বাংলাদেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক রূপ নিয়েছে
প্রকাশ ঘোষ বিধান
বাংলাদেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক ও উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসের শুরুতেই দৈনিক আক্রান্তর ও মৃত্যুর সংখ্যা এ বছরের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। হঠাৎ রোগী বেড়ে যাওয়ায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে বিশেষ করে উপজেলা পর্যায়ে বেড সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক রোগীকে মেঝেতে থেকে কিংবা সাধারণ রোগীদের সাথে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষা ও থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন স্থানে এডিস মশার প্রজনন বেড়েছে, যা এই প্রাদুর্ভাবের প্রধান কারণ।
বাংলাদেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আসলেই আশঙ্কাজনক ও উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে, বিশেষ করে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসের এই মৌসুমী সময়ে সংক্রমণ ও হাসপাতালের ওপর চাপ তীব্রভাবে বাড়ছে। সাম্প্রতিক সরকারি ও চিকিৎসকদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ডেঙ্গুর প্রকোপ এখন কেবল ঢাকাতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং দেশের সবকটি ৬৪টি জেলা ও উপজেলাতেই এ রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহ বা অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে ডেঙ্গু সংক্রমণ চূড়ান্তর রূপ নিতে পারে।
ডেঙ্গু কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়। ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তর কোনো রোগীকে স্পর্শ করলে, তার পাশে বসলে, একই বিছানায় ঘুমালে কিংবা তার ব্যবহৃত জিনিসপত্র ব্যবহার করলে অন্য কারও এই রোগে আক্রান্তর হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। এটি মূলত একটি মশাবাহিত সংক্রামক রোগ, যা ভাইরাসবাহী এডিস মশার কামড়ের মাধ্যমে একজন থেকে অন্যজনে ছড়ায়। এডিস মশা যখন কোনো ডেঙ্গু আক্রান্তর রোগীকে কামড়ায়, তখন মশাটি ভাইরাস দ্বারা সংক্রামিত হয়। সেই সংক্রামিত মশা যখন সুস্থ মানুষকে কামড়ায়, তখন সে ডেঙ্গুতে আক্রান্তর হয়। মশা এখানে ভাইরাস বহনকারী মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।
ডেঙ্গু হলো এডিস মশার কামড়ে ছড়ানো একটি ডেঙ্গু জ্বর ভাইরাসজনিত রোগ। এডিস মশাবাহিত ভাইরাসজনিত রোগ। সাধারণত জুলাই থেকে অক্টোবর মাসের বর্ষা বা বর্ষা-পরবর্তী সময়ে বেশি ছড়ায়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এর কোনো নির্দিষ্ট মরশুম নেই, সারা বছরই ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা যাচ্ছে। সাধারণ বা মৃদু ডেঙ্গু জ্বর সাধারণত এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে ঠিক হয়ে যায়, তবে সময়মতো চিকিৎসা না পেলে এটি মারাত্মক আকার ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার বা ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম ধারণ করতে পারে, যা জীবননাশের কারণ হতে পারে।
এডিস মশার কামড়ের ৩ থেকে ১৫ দিনের মধ্যেহঠাৎ খুব উচ্চ তাপমাত্রার (১০৪ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ৪০ডিগ্রি সেলসিয়াস) জ্বর হওয়া। চোখে তীব্র ব্যথা, প্রচ- মাথাব্যথা, এবং মাংসপেশি ও হাড়ের জোড়ে তীব্র ব্যথা যাকে হাড্ডিভাঙা জ্বর বলা হয়। অতিরিক্ত দুর্বলতা, বমি বমি ভাব বা বারবার বমি হওয়া। জ্বর শুরুর ২-৩ দিন পর সারা শরীরে লালচে র্যাশ দেখা দেওয়া।
চিকিৎসকদের পরামর্শ মতে; জ্বর হওয়ার প্রথম ৩ দিনের মধ্যে সাধারণত পরীক্ষা এবং রক্তের পরীক্ষা করানো উচিত। তবে শুধু প্লেটলেট কাউন্ট কমে যাওয়ার ওপর নির্ভর না করে রোগীর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থার ওপর কড়া নজর রাখতে হবে।
সাধারণত জ্বর শুরু হওয়ার ৩ থেকে ৭ দিনের মাথায় জ্বর কমে আসে এবং আসল জটিলতা শুরু হয়। এই সময় রক্তনালি থেকে রক্তের জলীয় অংশ বা প্লাজমা বের হয়ে পেটে ও ফুসফুসে জমা হতে পারে। এসময় রোগীর পেটে তীব্র ব্যথা হওয়া বা পেটে চাপ দিলে ব্যথা লাগা। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৩ বার বা তার বেশি বমি হওয়া। দাঁতের মাড়ি, নাক বা ত্বকের নিচে রক্তপাত হওয়া বা ত্বকে কালো বা নীল দাগ পড়া। বমি বা পায়খানার সঙ্গে রক্ত আসা, পায়খানার রং আলকাতরার মতো কালো হওয়া। প্রচ- শ্বাসকষ্ট হওয়া বা দ্রুত শ্বাস নেওয়া। চরম ক্লান্তির, অস্থিরতা বা রোগীর হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া। দীর্ঘ সময় ধরে প্রগ্রাব না হওয়া লক্ষণগুলো দেখা দেয়।
আক্রান্তর রোগীকে সম্পূর্ণ বিশ্রামে রাখতে হবে। জ্বর কমে গেলেও রোগীকে সঙ্গে সঙ্গে স্কুল, কলেজ বা অফিসে পাঠানো যাবে না। শুধু পানি না খাইয়ে রোগীকে খাবার স্যালাইন, ডাবের পানি, ফলের রস, লেবুর শরবত ও স্যুপের মতো তরল খাবার অল্প অল্প করে বারবার দিতে হবে। জ্বরের জন্য কেবলমাত্র প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ দেওয়া যাবে। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কখনোই অ্যাসপিরিন, আইবুপ্রফেন বা ডাইক্লোফেনাক জাতীয় ব্যথানাশক ওষুধ দেওয়া যাবে না, কারণ এগুলো রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আক্রান্তর রোগীকে সবসময় মশারির ভেতরে রাখতে হবে, যাতে কোনো এডিস মশা রোগীকে কামড়ে পরিবারের অন্য কাউকে সংক্রমিত করতে না পারে।
জ্বর কমে যাওয়ার পরবর্তী সময়টিকে চিকিৎসকরা সবচেয়ে জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ বলছেন। এ সময় প্লাটিলেট কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে এবং রক্তক্ষরণ বা প্লাজমা লিকেজের মতো মারাত্মক লক্ষণ দেখা দিতে পারে। তাই আতঙ্কিত না হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং বেশি করে তরল খাবার খাওয়া উচিত।
বাংলাদেশে বর্তমানে ডেঙ্গু পরিস্থিতি অত্যন্তর আশঙ্কাজনক এবং এর সাথে হামের প্রাদুর্ভাব যুক্ত হয়ে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকার দেশব্যাপী ৩ মাসের বিশেষ পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে। বাসাবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও চারপাশের জমা পানি পরিষ্কার করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এছাড়া উপজেলা হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসাসুবিধা ও মশারি সরবরাহের ব্যবস্থা বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট












