সাতক্ষীরায় নদী-খাল গিলে খাচ্ছে ৩০২ দখলদার
ইটভাটা, শিল্পকারখানা ও মাছের ঘেরে সংকুচিত কপোতাক্ষ-ইছামতি-বেতনা: ৫০ দিনের বিশেষ উচ্ছেদ অভিযানের প্রস্তুতি
মিলন বিশ্বাস: সাতক্ষীরার দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ নদী ও খালের অবৈধ দখল। বছরের পর বছর ধরে নদীর জমি দখল করে গড়ে উঠেছে ইটভাটা, শিল্পকারখানা, মাছের ঘের, পুকুর ও বসতবাড়ি। এতে কপোতাক্ষ, ইছামতি, বেতনাসহ জেলার গুরুত্বপূর্ণ নদী ও খালের স্বাভাবিক প্রবাহ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এবার এসব অবৈধ দখলদারদের চিহ্নিত করে উচ্ছেদের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়েছে জেলা প্রশাসন।
জেলা প্রশাসনের প্রস্তুত করা সর্বশেষ তালিকায় কপোতাক্ষ, ইছামতি, বেতনা নদী এবং বিভিন্ন নৌ-খালের ৩০২ জন অবৈধ দখলদারের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের নির্দেশনায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) পর্যায়ে সরেজমিন তদন্ত ও পুনঃযাচাই শেষে এই তালিকা প্রস্তুত করা হয়। তালিকার পাশাপাশি একটি উচ্ছেদ কর্মপরিকল্পনাও কমিশনে পাঠানো হয়েছে, যা জেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইটেও প্রকাশ করা হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সদর উপজেলার বাবুলিয়া মৌজায় নদীর জায়গা দখল করে বীরদর্পে চলছে ‘কামরুল এসবিবি’ ও ‘মনির এসবিএল’ নামের দুটি ইটভাটা। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২ বিঘা ৮ কাঠা নদীর জমি গিলে খেয়েছে এই ইটভাটা দুটি। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এই স্থাপনাগুলো বহাল থাকায় নদীর স্বাভাবিক পানির প্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
একই চিত্র বিনেরপোতা এলাকায়। সেখানে বেতনা নদীর তীরে নির্মাণাধীন হাসান ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের বিরুদ্ধে নদীর জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে। জেলা প্রশাসনের তালিকায় উল্লেখ করা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির দখলে রয়েছে প্রায় ১ দশমিক ১৮৭ বিঘা নদীর জমি। এমনকি নদীর সীমানার ভেতরেই পাকা প্রাচীর ও স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সরকারি নৌ-খাল দখল করে মাছের ঘের, ধান চাষ ও অন্যান্য স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। কোথাও কোথাও খালের অস্তিত্বই এখন মানচিত্র থেকে বিলীনের পথে। স্থানীয় লোকজনের দাবি, পানি চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই সাতক্ষীরা শহর ও আশপাশের এলাকা তলিয়ে নরককু-ে পরিণত হয়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র মিলেছে তালা উপজেলার মাগুরা, জগদানন্দকাটি, পুটিয়াখালী, রাজেন্দ্রপুর ও জালালপুর মৌজায়। সেখানে শতাধিক ব্যক্তি কপোতাক্ষ নদীর জমি দখল করে স্থায়ী-অস্থায়ী বসতি, পুকুর ও কৃষিজমি তৈরি করেছেন।
জেলা প্রশাসনের কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী, বর্ষা মৌসুমের মধ্যেই নদীর গুরুত্বপূর্ণ অংশ উদ্ধার করতে ৫০ দিনের একটি বিশেষ (ক্র্যাশ) অভিযান পরিচালনা করা হবে। তবে পর্যাপ্ত জনবল, লজিস্টিক সহায়তা এবং নদীর জমিতে বসবাসকারী ভূমিহীন পরিবারগুলোর পুনর্বাসনকে এই অভিযানের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এরই মধ্যে শহরের বাইপাস সড়কসংলগ্ন একটি খাল থেকে অবৈধ নেট-পাটা অপসারণের কাজ শুরু হয়েছে।
সমাজসেবক ডা. আবুল কালাম বাবলা বলেন, “সাতক্ষীরার সবচেয়ে বড় সংকট জলাবদ্ধতা। ব্যক্তি স্বার্থে যারা খাল-নদী আটকে রেখেছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।”
সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) সাতক্ষীরার সভাপতি তৈয়ব হাসান সামছুজ্জামান বাবু বলেন, “নদী ও খাল দখলমুক্ত করা গেলে পানি প্রবাহ স্বাভাবিক হবে, কমবে জলাবদ্ধতা। তবে অভিযান যেন কেবল ছোট দখলদারদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধেও সমানভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে।”
জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ বলেন, “খাল, ড্রেন ও পানি চলাচলের পথ পরিষ্কারের কাজ চলছে। নতুন করে কেউ দখল বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বড় অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধেও যথাযথ নোটিশ দিয়ে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হবে।”
অতীতেও নদী দখলমুক্ত করতে একাধিকবার তালিকা ও লোকদেখানো অভিযান হয়েছিল, কিন্তু প্রভাবশালী দখলদারদের রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় সেসব উদ্যোগ ভেস্তে যায়। তাই এবার ৩০২ দখলদারের তালিকা প্রকাশের পর শুরু হতে যাওয়া অভিযান শেষ পর্যন্ত কপোতাক্ষ, ইছামতি ও বেতনাকে কতটা মুক্ত করতে পারে, সেদিকেই তাকিয়ে আছেন সাতক্ষীরাবাসী।









