ধরিত্রী আমাদের অস্তিত্বের একমাত্র আধার
প্রকাশ ঘোষ বিধান
ধরিত্রী মানুষের বসবাসের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটিই আমাদের একমাত্র পরিচিত আশ্রয়স্থল। ধরিত্রী আমাদের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় নির্মল বায়ু, পানি, খাদ্য এবং প্রাকৃতিক উপাদান সরবরাহ করে।
ধরিত্রী শব্দের অর্থ হলো পৃথিবী, ধরণী বা ধরা। এটি একটি সংস্কৃত শব্দ যার আক্ষরিক অর্থ হলো যা ধারণ করে বা চরাচর ধারণকারী। পৃথিবীর সমার্থক শব্দ হিসেবে: ধরণী, অবনী, বসুধা, বসুন্ধরা বা ক্ষিতি অর্থে এটি ব্যবহৃত হয়।
মহাবিশ্বে এ পর্যন্ত কেবল পৃথিবীই প্রাণের অস্তিত্ব নিশ্চিত করেছে। এটি আমাদের খাদ্য, আশ্রয় এবং বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় উপাদান সরবরাহ করে। ধরিত্রী বা আমাদের পৃথিবী আমাদের অস্তিত্বের একমাত্র আধার, তাই এর গুরুত্ব অপরিসীম। ধরিত্রী আমাদের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় বায়ু, পানি, খাদ্য এবং বাসস্থান প্রদান করে।
ধরিত্রী আমাদের খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি এবং শ্বাস নেওয়ার জন্য অক্সিজেন সরবরাহ করে। সাগর, নদী, পাহাড় এবং বনভূমি নিয়ে গঠিত ধরিত্রী মানুষের বসবাসের উপযোগী পরিবেশ বজায় রাখে। প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ধরিত্রী কাজ করে। পাহাড়-পর্বত ও বন উজাড় করলে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটে। ধরিত্রী আমাদের ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ, অক্সিজেন সমৃদ্ধ বায়ুম-ল এবং মিঠা পানির আধার হিসেবে কাজ করে, যা সব ধরণের প্রাণের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য।
পৃথিবীকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার জন্য সর্বসম্মতিক্রমে ধার্য করা একটি দিবসই হলো ধরিত্রী দিবস। ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের এই দিনে মার্কিন সেনেটর গেলর্ড নেলসন ধরিত্রী দিবসের প্রচলন করেন। ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে সানফ্রান্সিস্কোতে ইউনেস্কো সম্মেলনে শান্তি কর্মী জন ম্যাককনেল পৃথিবী মায়ের সম্মানে একটা দিন উৎসর্গ করতে প্রস্তাব করেন এবং শান্তির ধারণা থেকে, উত্তর গোলার্ধে বসন্তের প্রথম দিন হিসেবে ১৯৭০ সালে ২১ মার্চ প্রথম এই দিনটা উদযাপিত হয়। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় এই দিনই পরে একটা পরিঘোষণায় অনুমোদিত হয়, যেটা লিখেছিলেন ম্যাককনেল এবং মহাসচিব উ থান্ট জাতি সংঘ সনদে স্বাক্ষর করেছিলেন। এক মাস পর একটা পরিবেশগত শিক্ষামূলক দিন হিসেবে ১৯৭০ সালের ২২ এপ্রিল একটা আলাদা ধরিত্রী দিবসের অবতারণা করেন যুক্তরাষ্ট্র সেনেটর গেলর্ড নেলসন।
বিশ্ব ধরিত্রী দিবস প্রতি বছর ২২ এপ্রিল পরিবেশ রক্ষার সমর্থনে বিশ্বজুড়ে পালিত হয়। ধরিত্রী দিবস পালনের উদ্দেশ্য পৃথিবী এবং এর প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা করা এবং জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা। কারণ জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ দূষণ আমাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি। বর্তমানে পরিবেশ দূষণ, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং বন উজাড়ের কারণে এই বাসযোগ্য গ্রহটি হুমকির মুখে পড়েছে। তাই আমাদের এই পৃথিবীকে রক্ষায় সচেতন হওয়া জরুরি।
মানুষ সৃষ্টির শুরু থেকেই প্রকৃতির সবকিছু একপক্ষীয়ভাবে ভোগ করে আসছে, মানুষ তার চাহিদার সীমানাকে নির্দিষ্ট করতে ভুলে গেছে। মানুষ তার ভোগ-বিলাসপূর্ণ অফুরন্ত চাহিদা আর উন্নত জীবনযাপনের উদ্দেশ্যে নির্বিচারে বৃক্ষনিধন বন উজাড় করছে,পাহাড় কেটে বসতি গড়ে তোলা ও সমুদ্র সৈকতে আবাসিক এলাকা করছে। কলকারখানার বৃদ্ধি, গ্রিনহাউস গ্যাসসহ অন্যান্য ক্ষতিকারক গ্যাসের নিঃসরণ, ক্ষতিকারক কেমিক্যালের ব্যবহারসহ নানা ধ্বংসাত্মক কাজ করায় ফল হিসেবে মাটি, পানি, বায়ুদূষণ, পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি, মেরু অঞ্চলের বরফ গলে যাচ্ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বরফ গলে সাগরের উচ্চতা বাড়ছে। ফলে ইতিমধ্যে তলিয়ে গেছে বিশ্বের বহু জনপদ। বিশ্বে এখন এই যে ঘন ঘন ভূমিকম্প, খরা, অতিবৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢল নামছে তা মানুষে অপরিণামদর্শিতার কারণে ঘটছে। বিশ্বের অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি কার্বনের নিঃসরণ না কমে বরং তা বাড়ছে।
ধরিত্রীর বয়স আনুমানিক ৪৫০ কোটি বছর। দীর্ঘ পরিক্রমায় ধরিত্রী যেমন সুগঠিত হয়েছে, ধারণ করেছে প্রাণ-অপ্রাণসহ নানা প্রাকৃতিক উপাদান। ধরিত্রী নিজস্ব নিয়মশৃঙ্খলে আবদ্ধ। ধরিত্রীর এ শৃঙ্খল তার প্রতিটি উপাদানকে একটি একক নিয়মে আবদ্ধ করে রাখে। এ নিয়মের ব্যতিক্রম হলেই দেখা দেয় বিপর্যয়। তাই যখন ধরিত্রীর এই শৃঙ্খলে কোনোভাবে আঘাত আসে, তখন তার প্রভাব প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানের ওপর পড়ে। প্রকৃতি যখন বিরূপ হয় মানুষ তখন অসহায় হয়ে পড়ে। পৃথিবী সুস্থ না থাকলে মানুষও বেঁচে থাকার সুযোগ নেই। তাই অসুস্থ পৃথিবীকে ধীরে ধীরে সুস্থ অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে। তার জন্য মানুষকে পরিবেশ সুরক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
প্রতি বছর ২২ এপ্রিল বিশ্বব্যাপী ধরিত্রী দিবস পালন করা হয়, যার মূল লক্ষ্য পরিবেশ রক্ষা এবং পৃথিবীর প্রতি দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি করা। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, পরিবেশের ভারসাম্য বজায় না থাকলে মানব সভ্যতা হুমকির মুখে পড়বে। পরিবেশ রক্ষায় জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে সবুজ বা নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, যা পৃথিবীর ভবিষ্যৎ সুরক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
পৃথিবী হলো আমাদের একমাত্র ঘর এবং এর সুরক্ষা নিশ্চিত করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। কারণ এর ওপরই আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নির্ভরশীল। আমাদের বেঁচে থাকার জন্য ধরিত্রীর সুস্থ থাকা জরুরি। ধরিত্রী দিবস পালনের মাধ্যমে প্রতিবছর এই সচেতনতা ও দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়। মানুষ প্রকৃতির সন্তান। প্রকৃতি যেন মাতৃশ্রদ্ধা পায়। তাই আমাদের প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানকে সম্মান করা উচিত।
পৃথিবীর অস্তিত্বসংকটের জন্য প্রকৃতি দায়ী নয়, মানুষ দায়ী। আর তাই পৃথিবী রক্ষার দায়িত্বও আমাদের নিতে হবে। কেন পৃথিবীর ক্ষতি হচ্ছে এবং কীভাবে তা কমানো যায় তা জানার জন্য সচেতনতা প্রয়োজন। ধরিত্রীকে রক্ষায় কার্বন নিঃসরণ কমানো, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় মানুষকে সচেতন হতে হবে। লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট









