শেখ ফরিদ হোসেন
একটি গণতান্ত্রিক দেশের প্রাণভোমরা হলো অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। তবে স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে দেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ ২’শতাধিক নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। এরমধ্যে বেশি সনাতন ব্যালট পেপারে এবং কিছু ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণ হয়েছে। প্রত্যেকটি নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। বিগত কয়েক দশকে বিভিন্ন নির্বাচনকে ঘিরে জাল ভোট, ব্যালট ছিনতাই, একাধিক ব্যালটে সিল মারা, কেন্দ্র দখল এবং ফলাফল নিয়ে বিতর্কের মতো অভিযোগ বারবার জনমনে প্রশ্ন তৈরি করেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হলেও একটি বিষয় স্পষ্ট-নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা বারবার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। তাই আগামী স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে মানুষের আস্থা পুনর্গঠনে নতুন ভাবনার সময় এখন সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রযুক্তি আজ বিশ্বের নানা ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করছে। নির্বাচন ব্যবস্থাও এর বাইরে নয়। এই নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রশ্নমুক্ত রাখতে বছরের পর বছর ধরে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। এর মধ্যে অনেক দেশ ইলেকট্রনিক ভোটিং, বায়োমেট্রিক ভোটার শনাক্তকরণ কিংবা ডিজিটাল যাচাই ব্যবস্থার মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। তাই বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ব্যালট পেপারের সঙ্গে ফিঙ্গারপ্রিন্ট প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে আলোচনা হওয়া অস্বাভাবিক নয়। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি চমৎকার সুরক্ষা ব্যবস্থা মনে হলেও, এর পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর দার্শনিক ও ব্যবহারিক বিতর্ক। পরিচয়ের নিশ্চয়তা ও জালিয়াতি রোধ-এই পদ্ধতির প্রধান ইতিবাচক দিক হলো ভোটারের শতভাগ পরিচয় নিশ্চিত করা।
অতীতে ‘জাল ভোট’ বা মৃত ব্যক্তির ভোট দেওয়ার মতো যে অভিযোগগুলো উঠত, আঙুলের ছাপের আধুনিক প্রযুক্তির কারণে তা অনেকাংশেই রোধ করা সম্ভব। যখন একজন ভোটার নিজের পছন্দের প্রার্থীকে সিল মেরে নির্দিষ্ট রেজিস্টারে নিজের আঙুলের ছাপ প্রদান করেন, তখন এটি অকাট্য প্রমাণ হিসেবে কাজ করে যে, সঠিক ব্যক্তিটিই ভোট দিয়েছেন এবং পুনরায় একই ব্যক্তির ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকে না। ফলে ভোট দেওয়ার সময় ব্যালট পেপারের নির্ধারিত স্থানে ভোটারের আঙুলের ছাপ গ্রহণ বা প্রযুক্তিগতভাবে তা সংযুক্ত করার ব্যবস্থা থাকলে প্রতিটি ব্যালটের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি হতে পারে। এর উদ্দেশ্য ভোটারকে শনাক্ত করা নয়; ভোটের গোপনীয়তা নষ্ট করা নয়; বরং ভোট গ্রহণ-পরবর্তী কোনো গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রয়োজন হলে তদন্তের জন্য একটি প্রযুক্তিগত যাচাইয়ের সুযোগ রাখা।
যদি কোনো কেন্দ্রে ব্যালট বাক্স ছিনতাই হয়েছে অথবা একাধিক ব্যালটে একই ব্যক্তির সিল মারার অভিযোগ উঠেছে। বর্তমান ব্যবস্থায় এসব অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু যদি ব্যালটে নিরাপদভাবে সংরক্ষিত ফিঙ্গারপ্রিন্ট বিশ্লেষণের সুযোগ থাকে, তাহলে আদালতের নির্দেশ বা আইনসম্মত তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন সহজ হতে পারে। এতে দোষী ব্যক্তি, দায়িত্বে অবহেলাকারী কর্মকর্তা কিংবা সংশ্লিষ্ট অন্যদের বিরুদ্ধে প্রমাণভিত্তিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে নির্বাচন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং ভবিষ্যতে অনিয়মের প্রবণতা কমানোর ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
তবে এই ধারণার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জও কম নয়। গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মৌলিক ভিত্তি হলো গোপন ব্যালট। কোনো অবস্থাতেই এমন প্রযুক্তি গ্রহণ করা যাবে না, যাতে একজন ভোটার কাকে ভোট দিয়েছেন, তা শনাক্ত করা সম্ভব হয়। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা, তথ্য সংরক্ষণের নীতিমালা, প্রযুক্তির নির্ভরযোগ্যতা, বাস্তবায়নের ব্যয়, সাংবিধানিক বৈধতা এবং বিদ্যমান নির্বাচনী আইনের সঙ্গে এর সামঞ্জস্য-সবকিছু গভীরভাবে পর্যালোচনা অপরিহার্য। ফলে প্রযুক্তি যেন স্বচ্ছতা বাড়ানোর পরিবর্তে নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি না করে, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে। এবং নির্বাচন কমিশন, প্রযুক্তিবিদ, আইনজ্ঞ, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ এবং মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদেরঅংশগ্রহণে এ বিষয়ে উন্মুক্ত আলোচনা বা একটি বিস্তৃত জাতীয় সংলাপের মাধ্যমে এর সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা আরও স্পষ্ট হবে। প্রয়োজনে সীমিত পরিসরে পরীক্ষামূলকভাবে এর কার্যকারিতা যাচাই করে পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।
গণতন্ত্রের শক্তি কেবল ভোট গ্রহণে নয়, সেই ভোটের প্রতি মানুষের বিশ্বাসে। সেই বিশ্বাস আরও সুদৃঢ় করতে নতুন প্রযুক্তি, নতুন ধারণা এবং নতুন সংস্কার নিয়ে প্রযুক্তি, আইন এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার সমন্বয় অপরিহার্য। নতুন কোনো ধারণা গ্রহণের আগে তা নিয়ে মুক্ত আলোচনা, সমালোচনামূলক মূল্যায়ন এবং বাস্তবসম্মত পরীক্ষা-নিরীক্ষা হওয়া উচিত। কারণ একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন কেবল একটি সরকারের বৈধতা নিশ্চিত করে না; এটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভিত্তিকেও আরও শক্তিশালী করে। তাই বাংলাদেশে এমন একটি নির্বাচন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে ফলাফল নয়, পুরো প্রক্রিয়াটিই জনগণের কাছে প্রশ্নাতীতভাবে গ্রহণযোগ্য হবে।
লেখক: শেখ ফরিদ হোসেন, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, সাপ্তাহিক সূর্যের আলো, সাতক্ষীরা।