পর্যটনের উন্নয়নে সময়ের মূল্য বুঝতে হবে
মো. মামুন হাসান
পর্যটনের কথা উঠলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে কক্সবাজারের সমুদ্র, সুন্দরবনের নৈসর্গিক সৌন্দর্য, সিলেটের চা বাগান, সাজেকের পাহাড় কিংবা দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির নিদর্শন। পর্যটনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হলে সাধারণত অবকাঠামো, বিনিয়োগ, যোগাযোগব্যবস্থা ও প্রচারণার বিষয়গুলোই বেশি গুরুত্ব পায়। কিন্তু পর্যটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়। সেটি হলো সময়।
একজন পর্যটকের কাছে সময়ই সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। তিনি কোনো গন্তব্যে শুধু দৃশ্য দেখতে যান না, সীমিত সময় ও অর্থ ব্যয় করে একটি অভিজ্ঞতা অর্জন করতে যান। সেই অভিজ্ঞতা কতটা স্বস্তিদায়ক, আনন্দদায়ক ও স্মরণীয় হবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করে তার সময় কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে তার ওপর। একটি গন্তব্য যতই আকর্ষণীয় হোক, সেখানে পৌঁছাতে যদি দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকতে হয়, প্রয়োজনীয় তথ্য পেতে ভোগান্তি হয়, পরিবহন ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা থাকে কিংবা টিকিট, খাবার ও থাকার ব্যবস্থা করতে অযথা সময় ব্যয় করতে হয়, তাহলে সেই গন্তব্যের সৌন্দর্যও অনেকটা ম্লান হয়ে যায়।
অর্থ হারালে তা আবার উপার্জন করা সম্ভব। কোনো সেবা ভালো না লাগলে বিকল্প সেবা নেওয়ার সুযোগও থাকে। কিন্তু একবার যে সময় চলে যায়, তা আর ফিরে আসে না। তাই পর্যটকের সময়ের প্রতি সম্মান দেখানো মানে তার অর্থ, পছন্দ ও ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিও সম্মান দেখানো।
পর্যটনসেবার মান নির্ধারণে এই বিষয়টি আমাদের আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিশ্বের সফল পর্যটন গন্তব্যগুলো শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বা আকর্ষণীয় স্থাপনার ওপর নির্ভর করে না। তারা পর্যটকের পুরো যাত্রাপথকে গুরুত্ব দেয়। একজন পর্যটক গন্তব্যে যাওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় তথ্য পান, যাতায়াতের সময় সম্পর্কে ধারণা নিতে পারেন, অনলাইনে বুকিং করতে পারেন এবং সেখানে পৌঁছে সহজেই প্রয়োজনীয় সেবা গ্রহণ করতে পারেন। ফলে তার মূল্যবান সময় অনিশ্চয়তা, অপেক্ষা ও অপ্রয়োজনীয় জটিলতায় নষ্ট হয় না।
বাংলাদেশের পর্যটন উন্নয়নের ক্ষেত্রেও এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি। শুধু নতুন পর্যটনকেন্দ্র, রিসোর্ট কিংবা সড়ক নির্মাণ করলেই পর্যটন শিল্প শক্তিশালী হবে না। একজন পর্যটক কীভাবে একটি গন্তব্যে পৌঁছাবেন, কত সময় লাগবে, কোথায় থাকবেন, কোথায় খাবেন, কোন কোন স্থান ঘুরে দেখতে পারবেন এবং সীমিত সময়ে কীভাবে সর্বোচ্চ অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবেন, এসব বিষয়ও পর্যটন পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত।
এ ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়ানো দরকার। একটি পর্যটন গন্তব্যের যাতায়াত ব্যবস্থা, প্রবেশমূল্য, থাকার সুবিধা, খাবারের স্থান, দর্শনীয় স্থান, স্থানীয় গাইড, জরুরি যোগাযোগ ও অনলাইন বুকিংয়ের তথ্য যদি সহজে এক জায়গায় পাওয়া যায়, তাহলে পর্যটকের অনিশ্চয়তা অনেকটাই কমে যায়। পাশাপাশি পর্যটনকেন্দ্রে কার্যকর সাইনেজ, তথ্যকেন্দ্র, পার্কিং, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা ও গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নও পর্যটকের মূল্যবান সময় সাশ্রয় করতে পারে।
পর্যটকের সময় ব্যবস্থাপনার সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণেরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। একটি পর্যটন এলাকার স্থানীয় মানুষ যদি পর্যটনসেবায় দক্ষ ও প্রশিক্ষিত হন, তাহলে পর্যটক দ্রুত প্রয়োজনীয় তথ্য ও সেবা পেতে পারেন। স্থানীয় গাইড, পরিবহনকর্মী, হোটেল ও রেস্তোরাঁর কর্মী এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা যদি পর্যটকের সময়ের মূল্য বোঝেন, তাহলে পুরো গন্তব্যের অভিজ্ঞতাই বদলে যেতে পারে।
পর্যটকের সময়কে দক্ষতার সঙ্গে ব্যবস্থাপনা করা স্থানীয় অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। একজন পর্যটক যদি সীমিত সময়ের মধ্যে বেশি কিছু দেখতে ও করতে পারেন, তাহলে তার ব্যয়ের সুযোগও বাড়ে। তিনি স্থানীয় খাবার গ্রহণ করতে পারেন, স্থানীয় পণ্য কিনতে পারেন, গাইড নিতে পারেন কিংবা অতিরিক্ত এক রাত অবস্থান করতে পারেন। ফলে পর্যটকের সময়ের সঠিক ব্যবস্থাপনা শুধু তার অভিজ্ঞতা উন্নত করে না, স্থানীয় অর্থনীতিকেও গতিশীল করে।
অন্যদিকে সময়ের অপচয় পর্যটন অর্থনীতির জন্য এক ধরনের অদৃশ্য ক্ষতি। যানজট, দীর্ঘ অপেক্ষা, তথ্যের ঘাটতি, পরিবহন সংকট কিংবা সেবার ধীরগতি পর্যটকের ব্যয়ের সুযোগ কমিয়ে দেয়। আরও বড় বিষয় হলো, একটি খারাপ অভিজ্ঞতা তাকে ভবিষ্যতে সেই গন্তব্যে পুনরায় আসতে নিরুৎসাহিত করতে পারে। তার নেতিবাচক অভিজ্ঞতা অন্য সম্ভাব্য পর্যটকদের মধ্যেও প্রভাব ফেলতে পারে। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে একটি পর্যটন গন্তব্যের ভালো বা খারাপ অভিজ্ঞতা খুব দ্রুত অনেক মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
তাই আমাদের ভাবতে হবে, আমরা কি শুধু পর্যটকের জন্য একটি সুন্দর গন্তব্য তৈরি করছি, নাকি একটি সুন্দর সময়ও তৈরি করছি। একটি স্থান প্রাকৃতিকভাবে যতই আকর্ষণীয় হোক, সেখানে যদি পর্যটকের সময়ের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে সেই সৌন্দর্য পূর্ণাঙ্গ পর্যটন অভিজ্ঞতায় রূপ নেয় না। বাংলাদেশের পর্যটন উন্নয়নকে তাই শুধু অবকাঠামো নির্মাণ ও প্রচারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। পর্যটকের পুরো যাত্রাপথকে বিবেচনায় নিয়ে একটি সমন্বিত, নিরাপদ ও সময়বান্ধব পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। একজন পর্যটক কখন কোথায় যাবেন, কত সময় ব্যয় করবেন এবং কীভাবে স্বল্প সময়ে সর্বোচ্চ অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরবেন, সেই পরিকল্পনাও পর্যটন ব্যবস্থাপনার অংশ হওয়া প্রয়োজন।
আমাদের প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদের কোনো ঘাটতি নেই। কক্সবাজার থেকে সুন্দরবন, পাহাড় থেকে নদী, প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে গ্রামীণ জীবন ও লোকসংস্কৃতি, সব মিলিয়ে বাংলাদেশের পর্যটনের সম্ভাবনা বিস্তৃত। এখন প্রয়োজন এসব সম্পদকে দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পর্যটকের জন্য সহজ, স্বস্তিদায়ক ও সময়বান্ধব অভিজ্ঞতায় রূপ দেওয়া।
শেষ পর্যন্ত একজন পর্যটক হয়তো কোনো গন্তব্যের সব ছবি মনে রাখবেন না, কিন্তু সেখানে তিনি কেমন সময় কাটিয়েছেন, সেই অনুভূতি মনে রাখবেন। একটি দেশের পর্যটন ব্যবস্থা কতটা উন্নত, তা শুধু পর্যটনকেন্দ্রের সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না। একজন পর্যটক সেখানে কতটা সহজে, নিরাপদে এবং স্বস্তিতে সময় কাটাতে পারছেন, সেটিও পর্যটন উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
বাংলাদেশকে যদি একটি শক্তিশালী ও প্রতিযোগিতামূলক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়, তাহলে পর্যটন সম্পর্কে আমাদের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনতে হবে। পর্যটনকে শুধু গন্তব্যকেন্দ্রিক না দেখে সময় ও অভিজ্ঞতাকেন্দ্রিক করে তুলতে হবে। কারণ পর্যটকের সময় সীমিত, কিন্তু সেই সময়ের অভিজ্ঞতা দীর্ঘস্থায়ী।
পর্যটন উন্নয়নের তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়া উচিত, আমরা পর্যটকের সময়কে কতটা মূল্যবান করে তুলতে পারছি। এই প্রশ্নের উত্তরই অনেকাংশে নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ শুধু একটি পর্যটন গন্তব্য হিসেবে পরিচিত হবে, নাকি একটি স্মরণীয় পর্যটন অভিজ্ঞতার দেশ হিসেবে বিশ্বে নিজের অবস্থান তৈরি করতে পারবে।
লেখক: মো. মামুন হাসান, ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।









