শ্যামনগর প্রতিনিধি: ‘আমাদের বাড়ি অনেক দুরে, প্রায় দুই থেকে আড়াই কিলোমিটার কাঁদা ঠেলে স্কুলে আসতে হয়। পথে খুব কাঁদা বিধায় স্কুলে এসে তাদের দিয়ে যায়, আবার নিয়েও যায়। অন্য সবার মত আমার বাচ্চাডাও দুই সেট জামা প্যান্ট নিয়ে স্কুলে আসে।
বিদ্যালয় পরিদর্শনে আসা উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে পেয়ে কথাগুলো বলেন শ্যামনগর উপজেলার সুন্দরবন তীরবর্তী মরাগাং গ্রামের নমিতা রানী মন্ডল। ত্রিশোর্ধ্ব বয়সী এ নারী আরও বলেন তার ছেলে ধৃতরাজ মন্ডল প্রথম শ্রেণীর ছাত্র। স্কুলে আসা ও যাওয়ার কাজে এক সেট এবং ক্লাসে পাঠ গ্রহণের সময় অপর সেট জামা প্যান্ট ব্যবহার করতে হয় তার।
প্রায় অভিন্ন কথা শোনায় একই গ্রামের প্রিয়াংকা মন্ডল। অনামিকা ও মিহির নামে নিজের দুই সন্তানকে বিদ্যালয়ে পৌছে দিতে আসা এ নারীর দাবি ‘কাঁদার জন্য বাচ্চারা স্কুলে আসতে চাই না। বাধ্য হয়ে সাথে করে নিয়ে আসার পাশাপাশি ছুটির সময় পুনরায় এসে নিয়ে যেতে হয়’। এছাড়া দুই সেট জামা কাপড় না থাকলে স্কুলে এসে কেউ ক্লাস করতে পারে না বলেও দাবি করেন তিনি।
স্কুলে যাতায়াত নিয়ে দুর্ভোগের এমন করুন বর্ণনা শুধু এই দু’জন অভিভাবকের কন্ঠে উচ্চারিত হয়নি। বরং দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্র হোসাইন ও তৃতীয় শ্রেণীর খাদিজাসহ আরও অসংখ্য ক্ষুদে ছাত্র-ছাত্রী আর অভিভাবকদের দাবি বর্ষাকালে স্কুলে আসতে ছাত্র-ছাত্রীদের অনেক কষ্ট পোহাতে হয়।
বই খাতা আর জামা প্যান্ট কাঁদায় লেপ্টে যায়। ক্ষুদে শিক্ষার্থীর ভাষ্য স্কুলে যাতায়াতের একমাত্র রাস্তা চলে গেছে উপকুল রক্ষা বাঁধের উপর দিয়ে। কিন্তু ইটের সোলিং করা সেই রাস্তা ভেঙে এবড়ো-থেবড়ো হওয়ার কারনে স্বাভাবিক চলাচল করা যায় না। সামান্য বৃষ্টি হলে গোটা রাস্তা চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের অন্তত দুই সেট পোশাক নিয়ে স্কুলে আসতে হয়। রাস্তার দুরাবস্থার কারনে তাদেরই অনেক সহপাঠী বর্ষাকালে স্কুলে আসতে চায় না বলেও দাবি ক্ষুদে অনেক শিক্ষার্থীর।
দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্র মরাগাং গ্রামের হোসাইনের ভাষ্য, আমাদের রাস্তা অনেক রারাপ, আমাদের আসিত গে বই-টই ভিজে যায়। আমাদের আসতি অনেক কষ্ট হয়’। খাদিজা আক্তার জানায়, ‘আমি প্রথম ওয়ানে পড়ি, স্কুলে আসতে গেলি আমার জামা-কাপড় কাঁদাতে ভিজে যায়’। প্রায় একই কথা বলে তুলসী মন্ডলের মেয়ে হিয়া, নুর হোসেনের ছেলে জাহিদসহ আরও কয়েক শিশু।
বিদ্যালয়ে আসতে ছোট ছোট শিশুরা রীতিমত সংগ্রাম করছে- উল্লেখ করে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অনিমেষ কুমার মৃধা জানান রাস্তা এত খারাপ যে অভিভাবকরা দুই সেট পোশাকসহ বাচ্চাদের স্কুলে দিয়ে যায়। আবার ছুটি হলে শ্রেণী কক্ষের পোশাক পরিবর্তন করিয়ে নিয়ে যায়। এসব ধকল সামলাতে না পেরে কোন কোন পরিবার শিশুদের নিয়মিত স্কুলে পাঠাচ্ছে না।
স্থানীয় সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কাশেম মোড়ল জানান বিদ্যালয়ের এক পাশে পায় তিন কিলোমিটার রাস্তার বেহাল দশা দীর্ঘদিনের। যার জন্য ছোট ছোট ছাত্র-ছাত্রীরা স্কুলে আসতে মারাত্মক কষ্ট সহ্য করছে। স্কুলে আসার পথে রাস্তায় পড়ে গিয়ে আহত হওয়ার ঘটনা নিত্যকার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। প্রত্যন্ত জনপদ হওয়ার দরুন সুন্দরবন পাঁড়ের এই মরাগাং স্কুলের যোগাযোগ ব্যবস্থার কোন উন্নতি ঘটছে না।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার শামসুজ্জাহান কনক জানান, মারাগং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুরা টানা তিনবার জাতীয় স্কুল ফুটবল প্রতিযোগীতায় সাফল্য দেখিয়েছে। তাদের জন্য কিছু পুরস্কার বিদ্যালয়ে পৌছে দিতে যেয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থার যে চিত্র দেখছেন, তাতে রীতিমত হতবাক। কোমলমতি শিশুদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত ব্যবস্থা উন্নত করতে উর্ধ্বতন কতৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করা হবে।
উল্লেখ্য ১৬৫ নং পুর্ব মরাগাং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুরা সর্বশেষ চারবার স্কুল ফুটবল প্রতিযোগীতায় অংশ নিয়ে দু’বার(২০২৪ ও ২০২৬) সালে জাতীয় পর্যায়ের প্রথম রাউন্ডে পৌছায়। এছাড়া বিদ্যালয়টি গত ২০২৫ সালে বিভাগীয় পর্যায়ে রানার্সআপ হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করে। ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের সাফল্যের পুরস্কার স্বরুপ উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সকল খেলোয়াড়কে ক্রেষ্ট ছাড়াও স্কুল ব্যাগ এবং ফুটবল উপহার হিসেবে দেযা হয়। এসময় অন্যান্যের ম্েযধ উপস্থিত ছিলেন সহকারী শিক্ষা অফিসার শাহিন আলম, প্রেসক্লাব সভাপতি সামিউল মনির, সাাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কাশেম মোড়ল প্রমুখ।