আন্তর্জাতিক দাতব্য দিবস: মানবতার সেবাই বিশ্বজনীন অনন্য
সাকিবুর রহমান বাবলা
প্রতি বছর ৫ সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক দাতব্য দিবস। মানবতা, সহমর্মিতা, পরোপকার এবং সমাজের অসহায় মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার চেতনাকে জাগ্রত করাই এ দিবসের মূল লক্ষ্য। জাতিসংঘের উদ্যোগে পালিত এই দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, একটি ন্যায়ভিত্তিক, শান্তিপূর্ণ এবং টেকসই বিশ্ব গঠনে দাতব্য কার্যক্রমের গুরুত্ব অপরিসীম।
‘দাতব্য’ বলতে কোনো প্রতিদান বা ব্যক্তিগত স্বার্থের প্রত্যাশা ছাড়াই অন্যের কল্যাণে অর্থ, সম্পদ, সময়, শ্রম কিংবা সেবা প্রদানকে বোঝায়। এটি কেবল অর্থ দানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষের কষ্ট লাঘব, মানবিক সহায়তা প্রদান এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার এক মহান প্রচেষ্টা। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যুদ্ধ, মহামারি কিংবা দারিদ্র্যের মতো সংকটময় পরিস্থিতিতে দাতব্য কার্যক্রম মানুষের জীবন রক্ষা ও পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
আন্তর্জাতিক দাতব্য দিবসের সূচনা হয় হাঙ্গেরি সরকারের উদ্যোগে। ২০১১ সালে দেশটি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এ দিবস পালনের প্রস্তাব উত্থাপন করে। পরবর্তীতে ২০১২ সালের ১৭ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ প্রস্তাব এ/আরইএস/৬৭/১০৫ গ্রহণের মাধ্যমে প্রতি বছর ৫ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক দাতব্য দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ২০১৩ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী আনুষ্ঠানিকভাবে দিবসটি উদযাপিত হয়ে আসছে।
৫ সেপ্টেম্বর তারিখটি নির্বাচনের পেছনে রয়েছে এক গভীর মানবিক ইতিহাস। এদিন ১৯৯৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত মানবতাবাদী ব্যক্তিত্ব মাদার তেরেসা। কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত তাঁর ‘মিশনারিজ অব চ্যারিটি’ দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে অনাথ, অসুস্থ, কুষ্ঠরোগী, অন্ধ এবং মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের সেবায় নিবেদিত ছিল। মানবকল্যাণে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি ১৯৭৯ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন এবং পুরস্কারের সমগ্র অর্থ দরিদ্র মানুষের কল্যাণে দান করেন। তাঁর আত্মত্যাগ, ভালোবাসা ও মানবসেবার স্মৃতিকে সম্মান জানাতেই ৫ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক দাতব্য দিবস হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
বর্তমান বিশ্বে দাতব্য কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য হলো দারিদ্র্য ও ক্ষুধা দূর করা, সামাজিক বৈষম্য কমানো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা। ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে এই মানবিক সেবা বিভিন্ন উপায়ে পরিচালিত হয়-যেমন আর্থিক অনুদান দেওয়া, খাদ্য, পোশাক, ওষুধ ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা কিংবা স্বেচ্ছাসেবার মাধ্যমে সময় ও শ্রম উৎসর্গ করা। কেবল সাময়িক সহায়তাই নয়, বরং স্থায়ী স্কুল, হাসপাতাল, এতিমখানা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র পরিচালনার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সেবা প্রদান করা হচ্ছে। এসব টেকসই দাতব্য উদ্যোগ এবং বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব জাতিসংঘের ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বিশ্বের প্রায় সব ধর্মই দাতব্য কাজকে উৎসাহিত করেছে। ইসলামে যাকাত একটি ফরজ ইবাদত এবং সদকা একটি মহৎ মানবিক কর্ম। হিন্দুধর্মে দান ও পরোপকারকে ধর্মীয় কর্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। খ্রিস্টধর্ম ও বৌদ্ধধর্মেও দরিদ্র ও অসহায় মানুষের সেবাকে আধ্যাত্মিক উন্নতির অন্যতম পথ হিসেবে দেখা হয়। ফলে দাতব্য কার্যক্রম শুধু সামাজিক নয়, নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বিশ্বব্যাপী বহু বৃহৎ দাতব্য প্রতিষ্ঠান মানবকল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। ডেনমার্কভিত্তিক নোভো নরডিস্ক ফাউন্ডেশন, ভারতের টাটা ট্রাস্টস এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন বিশ্বের বৃহত্তম দাতব্য তহবিলসমৃদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম। চিকিৎসা গবেষণা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, দারিদ্র্য বিমোচন এবং মানব উন্নয়নে তাদের অবদান বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত। হিউম্যানিটি অ্যান্ড ইনক্লুশন মানবিক কাজে, পার্টনার্স ইন হেলথ এবং ফন্ট বোরিস-এর মতো আন্তর্জাতিক চিকিৎসাসেবা দানকারী চ্যারিটি অন্যতম।
মাঠপর্যায়ে সরাসরি মানবিক সহায়তা, চিকিৎসা ও জরুরি ত্রাণ প্রদানের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক কমিটি অব দ্য রেড ক্রস, ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস, ওয়ার্ল্ড ভিশন ইন্টারন্যাশনাল এবং ইসলামিক রিলিফ ওয়ার্ল্ডওয়াইড বিশ্বজুড়ে সংকটপূর্ণ অঞ্চলে মানুষের জীবন রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে। জাতিসংঘের অধীনস্থ সংস্থাগুলোর মধ্যে আয়তন ও কার্যক্রমের দিক থেকে সবচেয়ে বড় মানবিক সংস্থা হলো ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম। এছাড়া ইউনিসেফ ও ইউএনএইচসিআর শিশু, শরণার্থী এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের সুরক্ষা ও কল্যাণে প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে। মানবসেবায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ রেড ক্রস, ইউএনএইচসিআর, ইউনিসেফ, ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস ও ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে।
দাতব্য কর্মকান্ডে রাষ্ট্র ও জাতির অবদানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মোট অর্থমূল্যের বিচারে বিশ্বের সবচেয়ে বড় দাতা দেশ হলো যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ ও উদারতার সূচকে ইন্দোনেশিয়া দীর্ঘদিন ধরে শীর্ষস্থানে, এছাড়া রয়েছে ইউরোপভিত্তিক প্রতিষ্ঠান চ্যারিটিজ এইড ফাউন্ডেশন। এটি প্রমাণ করে যে দাতব্য শুধু অর্থের বিষয় নয়; বরং মানুষের হৃদয়ের উদারতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রতিফলন।
বাংলাদেশেও দাতব্য ও মানবকল্যাণমূলক কার্যক্রমের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ক্ষুদ্রঋণ ও দারিদ্র্য বিমোচনে অবদান রেখে চলেছে দেশের বৃহত্তম উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক। ক্যারিতাস বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পুনর্বাসন এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে কাজ করছে। তরুণদের নেতৃত্বে পরিচালিত জাগো ফাউন্ডেশন সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। একইভাবে আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন শিক্ষা, ত্রাণ, দক্ষতা উন্নয়ন ও সামাজিক কল্যাণমূলক কর্মকান্ডের মাধ্যমে মানুষের আস্থা অর্জন করেছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গ্রামীণ ব্যাংক, ব্র্যাক, জাগো ফাউন্ডেশন ও ফ্রেন্ডশিপসহ বিভিন্ন বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান ও তাদের প্রতিষ্ঠাতারা সম্মাননা লাভ করেছেন।
কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সাহায্য ছাড়াই নিজের সময়, শ্রম, অর্থ বা সম্পদের মাধ্যমে নিঃস্বার্থভাবে অন্যের কল্যাণে কাজ করাই হলো ব্যক্তিগত দাতব্য সেবা বা পরোপকার। স্বেচ্ছাসেবা, সরাসরি আর্থিক বা বস্তুগত দান, বৃক্ষ রোপণ, আইনি সহায়তা, পরামর্শ, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা রক্তদানের মতো সামাজিক ও মানবিক নানা উপায়ে একজন ব্যক্তি একক উদ্যোগেই মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারেন।
আজকের বিশ্বে যখন যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য, ক্ষুধা এবং মানবিক সংকট ক্রমাগত বাড়ছে, তখন দাতব্য কার্যক্রমের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা, করপোরেট প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। দাতব্য শুধু অর্থ প্রদান নয়; এটি মানুষের প্রতি ভালোবাসা, সহমর্মিতা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধের বাস্তব প্রকাশ।
আন্তর্জাতিক দাতব্য দিবস আমাদের শেখায়-মানবতার সেবাই সর্বোচ্চ সেবা। প্রত্যেকে যদি নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সহায়ক হিসেবে অন্যের পাশে দাঁড়াই, তবে ক্ষুধামুক্ত, বৈষম্যহীন, মানবিক ও শান্তিপূর্ণ একটি বিশ্ব গড়ে তোলা সম্ভব। তাই আসুন, দানের পরিমাণ নয়, মানবতার প্রতি আমাদের অঙ্গীকারকে বড় করে দেখি এবং একটি সুন্দর মানবতার পৃথিবী নির্মাণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করি।









