সাকিবুর রহমান বাবলা
৮ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী পালিত হয় আন্তর্জাতিক জন্ম নিবন্ধন দিবস। এটি জাতিসংঘ ঘোষিত কোনো আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক দিবস নয়; ২০১৮ সালে জনসন বেবি ও সেভ দ্য চিলড্রেনের যৌথ ‘দি রাইট স্টার্ট’ উদ্যোগের মাধ্যমে দিনটির আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রচার ও পালন শুরু হয়। মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় জন্ম নিবন্ধনের গুরুত্ব তুলে ধরা এবং জন্মের পর প্রতিটি শিশুর আইনি পরিচয় নিশ্চিত করাই ছিল এ উদ্যোগের প্রধান উদ্দেশ্য।
জন্ম নিবন্ধন নিছক একটি সনদ বা কয়েকটি সংখ্যার সমষ্টি নয়; এটি রাষ্ট্রের কাছে একজন মানুষের অস্তিত্বের প্রথম সরকারি স্বীকৃতি। জন্ম নিবন্ধনের মাধ্যমে শিশুর নাম, জন্মতারিখ, পিতা-মাতা ও পারিবারিক পরিচয়ের একটি নির্ভরযোগ্য সরকারি রেকর্ড তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, বিবাহ নিবন্ধন, উত্তরাধিকারসহ নানা নাগরিক ও সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় এই রেকর্ড গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। ফলে এটি শিশুর বর্তমান নিরাপত্তার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নাগরিক জীবনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের ৭ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, শিশুর জন্মের পর অবিলম্বে তাকে নিবন্ধন করতে হবে; জন্ম থেকেই তার নাম ও জাতীয়তা অর্জনের অধিকার রয়েছে এবং যতদূর সম্ভব পিতা-মাতাকে জানা ও তাদের দ্বারা লালিত-পালিত হওয়ার অধিকারও রয়েছে। একইভাবে আইসিসিপিআর-এর ২৪(২) অনুচ্ছেদ প্রত্যেক শিশুর জন্মের পর অবিলম্বে নিবন্ধনের অধিকার স্বীকার করেছে। জাতিসংঘের লিগ্যাল আইডেন্টিটি অ্যাজেন্ডাও জন্ম নিবন্ধনকে আইনি পরিচয় প্রতিষ্ঠার মৌলিক উপায় হিসেবে বিবেচনা করে।
জন্ম নিবন্ধনের সঙ্গে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ১৬.৯-এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য, জন্ম নিবন্ধনসহ, আইনি পরিচয় নিশ্চিত করাই এ লক্ষ্যের উদ্দেশ্য। নির্ভরযোগ্য জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন ব্যবস্থা শুধু ব্যক্তির অধিকার রক্ষা করে না; জনসংখ্যা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নের নির্ভুল পরিসংখ্যান তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
জন্ম নিবন্ধনের ধারণা আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সৃষ্টি হলেও মানুষের জন্ম, বংশ ও পরিচয় সংরক্ষণের সামাজিক রীতি বহু প্রাচীন। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় প্রশাসনে নাম, বংশপরিচয় ও গুরুত্বপূর্ণ জীবনের ঘটনাবলি লিখে রাখার ঐতিহ্য ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক নিবন্ধন ব্যবস্থায় রূপ নেয়। ইউরোপে ১৬শ শতাব্দী থেকে গির্জাভিত্তিক নথি এবং পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় নাগরিক নিবন্ধন ব্যবস্থা বিস্তৃত হয়। ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে ১ জুলাই ১৮৩৭ থেকে বেসামরিক জন্ম, বিবাহ ও মৃত্যু নিবন্ধনের আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা চালু হয়।
বাংলাদেশের ভূখন্ডে আধুনিক জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনের আইনি ভিত্তি ব্রিটিশ আমলের ১৮৭৩ সালের ‘বার্থস অ্যান্ড ডেথস রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট’-এর সঙ্গে যুক্ত। স্বাধীনতার পর দীর্ঘদিন পুরোনো কাঠামো চললেও ২০০১–২০০৬ সালে ইউনিসেফ-বাংলাদেশের সহায়তায় পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে নতুনভাবে জন্ম নিবন্ধন কার্যক্রম বিস্তৃত করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় ৭ ডিসেম্বর ২০০৪ জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ২০০৪ প্রণীত হয় এবং ৩ জুলাই ২০০৬ থেকে তা কার্যকর হয়।
বর্তমানে বাংলাদেশে জন্ম নিবন্ধন ব্যবস্থায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। নিবন্ধন তথ্য প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থায় সংরক্ষণ করা হয় এবং ১৭ অঙ্কের অনন্য জন্ম নিবন্ধন নম্বর ব্যবহৃত হচ্ছে। আইনে শিশুর জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে জন্মসংক্রান্ত তথ্য নিবন্ধকের কাছে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে; বিলম্ব হলেও নির্ধারিত প্রক্রিয়া ও ফি দিয়ে নিবন্ধনের সুযোগ আছে।
জন্ম নিবন্ধন শিশুকে বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম, মানবপাচার ও বিভিন্ন ধরনের শোষণ থেকে সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বয়সের নির্ভরযোগ্য সরকারি প্রমাণ থাকলে শিশুর বয়স নিয়ে জালিয়াতি কমানো সম্ভব হয়। কোনো শিশু হারিয়ে গেলে বা বাস্তুচ্যুত বা ভবঘুরে হলে তার পরিচয় পুনঃপ্রতিষ্ঠায়ও জন্ম নিবন্ধন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধ, দুর্যোগ ও বাস্তুচ্যুতির পরিস্থিতিতে জন্ম নিবন্ধনের অভাব ভবিষ্যতে রাষ্ট্রহীনতা ও আইনি পরিচয় সংকটের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
অগ্রগতি সত্ত্বেও বিশ্বে এখনও বিপুলসংখ্যক শিশু জন্ম নিবন্ধনের বাইরে। ইউনিসেফ-এর সর্বশেষ বৈশ্বিক তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ১৫ কোটি শিশু এখনো নিবন্ধিত নয়; আরও পাঁচ কোটির বেশি শিশুর জন্ম নিবন্ধিত হলেও তাদের হাতে জন্মসনদের প্রমাণ নেই। নিম্নআয়ের পরিবার, দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চল, দুর্বল প্রশাসনিক ব্যবস্থা, দারিদ্র্য, সচেতনতার অভাব, বাস্তুচ্যুতি ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এ ক্ষেত্রে বড় বাধা।
বাংলাদেশে দুর্গম ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, দরিদ্র পরিবার এবং প্রশাসনিক বা প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে সবার জন্ম নিবন্ধন নিশ্চিত করা এখনও একটি চলমান চ্যালেঞ্জ; যদিও সরকার এ বিষয়ে পৃথক দপ্তর গঠন করেছে। তবে নিবন্ধন ব্যবস্থাকে আরও সহজ, সুলভ, স্বচ্ছ এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও স্থানীয় সরকার সেবার সঙ্গে সমন্বিত করা জরুরি।
আধুনিক সরকারি জন্ম নিবন্ধন কোনো ধর্মীয় আচার থেকে সরাসরি উদ্ভূত নয়; তবে বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতিতে শিশুর নামকরণ, বংশপরিচয় সংরক্ষণ এবং সমাজে তার আগমন ঘোষণা করার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। ইসলামে শিশুর সুন্দর নাম রাখা, পিতৃপরিচয় সংরক্ষণ এবং পরিচয় বিকৃত না করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। হিন্দুধর্মে নামকরণ সংস্কার শিশুর সামাজিক ও ধর্মীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ আচার। খ্রিষ্টীয় সমাজে গির্জার বাপ্তিস্ম ও চার্চ রেজিস্টারে জন্ম বা দীক্ষার তথ্য সংরক্ষণের ঐতিহ্য রয়েছে। বৌদ্ধ সমাজেও শিশুর নামকরণ ও মঙ্গলকামনার সামাজিক-ধর্মীয় রীতি প্রচলিত। এসব ঐতিহ্যকে আধুনিক রাষ্ট্রীয় জন্ম নিবন্ধনের সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক নয়; তবে পরিচয় সংরক্ষণের মানবিক ও সামাজিক প্রয়োজনের সঙ্গে এদের একটি ঐতিহাসিক সাদৃশ্য রয়েছে।
বাংলাদেশে প্রতিবছর ৬ অক্টোবর জাতীয় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন দিবস পালিত হয়। তবে আন্তর্জাতিকভাবে ৮ অক্টোবরের দিবসটিও আমাদের মনে করিয়ে দেয়-একটি শিশুকে জন্মের পর শুধু পৃথিবীতে স্বাগত জানালেই দায়িত্ব শেষ হয় না; তাকে রাষ্ট্রের নথিতে দৃশ্যমান করাও জরুরি।
জন্ম নিবন্ধন তাই কাগজের সনদ নয়, এটি একজন মানুষের ‘অধিকার পাওয়ার অধিকার’-এর প্রথম ভিত্তি। জন্মের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিটি শিশুকে আইনি পরিচয়ের আওতায় আনা মানে তাকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও সামাজিক মর্যাদার পথে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া। একটি শিশুকে গণনায় আনা মানে শুধু একটি সংখ্যা যোগ করা নয়-একটি জীবনকে রাষ্ট্র ও পৃথিবীর কাছে দৃশ্যমান করা। আর যে রাষ্ট্র তার প্রতিটি শিশুকে জন্ম থেকেই দৃশ্যমান ও স্বীকৃত করে, সে রাষ্ট্রই অধিকতর মানবিক, নিরাপদ ও ভবিষ্যৎমুখী।