বিশ্ব ম্যানগ্রোভ দিবস : সুন্দরবনের চোখের জলে লেখা ইতিহাস
আখলাকুর রহমান
আজ ছাব্বিশে জুলাই। বিশ্ব ম্যানগ্রোভ দিবস। এই দিনটা এলেই সুন্দরবনের কথা মনে পড়ে, আর সুন্দরবনের কথা মনে পড়লেই মনে পড়ে তার বুকের ভেতর জমে থাকা অসংখ্য করুণ কাহিনী। সুন্দরবন শুধু একটা বন নয়, এটা একটা জীবন্ত ইতিহাস, যার প্রতিটা পাতায় লেখা আছে সংগ্রামের গল্প, হারানোর গল্প, আর টিকে থাকার গল্প। এই বন আমাদের কাছে শুধু গাছপালার সমাহার নয়, এটা আমাদের অস্তিত্বের একটা অংশ।
পৃথিবীর মানচিত্রে তাকালে দেখা যায়, সুন্দরবনই একমাত্র জায়গা, যেখানে সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনভূমি একসঙ্গে ছড়িয়ে আছে। বাংলাদেশ আর ভারতের সীমান্ত জুড়ে বিস্তৃত এই বন ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মর্যাদা পেয়েছে। কিন্তু এই মর্যাদার আড়ালে লুকিয়ে আছে অসংখ্য করুণ কাহিনী, যা আমরা প্রায়ই ভুলে যাই।
সুন্দরবনের নাম শুনলেই প্রথমে যে কথাটা মনে আসে, সেটা বাঘের কথা। রয়েল বেঙ্গল টাইগার। এই বনের রাজা। কিন্তু এই রাজার সংখ্যা একসময় ভয়াবহভাবে কমে গিয়েছিল। সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, বর্তমানে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা একশো পঁচিশের কাছাকাছি। দুই হাজার আঠারো সালে এই সংখ্যা ছিল একশো চৌদ্দ, আর দুই হাজার পনেরো সালে ছিল একশো ছয়। সংখ্যাটা ধীরে ধীরে বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু এই বৃদ্ধির পেছনে লুকিয়ে আছে বহু বছরের সংগ্রাম, বহু বাঘের অপমৃত্যু, আর বহু শিকারির লোভের ইতিহাস।
শিকারিদের হাতে কত বাঘ প্রাণ হারিয়েছে, তার সঠিক হিসাব কারও কাছে নেই। বাঘের চামড়া, হাড়, নখ, এসবের চোরাচালান এক সময় রমরমা ব্যবসা ছিল। বন বিভাগের কড়াকড়ি আর স্থানীয় মানুষের সচেতনতা বাড়ায় এই ব্যবসা অনেকটা কমেছে, কিন্তু পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। প্রতিটা চোরাশিকারের পেছনে একটা করুণ গল্প থাকে, কখনো দারিদ্র্যের, কখনো লোভের।
সুন্দরবনের আরেক করুণ অধ্যায় জলদস্যুদের গল্প। এক সময় এই বনের নদীপথে জলদস্যুদের রাজত্ব ছিল। জেলেরা মাছ ধরতে গিয়ে অপহৃত হতেন, মুক্তিপণ না দিলে ফিরে আসতেন না অনেকে। কত মায়ের সন্তান, কত স্ত্রীর স্বামী নদীর জলে হারিয়ে গেছেন, তার হিসাব কেউ রাখেনি। কোনো কোনো জেলে পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই ভয় নিয়ে বড় হয়েছে। সরকারি অভিযানে জলদস্যুদের দৌরাত্ম্য অনেকটা কমেছে ঠিকই, কিন্তু সেই ভয়ের স্মৃতি এখনো উপকূলের মানুষের মনে গেঁথে আছে।
মধু সংগ্রহকারী মৌয়ালদের জীবনও কম করুণ নয়। প্রতি বছর মৌসুমে দল বেঁধে তারা গভীর বনে ঢোকেন মধু আর মোম সংগ্রহ করতে। প্রতিবার বনে ঢোকার আগে তারা জানেন না, ফিরে আসতে পারবেন কিনা। বাঘের আক্রমণে কত মৌয়াল প্রাণ হারিয়েছেন, তার সংখ্যা কম নয়। তবুও পেটের দায়ে তারা বারবার ফিরে যান সেই বিপজ্জনক পথে, কারণ সুন্দরবনের মধু ছাড়া তাদের সংসার চলে না। মৌয়ালদের পরিবারগুলোতে একটা কথা প্রচলিত আছে, বনে যাওয়া মানে জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে একটা সরু রেখা পার হওয়া।
বাওয়ালিরা যান কাঠ আর গোলপাতা সংগ্রহে। জেলেরা যান মাছ আর কাঁকড়া ধরতে। প্রত্যেকের গল্পে আছে একই সুর, বনের ওপর নির্ভরতা আর বনের বিপদের মধ্যে বেঁচে থাকার লড়াই। লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই বনের ওপর নির্ভরশীল। অথচ এই মানুষগুলোর জীবনযাত্রার মান আজও অত্যন্ত কষ্টের। ঝড়ে ঘর ভাঙে, নদীর ভাঙনে জমি হারায়, তবুও তারা সুন্দরবন ছেড়ে যান না, কারণ এই বনই তাদের বাঁচার শেষ অবলম্বন।
সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য নিয়ে কথা বললে বিস্ময়ে থমকে যেতে হয়। এই বনে আছে প্রায় সাড়ে তিনশো প্রজাতির উদ্ভিদ, চারশোর কাছাকাছি প্রজাতির মাছ, তিনশো প্রজাতির পাখি, আর অসংখ্য সরীসৃপ ও স্তন্যপায়ী প্রাণী। ইরাবতী ডলফিন আর গাঙ্গেয় ডলফিনের মতো বিরল প্রাণীও এই নদীগুলোতে বাস করে। কিন্তু এই সম্পদ আজ নানাভাবে হুমকির মুখে।
সংরক্ষণের অভাব সুন্দরবনের সবচেয়ে বড় সংকট। আইন আছে, নিয়ম আছে, কিন্তু বাস্তবায়নের ঘাটতি প্রকট। অবৈধভাবে গাছ কাটা, চিংড়ি ঘেরের জন্য বন উজাড় করা, শিল্প কারখানার বর্জ্য নদীতে ফেলা, এসব চলছেই। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো বড় বড় প্রকল্প নিয়ে পরিবেশবিদরা বারবার সতর্ক করেছেন, তবুও উন্নয়নের নামে সুন্দরবনের ঝুঁকি বেড়েই চলেছে। বন বিভাগের জনবল সীমিত, টহল দেওয়ার সম্পদও সীমিত, ফলে বিশাল এই বনের প্রতিটা কোণা পাহারা দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
জলবায়ু পরিবর্তনও সুন্দরবনের জন্য এক নীরব ঘাতক। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, লবণাক্ততা বাড়ছে, বনের ভেতরের মিঠা পানির উৎস কমে যাচ্ছে। সুন্দরী গাছ, যার নাম থেকেই সুন্দরবনের নামকরণ, সেই গাছও আজ টপ ডাইব্যাক রোগে আক্রান্ত হয়ে ধ্বংস হচ্ছে বহু জায়গায়। প্রকৃতির এই ধীর মৃত্যু আমরা খালি চোখে দেখতে পাই না, কিন্তু বিজ্ঞানীদের গবেষণা প্রতিবারই একই সতর্কবার্তা দিচ্ছে।
তেলবাহী বা কয়লাবাহী জাহাজডুবির ঘটনাও সুন্দরবনের ইতিহাসে করুণ অধ্যায় হয়ে আছে। দুই হাজার চৌদ্দ সালের ডিসেম্বর মাসে শ্যালা নদীতে একটি তেলবাহী ট্যাংকার অন্য একটি জাহাজের সঙ্গে সংঘর্ষে ডুবে যায়। প্রায় তিন লক্ষ পঞ্চাশ হাজার লিটার ফার্নেস অয়েল নদীর জলে মিশে যায়। কালো তেলে ঢেকে গিয়েছিল নদীর জল, প্রায় পঁয়ত্রিশ মাইল এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই তেল। মারা গিয়েছিল অসংখ্য জলজ প্রাণী, ডলফিন থেকে শুরু করে ছোট মাছ পর্যন্ত। সেই ক্ষত সারতে বছরের পর বছর লেগে গেছে, আর অনেক বিশেষজ্ঞ বলেন, প্রকৃত ক্ষতি এখনো পুরোপুরি বোঝা যায়নি।
স্থানীয় জেলেরা সেই ঘটনার কথা মনে করলে আজও কষ্ট পান। তাদের ভাষায়, নদীর জল যেদিন কালো হয়ে গিয়েছিল, সেদিন থেকে অনেক দিন তারা মাছ ধরতে পারেননি। যে নদী তাদের সংসারের একমাত্র উৎস, সেই নদীই একদিন হয়ে উঠেছিল বিষাক্ত। এই ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, শিল্প উন্নয়ন আর নৌপরিবহনের নামে আমরা কতটা ঝুঁকি নিচ্ছি এই স্পর্শকাতর বনের সঙ্গে।
তবুও সুন্দরবন হার মানেনি। প্রতিবার আঘাত পেয়ে এই বন আবার নিজেকে গড়ে তোলার চেষ্টা করে। প্রকৃতির এই অসীম সহনশীলতা আমাদের কাছে এক বিস্ময়। ঘূর্ণিঝড় এলে সবার আগে এই গাছগুলোই বুক পেতে দাঁড়ায়। আয়লা, সিডর, আম্পান, প্রতিটি ঝড়ের নাম আমাদের মনে আছে, কারণ প্রতিটি ঝড়ের পরে আমরা দেখেছি সুন্দরবন কতটা রক্ষা করেছে আমাদের। যে গ্রামগুলো সুন্দরবনের একেবারে কাছে, সেখানে ক্ষয়ক্ষতি তুলনামূলক কম হয়। যে গ্রাম একটু দূরে, সেখানে ক্ষতি বেশি। এই সহজ সত্যটা মাঠের মানুষ বোঝে, বইয়ের ভাষায় যাকে বলে উপকূলীয় সুরক্ষা।
সরকারি পর্যায়ে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে। বনের একটা বড় অংশ, প্রায় অর্ধেকের বেশি এলাকা, সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, যেখানে সম্পদ আহরণ নিষিদ্ধ। বাঘ আর মানুষের সংঘাত কমাতে লোকালয়ের কাছে বেড়া দেওয়া হয়েছে, বনের ভেতর আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি হয়েছে ঝড়ের সময় বন্যপ্রাণী রক্ষার জন্য। এই উদ্যোগগুলো আশার আলো দেখায় ঠিকই, কিন্তু পথ এখনো অনেক লম্বা।
সুন্দরবন শুধু বাংলাদেশের নয়, এটা সারা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন, এবং একটা ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান। এই বন রক্ষা পেলে রক্ষা পাবে উপকূলীয় লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন, রক্ষা পাবে জীববৈচিত্র্য, রক্ষা পাবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিঃশ্বাস নেওয়ার অধিকার। এই বন প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার অর্থনৈতিক সুবিধা দেয়, মাছ থেকে শুরু করে কাঠ, মধু, পর্যটন, সবকিছুতেই সুন্দরবনের অবদান বিশাল।
সাতক্ষীরার মানুষ হিসেবে আমরা জানি, সুন্দরবন কতটা কাছের। এই বনের নিঃশ্বাসের সঙ্গে আমাদের নিঃশ্বাস মিশে আছে। কিন্তু এই নৈকট্যের দাবিদার হয়ে আমরা কতটা দায়িত্ব পালন করছি, সেই প্রশ্নটা নিজেদের করা দরকার। বনের পাশে বাস করেও আমরা যদি বনকে রক্ষা না করি, তাহলে সেই ব্যর্থতার দায় আমাদেরই বহন করতে হবে। বিশ্ব ম্যানগ্রোভ দিবসে তাই শুধু আনন্দ উদযাপনের কিছু নেই। এই দিনটা আমাদের কাছে একটা সতর্কবার্তা, একটা দায়বদ্ধতার দিন। সুন্দরবনের প্রতিটা করুণ কাহিনী আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতি যতই সহনশীল হোক, তার ধৈর্যের একটা সীমা আছে। সেই সীমা অতিক্রম করার আগেই আমাদের সচেতন হতে হবে, নয়তো ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।
আমাদের প্রত্যেকের ছোট ছোট সিদ্ধান্ত এই বনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দিতে পারে। অবৈধ কাঠ না কেনা, বন বিভাগের নিয়ম মেনে চলা, স্থানীয় জেলে ও মৌয়ালদের জীবিকার বিকল্প ব্যবস্থার পক্ষে কথা বলা, শিশুদের সুন্দরবনের গুরুত্ব শেখানো, এই ছোট ছোট পদক্ষেপগুলোই একসময় বড় পরিবর্তনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সুন্দরবন আমাদের যা দিয়েছে, তার প্রতিদানে আমাদের এতটুকু দায়িত্ব তো নেওয়া উচিত।
সুন্দরবন আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে প্রতিকূলতার মধ্যে টিকে থাকতে হয়। নোনা জলের মধ্যেও কীভাবে শিকড় গেড়ে দাঁড়িয়ে থাকা যায়, সেই শিক্ষা এই গাছগুলোর কাছ থেকেই নেওয়া উচিত আমাদের। আজ যদি আমরা এই বনের পাশে না দাঁড়াই, কাল হয়তো এই বন আমাদের পাশে দাঁড়াতে পারবে না। তাই আসুন, বিশ্ব ম্যানগ্রোভ দিবসে আমরা প্রতিজ্ঞা করি, সুন্দরবনকে ভালোবাসব, রক্ষা করব, আর পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দেব একটা সবুজ, নিরাপদ ভবিষ্যৎ। এই দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, এই দায়িত্ব আমাদের প্রত্যেকের।
লেখক: একজন উদ্যোক্তা











