বিচারহীনতা ও মামলার জট: বিপন্ন গণতন্ত্র, জিম্মি সাধারণ মানুষ
গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ
একটি রাষ্ট্র কতটা গণতান্ত্রিক, তা শুধু নির্বাচন, সংসদ কিংবা রাজনৈতিক কর্মকা-ের মাধ্যমে পরিমাপ করা যায় না। এর অন্যতম প্রধান মানদ- হলো বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং নাগরিকের ন্যায়বিচার পাওয়ার নিশ্চয়তা। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই তিন ক্ষেত্রেই নানা উদ্বেগজনক প্রশ্ন রয়েছে। একদিকে রাজনৈতিক হয়রানি, বেআইনি গ্রেপ্তার, হেফাজতে নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের অভিযোগ, অন্যদিকে আদালতে বছরের পর বছর ঝুলে থাকা বিপুলসংখ্যক মামলা। ফলে ন্যায়বিচারপ্রত্যাশী সাধারণ মানুষকে দীর্ঘ অপেক্ষা, অর্থনৈতিক ব্যয় ও হয়রানির মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।
ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্টের (WJP) Rule of Lwa Index 2025 -এ ১৪৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৫তম। দক্ষিণ এশিয়ায়ও বাংলাদেশের অবস্থান নিচের সারিতে। এই অবস্থান নিঃসন্দেহে আমাদের আইনের শাসন, বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা ও নাগরিক অধিকার সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা আছে। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। সরকার পরিবর্তন হয়েছে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলেছে, কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মামলা দিয়ে হয়রানি করার অভিযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় বা বিরোধের কারণে সাধারণ নাগরিকও মামলার আসামি হয়ে পড়ছে এমন অভিযোগও আছে।
গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি হলো আইনের সমান প্রয়োগ এবং ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা। কোনো নাগরিক অপরাধের সুনির্দিষ্ট ভিত্তি ছাড়া গ্রেপ্তার বা হয়রানির শিকার হলে তা শুধু ব্যক্তির অধিকার ক্ষুণœ করে না, রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা হারায়। বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-, হেফাজতে নির্যাতন কিংবা আইন প্রয়োগে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগের প্রতিটি ঘটনাই স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে। কারণ রাষ্ট্রের হাতে আইন প্রয়োগের ক্ষমতা আছে বলেই সেই ক্ষমতার ব্যবহার আরও বেশি জবাবদিহিমূলক হওয়া প্রয়োজন।
আইন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশের আদালতগুলোতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৪৬ লাখেরও বেশি; এর মধ্যে নি¤œ আদালতেই রয়েছে ৪০ লাখের বেশি মামলা। এই বিপুল মামলাজট শুধু বিচারব্যবস্থার পরিসংখ্যান নয় এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে লাখ লাখ পরিবার ও মানুষের জীবন। একটি জমি-সংক্রান্ত বিরোধ, পারিবারিক মামলা কিংবা ফৌজদারি মামলার নিষ্পত্তির জন্য বছরের পর বছর আদালতে ঘুরতে হয় অনেক মানুষকে। মামলার খরচ, আইনজীবীর ফি, যাতায়াত এবং কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার কারণে নি¤œ ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে।
প্রচলিত প্রবাদ-‘Justice delayed is justice denied’-অর্থাৎ বিচার বিলম্বিত হলে ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়। দীর্ঘসূত্রতা একদিকে প্রকৃত অপরাধীর বিচারে বিলম্ব ঘটায়, অন্যদিকে নির্দোষ ব্যক্তিকেও দীর্ঘদিন আইনি অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখে। এর ফলে বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এই সংকটের সমাধান শুধু নতুন আইন প্রণয়নে নয়, প্রথমত, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
বিচারক নিয়োগ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে, যাতে যোগ্যতা, সততা ও পেশাগত দক্ষতা প্রধান বিবেচ্য হয়। দ্বিতীয়ত, পুলিশ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংস্কার জরুরি। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তদন্ত, গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়ার কঠোর অনুসরণ এবং হেফাজতে নির্যাতন বা বেআইনি বলপ্রয়োগের অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, মামলাজট কমাতে বিচারক ও আদালতের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর ই-কোর্ট, মামলার ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা, দ্রুত শুনানি এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (অউজ) আরও কার্যকর করা যেতে পারে। তবে শুধু বিচারকের সংখ্যা বাড়ালেই হবে না; দক্ষতা, অবকাঠামো ও প্রশাসনিক সক্ষমতাও সমানভাবে বাড়াতে হবে।
চতুর্থত, মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলার বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিকার প্রয়োজন। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কাউকে হয়রানি করতে মামলা দায়ের প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে তদন্তকারী সংস্থাকেও দায়িত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে।
(এটা লেখকের নিজস্ব মত)।










