জিআই স্বীকৃত হিমসাগর ও সাতক্ষীরার আম পর্যটন: বৈশ্বিক মডেল ও আমাদের করণীয়
মো. মামুন হাসান
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে অবস্থিত সাতক্ষীরা জেলা এখন কেবল সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার হিসেবেই নয়, বরং দেশের ‘আর্লি ম্যাঙ্গো বাস্কেট’ বা আগাম আমের ভা-ার হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পাচ্ছে। প্রতি বছর মে মাসের শুরুতেই যখন রাজশাহী বা চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম বাগানগুলো কেবল পরিপক্ব হওয়ার অপেক্ষায় থাকে, সাতক্ষীরার বাজারে তখন হিমসাগর ও গোবিন্দভোগের সুবাসে ম ম করে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সাতক্ষীরায় প্রায় ৫ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে বাণিজ্যিকভাবে আমের আবাদ হচ্ছে, যা থেকে বার্ষিক উৎপাদনের পরিমাণ ছাড়িয়ে যাচ্ছে ৫০ হাজার মেট্রিক টন। এই বিপুল উৎপাদন কেবল স্থানীয় বাজারের চাহিদা মেটাচ্ছে না, বরং গত কয়েক বছরে ইউরোপের বাজারে রপ্তানি হওয়া বাংলাদেশের মোট আমের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই জোগান দিচ্ছে এই জেলা। সাতক্ষীরার এই প্রাকৃতিক ও বাণিজ্যিক সুবিধাকে পুঁজি করে ‘আম পর্যটন’ বা ‘এগ্রো-ট্যুরিজম’ এর যে বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে, তা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে দেশের পর্যটন মানচিত্রে সাতক্ষীরা একটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দিকে তাকালে দেখা যায় যে তারা কীভাবে একটি নির্দিষ্ট কৃষিপণ্যকে পর্যটনের প্রধান আকর্ষণে পরিণত করেছে। উদাহরণস্বরূপ, থাইল্যান্ডের কথা বলা যায়। দেশটিতে প্রতি বছর বিশেষ করে রায়ং এবং চন্তাবুরি প্রদেশে ‘ফ্রুট ফেস্টিভ্যাল’ আয়োজন করা হয়, যেখানে হাজার হাজার বিদেশি পর্যটক কেবল হাতে পাড়া ফল খাওয়ার অভিজ্ঞতার জন্য ভিড় করেন। একইভাবে জাপানের হোক্কাইডো অঞ্চলে বিশেষ জাতের তরমুজ ও চেরি ফলকে কেন্দ্র করে বিলাসবহুল পর্যটন প্যাকেজ পরিচালনা করা হয়। ভারতের রতœাগিরিতে আলফনসো আমকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বিশাল এক পর্যটন শিল্প, যেখানে পর্যটকরা বাগানের ভেতরেই রিসোর্টে রাত কাটান। সাতক্ষীরায় ঠিক এই মডেলটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব। সাতক্ষীরার হিমসাগর আম ইতোমধ্যে জিআই পণ্য হিসেবে বিশ্বস্বীকৃতি পেয়েছে, যা মার্কেটিংয়ের ক্ষেত্রে আমাদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। পর্যটকদের জন্য যদি এমন একটি প্যাকেজ তৈরি করা যায় যেখানে তারা সকালে সুন্দরবনে ভ্রমণ করবেন এবং দুপুরে কোনো প্রাচীন আম বাগানে বসে খাঁটি ও বিষমুক্ত হিমসাগরের স্বাদ নেবেন, তবে তা পর্যটন খাতে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে।
সাতক্ষীরাকে একটি আন্তর্জাতিক আম পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে আমাদের মার্কেটিং পলিসিতে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। বর্তমানের গতানুগতিক বাজার ব্যবস্থার বদলে ‘এক্সপেরিয়েন্স ট্যুরিজম’ বা অভিজ্ঞতাভিত্তিক পর্যটনে জোর দিতে হবে। এখানে ‘ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি’ পদ্ধতি প্রবর্তন করা জরুরি। প্রতিটি বড় বাগানের জন্য আলাদা কিউআর কোড থাকবে, যা স্ক্যান করলে পর্যটক জানতে পারবেন বাগানটির অবস্থান, গাছের বয়স এবং আমটি কত তারিখে পাড়া হয়েছে। এটি ক্রেতার মনে আমটি সম্পর্কে শতভাগ আস্থা তৈরি করবে। এছাড়া সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার ও ট্রাভেল ব্লগারদের মাধ্যমে ‘ম্যাঙ্গো ট্রেইল’ ক্যাম্পেইন চালানো যেতে পারে। তরুণ উদ্যোক্তারা আম বাগানগুলোতে ‘পিক ইউর ওউন ফ্রুট’ বা নিজের আম নিজে পাড়ার সুযোগ সংবলিত প্যাকেজ চালু করতে পারেন। এর ফলে পর্যটকরা কেবল পণ্য কিনছেন না, বরং তারা একটি স্মৃতির অংশ হচ্ছেন, যা মার্কেটিংয়ের ভাষায় সবচাইতে শক্তিশালী প্রচার।
পরিসংখ্যান বলছে, সাতক্ষীরায় বছরে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার আমের লেনদেন হয়। কিন্তু এই বিপুল অর্থের একটি বড় অংশ মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে চলে যায়। আম পর্যটন চালু হলে পর্যটক সরাসরি কৃষকের বাগান থেকে আম কিনবেন, যার ফলে কৃষক ন্যায্য মূল্য পাবেন এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে সরাসরি অর্থের প্রবাহ বাড়বে। এই শিল্পকে এগিয়ে নিতে একটি সমন্বিত ‘ম্যাঙ্গো করিডোর’ নির্মাণ করা প্রয়োজন। সাতক্ষীরার তালা থেকে শুরু করে কলারোয়া, দেবহাটা ও কালীগঞ্জ পর্যন্ত বিস্তৃত আম বাগানগুলোকে এক সুতোয় গেঁথে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় রাস্তাঘাট উন্নয়ন, পর্যটকদের জন্য মানসম্মত স্যানিটেশন ও নিরাপদ আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে সাতক্ষীরায় যদি একটি ‘ম্যাঙ্গো ট্যুরিজম ভিলেজ’ স্থাপন করা যায়, যেখানে আমের মিউজিয়াম, আধুনিক হিমাগার এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র থাকবে, তবে এটি বিদেশের আমদানিকারকদেরও আকৃষ্ট করবে।
সবশেষে, সাতক্ষীরার এই আগাম আম কেবল একটি ফল নয়, এটি আমাদের জাতীয় গৌরবের প্রতীক। রাজশাহী বা চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ হলেও সাতক্ষীরার আম বাণিজ্যে ও আধুনিকতায় অনন্য। এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে জেলা প্রশাসন, পর্যটন কর্পোরেশন এবং কৃষি বিভাগকে একযোগে কাজ করতে হবে। উন্নত হিমাগার সুবিধা এবং বিমানবন্দর সংলগ্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকলে সাতক্ষীরার আম ও পর্যটন শিল্প থেকে প্রতি বছর কয়েক বিলিয়ন ডলার আয় করা সম্ভব। সাতক্ষীরাকে ‘গ্লোবাল ম্যাঙ্গো হাব’ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য এখনই সঠিক সময়, যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। লেখক: ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট












