ইজিবাইক: জীবিকার চাকা থামিয়ে কি যানজটের সমাধান হবে?
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
বাংলাদেশের সড়কে ইজিবাইক এখন একটি অনিবার্য বাস্তবতা। এই বাস্তবতাকে কেউ দেখেন যানজটের কারণ হিসেবে, কেউ দেখেন কর্মসংস্থানের উৎস হিসেবে। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, ইজিবাইককে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা মূলত দুটি প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে। প্রথমত, একটি রাষ্ট্র কীভাবে নগর ও পরিবহন ব্যবস্থাপনা করবে? দ্বিতীয়ত, সেই ব্যবস্থাপনার নামে মানুষের জীবিকার অধিকার কতটা সুরক্ষিত থাকবে? সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ইজিবাইকের বিরুদ্ধে অভিযান, চলাচলে নিষেধাজ্ঞা কিংবা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে।
যুক্তি দেওয়া হচ্ছেÑযানজট কমাতে হবে, সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। লক্ষ্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে সমস্যার শিকড় পরিকল্পনার ঘাটতিতে, তার সমাধান কি কেবল একটি যানবাহনকে দায়ী করেই সম্ভব? বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের অধিকাংশ শহর, জেলা সদর কিংবা উপজেলা শহরের সম্প্রসারণ হয়েছে পরিকল্পনার আগেই। সড়ক সংকীর্ণ, ফুটপাত দখল হয়ে গেছে, বাজার গড়ে উঠেছে রাস্তার ওপর, বাসস্ট্যান্ডের নির্দিষ্ট স্থান নেই, ব্যক্তিগত যানবাহনের সংখ্যা বেড়েছে কয়েক গুণ।
একই রাস্তায় বাস, ট্রাক, মোটরসাইকেল, রিকশা, ভ্যান, ইজিবাইকÑসব চলাচল করছে। এমন পরিস্থিতিতে যানজট সৃষ্টি হওয়াই স্বাভাবিক। তাই যানজটের দায় শুধু ইজিবাইকের ঘাড়ে চাপানো বাস্তবতার সরলীকরণ মাত্র। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিতÑআমাদের শহরগুলোর জন্য কি সমন্বিত পরিবহন পরিকল্পনা আছে? কতটি পৌরসভায় পৃথক ধীরগতির যানবাহনের লেন রয়েছে? কোথায় ইজিবাইকের জন্য নির্দিষ্ট স্টপেজ বা পার্কিং ব্যবস্থা করা হয়েছে? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উত্তর হবেÑনা। অর্থাৎ সমস্যার বড় অংশ পরিকল্পনার, যানবাহনের নয়। ইজিবাইককে শুধু পরিবহনের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বড় একটি সামাজিক বাস্তবতা অদৃশ্য হয়ে যায়। এই খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লাখো মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত।
একজন চালক শুধু নিজের জন্য গাড়ি চালান না; তাঁর আয়ের ওপর নির্ভর করে পুরো পরিবার। সংসারের বাজার, সন্তানের স্কুলের ফি, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ওষুধÑসবকিছুর উৎস সেই দৈনিক আয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, অধিকাংশ চালক নিজস্ব মূলধনে ইজিবাইক কেনেন না। তাঁরা এনজিও, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান কিংবা সমবায় সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে গাড়ি কেনেন। প্রতি সপ্তাহে বা মাসে কিস্তি পরিশোধ করতে হয়। কোনো কারণে কয়েক দিন গাড়ি চালাতে না পারলে কিস্তি বকেয়া পড়ে, জরিমানা যোগ হয়, অনেক সময় ঋণের চাপ অসহনীয় হয়ে ওঠে। অর্থাৎ প্রশাসনিক একটি সিদ্ধান্ত কেবল একটি যানবাহনকে নয়, একটি পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে নড়বড়ে করে দেয়।
রাষ্ট্র যদি কোনো পরিবহন খাত নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, সেটি অবশ্যই তার অধিকার। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের আগে একটি প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজনÑযাঁদের জীবিকা বন্ধ হবে, তাঁদের বিকল্প কী? উন্নত দেশগুলোতে কোনো খাত পুনর্বিন্যাসের আগে পুনর্বাসন, প্রশিক্ষণ কিংবা বিকল্প কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা থাকে। আমাদের ক্ষেত্রেও সেই দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। শিক্ষার বিষয়টিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। উপজেলা ও গ্রামীণ অঞ্চলের অসংখ্য স্কুল-কলেজ শিক্ষার্থী প্রতিদিন ইজিবাইকে যাতায়াত করে। অনেক এলাকায় বাস নেই, মিনিবাস নেই, এমনকি নিয়মিত রিকশাও পাওয়া যায় না।
অভিভাবকেরা তুলনামূলক কম খরচে সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে পারেন ইজিবাইকের মাধ্যমে। যদি পরিকল্পনা ছাড়া এই পরিবহন হঠাৎ সীমিত করা হয়, তাহলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমবে, ঝরে পড়ার ঝুঁকি বাড়বে। শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর এমন প্রভাব কোনোভাবেই কাম্য নয়। একইভাবে স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও ইজিবাইকের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বাংলাদেশের অসংখ্য গ্রামে অ্যাম্বুলেন্স সময়মতো পৌঁছাতে পারে না। সরু রাস্তা, কাঁচা পথ কিংবা দুর্গম এলাকায় মুমূর্ষু রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার একমাত্র বাহন হয়ে ওঠে ইজিবাইক।
প্রসূতি মা, স্ট্রোকের রোগী, হৃদ্রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি কিংবা সাপে কাটা রোগীÑঅনেক ক্ষেত্রেই দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছাতে এই যানবাহন জীবন বাঁচানোর মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। তাই ইজিবাইককে কেবল যানজটের কারণ হিসেবে দেখা বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশকে অস্বীকার করার শামিল। উদ্বেগের বিষয় হলো, বিভিন্ন এলাকায় অভিযোগ উঠেছেÑকিছু প্রভাবশালী পরিবহন স্বার্থ সড়কে ব্যারিকেড দিয়ে ইজিবাইক থামিয়ে যাত্রী নামিয়ে দিচ্ছে এবং অন্য পরিবহনে উঠতে বাধ্য করছে। যদি এমন ঘটনা সত্য হয়ে থাকে, তবে তা কেবল বেআইনি নয়, নাগরিক অধিকার ও মুক্ত প্রতিযোগিতার পরিপন্থী। আইন প্রয়োগের দায়িত্ব প্রশাসনের; কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নয়।
সড়ককে প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র বানানো হলে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। তবে সব দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দিলে চলবে না। ইজিবাইক চালকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। ট্রাফিক আইন মানা, নির্ধারিত স্থানে যাত্রী ওঠানামা করানো, অতিরিক্ত যাত্রী না নেওয়া এবং অপ্রাপ্ত বয়স্কদের গাড়ি চালাতে না দেওয়াÑএসব নিশ্চিত করতে হবে। শৃঙ্খলা এক তরফাভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় না; চালক, যাত্রী, প্রশাসন ও নগর কর্তৃপক্ষÑসবার সম্মিলিত দায়িত্বে তা গড়ে ওঠে। এখন সময় এসেছে ইজিবাইককে নিষিদ্ধ করার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে এটিকে নীতির আওতায় আনার।
নিবন্ধন, রুট পারমিট, চালকদের প্রশিক্ষণ, নির্দিষ্ট স্টপেজ, নিরাপদ চার্জিং ব্যবস্থা এবং আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই খাতকে সুশৃঙ্খল করা সম্ভব। এতে যেমন যানজট কমবে, তেমনি মানুষের জীবিকাও রক্ষা পাবে। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা মানুষের জীবনকে সহজ করে; কঠিন নয়। একটি ইজিবাইকের চাকা থামিয়ে যদি হাজারো পরিবারের চুলা নিভে যায়, শিক্ষার্থীর বিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ হয়, মুমূর্ষু রোগীর হাসপাতালে পৌঁছানো বিলম্বিত হয়, তবে সেই উন্নয়ন প্রশ্নের মুখে পড়ে। ইজি বাইককে তাই কেবল একটি যানবাহন হিসেবে নয়, একটি সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে দেখতে হবে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, কিন্তু সেই শৃঙ্খলা যেন মানবিকতাকে অস্বীকার না করে। কারণ একটি ইজিবাইকের স্টিয়ারিংয়ের সঙ্গে শুধু একজন চালকের হাত নয়, একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ, একটি শিশুর শিক্ষা, একজন রোগীর জীবন এবং প্রান্তিক বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় অংশ জড়িয়ে আছে। অতএব, সমাধানের পথ নিষেধাজ্ঞা নয়Ñসুশাসন; সংঘাত নয়Ñসমন্বয়; আর দমন নয়Ñপরিকল্পিত নিয়ন্ত্রণ। এই উপলব্ধিই হতে পারে নিরাপদ সড়ক ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনের সবচেয়ে কার্যকর ভিত্তি।
লেখক: সংবাদকর্মী












