শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

বহিস্কারাদেশ প্রত্যাহার হতেই মামলার স্বাক্ষীকে হুমকি শ্যামনগরের যুবদল নেতার

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬, ৮:০৩ অপরাহ্ণ
বহিস্কারাদেশ প্রত্যাহার হতেই মামলার স্বাক্ষীকে হুমকি শ্যামনগরের যুবদল নেতার

শ্যামনগর প্রতিনিধি: সাতক্ষীরার শ্যামনগরে যুবদল নেতা বাবলুর রহমানের বিরুদ্ধে প্রেসক্লাবে হামলার মামলার স্বাক্ষীকে ‘পিতার সামনে পিটিয়ে সাইজ করা’র-হুমকি দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে চার/পাঁচজন সহযোগীকে নিয়ে তিনি সাংবাদিক মিজানুর রহমানকে পৌরসদরের মুক্তিযোদ্ধা সড়কে একা পেয়ে এমন হুমকি দেন বলে অভিযোগ। এঘটনার কয়েকঘন্টা আগে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ যুবদল থেকে বাবলুর রহমানের বহিস্কারাদেশ প্রত্যাহার করে। শ্যামনগর উপজেলা প্রেসক্লাবে হামলার ঘটনায় জড়িত থাকায় গত ৩ মার্চ কেন্দ্রীয় যুবদল তাকে সংগঠন থেকে বহিস্কার করেছিল।

দৈনিক কল্যাণ পত্রিকার প্রতিনিধি মিজানুর রহমান উপজেলার আবাদচন্ডিপুর গ্রামের মোঃ সামছুর রহমানের ছেলে। গত ২ মার্চ শ্যামনগর উপজেলা প্রেসক্লাবে হামলা ও লুটপাটের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার তিন নং স্বাক্ষী তিনি। এঘটনায় নিরাপত্তা শংকার কথা জানিয়ে মিজানুর রহমান শ্যামনগর থানায় সাধারণ ডায়েরী (যার নং- ৬৯১/১২-০৬-২৬) করেছেন।

মিজানুর রহমান জানান বৃহস্পতিবার দুপুরের দিকে মায়ের জন্য প্রয়োজনীয় ঔষধ নিয়ে তিনি প্রেসক্লাবে ফিরছিলেন। এসময় প্রেসক্লাবে হামলা, লুটপাটসহ সভাপতি সামিউল মনিরকে পিটিয়ে আহত করার মামলার আসামী বাবলু কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে তাকে ঘিরে ধরে। নানা অবান্তর কথার একপর্যায়ে ‘পিতার সামনে নিয়ে পিটিয়ে সাইজ করা’ ও ‘স্বাক্ষী হওয়ার খায়েশ মিটিয়ে দেয়া’সহ বিভিন্ন হুমকি দেন। এসময় কোন কথা না বলে তিনি বিআরডিবি অফিসের সামনের সড়ক ধরে প্রেসক্লাব অভিমুখে চলে যান।

শ্যামনগর থানার অফিসার ইনচার্জ খালেদুর রহমান জানান হুমকি পাওয়ার ঘটনায় মিজানুর রহমান শুক্রবার সকালে সাধারণ ডায়েরী করেছেন। বিষয়টি তদন্তপুর্বক পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রেসক্লাবে হামলার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় দ্রুত অভিযোগপত্র দেয়া হবে।

প্রসংগত উল্লেখ্য ‘যুবদল-যুবলীগ-যুববিভাগ’ মিলে খোলপেটুয়া নদীর বালু লুটের ঘটনার সংবাদ প্রকাশের জেরে গত ২ মার্চ প্রেসক্লাবে হামলা চালায় যুবদলের নেতাকর্মীরা। সে ঘটনায় ১৪ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামীয় ২০/২৫ জনের বিরুদ্ধে শ্যামনগর থানায় মামলা হয়। জেলা স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতা আব্দুর রহমান বাবু, উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব আনোয়ারুল ইসলাম আঙ্গুর ও বাবলুর রহমানকে উক্ত মামলায় আসামী করা হয়।

 

Ads small one

শিশুশ্রমমুক্ত সমাজ গঠনে সমন্বিত উদ্যোগের বিকল্প নেই

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬, ১১:১৬ অপরাহ্ণ
শিশুশ্রমমুক্ত সমাজ গঠনে সমন্বিত উদ্যোগের বিকল্প নেই

সোহাগ হোসেন

শিশুরা একটি জাতির সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। তাদের সুস্থ, নিরাপদ ও শিক্ষানির্ভর পরিবেশে বেড়ে ওঠার মধ্য দিয়েই একটি দেশের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এখনো সমাজের একটি অংশের শিশু জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় কাটাচ্ছে বিভিন্ন ধরনের শ্রমে নিয়োজিত থেকে। এবারের প্রতিপাদ্যÑ “শিশুশ্রমকে না বলি, শোভন কর্ম পরিবেশ নিশ্চিত করি”— আমাদের সেই বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায় এবং শিশুদের অধিকার রক্ষায় নতুন করে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে।

শিশুশ্রম কেবল একটি সামাজিক সমস্যা নয়; এটি মানবসম্পদ উন্নয়নের অন্যতম প্রধান অন্তরায়। যে বয়সে একটি শিশুর বিদ্যালয়ে যাওয়ার, খেলাধুলা করার এবং নিজের মেধা ও প্রতিভা বিকাশের কথা, সে বয়সে অনেক শিশু জীবিকার তাগিদে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করছে। এর ফলে তারা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে এবং স্বাভাবিক শৈশব হারাচ্ছে।

শিশু শ্রমের পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে দারিদ্র্যকে চিহ্নিত করা হলেও বিষয়টি কেবল অর্থনৈতিক নয়। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার প্রতি অনাগ্রহ, বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া, পারিবারিক অস্থিরতা, সামাজিক সচেতনতার অভাব এবং সস্তা শ্রমের চাহিদাও এই সমস্যাকে জিইয়ে রাখছে। বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতে শিশু শ্রম সহজে দৃশ্যমান না হওয়ায় সমস্যাটি অনেক সময় আড়ালে থেকে যায়।

একটি রাষ্ট্র তখনই প্রকৃত অর্থে উন্নত হতে পারে, যখন তার প্রতিটি শিশু শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার মৌলিক অধিকার ভোগ করতে পারে। শিশু শ্রমের কারণে একটি শিশু যেমন নিজের সম্ভাবনা থেকে বঞ্চিত হয়, তেমনি দেশও হারায় একজন সম্ভাবনাময় নাগরিককে। ফলে শিশু শ্রম নিরসনকে শুধু মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, জাতীয় উন্নয়নের কৌশলগত প্রয়োজন হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে।

শিশু শ্রম রোধে কার্যকরী পদক্ষেপ সমূহ:
প্রথমত, শিশু শ্রমের অন্যতম প্রধান কারণ দারিদ্র্য দূরীকরণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। দরিদ্র ও নি¤œ আয়ের পরিবারগুলোর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে পরিবারগুলো সন্তানদের শ্রমে পাঠাতে বাধ্য না হয়।

দ্বিতীয়ত, সকল শিশুর জন্য মানসম্মত ও সহজলভ্য শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। বিদ্যালয় ত্যাগকারী শিশুদের পুনরায় শিক্ষার আওতায় আনা এবং শিক্ষা কার্যক্রমকে আরও আকর্ষণীয় ও বাস্তবমুখী করে তুলতে হবে।
তৃতীয়ত, শিশু শ্রম সংক্রান্ত বিদ্যমান আইন ও নীতিমালার কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ ও অনানুষ্ঠানিক খাতে শিশু নিয়োগের বিরুদ্ধে নিয়মিত তদারকি ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

চতুর্থত, শিশু শ্রমের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে পরিবার, নিয়োগকর্তা ও সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। সামাজিক আন্দোলন ও গণসচেতনতামূলক কার্যক্রম এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

পঞ্চমত, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে শিশু শ্রম প্রতিরোধে শক্তিশালী নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে কোনো শিশু শ্রমে জড়িত হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
ষষ্ঠত, ইতোমধ্যে শ্রমে জড়িত শিশুদের পুনর্বাসন, শিক্ষা এবং দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। তাদেরকে শ্রম থেকে সরিয়ে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

শিশু শ্রম নির্মূল কেবল মানবিক দায়িত্ব নয়, এটি একটি উন্নত ও টেকসই রাষ্ট্র গঠনের পূর্বশর্ত। তাই শিশুদের হাতে শ্রমের সরঞ্জাম নয়, শিক্ষা ও স্বপ্নের আলো তুলে দেওয়ার লক্ষ্যে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ, সাতক্ষীরা

 

 

 

সাতক্ষীরায় সাংবাদিকতার সংকট ও সম্ভাবনা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬, ১১:১২ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরায় সাংবাদিকতার সংকট ও সম্ভাবনা

আব্দুর রহমান

সাংবাদিকতা আমার কাছে কোনো আকস্মিক পেশা নয়; এটি দীর্ঘ লেখালেখির চর্চা ও সমাজ-মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার একটি স্বাভাবিক পরিণতি। ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে “মাসিক সাহিত্যপাতা” (sahityapata.com) নামে একটি সৃজনশীল সাহিত্য পত্রিকার প্রকাশনার মধ্য দিয়ে আমার লেখালেখির পথচলা শুরু।

 

সাহিত্যচর্চার সূত্র ধরেই বিভিন্ন পত্রিকার সম্পাদক ও সাংবাদিকদের সঙ্গে পরিচয়, সংবাদ লেখার প্রতি আগ্রহ এবং ধীরে ধীরে সংবাদ জগতের সঙ্গে সম্পৃক্ততা তৈরি হয়। এরপর ২০০৯ সালে দৈনিক কাফেলা পত্রিকায় সাংবাদিকতা জীবনের আনুষ্ঠানিক সূচনা। দীর্ঘ এই পথচলায় কাজ করেছি দৈনিক পত্রদূত, দৈনিক কালের চিত্র, দৈনিক সাতঘরিয়া, দৈনিক সাতনদী, দৈনিক দক্ষিণের মশালসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে। বর্তমানে দৈনিক আলোর পরশ পত্রিকায় সহকারী বার্তা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি।

 

পাশাপাশি জাতীয় ও স্থানীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেও কাজ করার সুযোগ হয়েছে। ছোটবেলা থেকেই সাতক্ষীরা আহ্ছানিয়া মিশনের পরিবেশে বেড়ে ওঠার কারণে সমাজ, মানুষ ও জনকল্যাণের প্রতি এক ধরনের দায়বদ্ধতা তৈরি হয়েছিল। সেই দায়বদ্ধতাই আমাকে সাংবাদিকতার পথে নিয়ে এসেছে। সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর এবং সাতক্ষীরা আলিয়া কামিল মাদ্রাসা থেকে হাদিসে কামিল সম্পন্ন করার পরও আমি অন্য কোনো পেশার দিকে ঝুঁকিনি।

 

কারণ সাংবাদিকতাকে আমি কখনো শখ হিসেবে দেখিনি; এটিই আমার একমাত্র পেশা এবং জীবনের বড় অংশজুড়ে থাকা একটি দায়িত্ব। প্রায় দুই দশকের কাছাকাছি সময় ধরে সাংবাদিকতার নানা পরিবর্তন কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। দেখেছি সংবাদপত্রের স্বর্ণালী সময়, দেখেছি অনলাইন সাংবাদিকতার উত্থান, আবার দেখেছি সাংবাদিকতার নামে নানা অপসংস্কৃতির বিস্তার। আজ যখন পেছনে তাকাই, তখন মনে হয় সাতক্ষীরায় প্রকৃত সাংবাদিকতা যেন ক্রমেই সোনার হরিণে পরিণত হচ্ছে।

 

একসময় একটি সংবাদ প্রকাশের আগে দিনের পর দিন তথ্য সংগ্রহ করা হতো। সংবাদে একটি ভুল শব্দও সম্পাদকরা সহ্য করতেন না। সংবাদকর্মীরা নিজেদের পরিচয়ের চেয়ে কাজকে বড় মনে করতেন। কিন্তু প্রযুক্তির এই যুগে সংবাদ পরিবেশনের গতি যত বেড়েছে, অনেক ক্ষেত্রে ততই কমেছে তথ্য যাচাইয়ের গভীরতা ও পেশাগত দায়বদ্ধতা। বর্তমানে সাতক্ষীরা জেলায় জাতীয়, স্থানীয়, অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক অসংখ্য গণমাধ্যম সক্রিয়। সাংবাদিক পরিচয়ধারীর সংখ্যাও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে।

 

তবে, প্রশ্ন হলো- এই বিপুল সংখ্যার মধ্যে কতজন সাংবাদিকতাকে প্রকৃত পেশা হিসেবে নিয়েছেন? কতজন নিয়মিত মাঠে গিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করেন? কতজন একটি সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই করেন? প্রশ্নগুলোর উত্তর খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। সাতক্ষীরার বাস্তবতায় সাংবাদিকতা কখনোই সহজ কাজ নয়। সুন্দরবন, সীমান্ত, উপকূলীয় দুর্যোগ, জলবায়ু পরিবর্তন, চিংড়ি শিল্প, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ভূমিদস্যুতা, মাদক এবং স্থানীয় রাজনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কাজ করতে হয়।

 

অনেক সময় ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়েও সংবাদ সংগ্রহ করতে হয়। অথচ জেলার অধিকাংশ সাংবাদিকের আর্থিক নিরাপত্তা এখনও অনিশ্চিত। অনেকেই নির্দিষ্ট বেতন ছাড়াই কাজ করছেন। সংবাদ সংগ্রহের খরচ, যাতায়াত, ইন্টারনেট ও যোগাযোগ ব্যয় নিজেরাই বহন করছেন। ফলে অনেক মেধাবী তরুণ সাংবাদিকতা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। এর পাশাপাশি উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে অপেশাদার ও হলুদ সাংবাদিকতার চর্চা। কিছু ব্যক্তি সাংবাদিক পরিচয়কে জনস্বার্থের পরিবর্তে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করছেন।

 

কোথাও প্রভাব বিস্তার, কোথাও তদবির, কোথাও আবার ব্যক্তিগত বিরোধ নিষ্পত্তির হাতিয়ার হিসেবে সাংবাদিক পরিচয়ের অপব্যবহার হচ্ছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের কাছে পুরো সাংবাদিক সমাজই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক সময়ে সাতক্ষীরার গণমাধ্যম অঙ্গনে এমন দৃশ্যও দেখা যাচ্ছে, যেখানে এক সম্পাদক আরেক সম্পাদকের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করছেন, পাল্টা জবাব প্রকাশ হচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য।

 

এসব ঘটনা সাধারণ মানুষের সামনে সাংবাদিক সমাজের অভ্যন্তরীণ বিভক্তি ও দ্বন্দ্বকে উন্মোচিত করছে। ফলে সাংবাদিকতার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থাও কমছে। একজন সাধারণ পাঠক যখন প্রতিদিন সাংবাদিকদের নিজেদের মধ্যকার কাদা ছোড়াছুড়ি দেখতে পান, তখন স্বাভাবিকভাবেই তার মনে প্রশ্ন জাগে- যারা সমাজের অন্যদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার কথা বলেন, তারা নিজেরা কতটা জবাবদিহির মধ্যে আছেন? বাস্তবতা হলো, সাংবাদিকতা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার অস্ত্র নয়; এটি জনস্বার্থ রক্ষার একটি দায়িত্বশীল মাধ্যম।

 

কোনো অভিযোগ থাকলে তা তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা যেতে পারে। কিন্তু সাংবাদিকতাকে ব্যক্তিগত বিরোধের মঞ্চে পরিণত করা হলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো পেশা। আরেকটি বড় সংকট হলো পারস্পরিক মূল্যায়নের অভাব। একজনের ভালো কাজের প্রশংসা করার পরিবর্তে তাকে ছোট করার প্রবণতা বাড়ছে। বিভাজন, গ্রুপিং এবং ব্যক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা পেশার জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠছে। অথচ সত্য ও জনস্বার্থই হওয়া উচিত সাংবাদিকদের অভিন্ন লক্ষ্য।

 

আমার নিজের জীবনেও রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রভাব দেখেছি। কোনো সময় আমাকে রাজনৈতিক পরিচয়ে চিহ্নিত করার চেষ্টা হয়েছে, মিথ্যা ও মানহানিকর সংবাদও প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, একজন সাংবাদিকের প্রকৃত পরিচয় তার রাজনৈতিক অবস্থান নয়; তার পরিচয় তার লেখা, তার অনুসন্ধান, তার সততা এবং জনস্বার্থে কাজ করার দায়বদ্ধতা। রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলাতে পারে, সরকার পরিবর্তন হতে পারে, কিন্তু সাংবাদিকতার মূল দায়িত্ব কখনো পরিবর্তন হয় না।

 

এই অবস্থার পরিবর্তনে প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ। সরকারের উচিত প্রকৃত সংবাদকর্মীদের একটি নির্ভরযোগ্য জাতীয় ডাটাবেজ তৈরি করা। তথ্য অধিদপ্তর, প্রেস ইনস্টিটিউট এবং গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ে আধুনিক অনলাইন নিবন্ধন ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। শিক্ষাগত যোগ্যতা, কর্মঅভিজ্ঞতা, নিয়োগপত্র ও প্রতিষ্ঠানের প্রত্যয়ন যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত সংবাদকর্মীদের তালিকাভুক্ত করা হলে সাংবাদিক পরিচয়ের অপব্যবহার অনেকাংশে কমবে।

 

একই সঙ্গে সাংবাদিকদের জন্য প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্যসেবা, বীমা সুবিধা এবং আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করাও জরুরি। তবে সব সংকটের মাঝেও আশার জায়গা রয়েছে। সাতক্ষীরার সাংবাদিকতার ইতিহাস গৌরবময়। এ জেলার অনেক সাংবাদিক জাতীয় পর্যায়ে সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন। এখনও অনেক তরুণ সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে সাংবাদিকতায় যুক্ত হচ্ছেন। সুন্দরবন, উপকূলীয় জীবন, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষি, মৎস্যসম্পদ, সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং সীমান্ত অঞ্চলের বাস্তবতা নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানের সাংবাদিকতা করার অপার সম্ভাবনা রয়েছে।

 

সাংবাদিকতার শক্তি বিভক্তিতে নয়, ঐক্যে; ব্যক্তি স্বার্থে নয়, জনস্বার্থে; পরিচয়ে নয়, পেশাদারিত্বে। নতুন প্রজন্ম যদি সাংবাদিকতাকে প্রভাবের মাধ্যম নয়, দায়িত্বের জায়গা হিসেবে গ্রহণ করে, তাহলে সাতক্ষীরার সাংবাদিকতা আবারও তার হারানো গৌরব ফিরে পেতে পারে। সংবাদমাধ্যমের সংখ্যা বাড়লেই সাংবাদিকতার উন্নয়ন হয় না। সাংবাদিক পরিচয়পত্রের সংখ্যা বাড়লেই গণমাধ্যম শক্তিশালী হয় না।

 

শক্তিশালী হয় তখনই, যখন সত্য বলার সাহসী মানুষ তৈরি হয়; যখন একজন সংবাদকর্মী নির্ভয়ে কলম ধরতে পারেন; যখন সমাজ তাকে সম্মান দেয় এবং রাষ্ট্র তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। সাতক্ষীরার বাস্তবতায় আজ সেই জায়গাটিই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। অন্যথায় সাংবাদিকের সংখ্যা হয়তো আরও বাড়বে, কিন্তু প্রকৃত সাংবাদিকতা আমাদের চোখের সামনেই সোনার হরিণ হয়েই থেকে যাবে।

লেখক: সহকারী বার্তা সম্পাদক, দৈনিক আলোর পরশ

 

সাতক্ষীরার মানুষ কি শুধু ভোট দেবে, নাকি উন্নয়নের হিসাবও চাইবে?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬, ১১:০৪ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরার মানুষ কি শুধু ভোট দেবে, নাকি উন্নয়নের হিসাবও চাইবে?

গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ

স্বাধীনতার পর থেকে সাতক্ষীরার মানুষ বিভিন্ন সময়ে তাদের পছন্দের রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের ওপর আস্থা রেখে ভোট দিয়েছে। জনগণের সেই আস্থার প্রতিফলন হিসেবে বহুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন জেলার বিভিন্ন আসনের জনপ্রতিনিধিরা। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আজও জনমনে ঘুরপাক খায়-সাতক্ষীরা এর বিনিময়ে কতটা কাক্সিক্ষত উন্নয়ন পেয়েছে?

একজন সংসদ সদস্যের প্রধান দায়িত্ব শুধু নির্বাচিত হওয়া নয়; বরং সংসদে নিজ এলাকার মানুষের দাবি, সমস্যা ও সম্ভাবনাগুলো জোরালোভাবে তুলে ধরা। অবকাঠামো উন্নয়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও শিল্পায়নের মতো মৌলিক বিষয়গুলোতে কার্যকর ভূমিকা রাখাই জনগণের প্রত্যাশা।

বর্তমানে সাতক্ষীরার চারটি আসনেই একই রাজনৈতিক দলের সংসদ সদস্য থাকা সত্ত্বেও জেলার বহু গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্প, বিশেষ করে রেলপথ ও যোগাযোগ অবকাঠামোর ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি দৃশ্যমান নয় বলে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত সাতক্ষীরা রেলপথ প্রকল্প এখনও বাস্তবায়নের অপেক্ষায়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটেও এ প্রকল্পে দৃশ্যমান অগ্রগতি বা গুরুত্বের প্রতিফলন না পাওয়ায় জেলার মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। একইভাবে জেলার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবকাঠামো, শিল্প স্থাপন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে বড় ব্যবধান রয়ে গেছে।

জনগণ জানতে চায়-তাদের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সংসদে ও সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সাতক্ষীরার দাবিগুলো কতটা গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপন করেছেন। কেন আজও রেলপথ বাস্তবায়ন অনিশ্চিত? কেন জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোচ্ছে না? এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া জনগণের অধিকার।
গণতন্ত্রে ভোট শুধু ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যম নয়; এটি জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার অন্যতম শক্তিশালী উপায়। তাই দলীয় আবেগ বা পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে এখন সময় এসেছে উন্নয়নের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার এবং জনপ্রতিনিধিদের কাছে বাস্তব অগ্রগতির হিসাব চাওয়ার।

সাতক্ষীরার মানুষ কোনো ব্যক্তি বা দলের বিরোধিতা নয়, বরং জেলার সার্বিক উন্নয়ন দেখতে চায়। তারা চায় আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, কার্যকর রেলসংযোগ, উন্নত সড়ক, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং একটি সম্ভাবনাময় সমৃদ্ধ সাতক্ষীরা।

সাতক্ষীরার মানুষের ভোটের মূল্য আছে। সেই ভোটের যথাযথ মর্যাদা দিতে হলে উন্নয়ন ও জবাবদিহিতা—দুটিই নিশ্চিত করতে হবে। লেখক: কেন্দ্রীয় শুরা সদস্য, ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশ