বাংলার কৃষি-ই বাঙালির প্রাণ সঞ্চালিকা
সুদয় কুমার মন্ডল
বাংলার কৃষি ই বাঙালির প্রাণ সঞ্চালিকা। জাতীয় অর্থনীতির চালিকা শক্তি। বহু প্রাচীনকাল থেকে অর্থাৎ সভ্যতার বিবর্ণ যুগ থেকে মানুষ বেঁচে থাকার তাগিদে আদিম যুগের মানুষ যখন গাছের ফল মূল পাতালতা খেয়ে জীবনধারণ করতো পাথরে পাথরে ঘষে আগুন জ্বালানো ও জীবন রক্ষায় পাথর দিয়ে অস্ত্র বানানোসহ নানা ধরনের আবিষ্কার প্রবণতা মানুষকে উৎসাহী ও উদ্যমী করে তোলে। কঠোর পরিশ্রমি মানুষ কালে কালে তাদের সফলতা ও সাফল্য অর্জন করে সভ্যতার পত্তন ঘটায়। উৎসাহ উদ্দীপনা মানুষের সংস্কারপন্থি করে তোলে। আবিষ্কারের বিপ্লব ও জীবনধারা পরিবর্তনের সুযোগ সুবিধা অর্জন স্বীয় মেধা ও প্রতিভার বিকাশ সাধনে উত্তরোত্তর প্রবৃদ্ধি সাধিত হয়।
মানুষ বেঁচে থাকার তাগিদে উৎপাদন মুখী হয়ে কৃষি ব্যবস্থার প্রচলন ও প্রসারণ ঘটায় তারা খাদ্য সামগ্রীসহ জীবন ধারণের সকল কার্যকলাপে প্রবৃত্ত হয়। নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় তারা বদ্ধপরিকর ছিল। নানা প্রতিকূলতা ও সমস্যা সংকুল দিনগুলিতে মানুষ একতাবদ্ধ হয়ে সমাজ গঠন ও সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট হয়। ক্রমান্বয়ে মানুষ এ ব্যবস্থাকে সমৃদ্ধির দ্বারপ্রান্তে উপনীত করতে থাকে। কৃষি ব্যবস্থায় মানুষের মূল উপজীব্য, সাথে সাথে শিক্ষা ব্যবস্থাকে মানুষ অধিকতর গুরুত্ব আরোপ করে। সামাজিক প্রথা ও রীতিনীতি মানুষকে শৃঙ্খলা বদ্ধ ও কর্তব্য পরায়ন করে তোলে।
গড়ে উঠতে থাকে সভ্যতার প্রাচীনতম ঐতিহ্যবাহী অভাবনীয় স্তম্ভ। মানুষের প্রতিভার বিকাশ আদিম যুগের অসহায় মানুষকে প্রগতিশীল করে তোলে। মেধা ও প্রতিভার বিকাশ মানব কল্যাণের আশীর্বাদ। সৃষ্টির উষা লগ্নে মানুষ ছিল অরণ্যচারি যাযাবর মেধা ও প্রতিভার উন্মেষ সে কলঙ্ক থেকে মুক্ত করে। বিজ্ঞান দর্শন সমাজ সভ্যতা রাষ্ট্র সংস্কৃতি সৃজনশীলতা সবই মানুষের প্রতিভার ফসল। পূর্ব সুরীর অবদান উত্তরসূরীরীর রক্তে প্রবাহমান।
আবহমান কালের বঙ্গদেশ বিভিন্ন সময়ে বা যুগে যুগে বিভিন্ন শাসকের অধীনস্থ হলেও বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় আজ এ দেশ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ। সাগর বনানী নদী-নালা বিধৌত ৫৫ হাজার ৫২৬ বর্গ কিলোমিটারব্যাপী এদেশের অবস্থিতি। উর্বর পলল মৃত্তিকা সম্পন্ন এদেশের মাটি। সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা প্রকৃতির এক অপরূপ বন্ধন। পূর্ব পুরুষের এ মাটি আজ ও খাঁটি সোনার চাইতেও খাঁটি। এদেশের ভূমিজ সন্তানের অনাবিল সুখের আশ্রয়স্থল ও ঠিকানা। বাংলাদেশ কৃষি সমৃদ্ধি শালী দেশ। পৃথিবীর অপর কোন দেশের সাথে যার তুলনা মেলে না।
কবির ভাষায় বলতে হয়Ñ“এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি , সকল দেশের সেরা সে যে আমার জন্মভূমি”। মাটির সাথে নাড়ীর সম্পর্ক অতুলনীয় এক জন্মভূমি। আতিথিয়তা ও স্বজন প্রীতির বিরল দৃষ্টান্ত।
এদেশের প্রকৃতি কৃষি বান্ধব। ৮০% ভাগ মানুষ কৃষি নির্ভর। গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ পূর্বপুরুষের আমল থেকে স্বাচ্ছন্দ্য সুখের এ আবাসস্থল। অধিক ক্যালরি ও পুষ্টি সমৃদ্ধ খাদ্যের যথেষ্ট প্রাচুর্য বিদ্যমান। নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া জীবন বান্ধব। ষড় ঋতুর এ দেশ। ভিন শক্তির শাসনামলে ও এদেশের কৃষি ব্যবস্থায় ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছিল। কৃষকদের ভাগ্যন্নয়ন অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সংগ্রাম ও পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন।
সেকেলে প্রথায় যেমন লাঙ্গল জোয়াল, মই হালের গরু দিয়ে চাষাবাদ করলেও সনাতনী প্রথায় কৃষকরা উৎপাদনমুখী ও সুখী সমৃদ্ধশীল জীবন যাপন করত। উৎপাদিত ফসল বিক্রি করে তারা আনুষঙ্গিক খরচ ও অন্যান্য চাহিদা পূরণ করত। সামাজিক প্রথা ও রীতিনীতি অধিকাংশ মানুষ মেনে চলত। বিশেষ করে বাংলার কৃষকরা চাষ মৌসুমের আগে থেকে তোড়জোড় বা কৃষি কাজে ব্যবহৃত যাবতীয় সরঞ্জাম যেমনÑলাঙ্গল জোয়াল মই হালের বলদ ধান ভেজানো ডোল, ঝুড়ি, কোদাল এমনকি বর্ষা মৌসুম অবধি স্থায়ীভাবে কাজের লোক বা মসুমী রেখে মহাজন বা আভিজাত্যশালীরা কৃষি কাজ করাতো।
যাদের হালের বলদ ঘাটতি থাকতো তারা অপার কৃষকের নিকট থেকে বোটায় বা ধান চুক্তিতে হালের বলদ সংগ্রহ করতো। এও একটা প্রথা ছিল। আবার অনেকে আষাঢ় মাসে গরুর হাটে যেয়ে হালের বলদ কিনেও আনতো। বিনিময়ে কুড়ি পালিতে এক সলা, আট সলায় এক বিশ ধান চুক্তিতে মসুমী খাটত। এরা চাষের আনুষঙ্গিক সমস্ত কাজকর্ম করে (বীজতলা থেকে জমি রোপন পর্যন্ত) তারপর হাট থেকে কিসেন বা মজুর হাট চুক্তি কিনে এনে জমি রোপন কর তো।
বাংলার কৃষি ব্যবস্থায় আবহমান কালের এই সংস্কৃতি বিরাজমান ছিল। বাংলার কৃষি বাঙালি সংস্কৃতিতে চির প্রবাহমান সংস্কৃতির এক ফল্গুধারা, বলিষ্ঠ প্রবাহ। বর্ষা ঋতুকে কেন্দ্র করে বাঙালি সংস্কৃতি জাগ্রত। বর্ষা বাংলার চাষিকুলের এক ফলিত আশীর্বাদ। এর ঋতুতে বাংলার কৃষক পরিবার আনন্দে মেতে ওঠে। সমৃদ্ধির ফসলে ভরে তুলবে এই প্রতিষ্ঠ এই প্রত্যাশায়। বর্ষায় বিলম্ব বা ঘাটতি হলে নারী-পুরুষ মিলে ঈশ্বরের আরাধনা করে ঈশ্বরের আরাধনা করে। আল্লাহ বা ভগবান ‘মেঘ দে পানি দে’। ধুলোয় পানি ঢেলে গড়াগড়ি বায়। প্লাবন ও জলোচ্ছ্বাসের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য যথোপযোগী ভূমি রক্ষা বাঁধ না থাকায় পাবলিক বাঁধ দেওয়ার রেওয়াজ বা প্রথা ছিল। ভূমি মালিকগণ বা জনসাধারণের মতে, ভূমি রক্ষা বাঁধ বা ছোট ছোট বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে জনবসতি ও ফসলি জমি রক্ষা করতো।
অধিকাংশ সময় বিশেষ করে জোয়ারের সময় থালের ভাত ফেলে রেখে জনগণ এ কাজে সম্পৃক্ত হতো। সরকারিভাবে কোন উদ্যোগ না থাকলেও নিজেদের ভালো-মন্দ নিজেরাই একতা ও আবশ্যকতায় তা সম্পন্ন করে ফেলতো। একতাবদ্ধ ছিল তখনকার মানুষের সবচেয়ে বড় গুণ। শিল্প বিপ্লবের ফলে কৃষি ব্যবস্থা চরম অবনতি ঘটে। ইংরেজদের নীল চাষ দেশীয় কৃষকদের চরম হতাশার সৃষ্টি করেছিল। তথাপিও এ বাংলা আর কৃষিকে তারা ধ্বংস করতে পারেনি।
আধুনিক সভ্যতার যুগে নানা ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়েও বাংলার কৃষি টিকে আছে। প্রযুক্তির যুগে কৃষি ব্যবস্থা টিকে থাকলেও আগের মত এখন আর কৃষকদের সুখ-শান্তি সুরক্ষা অনিশ্চিত। যা বাংলার কৃষক কুলের ভাগ্য বিড়ম্বনার সামিল। কৃষক কূলের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হলে উৎপাদন ব্যাহত হয়। এক সময় মহাজনদের কাছে গরিব মধ্যবিত্ত কৃষকরা নিপীড়িত হয়েও তাদের অস্তিত্ব বিলীন হতে দেয়নি। তাদের কষ্টার্জিত ফসল ঋণের দায়ে মহাজনদের দিয়েও দেউলে হয়নি, তাদের যা সহায় সম্পদ ছিল তাতে উৎপাদন করে তারা টিকে ছিল। কিন্তু আজ বাংলার কৃষক কুল অসহায়। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে বিপর্যস্ত। রাষ্ট্রীয় সহানুভূতি ক্ষীণ।
অধিকার সুরক্ষা অনিশ্চিত। কৃষিতে নানা অন্তরায়। আভিজাত্য ও প্রভাবশালীরা জবর দখলে কৃষকদের যৎসামান্য কৃষি জমিতে লবণাক্ততা সৃষ্টি করে তাদের ভাতে মেরে দিচ্ছে। বাস্তব ভিটা পর্যন্ত কেড়ে নেচ্ছে। বাংলার কৃষি আজ বিপন্ন নানা প্রতিকূলতায়। দূর্জয় বাঙালির কত সাধনার ফল এদেশের মাটি স্বাধীনতার স্পর্শে হয়েছে খাঁটি এই সোনার বাংলায় কিন্তু বলা বাহুল্য ঘুচেনি মেহনতী গরিব কৃষকদের দুর্গতি। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রোদ্দুরে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে যে চাষা জাতির খাদ্য যোগায় তারা কেন অবহেলিত বঞ্চিত। ইতিপূর্বে উন্মুক্ত জনসাধারণের ব্যবহার্য খাসখালগুলোও প্রভাবশালীরা প্রভাব বিস্তার করে নিজেদের অধীনস্থ করে রেখেছে।
পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা বাধা গ্রস্ত। যার ফলশ্রুতিতে জলবদ্ধতা ফসলের ক্ষতি সহ বিরূপ প্রতিক্রিয়া ও নিরন্ন-দরিদ্র অসহায় কৃষককুলের আমিষ ঘাটতি অবশ্যম্ভাবী। এমতাবস্থায় কৃষি ব্যবস্থার চরম অবনতি। জাতির প্রাণসঞ্চারিকা অবরুদ্ধ দিনে দিনে বাংলার কৃষক কুল অসহায় হয়ে পড়ছে রাষ্ট্রীয় সহানুভূতি অপ্রতুল। কৃষকদের ভাগ্য পরিবর্তন না হলে দেশের উন্নয়ন পূর্ণতা প্রাপ্ত হয় না। কৃষি-ই কৃষি প্রধান দেশে মানুষের জীবিকা নির্বাহের অন্যতম অবলম্বন।
১৯৪৭ সালে ডমিনিয়ান ভাগ হওয়ার পর তৎকালীন সরকার সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা উর্বর ভূমির স্বার্থক উৎপাদন ও জন সুরক্ষায় লবণাক্ততা ও জলোচ্ছ্বাস প্লাবন নিরাময়ে উপকূলীয় রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করে এ জনপদে মেহনতী মানুষ ও কৃষককূলের স্বার্থ সংরক্ষণ করে। ফলে গবাদি পশু হাঁস মুরগিও নানাবিধ ফসল উৎপন্ন করে অতি দরিদ্র মানুষও ভাগ্য পরিবর্তন করে। অথচ আজ সেই রক্ষা বাঁধ কেটে লবণাক্ততা সৃষ্টি করে প্রভাবশালীরা প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট সহ গরিব মেহনতী মানুষের অবর্ণনীয় দুর্দশায় ফেলেছে। যার থেকে পরিত্রাণ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।
কৃষকরা দেশের জনগণের খাদ্য যোগায় অথচ এই কৃষকরা আজ সভ্যতার করাল গ্রাসে নিপতিত। কবির ভাষায়,” সব সাধকের বড় সাধক আমার দেশের চাষা।” রৌদ্রে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে চাষীকূল মানুষের খাদ্য যোগায়। অথচ অট্টালিকা বাসি তাদের কথা কখনো ভাবে না বরং তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে দূরে সরিয়ে দেয়। অথচ কত প্রখ্যাত কবি সাহিত্যিক নাট্যকার রাজনৈতিক প্রবক্তা বাংলার কৃষি ও কৃষকদের নিয়ে সংস্কৃতির অঙ্গন মাতিয়ে তুলেছেন। যা অনেকেই হিসাব রাখে।
বাংলার কৃষি-ই বাঙালি জীবন্ত সত্তা। যা বাঙালি সংস্কৃতিতে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে। বাঙালি ঐতিহ্য নির্ভর কৃষি। অপসংস্কৃতির বিষাক্ত ছোবলে শুদ্ধ সংস্কৃতি আক্রান্ত। অট্টালিকায় বাস করলেও কৃষকদের কুড়ে ঘরের নিবিড় শান্তি কত মাধুর্যময় ছিল। রাষ্ট্রীয় প্রজ্ঞাপনায় কৃষক ও কৃষি ব্যবস্থার সুরক্ষা ও উন্নয়ন একান্ত অনিবার্য। তবেই এই বাংলার ভাগ্যাহত কৃষককূল স্বস্তির প্রাণ সঞ্চালন ফিরে পাবেÑএই প্রত্যাশায়।












