শিক্ষায় গভীর সংকট, উত্তরণের পথ কোথায়
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মান প্রতিফলিত হয় শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, দক্ষতা ও পরীক্ষার ফলাফলে। পরীক্ষার ফলাফল কেবল পাস-ফেলের হিসাব নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদানের মান, শিক্ষকদের দায়িত্বশীলতা, শিক্ষা প্রশাসনের দক্ষতা এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্মাণের সক্ষমতা। ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল দেশের শিক্ষাব্যবস্থার এমন কিছু দুর্বলতা সামনে এনেছে, যা গভীরভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি। ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পাসের হার, প্রায় ছয় লাখ শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়া, ইংরেজি ও তথ্যপ্রযুক্তিতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ব্যর্থতা এবং ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষার্থীরও পাস না করা—সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, শিক্ষার এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ কোথায়?
এবার ১১টি শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। গত বছর এ হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ। মোট পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন অকৃতকার্য হয়েছে। জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যাও গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এই ফলাফলকে শুধু শিক্ষার্থীদের দুর্বল প্রস্তুতির পরিণতি হিসেবে দেখলে প্রকৃত সমস্যার গভীরে পৌঁছানো যাবে না। বরং খতিয়ে দেখতে হবে, শিক্ষাব্যবস্থায় কোথায় ঘাটতি তৈরি হয়েছে এবং কেন তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হচ্ছে না।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র ইংরেজি ও তথ্যপ্রযুক্তি বা আইসিটি বিষয়ে। ইংরেজিতে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ জন এবং আইসিটিতে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন অকৃতকার্য হয়েছে। দুটি বিষয়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ব্যর্থতা মৌলিক দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়।
ইংরেজি উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও জ্ঞান অর্জনের অন্যতম মাধ্যম। একইভাবে তথ্যপ্রযুক্তি আধুনিক বিশ্বের অপরিহার্য অনুষঙ্গ। অথচ এ দুটি বিষয়ে এত শিক্ষার্থীর ব্যর্থতা প্রশ্ন তুলছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কি সময়োপযোগী শিক্ষা দিতে পারছে? শ্রেণিকক্ষে প্রয়োজনীয় অনুশীলন হচ্ছে কি না, পর্যাপ্ত শিক্ষক ও ব্যবহারিক উপকরণ রয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা দরকার।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম দুর্বলতা মুখস্থনির্ভরতা। শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য অনেক কিছু মুখস্থ করলেও বাস্তব জীবনে সেই জ্ঞান প্রয়োগের দক্ষতা অর্জন করতে পারে না। ইংরেজি শিক্ষায় কথোপকথন, শ্রবণ ও লেখার চর্চার ঘাটতি রয়েছে। আইসিটি শিক্ষার ক্ষেত্রেও ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ সীমিত। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ল্যাব থাকলেও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, ইন্টারনেট ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক নেই। ফলে প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে প্রবেশ করেও শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ প্রয়োজনীয় দক্ষতা থেকে পিছিয়ে থাকছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফলও পরিস্থিতির গভীরতা তুলে ধরেছে। এবার ২৯৩টি প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ২০২টি। অন্যদিকে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা মাত্র ১৩৯টি। একটি প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়ার পেছনে শিক্ষকসংকট, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, পাঠদানের মান, অবকাঠামো ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার মতো বিষয় জড়িত থাকতে পারে। তাই শুধু ফলাফল প্রকাশ করেই দায়িত্ব শেষ করা যাবে না; দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোর সমস্যা চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
বিভাগভিত্তিক ফলাফলও শিক্ষার বৈষম্য তুলে ধরেছে। বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার ৭৩ দশমিক ১২ শতাংশ, মানবিকে ৪২ দশমিক ১৭ শতাংশ এবং ব্যবসায় শিক্ষায় ৫০ দশমিক ৭৭ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে মানবিক বিভাগ থেকে, অথচ এ বিভাগেই পাসের হার সবচেয়ে কম। এর পেছনে শিক্ষার্থীদের আর্থসামাজিক অবস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুযোগ-সুবিধা, শিক্ষকসংকট ও পাঠদানের মান কতটা দায়ী, তা অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।
এবারের ফলাফলে ছাত্রীদের এগিয়ে থাকার বিষয়টিও লক্ষণীয়। প্রায় সব বিভাগেই পাসের হারে ছাত্রীরা ছাত্রদের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। মানবিক বিভাগে ছাত্রদের পাসের হার ৩৫ দশমিক ০১ শতাংশ, বিপরীতে ছাত্রীদের ৪৭ দশমিক ৪৯ শতাংশ। বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগেও ছাত্রীদের সাফল্য বেশি। এটি মেয়েদের শিক্ষায় অগ্রগতির ইতিবাচক দিক। তবে ছাত্রদের পিছিয়ে পড়ার কারণও অনুসন্ধান করা জরুরি।
বোর্ডভিত্তিক ফলাফল দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষার সুযোগ ও মানের ব্যবধান সামনে এনেছে। ঢাকা বোর্ডে পাসের হার ৬১ দশমিক ৮৩ শতাংশ। অন্যদিকে বরিশাল বোর্ডে ৪৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ এবং যশোর বোর্ডে ৪৪ দশমিক ৯২ শতাংশ। একই দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এমন ব্যবধান কেন তৈরি হচ্ছে, তা গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। শহর ও গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুযোগ-সুবিধা, শিক্ষকপ্রাপ্যতা এবং পাঠদানের মানের পার্থক্য এ ক্ষেত্রে কতটা ভূমিকা রাখছে, তা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটের মতো উপকূলীয় অঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আলাদা করে ভাবা দরকার। এসব এলাকার অনেক শিক্ষার্থীকে দারিদ্র্য, জলবায়ুজনিত দুর্যোগ, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, যাতায়াতের সমস্যা ও পারিবারিক আর্থিক সংকটের মধ্যে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হয়। পরিবারের উপার্জনে সহযোগিতা করতে গিয়ে অনেকের পড়াশোনা ব্যাহত হয়। মেয়েদের ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহের ঝুঁকিও রয়েছে। ফলে এসব অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের ফলাফল মূল্যায়ন ও উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নে স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
তবে শিক্ষার মানের অবনতির দায় শুধু শিক্ষার্থী কিংবা অভিভাবকের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা, নিয়মিত প্রশিক্ষণ, শ্রেণিকক্ষে উপযুক্ত পরিবেশ, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং শিক্ষা প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একজন শিক্ষার্থী কেন ব্যর্থ হচ্ছে, তার কারণ যেমন খুঁজতে হবে, তেমনি একটি প্রতিষ্ঠান কেন শিক্ষার্থীদের সফল করতে পারছে না, সেটিও খতিয়ে দেখতে হবে।
এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষকতা শুধু পাঠ্যবই শেষ করার কাজ নয়; শিক্ষার্থীর বোঝার ক্ষমতা, দুর্বলতা ও প্রয়োজন অনুযায়ী পাঠদান নিশ্চিত করাও শিক্ষকের দায়িত্ব। নিয়মিত মূল্যায়ন, বাড়তি সহায়তা এবং অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পিছিয়ে পড়া ঠেকানো সম্ভব। একই সঙ্গে শিক্ষকদের যথাযথ মর্যাদা, প্রশিক্ষণ ও মানসম্মত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
ফলাফল প্রকাশের পর উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ফলাফলে অসংগতি মনে হলে শিক্ষার্থীরা নির্ধারিত নিয়মে আবেদন করতে পারে। কিন্তু পুনর্নিরীক্ষণের মাধ্যমে সামগ্রিক শিক্ষাসংকটের সমাধান হবে না। প্রয়োজন শিক্ষাব্যবস্থার গভীর পর্যালোচনা। কোন বিষয়ে শিক্ষার্থীরা কেন পিছিয়ে পড়ছে, কোন অঞ্চলে ফলাফল খারাপ হওয়ার কারণ কী এবং কোন প্রতিষ্ঠানগুলো ধারাবাহিকভাবে দুর্বল ফল করছে—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা বোর্ডগুলোর উচিত ইংরেজি ও আইসিটি বিষয়ে বিশেষ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা। প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, ব্যবহারিক শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি, নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত ক্লাসের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে নিরপেক্ষ অনুসন্ধান করে সমস্যার কারণ চিহ্নিত করতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল পরীক্ষায় পাস করানো কিংবা জিপিএ-৫ বাড়ানো নয়। শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্য হলো জ্ঞান, দক্ষতা, যুক্তিবোধ ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ তৈরি করা। শুধু পাসের হার বাড়লেই শিক্ষার মান উন্নত হয়েছে—এমন দাবি করা যাবে না। আবার বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ব্যর্থতাকেও স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া যায় না।
এইচএসসির এবারের ফলাফল আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। প্রায় ছয় লাখ শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়ার পেছনে ব্যক্তিগত প্রস্তুতির ঘাটতি যেমন থাকতে পারে, তেমনি রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা। তাই এখন প্রয়োজন দোষারোপ নয়, আত্মসমালোচনা; দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া নয়, বরং দায়িত্ব গ্রহণ।
আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের নাগরিক, কর্মজীবী ও রাষ্ট্র পরিচালনার অংশীদার। তাদের যথাযথ শিক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই শিক্ষার সংকটকে কেবল একটি পরীক্ষার ফলাফল হিসেবে দেখার অবকাশ নেই। প্রয়োজন শিক্ষার ভিত্তি মজবুত করা, বৈষম্য কমানো, শিক্ষকদের সক্ষমতা বাড়ানো এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা।
প্রশ্ন এখন শুধু কতজন শিক্ষার্থী পাস করল, তা নয়; বরং আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কতজন শিক্ষার্থীকে প্রকৃত অর্থে শিক্ষিত ও দক্ষ করে তুলতে পারছে। শিক্ষায় গভীর সংকট কাটিয়ে উত্তরণের পথ খুঁজতে হলে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার পাশাপাশি কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ শিক্ষার মানোন্নয়ন কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, অভিভাবক ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব।
লেখক: সংবাদকর্মী












