হোমিও সম্্রাট হ্যানিম্যান: এক ক্ষণজন্মা আরোগ্য বিপ্লবী
আখলাকুর রহমান
১৮৪৩ সালের ২ জুলাই প্যারিসের এক নিস্তব্ধ সকালে চিরবিদায় নিয়েছিলেন চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসের এক অনন্য দ্রোহী পুরুষ, ক্রিশ্চিয়ান ফ্রেডরিক স্যামুয়েল হ্যানিম্যান। তাঁর সেই প্রয়াণ তিথিতে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণ করছে এই মহান রতœকে, যাঁর আবিষ্কৃত চিকিৎসাপদ্ধতি আজও বিশ্বজুড়ে লাখো-কোটি মুমূর্ষু প্রাণকে দিচ্ছে আরোগ্যের কোমল পরশ। হ্যানিম্যান কেবল একটি নতুন চিকিৎসা ব্যবস্থার জনক ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন প্রচলিত জরাজীর্ণ প্রথার বিরুদ্ধে এক আপসহীন আলোকমশাল। সংবাদপত্রের পাতায় এই মহামানবের জীবনগাথা তুলে ধরা মানে এক চরম ত্যাগ, ট্রাজেডি এবং সত্য প্রতিষ্ঠার লড়াইকে পুনরুজ্জীবিত করা।
১৭৫৫ সালে জার্মানির মাইসেন শহরের এক দরিদ্র চীনামাটির কারিগরের ঘরে যখন এই ক্ষণজন্মা মহাপুরুষের জন্ম হয়, তখন কেউ ভাবেনি অভাবের কৃষ্ণপক্ষে এমন এক চাঁদের উদয় হয়েছে। শৈশব থেকেই তীব্র মেধাবী হ্যানিম্যান দারিদ্র্যের নিষ্ঠুর কষাঘাতে জর্জরিত ছিলেন, এমনকি তেলের অভাবে রাতে আলো জ্বালিয়ে পড়ার সামর্থ্য পর্যন্ত তাঁর ছিল না। তবুও নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে কাদা দিয়ে তৈরি প্রদীপ জ্বালিয়ে গভীর রাত অবধি পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন এই জ্ঞানতপস্বী। বহু ভাষা ও বিজ্ঞানে অগাধ পান্ডিত্য অর্জন করে অবশেষ তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানে উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেন এবং একজন সফল চিকিৎসক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।
কিন্তু তৎকালীন প্রচলিত চিকিৎসা ব্যবস্থার নিষ্ঠুরতা ও অবৈজ্ঞানিক রূপ তাঁর সংবেদনশীল মনকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল। রোগীকে ভালো করার নামে রক্তমোক্ষণ বা ‘ব্লাড-লেটিং’ এবং পারদের মতো তীব্র বিষাক্ত উপাদানের যথেচ্ছ ব্যবহার দেখে তিনি শিউরে উঠেছিলেন, যেখানে আরোগ্যের চেয়ে রোগীর কষ্ট ও মৃত্যুই ছিল অবধারিত। বিবেকের দংশনে জর্জরিত হয়ে হ্যানিম্যান একদিন অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে নিজের লাভজনক চিকিৎসা পেশা পরিত্যাগ করেন। তিনি ঘোষণা করেন যে, মানুষের ক্ষতি করার চেয়ে চিকিৎসা না করাই শ্রেয়। এরপর চরম দারিদ্র্যের মাঝে পরিবার নিয়ে কেবল অনুবাদ ও গবেষণার কাজে নিজেকে সঁপে দেন।
“প্রকৃতির বুকে লুকিয়ে আছে আরোগ্যের এক মহাসত্য, যা বলপ্রয়োগে নয়, বরং মৃদু ও অহিংস উপায়ে মানুষকে সুস্থ করে তোলে।”- ড. স্যামুয়েল হ্যানিম্যান
এই ত্যাগের অন্ধকার সুড়ঙ্গ পথেই একদিন জ্বলে উঠল এক নতুন আলোর জ্যোতি, যা জন্ম দিল হোমিওপ্যাথির। ১৭৯০ সালে স্কটিশ চিকিৎসক উইলিয়াম কালেনের ‘মেটেরিয়া গবফরপধ’ অনুবাদ করতে গিয়ে তিনি খেয়াল করলেন, সুস্থ শরীরে সিঙ্কোনা গাছের ছাল সেবন করলে তা ম্যালেরিয়ার মতো উপসর্গ তৈরি করে। এই যুগান্তকারী পর্যবেক্ষণ থেকেই তিনি উপলব্ধি করলেন প্রকৃতির সেই চিরন্তন সত্য— ‘সিমিলিয়া সিমিলিবাস কিউরেন্টার’ অর্থাৎ যা রোগ সৃষ্টি করতে পারে, অত্যন্ত সূক্ষ্ম মাত্রায় তা-ই সেই রোগ নিরাময় করতে সক্ষম। নিজের এবং পরিবারের ওপর শত শত পরীক্ষা চালিয়ে তিনি গড়ে তুললেন এক সম্পূর্ণ নতুন চিকিৎসা বিজ্ঞান।
তবে এই নতুন সত্যের প্রতিষ্ঠা মোটেও সহজ ছিল না, বরং হ্যানিম্যানের জীবন ছিল এক মহাকাব্যিক ট্রাজেডি ও সংগ্রামের উপাখ্যান। প্রচলিত ধারার চিকিৎসক ও ওষুধ বিক্রেতাদের তীব্র রোষাণলে পড়ে তাঁকে বারবার এক শহর থেকে অন্য শহরে যাযাবরের মতো পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে। চরম অর্থকষ্টে নিজের সন্তানদের ক্ষুধার্ত মুখ দেখতে হয়েছে, এমনকি উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে তাঁর নিজের সন্তানদের অকালপ্রয়াণ সইতে হয়েছে। জীবনের এই নির্মম ট্রাজেডিগুলো তাঁর বুক ভেঙে দিলেও তাঁর আদর্শকে এক চুলও টলাতে পারেনি।
২জুলাই, সেই মহান সাধকের প্রয়াণ দিবসে দাঁড়িয়ে কৃতজ্ঞ বিশ্ব গভীর শ্রদ্ধায় তাঁর দিকে তাকায়। সমস্ত ঝড়-ঝাপটা পেরিয়ে হ্যানিম্যান যে সত্যের বীজ বুনেছিলেন, তা আজ এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে। আধুনিক যুগে এসেও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন, মৃদু ও সামগ্রিক আরোগ্যের আশায় বিশ্বের এক বিশাল জনগোষ্ঠী পরম আস্থায় আঁকড়ে ধরে আছে হ্যানিম্যানের সেই অক্ষয় অবদানকে। মৃত্যুর প্রায় দুই শতাব্দী পরেও তিনি বেঁচে আছেন প্রতিটি আরোগ্য লাভ করা রোগীর হাসিতে, প্রতিটি চিকিৎসকের পরম শ্রদ্ধায়। লেখক: উদ্যোক্তা












