজ এখন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটার মতো কোনো ঘটনা আমাদের নজরে পড়েনি। ইনশাআল্লাহ, এখন পর্যন্ত সবকিছু ভালো রয়েছে।”
জেলা প্রশাসন ও পৌরসভার আয়োজনে ১ অক্টোবর শুরু হওয়া গুড়পুকুর মেলা চলবে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত। দীর্ঘ দুই বছর পর ফিরে আসা এই আয়োজনে প্রতিদিনই বাড়ছে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি। নিরাপত্তা ব্যবস্থায় প্রশাসনের তৎপরতা, ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ এবং দর্শনার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে পঞ্চম দিনেও উৎসবমুখর ছিল গুড়পুকুর মেলা।