সম্পাদকীয়: চামড়া শিল্পের বিপর্যয় ও অপচয় আর কত দিন?
পবিত্র ঈদুল আজহার প্রধান অনুষঙ্গ কোরবানি। আর এই কোরবানিকে কেন্দ্র করে দেশের অর্থনীতি ও চামড়া শিল্পে এক বিশাল কর্মচাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া নিয়ে যে চরম অব্যবস্থাপনা ও বিপর্যয় দেখা যাচ্ছে, তা এবারও পিছু ছাড়েনি। উপকূলীয় অঞ্চল সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন এলাকায় চামড়ার ন্যায্য মূল্য না পেয়ে সাধারণ মানুষ ও মৌসুমি ব্যবসায়ীদের বাধ্য হয়ে তা মাটিতে পুঁতে ফেলা কিংবা পরিত্যক্ত অবস্থায় রাস্তায় ফেলে রাখার চিত্র কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এটি কেবল একটি জাতীয় সম্পদের অপচয়ই নয়, বরং দেশের সম্ভাবনাময় একটি শিল্পের করুণ পরিণতির স্পষ্ট সংকেত।
শ্যামনগরের বিভিন্ন ইউনিয়ন, বিশেষ করে দুর্গম গাবুরা বা বুড়িগোয়ালিনী এলাকার মাদ্রাসা ও এতিমখানা কর্তৃপক্ষ এবং সাধারণ মানুষ দিন-রাত অপেক্ষা করেও চামড়ার কোনো ক্রেতা পাননি। সরকার প্রতিবছরই কাঁচা চামড়ার একটি দাম নির্ধারণ করে দেয়, কিন্তু মাঠপর্যায়ে তার কোনো বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায় না—তা আরও একবার প্রমাণিত হলো। স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের বক্তব্য অনুযায়ী, লবণের আকাশচুম্বী দাম এবং বাড়তি পরিবহন খরচের কারণে লোকসানের আশঙ্কায় তাঁরা চামড়া কিনতে সাহস পাচ্ছেন না। এর ওপর যুক্ত হয়েছে স্থানীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও আড়তের অভাব।
এই সংকটের বহুমাত্রিক নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। প্রথমত, আমাদের দেশের কওমি মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলোর আয়ের একটা বড় অংশ আসে কোরবানির চামড়া বিক্রির অর্থ থেকে, যা দিয়ে সারাবছর দুস্থ ও অনাথ শিক্ষার্থীদের ভরণপোষণ করা হয়। চামড়ার বাজারে এই ধসের কারণে এই মানবিক প্রতিষ্ঠানগুলো চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ল। দ্বিতীয়ত, শত শত চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলা বা যত্রতত্র ফেলে রাখার কারণে তা পচে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে, যা উপকূলীয় অঞ্চলের নাজুক পরিবেশকে আরও ঝুঁকিতে ফেলবে।
প্রশ্ন হলো, বছরের পর বছর ধরে কেন এই একই সংকটের পুনরাবৃত্তি ঘটবে? কেন ট্যানারি মালিক ও বড় আড়তদারদের সিন্ডিকেটের কাছে মাঠপর্যায়ের প্রান্তিক মানুষ ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা জিম্মি হয়ে থাকবেন? সরকার শুধু দাম নির্ধারণ করেই যদি দায়িত্ব শেষ মনে করে, তবে মাঠপর্যায়ের এই বিশৃঙ্খলা কোনোদিনই থামবে না।
চামড়া শিল্পকে বাঁচাতে হলে এবং এই জাতীয় সম্পদের অপচয় রোধ করতে হলে এখনই দীর্ঘমেয়াদি ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন।
জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরকারি উদ্যোগে চামড়া সংরক্ষণের জন্য অস্থায়ী হিমাগার বা আধুনিক সেন্ট্রাল ডিপো তৈরি করা জরুরি, যাতে লবণের দাম বাড়লেও চামড়া পচে নষ্ট না হয়। একই সঙ্গে, সিন্ডিকেট ভেঙে মাঠপর্যায়ে সরকারি নজরদারি ও মনিটরিং সেল গঠন করতে হবে, যাতে ট্যানারি মালিকদের দেওয়া সেন্ট্রাল লোন বা সুবিধার সুফল প্রান্তিক বিক্রেতারাও পান। আমরা আশা করি, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও নীতিনির্ধারকেরা শ্যামনগরের এই বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নিয়ে চামড়া শিল্পের এই প্রাতিষ্ঠানিক সংকট দূরীকরণে দ্রুত ও কার্যকরী পদক্ষেপ নেবেন।












