বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩
বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩

কাজী ইমদাদুল হকের জীবনদর্শন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:০৮ অপরাহ্ণ
কাজী ইমদাদুল হকের জীবনদর্শন

প্রকাশ ঘোষ বিধান

বিংশ শতাব্দীর বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও প্রগতিশীল চিন্তাবিদ কাজী ইমদাদুল হকের জীবনদর্শন মূলত মানবতা, আধুনিক শিক্ষা, যুক্তিবাদ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার ওপর প্রতিষ্ঠিত। তৎকালীন অনগ্রসর ও রক্ষণশীল মুসলিম সমাজকে কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস এবং বংশগত আভিজাত্যের অহংকার থেকে মুক্ত করে একটি শিক্ষিত, প্রগতিশীল ও বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গড়ে তোলাই ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম লক্ষ্য। সাহিত্য ও সমাজসংস্কারমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি বাঙালি মুসলমান সমাজকে আধুনিকতার পথে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

কাজী ইমদাদুল হকের জীবনদর্শনে প্রগতিশীলতা, মানবতাবাদ, সমাজসংস্কার ও যুক্তিনির্ভর আধুনিকতার এক অনন্য সমন্বয় লক্ষ করা যায়। তিনি এমন এক সময়ে সাহিত্যচর্চা ও সমাজসংস্কারে আত্মনিয়োগ করেছিলেন, যখন বাঙালি মুসলমান সমাজের একটি বড় অংশ শিক্ষায় পিছিয়ে ছিল এবং নানা কুসংস্কার ও গোঁড়ামির প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারেনি। তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘আবদুল্লাহ’য় তৎকালীন সমাজের নানা অসংগতি তুলে ধরার পাশাপাশি মানবিক ও প্রগতিশীল সমাজ গঠনের প্রত্যাশা প্রকাশ পেয়েছে।

তাঁর জীবনদর্শনের মূল কেন্দ্রে ছিল মানুষ। ধর্মীয় পরিচয় কিংবা সম্প্রদায়গত বিভেদের ঊর্ধ্বে উঠে প্রকৃত মানুষ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। ‘আবদুল্লাহ’ উপন্যাসে বরিহাটী স্কুলের বিদায়লগ্নে শিক্ষক আবদুল্লাহর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে লেখকের এই মানবতাবাদী দর্শন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—“আশীর্বাদ করি, তোমরা মানুষ হও, প্রকৃত মানুষ হও—যে মানুষ হলে পরস্পর পরস্পরকে ঘৃণা করতে ভুলে যায়, হিন্দু মুসলমানকে, মুসলমান হিন্দুকে…”। এই বক্তব্যে মানুষের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সম্প্রীতির যে আহ্বান রয়েছে, তা তাঁর জীবনদর্শনের অন্যতম ভিত্তি।

তৎকালীন মুসলিম সমাজে প্রচলিত আশরাফ-আতরাফ বিভাজন, বংশগত আভিজাত্যের অহংকার এবং উচ্চ-নিম্ন শ্রেণির কৃত্রিম ভেদাভেদের কঠোর সমালোচনা করেছেন তিনি। তাঁর দৃষ্টিতে মানুষের প্রকৃত মর্যাদা নির্ধারিত হওয়া উচিত তার কর্ম, সততা ও মানবিক গুণাবলির ভিত্তিতে; বংশপরিচয়ের ভিত্তিতে নয়। সমাজে শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের মধ্যে কৃত্রিম বিভাজন দূর করার প্রত্যয় তাঁর সাহিত্যকর্মে বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

পীরপূজা, ছোঁয়াছুঁয়ি, অন্ধ ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং মনগড়া ধর্মীয় ব্যাখ্যার বিরুদ্ধেও তিনি সোচ্চার ছিলেন। তাঁর লেখায় ধর্মের নামে প্রচলিত অন্ধবিশ্বাস ও সামাজিক কুসংস্কারের সমালোচনা উঠে এসেছে। তিনি যুক্তি, বিবেক ও বিচারবুদ্ধির সাহায্যে সমাজের অসংগতিগুলো দূর করার পক্ষে ছিলেন। তাঁর সাহিত্য কেবল সামাজিক ব্যাধির চিত্র তুলে ধরেনি; বরং সেসব থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতেও মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছে।

নারীর অধিকার ও শিক্ষার প্রসারেও কাজী ইমদাদুল হকের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল প্রগতিশীল। তৎকালীন সমাজে অবরোধপ্রথার কারণে নারীদের শিক্ষার সুযোগ ও সামাজিক অংশগ্রহণ সীমিত হয়ে পড়েছিল। নারীদের অন্ধকারে আবদ্ধ রেখে একটি সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়—এ উপলব্ধি তাঁর চিন্তায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছিল। তিনি নারীশিক্ষা ও নারীর মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, সমাজের সামগ্রিক অগ্রগতির জন্য নারীকে শিক্ষিত ও সচেতন করে তোলা অপরিহার্য।

পেশাগত জীবনে শিক্ষাবিদ হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁকে শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে গভীরভাবে সচেতন করেছিল। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, শিক্ষার প্রসার ছাড়া কোনো সমাজের প্রকৃত মুক্তি সম্ভব নয়। তবে তাঁর শিক্ষাভাবনা কেবল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান, যুক্তিবাদী চিন্তা, আত্মমর্যাদা এবং সৎ উপায়ে স্বাবলম্বী হওয়ার মানসিকতা গড়ে তোলাকেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করতেন। বাঙালি মুসলমান সমাজের অগ্রগতির জন্য আধুনিক শিক্ষার প্রসার এবং প্রচলিত চিন্তাধারার ইতিবাচক পরিবর্তন প্রয়োজন বলে তিনি বিশ্বাস করতেন।

কাজী ইমদাদুল হক ঐতিহ্যকে সম্পূর্ণ অস্বীকার না করেও আধুনিক ও প্রগতিশীল হওয়ার পথ দেখিয়েছেন। তাঁর চিন্তায় ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে যুক্তিবাদ ও মানবতার কোনো মৌলিক বিরোধ ছিল না। বরং ধর্মের নামে গড়ে ওঠা কুসংস্কার ও সংকীর্ণতার পরিবর্তে বিবেক, সহমর্মিতা এবং নৈতিকতার চর্চাকে তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। এ কারণে তাঁর সাহিত্যকর্ম একদিকে যেমন তৎকালীন মুসলিম সমাজের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে, অন্যদিকে তেমনি সমাজ পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকেও ধারণ করেছে।

তাঁর সাহিত্যপ্রতিভার স্বীকৃতিস্বরূপ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও ‘আবদুল্লাহ’ উপন্যাসের প্রশংসা করেছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়। এই উপন্যাসে মুসলিম সমাজের অভ্যন্তরীণ সংকট, ধর্মীয় গোঁড়ামি, সামাজিক বৈষম্য এবং আধুনিকতার আকাঙ্ক্ষা যে বাস্তবতার সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে, তা বাংলা সাহিত্যে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

কাজী ইমদাদুল হকের জীবনদর্শনের মূল বাণী—‘মানুষ হও, প্রকৃত মানুষ হও’। এই আহ্বানের মধ্য দিয়ে তিনি মানুষের অন্তর্নিহিত সংকীর্ণতা, কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস দূর করে নৈতিকতা, পরমতসহিষ্ণুতা এবং সহানুভূতিশীলতার ভিত্তিতে সমাজ গঠনের কথা বলেছেন। ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে মানুষের সর্বজনীন পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়ার যে শিক্ষা তিনি দিয়েছেন, তা আজও সমান প্রাসঙ্গিক।

কাজী ইমদাদুল হক তাঁর সাহিত্য ও কর্মের মধ্য দিয়ে বাঙালি মুসলমান সমাজে মুক্তবুদ্ধি, আধুনিক শিক্ষা, যুক্তিবাদ ও মানবতাবাদী চেতনার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তাঁর জীবনদর্শন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, সমাজের প্রকৃত অগ্রগতি কেবল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বিস্তারে সীমাবদ্ধ নয়; এর জন্য প্রয়োজন মানুষের চিন্তা, বিবেক ও মূল্যবোধের পরিবর্তন। সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা, সামাজিক বৈষম্য ও কুসংস্কারমুক্ত মানবিক সমাজ গঠনে তাঁর চিন্তা ও সাহিত্য আজও প্রেরণার উৎস।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

Ads small one

ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে চাঁদা দাবি, কনটেন্ট ক্রিয়েটর মামুন গ্রেপ্তার

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬, ১১:৪৩ পূর্বাহ্ণ
ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে চাঁদা দাবি, কনটেন্ট ক্রিয়েটর মামুন গ্রেপ্তার

পত্রদূত ডেস্ক: স্ত্রীর সঙ্গে ধারণ করা ব্যক্তিগত ও আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে সাতক্ষীরার আলোচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর আব্দুল্লাহ আল মামুনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে করা মামলায় মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) রাতে দেবহাটা উপজেলার চণ্ডীপুর গ্রাম থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তার মামুন চণ্ডীপুর প্রি-ক্যাডেট স্কুলের পরিচালক করিম উল্লাহ মাস্টারের ছেলে। মামলার এজাহারে তার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত ভিডিও ব্যবহার করে ভয়ভীতি প্রদর্শন, টাকা দাবি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপত্তিকর ভিডিও প্রকাশের অভিযোগ আনা হয়েছে।

গত ১ নভেম্বর দেবহাটা উপজেলার নওয়াপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও বর্তমানে সাতক্ষীরার বাসিন্দা সাহেব আলী বাদী হয়ে সাতক্ষীরা সদর থানায় মামলাটি করেন। এতে সখিপুর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি জিসান বাবুলকে প্রধান আসামি, আব্দুল্লাহ আল মামুনকে দ্বিতীয় এবং বাদীর দ্বিতীয় স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস ওরফে মৌসুমীকে তৃতীয় আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও দুই থেকে তিনজনকে আসামি করা হয়েছে।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, পারিবারিক কারণে প্রায় ছয় থেকে সাত মাস আগে সাহেব আলী তার স্ত্রীকে তালাক দেন। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই নারী তাদের দাম্পত্য জীবনের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি ও ভিডিও ধারণ করে রেখেছিলেন। পরবর্তী সময়ে অভিযুক্তরা সেসব ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করে বাদীকে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠান।

এজাহারে বলা হয়, গত ১৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় ভিডিও পাঠিয়ে বাদীকে ভয়ভীতি দেখানো হয়। পরে ২০ অক্টোবর আবার যোগাযোগ করে এক লাখ টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

এ ছাড়া ২৯ অক্টোবর ‘সখিপুর ইউনিয়ন ছাত্রদল’ নামের একটি ফেসবুক আইডি এবং ১ নভেম্বর মামুনের ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি থেকে বাদীর ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করা হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনার পক্ষে ভিডিও, স্ক্রিনশট ও অডিও রেকর্ডিং সংরক্ষিত রয়েছে বলেও দাবি করেছেন বাদী।

সাহেব আলী অভিযোগ করেন, প্রথমে পাঁচ লাখ, পরে তিন লাখ এবং একপর্যায়ে এক লাখ টাকা দাবি করা হয়। পরে ৫০ হাজার টাকায় সমঝোতা হলেও টাকা দেওয়ার পর ব্ল্যাকমেল অব্যাহত থাকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপত্তিকর ভিডিও প্রচার করা হলে তিনি আইনের আশ্রয় নেন।

সাতক্ষীরা সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) জামিল কবির বলেন, পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে করা মামলায় আব্দুল্লাহ আল মামুনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত ও আপত্তিকর ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়সহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে।

সুন্দরবন, নদী ও জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ সাতক্ষীরা, পরিবেশ রক্ষায় বাড়ছে উদ্বেগ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬, ১১:৩৩ পূর্বাহ্ণ
সুন্দরবন, নদী ও জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ সাতক্ষীরা, পরিবেশ রক্ষায় বাড়ছে উদ্বেগ

মোঃ দেলোয়ার হোসেন

প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য, বিস্তীর্ণ বনভূমি, নদ-নদী, খাল-বিল, জলাভূমি ও জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা সাতক্ষীরা। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এ জেলার শ্যামনগর উপজেলায় অবস্থিত। প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ হলেও জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা, নদী-খাল দখল, অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষ ও বৃক্ষনিধনের কারণে জেলার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ক্রমেই হুমকির মুখে পড়ছে।

সাতক্ষীরার সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক সম্পদ সুন্দরবন। শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ, বুড়িগোয়ালিনী, গাবুরা ও পদ্মপুকুরসহ উপকূলীয় এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকা এ বনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ, বন্য শূকর, বানর, কুমির, উদবিড়ালসহ নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল রয়েছে। সুন্দরী, গেওয়া, গরান, কেওড়া ও পশুরসহ বিভিন্ন ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ এ বনের বৈশিষ্ট্য তৈরি করেছে।

সুন্দরবন শুধু বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল নয়, এটি উপকূলীয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক সুরক্ষাবর্ম। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও প্রবল বাতাসের ক্ষয়ক্ষতি কমানোর পাশাপাশি মাছ, কাঁকড়া, মধু ও বনজ সম্পদ আহরণের মাধ্যমে বহু মানুষের জীবিকার উৎস হিসেবে কাজ করছে।

জেলার প্রকৃতি ও অর্থনীতির সঙ্গে ইছামতী, কপোতাক্ষ, বেতনা, মরিচ্চাপ ও খোলপেটুয়াসহ বিভিন্ন নদ-নদী ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একসময় এসব নদীতে দেশীয় মাছের প্রাচুর্য ছিল। নদীর পানি কৃষিকাজ, নৌযান চলাচল ও মৎস্য আহরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। কিন্তু বর্তমানে পলি জমে নদীর নাব্যতা হ্রাস, অবৈধ দখল, অপরিকল্পিত বাঁধ ও দূষণের কারণে অনেক নদী ও খালের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সাতক্ষীরার ইছামতী, কপোতাক্ষ ও বেতনা নদীর ৩০২ জন অবৈধ দখলদার শনাক্তের তথ্য উঠে এসেছে। নদীর জায়গা দখল করে ঘরবাড়ি, মাছের ঘের, কৃষিজমি ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে।

সাতক্ষীরা শহরের প্রাণসায়ের খালও দীর্ঘদিন ধরে দখল ও দূষণের শিকার। বেতনা ও মরিচ্চাপ নদীর সঙ্গে সংযুক্ত এ খাল শহরের পানি নিষ্কাশন ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। খালটির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় শহরের জলাবদ্ধতা পরিস্থিতিও জটিল হয়ে উঠছে।

উপকূলীয় সাতক্ষীরার অন্যতম বড় পরিবেশগত সংকট লবণাক্ততা। শ্যামনগর, আশাশুনি, কালিগঞ্জ ও দেবহাটার বিভিন্ন এলাকায় মাটি ও পানির লবণাক্ততা কৃষি উৎপাদন এবং সুপেয় পানির প্রাপ্যতাকে প্রভাবিত করছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে কৃষি বিভাগের তথ্যের বরাতে বলা হয়, সাতক্ষীরার প্রায় ১ লাখ ৫৩ হাজার হেক্টর জমি বিভিন্ন মাত্রার লবণাক্ততায় আক্রান্ত। এর মধ্যে চিংড়ি চাষের জমিও রয়েছে।

লবণাক্ততার কারণে অনেক এলাকায় ধান, শাকসবজি ও অন্যান্য ফসল উৎপাদন কঠিন হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে মিঠাপানির পুকুর ও জলাশয়ের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে দেশীয় মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

জেলার আরেকটি বড় সমস্যা জলাবদ্ধতা। অতিবৃষ্টি, নদীর নাব্যতা সংকট, খাল ভরাট, অপরিকল্পিত মাছের ঘের এবং পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বর্ষা মৌসুমে বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।

২০২৬ সালের জুলাইয়ে টানা বৃষ্টিতে সাতক্ষীরা পৌরসভা ও সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ১ জুলাই থেকে ২০ জুলাই সকাল পর্যন্ত জেলায় ৪৬৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। ওই সময় প্রায় ৬ হাজার হেক্টর আউশ ধান ও সবজিক্ষেত পানিতে তলিয়ে যাওয়ার তথ্য জানায় কৃষি বিভাগ।

অন্যদিকে আশাশুনি ও শ্যামনগরের বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙন এবং বেড়িবাঁধের ঝুঁকি উপকূলীয় জনপদের মানুষের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাঁধ ভেঙে লবণাক্ত পানি লোকালয়ে প্রবেশ করলে বসতবাড়ি, কৃষিজমি, পুকুর ও মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সুন্দরবনের বাইরেও সাতক্ষীরার গ্রামীণ এলাকায় রয়েছে নানা প্রজাতির পাখি, সরীসৃপ, উভচর প্রাণী ও দেশীয় জলজ প্রাণী। পুকুর, বিল, খাল, ধানক্ষেত ও গাছপালা এসব প্রাণীর আবাসস্থল। কিন্তু জলাশয় ভরাট, নির্বিচারে গাছ কাটা, কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার ও প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে তাদের স্বাভাবিক আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে। এতে স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।

উপকূলীয় জেলা হওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও সাতক্ষীরায় বিশেষভাবে অনুভূত হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, নদীভাঙন ও লবণাক্ততা এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।

২০২৬ সালের ২৭ অক্টোবর প্রকাশিত বাসসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাতক্ষীরার প্রায় ১৮ থেকে ২০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। বিশেষ করে কৃষক, জেলে, দিনমজুর ও উপকূলীয় এলাকার নারীরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।

এ পরিস্থিতিতে জেলার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। সুন্দরবনের বনজ সম্পদ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি ইছামতী, কপোতাক্ষ, বেতনা, মরিচ্চাপ ও খোলপেটুয়াসহ সব নদ-নদী ও খাল দখলমুক্ত করতে হবে। প্রাণসায়ের খালসহ শহর ও গ্রামের জলাশয় দূষণমুক্ত করে স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হবে।

একই সঙ্গে অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষ নিয়ন্ত্রণ, কৃষিজমি ও মিঠাপানির উৎস সংরক্ষণ, দেশীয় মাছের প্রজননক্ষেত্র রক্ষা, পরিকল্পিত বনায়ন এবং প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। উপকূলীয় এলাকায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নত করা এবং লবণসহিষ্ণু কৃষির প্রসারও প্রয়োজন।

সাতক্ষীরার প্রকৃতি শুধু সৌন্দর্যের আধার নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে জেলার মানুষের খাদ্য, অর্থনীতি, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা। সুন্দরবন, নদ-নদী, খাল-বিল, কৃষিজমি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা না গেলে দীর্ঘমেয়াদে পুরো জনপদের পরিবেশ ও অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এ জন্য প্রশাসন, বন বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড, কৃষি ও মৎস্য বিভাগ, জনপ্রতিনিধি, পরিবেশবাদী সংগঠন এবং সাধারণ মানুষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। উন্নয়নের নামে প্রকৃতির ক্ষতি না করে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখেই উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। কারণ, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা গেলে নিরাপদ থাকবে সাতক্ষীরার পরিবেশ, সুরক্ষিত হবে মানুষের জীবন-জীবিকা।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল ডেমোক্র্যাটরা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬, ১১:২৫ পূর্বাহ্ণ
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল ডেমোক্র্যাটরা

আন্তজার্তিক ডেস্ক: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। ১০০ আসনের সিনেটে প্রয়োজনীয় ৫১টি আসন নিশ্চিত করে দলটি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টি পেয়েছে ৩৯টি আসন। বাকি আসনগুলোর ফলাফল এখনো ঘোষণা হয়নি।

বুধবার (৪ নভেম্বর) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার নির্বাচনি ফলাফল পর্যবেক্ষণকারী লাইভ ট্র্যাকার থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

সিনেটের পাশাপাশি নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদেও এগিয়ে রয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। ৪৩৫ আসনের এই কক্ষে দলটি ১৬৮টি আসনে জয় পেয়েছে এবং আরও ৯৩টি আসনে এগিয়ে রয়েছে। অন্যদিকে রিপাবলিকানরা জয় পেয়েছে ১০৫টি আসনে এবং এগিয়ে রয়েছে ৫৮টিতে। প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে প্রয়োজন ২১৮টি আসন। ফলে দুই কক্ষেই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে ডেমোক্র্যাটদের।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি, মূল্যস্ফীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে জনঅসন্তোষ নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের এগিয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ। সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোয় ট্রাম্প প্রশাসনের আইন প্রণয়ন, গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ ও নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বাধার মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলে ট্রাম্প প্রশাসনের বাকি মেয়াদে রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়বে। ফলে প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের ওপর নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিরোধী দল আরও শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারবে।