সম্পাদকীয়: প্রসঙ্গ: শ্রমিকের অধিকার ও আগামীর বাংলাদেশ: মহান মে দিবস ২০২৬
১৮৮৬ সালের ১ মে শিকাগোর হে মার্কেটে শ্রমিকদের বুকের রক্তে ভেজা সেই অধিকার আদায়ের লড়াই আজ এক বৈশ্বিক চেতনার নাম। ২০২৬ সালের এই মে দিবসে দাঁড়িয়ে আমরা যখন পেছনে ফিরে তাকাই, তখন দেখি শ্রমিকের অধিকার আর মর্যাদা রক্ষার লড়াইটি কেবল আট ঘণ্টা শ্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা এখন উন্নত কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) এই যুগে শ্রমিকের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক নতুন চ্যালেঞ্জে রূপ নিয়েছে।
বিগত দশকগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে উত্তরণের এই যাত্রায় প্রধান কারিগর হলেন আমাদের মেহনতি মানুষ। পোশাক শিল্প থেকে শুরু করে অবকাঠামো নির্মাণÑসবখানেই শ্রমিকের ঘামের গন্ধ মিশে আছে।
তবে মুদ্রাস্ফীতি আর জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির এই সময়ে প্রশ্ন জাগে, শ্রমিক কি তার ন্যায্য হিস্যা পাচ্ছে? বাজারের ঊর্ধ্বগতির সাথে পাল্লা দিয়ে শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি আজও অনেক ক্ষেত্রে অপূর্ণাঙ্গ। কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ‘রানা প্লাজা’ ট্র্যাজেডির পর অনেক উন্নতি হলেও, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের বিশাল এক অংশ আজও রয়ে গেছে সব ধরনের সুরক্ষার বাইরে।
২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আমরা এক নতুন সংকটের মুখোমুখি। প্রযুক্তির দ্রুত উত্থান বা অটোমেশন অনেক ক্ষেত্রে কায়িক শ্রমের জায়গা দখল করে নিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে শ্রমিকের দক্ষতা উন্নয়ন এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং টিকে থাকার লড়াই। প্রযুক্তির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হলে সাধারণ শ্রমিকদের আধুনিক যন্ত্রপাতির সাথে পরিচিত করা সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। চাকরির নিরাপত্তায় যন্ত্র যেন মানুষের বিকল্প না হয়ে পরিপূরক হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
মে দিবস মানে কেবল বর্ণিল র্যালি বা বক্তৃতার মঞ্চ নয়। মে দিবসের প্রকৃত সার্থকতা নিহিত রয়েছে শ্রমিকের মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার মধ্যে। আমাদের মনে রাখতে হবেÑশ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার পারিশ্রমিক দেওয়া ইসলামের শিক্ষা এবং আধুনিক শ্রম আইনের মূল ভিত্তি। অসুস্থতা, দুর্ঘটনা বা বার্ধক্যে শ্রমিকের পাশে দাঁড়ানোর জন্য রাষ্ট্রীয় বীমা ও সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। কাগজে-কলমে থাকা আইনগুলোর যথাযথ প্রয়োগ মাঠ পর্যায়ে নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখতে হবেÑ”শ্রমিক-মালিক সুসম্পর্কই হলো টেকসই উন্নয়নের চাবিকাঠি।”
পরিশেষে, ২০২৬ সালের এই মে দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোকÑএমন এক বাংলাদেশ গড়ার, যেখানে কোনো শ্রমিক শোষিত হবে না। শ্রমিকের অধিকার রক্ষা করা কোনো দয়া নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং উন্নয়নের অপরিহার্য শর্ত। মে দিবসের লাল সালাম পৌঁছে যাক বাংলার প্রতিটি কলকারখানা আর মেহনতি মানুষের ঘরে ঘরে। জয় হোক মেহনতি মানুষের।









