প্রকৃতির পরিচ্ছন্নতাকর্মী শকুন আজ মহাবিপন্ন
প্রকাশ ঘোষ বিধান
শকুন আমাদের প্রকৃতির এক অসাধারণ বন্ধু। এদের প্রকৃতির পরিচ্ছন্নতাকর্মী বা প্রাকৃতিক ঝাড়ুদার বলা হয়। মৃত পশুপাখি খেয়ে এরা আমাদের চারপাশ পরিষ্কার রাখে। তবে দুঃখের বিষয়, এই উপকারী পাখিটি আজ মহাবিপন্ন।
প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম শনিবার আন্তর্জাতিক শকুন সচেতনতা দিবস পালিত হয়। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা এবং পরিবেশের পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে শকুনের অতীব গুরুত্ব ও তাদের সংরক্ষণে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে বিশ্বজুড়ে দিনটি উদযাপিত হয়।
প্রকৃতির পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে পরিচিত মহাবিপন্ন এই পাখিটি সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে এবং এর সংরক্ষণে কাজ করাই এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য। ২০০৬ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার এন্ডেঞ্জার্ড ওয়াইল্ডলাইফ ট্রাস্ট এবং যুক্তরাজ্যের হক কনজারভেন্সি ট্রাস্ট প্রথম যৌথভাবে এই উদ্যোগ নেয়। ২০০৯ সাল থেকে এটি বিশ্বব্যাপী একটি সমন্বিত সচেতনতা ক্যাম্পেইন হিসেবে বড় পরিসরে উদযাপন করা শুরু হয়।
প্রকৃতির অতন্ত্র প্রহরী ও প্রধান পরিচ্ছন্নতাকর্মী শকুন আজ বাংলাদেশে ও বিশ্বে মহাবিপন্ন। মৃত প্রাণীর দেহ দ্রুত খেয়ে পরিবেশকে রোগমুক্ত ও গন্ধহীন রাখে এই উপকারী পাখিটি। তবে মানুষের নানা কর্মকান্ড ও অসচেতনতার কারণে আজ এদের অস্তিত্ব মারাত্মক সংকটে পড়েছে।
শকুনের বিলুপ্তির অন্যতম কারণ ছিল গবাদিপশু চিকিৎসায় ডাইক্লোফেনাক ওষুধের ব্যবহার। শকুন পুরোপুরি হারিয়ে গেলে এটি প্রমাণ করবে যে আমাদের খাদ্যশৃঙ্খলে বিষাক্ত রাসায়নিকের প্রভাব কতটা ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। শকুন মাত্র ২০-৩০ মিনিটে একটি বড় মৃতদেহ সম্পূর্ণ খেয়ে সাবাড় করতে পারে। এই প্রাকৃতিক চক্রটি বন্ধ হলে প্রকৃতি তার স্বাভাবিক পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার ক্ষমতা হারাবে।
প্রকৃতির ঝাড়ুদার হিসেবে পরিচিত শকুন হারিয়ে গেলে আমাদের পরিবেশ এক মহাবিপর্যয়ের মুখে পড়বে। শকুন মূলত মৃত পশুপাখি খেয়ে পরিবেশ পরিষ্কার রাখে এবং প্রাকৃতিকভাবে জীবাণু ধ্বংস করে। এদের পেটে থাকা শক্তিশালী এসিড অ্যানথ্রাক্স, জলাতঙ্ক বা ক্ষুরারোগের মতো মারাত্মক জীবাণু ধ্বংস করে দেয়। ফলে মহামারী ছড়াতে পারে না।
শকুন বিলুপ্ত হলে আমাদের পরিবেশে যেসব বড় ধরনের হুমকি তৈরি হবে। মৃত পশুপাখি মাটিতে পচে অ্যানথ্রাক্স, যক্ষ্মা, জলাতঙ্ক এবং কলেরার মতো মারাত্মক রোগ ছড়াবে। শকুনের পাকস্থলীতে থাকা বিশেষ এসিড এসব জীবাণু হজম করে ধ্বংস করে ফেলতে পারে, যা অন্য কোনো প্রাণী পারে না। শকুন না থাকলে মৃতদেহ খাওয়ার জন্য বন্য কুকুর, শিয়াল ও ইঁদুরের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাবে। ফলে মানুষের মাঝে জলাতঙ্ক রোগের সংক্রমণ ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়বে। মৃতদেহ পচে বৃষ্টির পানির সাথে মিশে নদী, নালা এবং ভূগর্ভস্থ পানির উৎসগুলো মারাত্মকভাবে দূষিত করবে।
ডাইক্লোফেনাক ও কিটোপ্রোফেন গবাদি পশুর চিকিৎসায় ব্যবহৃত এই ব্যথানাশক ওষুধগুলো শকুনের জন্য মারাত্মক বিষ। এই ওষুধ দেওয়া পশুর মাংস খেলে শকুনের কিডনি নষ্ট হয়ে যায় এবং তারা মারা যায়। বড় বড় শিমুল, বট বা রেইনট্রি গাছ কেটে ফেলার কারণে শকুনরা বাসা তৈরির জায়গা পাচ্ছে না। এখন মানুষ মৃত পশু খোলা মাঠে না ফেলে মাটিতে পুঁতে ফেলে। এতে শকুনের তীব্র খাদ্য সংকট দেখা দেয়।
বাংলাদেশ সরকার শকুনের জন্য ক্ষতিকর ডাইক্লোফেনাক এবং কিটোপ্রোফেন ওষুধের ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে। শকুনের প্রজনন ও সংরক্ষণের জন্য সিলেট ও সুন্দরবন অঞ্চলকে শকুন নিরাপদ এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে। শকুনের খাদ্য সংকট দূর করতে আইইউসিএন ও বন বিভাগ নির্দিষ্ট স্থানে নিরাপদ খাবার সরবরাহ করে।
শকুনের মতো একটি উপকারী পাখি হারিয়ে গেলে আমাদের পরিবেশ বড় ধরণের হুমকিতে পড়বে। তাই প্রকৃতিকে সুস্থ রাখতে শকুন বাঁচিয়ে রাখা জরুরি।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট












