বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬, ৩০ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬, ৩০ আষাঢ় ১৪৩৩

আবারও নতুন কুঁড়ি; আবারও নবদিগন্তের সূচনা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ২ মে, ২০২৬, ৭:৩৩ অপরাহ্ণ
আবারও নতুন কুঁড়ি; আবারও নবদিগন্তের সূচনা

সিলেট জেলা স্টেডিয়ামের আজকের চিত্র ছিল একেবারেই ভিন্ন। সুনসান এই মাঠ যেন হঠাৎ করেই প্রাণ ফিরে পেয়েছে। গ্যালারিতে উপচে পড়া দর্শক, মাঠজুড়ে খুদে ক্রীড়াবিদদের নানান ইভেন্টের রঙিন উপস্থিতি, আর পুরো আয়োজনজুড়ে উৎসবের আমেজ—সব মিলিয়ে দিনটি পরিণত হয় এক বিশেষ ক্রীড়া উৎসবে।
এই আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন। বেলা ৩টা ৪০ মিনিটে সিলেট জেলা স্টেডিয়ামে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পরে বিকেল ৫টা ৮ মিনিটে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে এই ক্রীড়া প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচির উদ্বোধন ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন জেলা স্টেডিয়ামে থাকা খুদে খেলোয়াড়রাও ভার্চুয়ালি যুক্ত হয় এই আয়োজনে।

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে ‘নতুন কুঁড়ি’ নামটি একসময় শিশু-কিশোরদের প্রতিভা বিকাশের প্রতীক ছিল। ১৯৭৬ সালে যাত্রা শুরু করা সেই উদ্যোগ পরবর্তীতে অনেক শিল্পী ও প্রতিভাবান ব্যক্তিকে জাতীয় পর্যায়ে তুলে এনেছিল। এবার সেই পরিচিত নামই ফিরে এসেছে নতুন রূপে—মঞ্চ নয়, মাঠে। শুরু হয়েছে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’, যার লক্ষ্য দেশের ভবিষ্যৎ ক্রীড়া তারকাদের খুঁজে বের করা।

এই উদ্বোধনী আয়োজনে দেশের বিভিন্ন ক্রীড়া বিভাগের ৩২ জন জাতীয় পর্যায়ের খেলোয়াড় অংশ নেন ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে। ক্রিকেট, ফুটবল, কাবাডিসহ বিভিন্ন খেলার তারকারা এক মঞ্চে উপস্থিত থেকে নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রেরণা দেন।

সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দেশের ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের নিয়ে মোট ৮টি ইভেন্টে এই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে উপজেলা পর্যায় থেকে, যা জেলা, বিভাগীয় ও জাতীয় পর্যায় পেরিয়ে শেষ হবে চূড়ান্ত পর্বে। ১৩ থেকে ২২ মে পর্যন্ত আঞ্চলিক পর্ব সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।

রেজিস্ট্রেশনের পরিসংখ্যানও চমকপ্রদ। মাত্র দুই সপ্তাহে সারাদেশ থেকে ১ লাখ ৬৭ হাজারের বেশি শিশু-কিশোর অংশ নিতে নিবন্ধন করেছে। এর মধ্যে ছেলে ১ লাখ ২০ হাজারের বেশি এবং মেয়ে প্রায় ৪৬ হাজার। সবচেয়ে বেশি অংশগ্রহণ এসেছে ঢাকা অঞ্চল থেকে এবং সবচেয়ে কম ময়মনসিংহ অঞ্চল থেকে।

প্রতিযোগিতায় ফুটবল, ক্রিকেট, কাবাডি, ব্যাডমিন্টন, অ্যাথলেটিক্স, সাঁতার, দাবা ও মার্শাল আর্টসহ বিভিন্ন ইভেন্ট রাখা হয়েছে। খেলাগুলো নকআউট ও সুইস লিগ পদ্ধতিতে পরিচালিত হবে, যাতে আন্তর্জাতিক মান বজায় থাকে।

ক্রীড়া সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই উদ্যোগ শুধু প্রতিযোগিতা নয়—এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, যা দেশের ক্রীড়াঙ্গনে নতুন প্রজন্মের ভিত্তি তৈরি করবে।

সিলেট থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রা এখন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে নতুন আশার বার্তা নিয়ে। ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ যেন সত্যিই হয়ে উঠছে—নবদিগন্তের সূচনা, যেখানে ফুটে উঠবে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের ক্রীড়া তারকারা।

Ads small one

রথযাত্রা: বিশ্বাস, সম্প্রীতি ও মানবিকতার অনন্ত যাত্রা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬, ১০:২৬ অপরাহ্ণ
রথযাত্রা: বিশ্বাস, সম্প্রীতি ও মানবিকতার অনন্ত যাত্রা

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

আজ বৃহস্পতিবার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা পালিত হবে। প্রতি বছরের আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে শুরু হওয়া এই রথযাত্রা কেবল একটি ধর্মীয় শোভাযাত্রা নয়; হাজার বছরের ঐতিহ্য, আধ্যাত্মিক দর্শন, সামাজিক সংহতি এবং মানবিক মূল্যবোধের এক অনন্য প্রতীক। রথের চাকা যেমন অবিরাম ঘুরে চলে, তেমনি ঘুরে চলে মানুষের বিশ্বাস, সভ্যতার ইতিহাস এবং আত্মশুদ্ধির পথ।

 

বর্তমান বিশ্বে মানুষ অভূতপূর্ব প্রযুক্তিগত অগ্রগতি অর্জন করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ প্রযুক্তি, ডিজিটাল অর্থনীতি ও বিশ্বায়ন মানুষের জীবনকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে। কিন্তু একই সঙ্গে বাড়ছে একাকীত্ব, মানসিক অস্থিরতা, অসহিষ্ণুতা, ধর্মীয় বিদ্বেষ, সামাজিক বিভাজন এবং নৈতিক অবক্ষয়। এমন বাস্তবতায় রথযাত্রার মতো ধর্মীয় উৎসব কেবল ভক্তির নয়, মানবিক জাগরণেরও উপলক্ষ হয়ে ওঠে।স্কন্দ পুরাণে বর্ণিত আছে, উৎকলের রাজা ইন্দ্রদ্যু¤œ ছিলেন ভগবান বিষ্ণুর একনিষ্ঠ ভক্ত। স্বপ্নাদেশ পেয়ে তিনি পুরুষোত্তম ক্ষেত্রে একটি মহামন্দির নির্মাণের উদ্যোগ নেন।

 

পরবর্তীতে সমুদ্র থেকে ভেসে আসা নিমকাঠ দিয়ে বিশ্বকর্মার মাধ্যমে দেববিগ্রহ নির্মাণের আয়োজন করা হয়। শর্ত ছিল, নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কেউ দরজা খুলবেন না। কিন্তু রানীর কৌতূহলে সেই শর্ত ভঙ্গ হয়। ফলে অসম্পূর্ণ অবস্থাতেই মূর্তি নির্মাণ বন্ধ হয়ে যায়। সেই অসম্পূর্ণ রূপেই প্রতিষ্ঠিত হন জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা।এই অসম্পূর্ণতাই রথযাত্রার অন্যতম গভীর দর্শন। সমাজে আমরা মানুষকে বিচার করি বাহ্যিক সৌন্দর্য, সম্পদ, পদমর্যাদা কিংবা সামাজিক পরিচয় দিয়ে। অথচ জগন্নাথদেবের মূর্তি যেন ঘোষণা করেÑপূর্ণতা বাহ্যিক নয়, অন্তরের। ঈশ্বর মানুষের বাহ্যিক রূপ নয়, হৃদয়ের ভক্তি দেখেন।

 

আজকের প্রতিযোগিতামূলক সমাজে এই শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। রথযাত্রার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শ্রীকৃষ্ণের বৃন্দাবন লীলার স্মৃতিও। পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, গোপীদের মুখে কৃষ্ণের প্রেম ও লীলাকথা শুনে কৃষ্ণ, বলরাম ও সুভদ্রা এমন এক ভাবাবেশে আপ্লুত হন যে তাঁদের চোখ বিস্ফারিত হয়, হাত গুটিয়ে যায় এবং শরীর এক বিশেষ ভঙ্গিমা ধারণ করে। সেই রূপই আজকের জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার প্রতীকী মূর্তিতে প্রতিফলিত হয়েছে।

 

এই কাহিনির ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও এর প্রতীকী অর্থ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণÑঈশ্বরের প্রেম মানুষের চেতনাকে বদলে দিতে পারে।রথযাত্রার সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত সমতা। রথ টানার সময় সেখানে ধনী-গরিব, রাজা-প্রজা, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, উচ্চবর্ণ-নি¤œবর্ণ কিংবা নারী-পুরুষের আলাদা কোনো পরিচয় থাকে না। সবাই একই দড়িতে হাত রাখে। এটি শুধু ধর্মীয় আচার নয়; বরং সামাজিক সমতার এক জীবন্ত প্রতীক।আজ যখন বিশ্বজুড়ে বৈষম্য বাড়ছে, তখন রথযাত্রা আমাদের মনে করিয়ে দেয়Ñসমাজের উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন সবাই একই লক্ষ্যে একসঙ্গে এগিয়ে যায়।

 

রাষ্ট্র, সমাজ কিংবা পরিবারÑকোনো ক্ষেত্রেই বিভাজন দীর্ঘস্থায়ী শান্তি আনতে পারে না। বাংলাদেশ বহু ধর্ম, বহু সংস্কৃতি ও বহু ঐতিহ্যের দেশ। এখানে দুর্গাপূজা, রথযাত্রা, বুদ্ধপূর্ণিমা, বড়দিন, ঈদÑসবই জাতীয় জীবনের অংশ। বাংলাদেশের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিয়েছে। তাই রথযাত্রা শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উৎসব নয়; এটি বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনারও প্রতীক।

 

রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের পাশাপাশি রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় নেতা, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষেরও সতর্ক থাকা জরুরি।রথের আরেকটি তাৎপর্য হলোÑঈশ্বর মানুষের কাছে আসেন। সাধারণত মানুষ মন্দিরে যায় ঈশ্বরের দর্শনে। কিন্তু রথযাত্রায় জগন্নাথদেব নিজেই মন্দির থেকে বেরিয়ে মানুষের দ্বারে আসেন। এই প্রতীকী ঘটনা আমাদের শেখায়, ধর্ম মানুষের জন্য; মানুষ ধর্মের জন্য নয়। প্রকৃত ধর্ম মানুষের কষ্ট লাঘব করে, মানুষের পাশে দাঁড়ায়, মানুষকে বিভক্ত নয়Ñঐক্যবদ্ধ করে।বিশ্বায়নের যুগে অনেকেই মনে করেন ধর্মের গুরুত্ব কমে যাচ্ছে।

 

বাস্তবে দেখা যায়, মানুষ যত আধুনিক হচ্ছে, ততই মানসিক শান্তির সন্ধান করছে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন মানুষের ভোগ বাড়াতে পারে, কিন্তু অন্তরের শূন্যতা পূরণ করতে পারে না। রথযাত্রার মতো উৎসব মানুষকে সামষ্টিক আনন্দ, সামাজিক সম্প্রীতি এবং আত্মিক প্রশান্তির অনুভূতি দেয়।জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সামাজিক অস্থিরতার এই সময়ে মানুষ নতুন করে আশা খুঁজছে। রথযাত্রা সেই আশারই প্রতীক। রথের চাকা যেমন থেমে থাকে না, তেমনি মানুষের সংগ্রামও থেমে থাকে না। প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েই মানুষ এগিয়ে যায়।

 

আজ আমাদের সমাজে নৈতিক সংকট স্পষ্ট। দুর্নীতি, প্রতারণা, মাদকাসক্তি, সহিংসতা, নারী ও শিশুর প্রতি নির্যাতন, পরিবেশ ধ্বংসÑএসব সমস্যা কেবল আইন দিয়ে সমাধান করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন নৈতিক শিক্ষা, আত্মসংযম ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা। ধর্মীয় উৎসবগুলো যদি মানুষকে আরও মানবিক হতে উদ্বুদ্ধ করে, তবেই সেগুলোর প্রকৃত তাৎপর্য প্রতিষ্ঠিত হবে।রথযাত্রার দড়িতে হাজারো মানুষের সম্মিলিত টান আমাদের আরেকটি বড় শিক্ষা দেয়Ñসমষ্টিগত প্রচেষ্টাই বড় পরিবর্তনের শক্তি। একটি রথ একা কেউ টানতে পারে না। ঠিক তেমনি একটি দেশও একক কোনো ব্যক্তি, দল বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এগোতে পারে না।

 

প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ, পারস্পরিক আস্থা এবং সহযোগিতার সংস্কৃতি।রথযাত্রা সাংস্কৃতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। গান, কীর্তন, শঙ্খধ্বনি, ঢাক, উৎসবমুখর পরিবেশÑসব মিলিয়ে এটি একটি লোকজ ঐতিহ্যের অংশ। নগরায়ণ ও আধুনিকতার চাপে অনেক ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু রথযাত্রা এখনো মানুষকে শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত রাখে। নতুন প্রজন্মের কাছে এই ঐতিহ্য পৌঁছে দেওয়াও আমাদের সাংস্কৃতিক দায়িত্ব।রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো, সব ধর্মীয় উৎসব নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও মর্যাদার সঙ্গে পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করা।

 

পাশাপাশি ধর্মীয় নেতাদেরও উচিত সম্প্রীতি, সহনশীলতা ও মানবকল্যাণের বার্তা সমাজে ছড়িয়ে দেওয়া। ধর্মকে যেন কোনোভাবেই রাজনৈতিক বিভাজন বা বিদ্বেষের হাতিয়ার হতে না দেওয়া হয়।রথের চাকা ঘোরে। সেই চাকার ঘূর্ণনে লুকিয়ে আছে সময়ের দর্শন। সুখ-দুঃখ, লাভ-ক্ষতি, উত্থান-পতনÑসবই জীবনের অংশ। তাই অহংকার নয়, বিনয়; বিভাজন নয়, ঐক্য; ঘৃণা নয়, ভালোবাসাÑএই মূল্যবোধই আমাদের ধারণ করতে হবে। রথযাত্রা আমাদের শেখায়, মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার মানবিকতা। যে সমাজে মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়ায়, ভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতিকে সম্মান করে, অন্যের অধিকারকে নিজের দায়িত্ব মনে করেÑসেই সমাজই সত্যিকার অর্থে সভ্য।

 

বৃহস্পতিবারের এই পবিত্র রথযাত্রা তাই শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি আত্মশুদ্ধির আহ্বান, সামাজিক সংহতির বার্তা এবং মানবিকতার উৎসব। রথের চাকা যেমন অনন্ত গতির প্রতীক, তেমনি মানুষের বিবেকও যেন চিরজাগ্রত থাকে। বিশ্বাসের এই যাত্রা আমাদের নিয়ে যাক এমন এক সমাজের দিকে, যেখানে ধর্ম হবে সম্প্রীতির, মানুষ হবে মানুষের, আর বাংলাদেশ হবে বৈচিত্র্েযর মধ্যেও ঐক্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। রথের দড়িতে হাত রাখা কেবল একটি আচার নয়; এটি প্রতীকীভাবে সত্য, ন্যায়, সহমর্মিতা ও মানবিকতার পক্ষে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার। সেই অঙ্গীকারই হোক এবারের রথযাত্রার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

লেখক: সংবাদকর্মী

 

বিশ্ব সাপ দিবস: ভয় নয়, প্রয়োজন সচেতনতা ও সংরক্ষণ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬, ১০:২২ অপরাহ্ণ
বিশ্ব সাপ দিবস: ভয় নয়, প্রয়োজন সচেতনতা ও সংরক্ষণ

সাকিবুর রহমান বাবলা

প্রতি বছর ১৬ জুলাই বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব সাপ দিবস। দিবসটির মূল উদ্দেশ্য হলো সাপ সম্পর্কে মানুষের ভ্রান্ত ধারণা দূর করা, এই প্রাণীর পরিবেশগত গুরুত্ব তুলে ধরা এবং বিপন্ন সাপের প্রজাতি সংরক্ষণে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা। মানুষের কাছে সাপ এমন একটি প্রাণী, যার নাম শুনলেই অধিকাংশের মনে ভয়, আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার অনুভূতি জাগে। অথচ প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় সাপের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ব সাপ দিবসের প্রচলনের পেছনে ভিন্ন মত রয়েছে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের একটি স্নেক ফার্মের নাম শোনা যায়, যা ১৯৬০-এর দশকে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা লাভ করে। পরবর্তীকালে সাপ সম্পর্কে মানুষের আগ্রহ ও সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ১৬ জুলাইকে বিশ্ব সাপ দিবস হিসেবে বিভিন্ন সংগঠন পালন করতে শুরু করে। বর্তমানে বিশ্বের নানা দেশে দিবসটি উপলক্ষে সচেতনতামূলক প্রচারাভিযান, প্রদর্শনী, কর্মশালা ও সংরক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

জীববিজ্ঞানের শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী এরা সরীসৃপ শ্রেণীর অন্তর্গত। প্রাগৈতিহাসিক যুগের বিভিন্ন প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শনে সাপের চিত্র পাওয়া যায়, যা মানবসভ্যতার সঙ্গে এ প্রাণীর দীর্ঘ সম্পর্কের ইঙ্গিত বহন করে। ধর্ম, পুরাণ, সাহিত্য ও লোককাহিনীতেও সাপের উল্লেখ ব্যাপক। বাইবেলের আদম-হাওয়ার কাহিনি, ভারতীয় মহাভারতের নাগলোক, প্রাচীন মিশরের রাজমুকুট কিংবা বাংলার বেহুলা-লখিন্দরের গল্পেÑ সাপ এক বিশেষ প্রতীক। পবিত্র কোরআনে হজরত মূসা (আ.)-এর মুজিজার বর্ণনায় সাপের উল্লেখ রয়েছে, যেখানে আল্লাহ তাআলা তাঁর লাঠিকে সাপে পরিণত করেছিলেন। সাপও আল্লাহ তাআলার সৃষ্ট একটি প্রাণী এবং অকারণে কোনো প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা সমর্থিত নয়।

বর্তমানে পৃথিবীতে ৪,০০০-এরও বেশি প্রজাতির সাপ শনাক্ত করা হয়েছে। এদের মধ্যে মাত্র এক-চতুর্থাংশের মতো বিষধর। অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া প্রায় সব মহাদেশেই সাপের বিচরণ দেখা যায়। ক্ষুদ্র থ্রেড সাপের দৈর্ঘ্য যেখানে মাত্র কয়েক সেন্টিমিটার, সেখানে অজগর বা অ্যানাকোন্ডা কয়েক মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। বিলুপ্ত টাইটানোবোয়া নামের এক বিশাল সাপের জীবাশ্ম পাওয়া গেছে, যার দৈর্ঘ্য প্রায় ১৩ মিটার বলে ধারণা করা হয়।

সাপের কিছু বৈশিষ্ট্য মানুষকে বিস্মিত করে। এদের বাহ্যিক কান নেই, ফলে প্রচলিত অর্থে শব্দ শোনে না; বরং মাটির কম্পন অনুভব করে পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা নেয়। সাপের পা নেই, কিন্তু শক্তিশালী পেশির সাহায্যে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে চলাচল করতে পারে। অনেকেই মনে করেন সাপ বাঁশির সুরে নাচে; বাস্তবে সাপ সাপুড়ের বাঁশির শব্দ নয়, বরং তার নড়াচড়ার প্রতি প্রতিক্রিয়া দেখায়। আবার ফুলের গন্ধে সাপ ছুটে আসে, সাপ দুধ পান করে, সাপ প্রতিশোধ নেয় বা মানুষের চেহারা মনে রাখে—এসব ধারণারও কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

প্রকৃতিতে সাপের গুরুত্ব অপরিসীম। সাপ খাদ্যশৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে ইঁদুরের উপদ্রব নিয়ন্ত্রণে সাপের অবদান কৃষির জন্য অত্যন্ত মূল্যবান। সাপ এসব প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রেখে খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যে পরোক্ষ অবদান রাখে। একই সঙ্গে সাপ নিজেও বিভিন্ন প্রাণীর খাদ্য হিসেবে কাজ করে, ফলে প্রকৃতির জটিল খাদ্যজালের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানও।

সাপের বৈজ্ঞানিক উপবর্গের নাম হলো Serpentes (সেরপেনটিস)। সাপের বিষ থেকে তৈরি বিষপ্রতিরোধী ওষুধ সাপের কামড়ে আক্রান্ত মানুষের জীবন রক্ষা করে। এছাড়া বিভিন্ন সাপের বিষে থাকা প্রোটিন ও এনজাইম ব্যবহার করে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, রক্ত জমাট বাঁধা সংক্রান্ত সমস্যা এবং কিছু স্নায়বিক রোগের ওষুধ তৈরিতে গবেষণা ও প্রয়োগ করা হচ্ছে। ক্যান্সার, ব্যথা নিয়ন্ত্রণ, স্ট্রোক এবং রক্তনালির রোগের চিকিৎসায়ও সাপের বিষের উপাদান নিয়ে গবেষণা চলছে। ফলে সাপের বিষ আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ও ওষুধ গবেষণার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়। আমাদের দেশে প্রায় ১০০টিরও বেশি প্রজাতির সাপের উপস্থিতি পাওয়া যায়, যার মধ্যে ৩০টিরও অধিক প্রজাতি কেবল সুন্দরবনেই বাস করে। তবে সব সাপ বিষধর নয়; বরং বাংলাদেশের অধিকাংশ সাপই বিষহীন এবং এগুলো মানুষের কোনো ক্ষতি করে না।

 

আমাদের স্থলভাগে থাকা সাপের মধ্যে গোখরা, কালাচ (কেউটে), কিং কোবরা (শঙ্খচূড়), চন্দ্রবোড়া এবং কিছু পিট ভাইপার (সবুজ বোড়া) বিষধর হওয়ায় মানুষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। আইইউসিএন বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, আবাসস্থল ধ্বংস, নির্বিচারে হত্যা ও পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে দেশের কিছু সাপের প্রজাতি হুমকির মুখে রয়েছে।

বাস্তবে সাপ কখনোই মানুষকে লক্ষ্য করে শিকার করতে আসে না; বরং সুযোগ পেলেই তারা মানুষের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলে। সাপের দংশনের অধিকাংশ ঘটনাই ঘটে অসাবধানতাবশত তাদের ওপর পা দেওয়া, তাদের মারার চেষ্টা করা বা অন্য কোনোভাবে বিরক্ত করার কারণে। তাই সাপ দেখে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হওয়াই শ্রেয়।

বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ায় সাপের কামড় একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে বর্ষাকালে সাপের উপদ্রব বাড়ে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখনো অনেক মানুষ সাপে কামড়ানোর পর হাসপাতালে না গিয়ে ওঝা, কবিরাজ বা ঝাড়ফুঁকের ওপর নির্ভর করেন, ফলে মূল্যবান সময় নষ্ট হয় এবং মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়। অথচ আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় অ্যান্টিভেনম প্রয়োগের মাধ্যমে অধিকাংশ বিষধর সাপের কামড়ের সফল চিকিৎসা সম্ভব।

সাপ কামড়ালে প্রথমেই রোগীকে শান্ত রাখতে হবে, অপ্রয়োজনীয় নড়াচড়া বন্ধ করতে হবে এবং দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। আক্রান্ত স্থানে কাটা, চুষে বিষ বের করার চেষ্টা, অতিরিক্ত শক্ত করে বেঁধে দেওয়া, আগুন বা রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা কিংবা ঝাড়ফুঁকের আশ্রয় নেওয়া বিপজ্জনক। সময়মতো চিকিৎসাই জীবন রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

তাই বিশ্ব সাপ দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক—সাপ সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান অর্জন, কুসংস্কার পরিহার, সাপের আবাসস্থল সংরক্ষণ এবং সাপের কামড়ের ক্ষেত্রে আধুনিক চিকিৎসার প্রতি আস্থা বৃদ্ধি। কারণ প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণীর মতো সাপও পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যার অস্তিত্ব রক্ষা মানেই পরিবেশের সুস্থ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা।

পাইকগাছায় কমিউনিটি ক্লিনিকের ভবন ধ্বস, ১০ লাখ টাকার ক্ষতি, স্বাস্থ্যসেবা চলছে স্কুলে

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬, ৬:২৮ অপরাহ্ণ
পাইকগাছায় কমিউনিটি ক্লিনিকের ভবন ধ্বস, ১০ লাখ টাকার ক্ষতি, স্বাস্থ্যসেবা চলছে স্কুলে

পলাশ কর্মকার, কপিলমুনি (খুলনা): খুলনার পাইকগাছা উপজেলার সোলাদানা ইউনিয়নের আমুরকাটা কমিউনিটি ক্লিনিকের ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। ভবনটি দীর্ঘদিন ধরেই ঝুঁকিপূর্ণ থাকায় প্রায় আড়াই বছর আগে সেখানকার স্বাস্থ্যসেবা পাশের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে স্থানান্তর করা হয়েছিল। সম্প্রতি ভবনটি ধসে পড়ায় অবকাঠামোর পাশাপাশি ক্লিনিকের বিভিন্ন সরঞ্জাম নষ্ট হয়েছে। এতে প্রায় ১০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছেন দায়িত্বরত স্বাস্থ্যকর্মী।

দায়িত্বরত স্বাস্থ্যকর্মী উষা মন্ডল জানান, গত সোমবার সকালে ভবনটি সম্পূর্ণ ধসে পড়ে। ভবনের সঙ্গে থাকা বৈদ্যুতিক মিটার, পানির মোটর, পানির ট্যাংক, রাউটারসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নষ্ট হয়ে গেছে। তাঁর হিসাবে ভবন ও সরঞ্জাম মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১০ লাখ টাকা। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১১ সালে প্রায় ২২ লাখ টাকা ব্যয়ে আমুরকাটা কমিউনিটি ক্লিনিকটি নির্মাণ করা হয়।

 

অভিযোগ রয়েছে, সমতল জমির পরিবর্তে একটি চিংড়িঘেরের পাশে নিচু জায়গায় কয়েকটি রড ও সিমেন্টের পিলারের ওপর ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছিল। ক্লিনিকে যাতায়াতের জন্য স্থায়ী কোনো সড়কও ছিল না। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নির্মাণের কয়েক বছরের মধ্যেই ভবনের বিভিন্ন স্থানে সিমেন্ট খসে রড বেরিয়ে আসে। ভবনে ওঠানামার সিঁড়িও ছিল ঝুলন্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ। এরপরও সেখানে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চলতে থাকে।

 

প্রায় ৮ থেকে ১০ বছর ধরে ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিল। ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে ঝুঁকি বেড়ে গেলে পাশের রঙধনু মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও আমুরকাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা স্বাস্থ্যকর্মীকে অন্যত্র কার্যক্রম পরিচালনার পরামর্শ দেন। পরে কর্তৃপক্ষের মৌখিক নির্দেশনা অনুযায়ী ক্লিনিকের কার্যক্রম আমুরকাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি শ্রেণিকক্ষে স্থানান্তর করা হয়। এরপর থেকে সেখানেই নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আহসানারা আহম্মেদ বিনতে বলেন, “আমি কয়েক মাস আগে এখানে যোগদান করেছি। বিষয়টি জেনেছি, উপজেলার আরও কয়েকটি কমিউনিটি ক্লিনিক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। সেগুলোও পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন পরিত্যক্ত ঘোষণা এবং নতুন ভবন নির্মাণ বা সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।”

স্থানীয়দের দাবি, দুর্ঘটনার আগেই ভবনটি পরিত্যক্ত করা হয়েছিল বলেই বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো গেছে। তারা দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণ করে স্থায়ীভাবে স্বাস্থ্যসেবা চালুর দাবি জানিয়েছেন।