শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪ আশ্বিন ১৪৩৩
শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪ আশ্বিন ১৪৩৩

আমি সবসময় ডিফরেন্ট ডিফরেন্ট জিনিস ট্রাই করতে চাই: সাবিলা নূর

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ৩০ মে, ২০২৬, ১০:২৬ পূর্বাহ্ণ
আমি সবসময় ডিফরেন্ট ডিফরেন্ট জিনিস ট্রাই করতে চাই: সাবিলা নূর

ছোটপর্দায় তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জনের পর সাবিলা নূর এবার বড়পর্দায়ও নিয়মিত হচ্ছেন। ঢালিউড কিং শাকিব খান–এর বিপরীতে মুক্তি পেয়েছে তার অভিনীত চলচ্চিত্র রক্সটার। ঈদুল ফিতরেও বড়পর্দায় তার উপস্থিতি ও সাফল্য ছিল চোখে পড়ার মতো। এবার কোরবানির ঈদে নতুন সিনেমা নিয়ে হাজির হয়েছেন তিনি।

সিনেমা মুক্তির দিন নির্মাতা আজমান রুশো–কে নিয়ে দর্শকদের সঙ্গে বসে ছবিটি দেখেন সাবিলা। পরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে কথা বলেন নিজের ক্যারিয়ার, চরিত্র প্রস্তুতি এবং চলচ্চিত্রটির ভিন্নধর্মীতা নিয়ে।

ক্যারিয়ারে ছকবাঁধা চরিত্রের বাইরে গিয়ে বৈচিত্র্যময় কাজ করার প্রসঙ্গে সাবিলা স্পষ্টভাবে বলেন, “আমি সবসময় ডিফরেন্ট ডিফরেন্ট জিনিস ট্রাই করতে চাই। আমি যখন ‘তাণ্ডব’ করেছি, তখন আমার অডিয়েন্সও এক্সপেক্ট করেনি যে আমাকে ‘লিচুবাগান’ টাইপের একটা গানে দেখবে। আমি ওই ইমেজটা ব্রেক করতে চেয়েছি। এরপর যখন ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ করেছি, সেটাও ‘তাণ্ডব’ থেকে একদম আলাদা ছিল। আমি চেয়েছিলাম আমার তৃতীয় সিনেমাটাও একদম ভিন্ন ধরনের কোনো চরিত্র হোক, যেখানে দর্শক আমাকে নতুনভাবে দেখবে। ‘রক্সটার’-এ সেটাই করার চেষ্টা করেছি।”

 

চলচ্চিত্রটিতে নিজের চরিত্র ‘মিরা’র প্রস্তুতি ও টিমওয়ার্ক প্রসঙ্গে সাবিলা নূর বলেন, “মিরার জার্নির কথা যদি বলি, আসলে আমরা খুব বেশি সময় পাইনি প্রিপারেশন নেওয়ার। মনে হয় দুই বা তিন সপ্তাহের মতো সময় পেয়েছি। তবে এই অল্প সময়ের মধ্যেই পরিচালক, ডিওপি, আর্ট এবং বিশেষ করে কস্টিউম, মেকআপ ও হেয়ার টিমের কোলাবরেটিভ এফোর্টের কারণেই মিরার এই রূপটি পর্দায় ফুটিয়ে তোলা সম্ভব হয়েছে। তাই মিরার পুরো জার্নিটা আমি আমার টিমকে ডেডিকেট করতে চাই।”

সুপারস্টার শাকিব খানের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে এই অভিনেত্রী বলেন, “শাকিব ভাইয়ের সঙ্গে স্ক্রিন শেয়ার করা সবসময়ই খুব ভালো লাগার বিষয়। উনি ভীষণ ডেডিকেটেড এবং ডিসিপ্লিনড। একজন কো-আর্টিস্ট হিসেবে উনি খুবই সাপোর্টিভ।”

ট্রেলার দেখে অনেকের রণবীর কাপুর অভিনীত বলিউড সিনেমা রকস্টার–এর সঙ্গে তুলনা করার বিষয়েও কথা বলেন সাবিলা। তিনি বলেন, “রণবীর কাপুরের ‘রকস্টার’ তো কাল্ট ক্লাসিক। ‘রকস্টার’ নিয়ে ভাবলেই সবার মাথায় ওই সিনেমার কথা আসে। কিন্তু আমাদের ‘রক্সটার’-এর গল্প পুরোপুরি আলাদা। এখানে একটা মানুষের জীবন, তার মিউজিক জার্নি এবং সেই পথের কিছু কঠিন বাস্তবতার গল্প দেখানো হয়েছে। ট্রেলার দেখে হয়তো একটা ভাইব এক মনে হতে পারে, কিন্তু পুরো সিনেমা দেখলে বুঝবেন এর সঙ্গে ওই সিনেমার কোনো মিল নেই। এটা আমাদের নিজস্ব প্রেক্ষাপটে তৈরি একেবারে নতুন গল্প।”

কোরবানির ঈদের ব্যস্ততার মধ্যেও দর্শকদের সিনেমা হলে এসে ছবিটি দেখার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে সাবিলা বলেন, “যারা আমাদের মেগাস্টারের ফ্যান, তারা তো সিনেমাটি দেখবেই। পাশাপাশি আমাদের টিম একটা ভিন্নধর্মী গল্প বলার চেষ্টা করেছে। আমরা যদি চাই ভবিষ্যতে বাংলাদেশে আরও ডিফরেন্ট ডিফরেন্ট জনরার সিনেমা তৈরি হোক, তাহলে আমাদের ‘রক্সটার’ দেখা উচিত।”

বড়পর্দার এই নতুন যাত্রা নিয়ে নিজের অনুভূতি জানিয়ে তিনি বলেন, “প্রতিটি সিনেমা মুক্তির আগেই আমি ভীষণ নার্ভাস থাকি। তাই কিছুটা নার্ভাস তো অবশ্যই, তবে নার্ভাসনেসের সঙ্গে আমি এক্সাইটেডও; কারণ নতুন কিছু দেখতে আমার সবসময়ই ভালো লাগে।”

Ads small one

গুড়পুকুর মেলা ফিরবে কবে-নাকি ইতিহাসের পাতাতেই থাকবে?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:২৪ অপরাহ্ণ
গুড়পুকুর মেলা ফিরবে কবে-নাকি ইতিহাসের পাতাতেই থাকবে?

মিলন বিশ্বাস

একটি মেলা কি শুধু কয়েক দিনের দোকানপাট, নাগরদোলা আর মানুষের ভিড়? একটি মেলা কি কেবল কেনাবেচার জায়গা? নাকি একটি মেলা হয়ে উঠতে পারে একটি জনপদের স্মৃতি, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও মানুষের মিলনের প্রতিচ্ছবি?
সাতক্ষীরার মানুষকে যদি এই প্রশ্ন করা হয়, তাহলে গুড়পুকুর মেলার কথা নিশ্চয়ই সামনে আসবে।

শুক্রবার পলাশপোলের গুড়পুকুরপাড়ে মনসা পূজা হয়েছে। সেখানে গিয়ে দেখা গেলÑভক্তরা আসছেন, পূজা দিচ্ছেন, প্রার্থনা করছেন। পূজার আনুষ্ঠানিকতা আছে, মানুষের উপস্থিতি আছেÑকিন্তু নেই সেই চেনা মেলার কোলাহল। নেই দূর-দূরান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ীদের সারি। নেই শিশুদের উচ্ছ্বাস, নেই সেই বিশাল লোকসমাগম। তাহলে কি গুড়পুকুর মেলার গল্প শেষ হয়ে যাচ্ছে? যে মেলা ছিল সাতক্ষীরার পরিচয়ের অংশ সাতক্ষীরার গুড়পুকুর মেলার উৎপত্তি নিয়ে রয়েছে নানা ইতিহাস ও জনশ্রুতি। এর সঠিক বয়স নিয়ে মতভেদ থাকলেও স্থানীয় ইতিহাসে মেলাটিকে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মনসা পূজাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই আয়োজন একসময় ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার গ-ি পেরিয়ে পরিণত হয়েছিল বৃহৎ সামাজিক ও বাণিজ্যিক মিলনমেলায়। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যবসায়ীরা আসতেন। বসত নানা ধরনের দোকান। মাটির সামগ্রী, বাঁশ-বেতের তৈরি পণ্য, খেলনা, গৃহস্থালির সামগ্রী, মিষ্টি, গাছের চারাÑকী ছিল না সেখানে!

মেলার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও কারুশিল্পীরা। সাধারণ মানুষের জন্য এটি ছিল কেনাকাটার জায়গা, শিশুদের জন্য আনন্দের জায়গা, আর সাতক্ষীরার মানুষের জন্য ছিল এক ধরনের বার্ষিক উৎসব। ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে যার সূচনা, সময়ের সঙ্গে সেটি হয়ে উঠেছিল মানুষে মানুষে মিলনের এক অসাম্প্রদায়িক লোকজ আয়োজন।

এক ভয়াবহ ঘটনায় থমকে যায় ঐতিহ্য
কিন্তু গুড়পুকুরের সেই উৎসবের পথ সবসময় মসৃণ ছিল না। ২০০২ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরা শহরের দুটি স্থানে বোমা হামলার ভয়াবহ ঘটনায় তিনজন নিহত এবং শতাধিক মানুষ আহত হন। সেই ঘটনার পর দীর্ঘ সময়ের জন্য গুড়পুকুর মেলার আয়োজন বন্ধ হয়ে যায়। পরে মানুষের দাবির মুখে আবারও মেলা শুরু হয়। কিন্তু আগের সেই বিশালতা আর পুরোপুরি ফিরে আসেনি। একটি ভয়াবহ ঘটনা একটি মেলার আয়োজন থামিয়ে দিতে পারেÑকিন্তু একটি ঐতিহ্যকে কি চিরদিনের জন্য থামিয়ে দেওয়া যায়?

সময় বদলেছে, মেলাও বদলাতে পারে
নিরাপত্তার বাস্তবতা বদলেছে। মানুষের বিনোদনের ধরন বদলেছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের ধরন বদলেছে। শহরও আগের মতো নেই। তাই বলে কি ঐতিহ্যও হারিয়ে যাবে? আমার মনে হয়, ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে তাকে সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। আগের মতো এক মাসব্যাপী বিশাল মেলা হয়তো এখন বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু সীমিত সময়ের, পরিকল্পিত ও নিরাপদ একটি মেলা কি আয়োজন করা যায় না? নির্দিষ্ট স্থান, নির্দিষ্ট সময়, নির্দিষ্ট সংখ্যক দোকান, কঠোর নিরাপত্তা, সিসিটিভি, অগ্নিনিরাপত্তা, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনের সার্বক্ষণিক নজরদারির মাধ্যমে একটি আধুনিক গুড়পুকুর মেলা আয়োজন করা সম্ভব কি নাÑসেটি ভেবে দেখা যেতে পারে।

মেলা বন্ধ হলে শুধু ব্যবসা বন্ধ হয় না
মেলা বন্ধ হলে কয়েকটি দোকান কম বসবেÑবিষয়টি এতটুকু নয়। মেলা বন্ধ হলে হারিয়ে যায় লোকজ সংস্কৃতির একটি মঞ্চ। হারিয়ে যায় স্থানীয় কারুশিল্পীর বাজার। হারিয়ে যায় ছোট ব্যবসায়ীর একটি মৌসুমি আয়ের সুযোগ। হারিয়ে যায় শিশুদের শৈশবের কিছু স্মৃতি। আর সবচেয়ে বড় কথাÑএকটি প্রজন্মের সঙ্গে পরবর্তী প্রজন্মের সাংস্কৃতিক যোগসূত্রটি দুর্বল হয়ে যায়।
আজকের শিশুটি যদি গুড়পুকুর মেলা না দেখে বড় হয়, আগামী প্রজন্মের কাছে গুড়পুকুর মেলা হয়তো শুধুই একটি পুরোনো গল্প হয়ে থাকবে।

প্রশাসনের কাছে একটি প্রশ্ন
প্রশাসনের দায়িত্ব শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষা নয়; একটি এলাকার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণেও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
তাই প্রশ্নটি অভিযোগের নয়, বরং বিবেচনারÑ সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী গুড়পুকুর মেলাকে কি নতুন আঙ্গিকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া যায় না? মেলা আয়োজনের ক্ষেত্রে যদি নিরাপত্তা বড় বিষয় হয়, তাহলে নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই আয়োজনের পরিকল্পনা করা হোক। যদি বড় পরিসর সমস্যা হয়, ছোট পরিসরে শুরু হোক। যদি দীর্ঘ সময়ের আয়োজন সম্ভব না হয়, কয়েক দিনের আয়োজন হোক। যদি পুরোনো মেলার সব আয়োজন ফিরিয়ে আনা সম্ভব না হয়, অন্তত ঐতিহ্যের মূল ধারাটুকু ফিরিয়ে আনা হোক। কারণ ঐতিহ্য সংরক্ষণ মানে অতীতকে হুবহু ফিরিয়ে আনা নয়; বরং অতীতের মূল্যবান অংশকে বর্তমানের সঙ্গে যুক্ত করে ভবিষ্যতের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

গুড়পুকুর শুধু পুকুরের নাম নয়
গুড়পুকুর আজ একটি জায়গার নাম। কিন্তু সাতক্ষীরার বহু মানুষের কাছে এটি তার চেয়েও বেশি কিছু। এটি শৈশবের স্মৃতি। এটি উৎসবের স্মৃতি। এটি পরিবারের সঙ্গে মেলায় যাওয়ার স্মৃতি। এটি দোকান সাজিয়ে বসা ব্যবসায়ীর স্মৃতি। এটি দূর গ্রাম থেকে আসা মানুষের স্মৃতি। এটি সাতক্ষীরার একটি সময়ের স্মৃতি। একটি পুকুর হয়তো ভরাট হয়ে যেতে পারে। একটি মাঠ হয়তো হারিয়ে যেতে পারে। একটি মেলাও হয়তো বন্ধ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু একটি জনপদের মানুষের স্মৃতি থেকে সেই ঐতিহ্যকে মুছে ফেলা যায় না।

ইতিহাসের কাছে আমাদের দায়
আমরা উন্নত শহর চাই। আধুনিক অবকাঠামো চাই। নিরাপদ নগর চাই। উন্নত বিনোদন চাই। কিন্তু উন্নয়নের পথে হাঁটতে গিয়ে যদি নিজেদের শিকড়টিই ভুলে যাই, তাহলে সেই উন্নয়নের সঙ্গে আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সম্পর্ক কোথায় থাকবে? সাতক্ষীরার অনেক ঐতিহ্য ইতিমধ্যে হারিয়ে গেছে বা হারিয়ে যাওয়ার পথে। গুড়পুকুর মেলাও যদি ধীরে ধীরে স্মৃতির পাতায় চলে যায়, তাহলে হয়তো একদিন আমরা আফসোস করবÑ “একসময় এখানে গুড়পুকুর মেলা বসত।” সেই আফসোস করার দিন আসার আগেই কি আমরা কিছু করতে পারি না?

প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, মন্দির কমিটি, ব্যবসায়ী সমাজ, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও নাগরিক সমাজÑসব পক্ষের সমন্বয়ে একটি নিরাপদ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ গুড়পুকুর মেলার সম্ভাবনা নতুন করে বিবেচনা করা যেতে পারে। কারণ এটি কোনো একক সম্প্রদায়ের বিষয় হিসেবে না দেখে সাতক্ষীরার সামগ্রিক লোকজ ঐতিহ্য হিসেবে দেখার সুযোগ রয়েছে। আজ মনসা পূজার দিনে গুড়পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে তাই একটি প্রশ্নই বারবার মনে আসেÑ গুড়পুকুর মেলার কোলাহল কি আবার ফিরবে? নাকি আগামী প্রজন্মকে আমরা শুধু ছবি দেখিয়ে বলবÑ “এই জায়গাতেই একসময় সাতক্ষীরার বিখ্যাত গুড়পুকুর মেলা বসতৃ” সিদ্ধান্ত আজকের মানুষের।

তবে ইতিহাস আমাদের কাছে একটি প্রশ্ন রেখে যায়Ñ একটি ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার পর তাকে স্মরণ করার চেয়ে, বেঁচে থাকতেই তাকে সংরক্ষণ করা কি বেশি জরুরি নয়?

(এটা লেখকের নিজস্ব মন্তব্য)। লেখক: সংবাদদকর্মী

সাতক্ষীরার চরাঞ্চলে শিক্ষা বঞ্চনার বহুমাত্রিক সংকট

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:২১ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরার চরাঞ্চলে শিক্ষা বঞ্চনার বহুমাত্রিক সংকট

মো. মামুন হাসান

একজন শিক্ষক হিসেবে যখন সাতক্ষীরার প্রত্যন্ত চরাঞ্চলের দিকে তাকাই, তখন প্রথমেই যে দৃশ্যটি চোখে ভাসে, তা হলো ভোরবেলা নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন শিশু, যাদের হাতে বই-খাতা, অথচ চোখে অনিশ্চয়তা। নৌকা আসবে কি না, নদী শান্ত থাকবে কি না, বাঁধ ভেঙে যাওয়া পথ পার হওয়া যাবে কি না এই প্রশ্নগুলো তাদের কাছে প্রতিদিনের বাস্তবতা। একজন শিক্ষকের কাজ শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দেওয়া নয়, বরং শিক্ষার্থীর সামগ্রিক পরিস্থিতি বোঝা এবং তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা। শ্যামনগর, গাবুরা, পদ্মপুকুর বা কৈখালীর মতো এলাকায় গেলে বোঝা যায়, শিক্ষা এখানে কেবল একটি অধিকার নয়, বরং প্রতিদিনের এক সংগ্রাম।

আমি যে প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করি, সেখানে কারিগরি শিক্ষা নিয়ে কাজ করার সুযোগ হয়। এই কাজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, একজন শিক্ষক হিসেবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো শিক্ষার্থীকে ধরে রাখা। শহরাঞ্চলে যেখানে ঝরে পড়ার হার তুলনামূলক কম, চরাঞ্চলে তা ভয়াবহ রকম বেশি। একজন শিক্ষার্থী সপ্তাহের তিন দিন আসে, দুই দিন আসে না কারণ পরিবারের সঙ্গে ঘেরে কাজ করতে হয়, অথবা ছোট ভাইবোনকে দেখে রাখতে হয়, অথবা নদী পার হওয়ার নৌকা পাওয়া যায়নি। শিক্ষক হিসেবে এই অনুপস্থিতিকে শুধু হাজিরার খাতায় দাগ কেটে রাখা যায় না; বুঝতে হয় এর পেছনের জীবনসংগ্রাম।

শিক্ষকতার পেশায় থেকে আরেকটি বাস্তবতা প্রতিনিয়ত সামনে আসে শিক্ষকরা নিজেই এই এলাকায় থাকতে চান না। প্রত্যন্ত চরে নিয়োগ পাওয়া অনেক সহকর্মী প্রথম সুযোগেই বদলির চেষ্টা করেন। এর পেছনে যুক্তিও আছে। বিদ্যুৎ নেই, বিশুদ্ধ পানি নেই, চিকিৎসাসেবা নেই বললেই চলে, সন্তানের জন্য ভালো স্কুলও নেই। একজন শিক্ষক যখন নিজের পরিবারের নিরাপত্তা আর সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে দ্বিধায় থাকেন, তখন তার কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদী প্রতিশ্রুতি আশা করা কঠিন। ফলে একটি বিদ্যালয়ে বছরের পর বছর শিক্ষক পরিবর্তন হতেই থাকে, আর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিক্ষার্থী, যাদের শেখার ধারাবাহিকতা বারবার ব্যাহত হয়।

তবে এই সংকটের মধ্যেও যে জিনিসটি আমাকে সবচেয়ে বেশি ভাবায়, তা হলো শিক্ষার সঙ্গে জীবিকার সংযোগহীনতা। একজন শিক্ষক পাঠ্যবই থেকে যা শেখান, তার সঙ্গে শিক্ষার্থীর বাস্তব জীবনের কোনো মিল থাকে না। একটি শিশু জানে কীভাবে চিংড়ির ঘের দেখাশোনা করতে হয়, কীভাবে সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ করতে হয়, অথচ বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে এসবের কোনো প্রতিফলন নেই। কারিগরি শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার কারণে আমি বিশ্বাস করি, যদি স্থানীয় বাস্তবতা ও জীবিকার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দক্ষতা প্রশিক্ষণ পাঠ্যক্রমে যুক্ত করা যায়, তাহলে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বাড়বে। সুন্দরবন-সংলগ্ন এই অঞ্চলে পর্যটন ও হসপিটালিটি বিষয়ক প্রাথমিক দক্ষতা প্রশিক্ষণ, নৌকা পরিচালনা, প্রাকৃতিক গাইডিং, স্থানীয় হস্তশিল্পের মতো বিষয়গুলো যদি শিক্ষার সঙ্গে সংযুক্ত করা যায়, তাহলে অভিভাবকরাও সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠাতে আগ্রহী হবেন, কারণ তারা দেখবেন শিক্ষা সরাসরি জীবিকার সঙ্গে সম্পর্কিত।

একজন শিক্ষকের দৃষ্টিকোণ থেকে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয় শ্রেণিকক্ষের বাইরে শিক্ষার্থীর মানসিক অবস্থা। ঘূর্ণিঝড়, নদী ভাঙন, লবণাক্ততার কারণে ফসল নষ্ট হওয়া এসব ঘটনা শিশুর মনে গভীর প্রভাব ফেলে। আয়লা বা আম্ফানের পর যে শিক্ষার্থীরা ঘরবাড়ি হারিয়েছে, তাদের কাছে পাঠ্যবইয়ের অক্ষরের চেয়ে বেঁচে থাকার লড়াই বড় হয়ে দাঁড়ায়। একজন শিক্ষক তখন কেবল শিক্ষক থাকেন না, হয়ে ওঠেন মানসিক সহায়তার একজন সঙ্গীও। কিন্তু এই বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ বা সহায়তা প্রায় নেই বললেই চলে।

তারপরও আশার জায়গা আছে। কিছু এলাকায় ভাসমান স্কুল বা নৌকাভিত্তিক শিক্ষা প্রকল্প শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এই উদ্যোগগুলো প্রমাণ করে, সদিচ্ছা থাকলে ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করা সম্ভব। একজন শিক্ষক হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, শুধু অবকাঠামো তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন শিক্ষকদের জন্য উপযুক্ত প্রণোদনা, প্রত্যন্ত এলাকায় কাজের জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধা এবং দীর্ঘমেয়াদী পদায়নের নিশ্চয়তা। একজন শিক্ষক যদি নিরাপদ থাকার নিশ্চয়তা পান, তাহলে তিনিও দীর্ঘমেয়াদী অঙ্গীকার নিয়ে কাজ করতে পারবেন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিক্ষাকে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সংযুক্ত করা। সাতক্ষীরার চরাঞ্চলের শিশুরা প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে বড় হয়। তাদের এই অভিজ্ঞতাকে শিক্ষার অংশ করে তোলা গেলে, শিক্ষা আর দূরের কোনো বিষয় থাকবে না, হয়ে উঠবে জীবনের অংশ। একজন শিক্ষক হিসেবে আমার বিশ্বাস, এই সংযোগ তৈরি করতে পারলেই চরাঞ্চলের শিশুদের কাছে শিক্ষার আলো সত্যিকার অর্থে পৌঁছাবে। তা না হলে প্রতিটি নতুন বর্ষা, প্রতিটি নতুন জলোচ্ছ্বাস এই শিশুদের স্বপ্নকেও একইসঙ্গে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে, এবং আমরা শিক্ষকরা কেবল দূর থেকে তা দেখে যাব।

লেখক: ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট

যাত্রা থেকে চলচ্চিত্র

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:১২ অপরাহ্ণ
যাত্রা থেকে চলচ্চিত্র

এম শফিকুল ইসলাম

দুর্দান্ত প্রত্যাপে তাঁরা অভিনয় করতেন যাত্রা মঞ্চে জনপ্রিয়তাও পেয়েছিলেন যাত্রালোকে। পরে এক সময় এলেন চলচ্চিত্রে। এখানেও বেশ সুনাম কুড়ালেন। যদিও এমন শিল্পীর সংখ্যা খুব বেশি নয়। যার তারা থেকে চলচ্চিত্রে আসা কয়েকজন শিল্পীর কথা তুলে ধরছি আজকের সাহিত্য পাতার প্রকাশনীতে। যাত্রাশিল্পের অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও যাত্রা গবেষক এম. এ মজিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী অভিনেতা আনোয়ার হোসেন পঞ্চাশের দশকে জীবনে প্রথম যাত্রা মঞ্চে অভিনয় করেন ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা চরিত্র’। এ চরিত্রে অভিনয় করে এতটাই জনপ্রিয়তা লাভ করেন যে শেষ পর্যন্ত তিনি মুকুটহীন নবাব খ্যাতিতে ভূষিত হন। এরপর অসংখ্যবার তিনি নবাব চরিত্রে অভিনয় করে গেছেন। এছাড়াও আরও কয়েকটি যাত্রাপালায় অভিনয় করেন তিনি। পরে খান আতিউর রহমান পরিচালিত নবাব সিরাজউদ্দৌলা ছবিতে ‘নবাব চরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসিত হয়েছেন।

 

১৯৫৯ সালে ঢাকা ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে ননী দাস নির্দেশিত ‘এক টুকরো জমি’ নাটকে এবং ১৯৬১ সালে মহিউদ্দিন পরিচালিত ‘তোমার আমার’ ছবিতে প্রথম অভিনয় করেন এবং চলচ্চিত্রের অভিনয়ে থিতু হন। অভিনেত্রী আনোয়ারা প্রথম জীবনে কয়েকটি যাত্রাপালায় অভিনয় করলেও সংখ্যায় তা বেশি ছিল না। আনোয়ারা নবাব সিরাজউদ্দৌলা যাত্রা পালায় আলেয়ার চরিত্রে অভিনয় করেন এবং সুখ্যাতি পান। পরে খান আতিউর রহমান পরিচালিত নবাব সিরাজউদ্দৌলা ছবিতে আলেয়া চরিত্রে অভিনয় করেই প্রশংসিত হন। ১৯৬১ সালে আনোয়ারা ফজলুল হকের ‘আজান’ ছবির মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিনয় করেন। অভিনেতা আমির সিরাজী সত্তরের দশক থেকে যাত্রাপালায় অভিনয়ের মাধ্যমে তার ক্যারিয়ার শুরু করেন।

 

চলচ্চিত্রের নতুন মুখের সন্ধানের বিজ্ঞাপন দেখে তিনি ১৯৮৪ সালে ঢাকায় আসেন এবং এই প্রতিযোগিতায় উত্তীর্ণ হয়ে চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করেন। তার অভিনীত প্রথম সিনেমা ইবনে মিজানের ‘পাতাল বিজয়’। আমির সিরাজীর মুক্তিপ্রাপ্ত প্রথম সিনেমা মতিন রহমানের ‘রাধা কৃষ্ণ’। দীর্ঘ ক্যারিয়ারের সাত শতাধিক সিনেমায় অভিনয় করেছেন তিনি। শর্বরী দাসগুপ্ত একজন বলিষ্ঠ যার দ্বারা ও চলচ্চিত্র অভিনেত্রী। তাঁর প্রকৃত নাম রিনা রানি। ১৯৭০ সালে তিনি এ যাত্রা দল গীতাশ্রী অপেরায় অভিনয় জীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করেন। তার অভিনীত চলচ্চিত্রগুলো হলো-কেয়ামত, মনে পড়ে তোমাকে, বাবা কেন চাকর প্রভৃতি।

 

চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য কর্মের স্বীকৃতি হিসেবে শর্বরী দাশগুপ্ত ২০১৭ সালের জিয়া গোল্ড মেডেল পদকে ভূষিত হয়েছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে অঞ্জু ঘোষ ব্রাক্ষণবাড়িয়ার ভোলানাথ অপেরার যাত্রার নৃত্য পরিবেশন করতেন ও গান গাইতেন। ১৯৮২ সালে এফ কবীর চৌধুরী পরিচালিত ‘সওদাগর’ সিনেমার মাধ্যমে অঞ্জুর চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে। চলচ্চিত্রের অভিনয়ে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান। ১৯৯৬ সালে অঞ্জু কলকাতায় পাড়ি জামান। সেখানে চলচ্চিত্র ও যাত্রাপালায় নিয়মিত অভিনয় করেছেন তিনি। অভিনেতা সিরাজ হায়দার একাধারে একজন মঞ্চ যাত্রা ও চলচ্চিত্র অভিনেতা ছিলেন। ১৯৬২ সালে নবম শ্রেণীতে পরকালীন ‘টিপু সুলতান’ শিরোনামে নাটকে প্রথমবার অভিনয় করেন। আশির দশকের নারায়ণ ঘোষ মিতার ‘সুখের সংসার’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে বড়পর্দায় অভিষেক হয় সিরাজ হায়দারের।

 

চলচ্চিত্রের পাশাপাশি তিনি টেলিভিশন, মঞ্চ ও যাত্রাপালায় অভিনয় করেছেন। প্রখ্যাত যাত্রাশিল্পী অমলেন্দু বিশ্বাস এবং জ্যোৎনা বিশ্বাসের কন্যা অরুনা বিশ্বাস। তিনিও যাত্রাপালায় বাবা মার মতো অভিনয় করেন। এছাড়া মঞ্চ নাটকের ও তাঁর সফলতা ছিল। ১৯৮৬ সালের নায়করাজ রাজ্জাক পরিচালিত অরুনা বিশ্বাসের প্রথম সিনেমা ‘চাপা ডাঙ্গার বউ’। তার বিপরীতে ছিলেন বাপ্পারাজ। এরপর ‘দুর্নাম সম্মান ‘কৈফিয়ত, হাঙ্গর নদী গ্রেনেডসহ আরো বহু সিনেমায় অভিনয় করেন।

 

অরুনা বিশ্বাস অভিনেতা সুজনের প্রকৃত নাম পঙ্কজ বৈদ্য। তার জন্মস্থান চট্টগ্রাম। তিনি সত্তরের দশক থেকে চট্টগ্রামে যাত্রাপালা এবং মঞ্চ নাটকের জনপ্রিয়তার সঙ্গে অভিনয় করতেন। আশির দশকে তিনি চলচ্চিত্রে আসেন। প্রথমে পাশ্বচরিত্রে অভিনয় করতেন। নায়ক হিসাবে তার সবচেয়ে জনপ্রিয় চলচ্চিত্র হচ্ছে সিবি জামান পরিচালিত উজান ভাটি। তিনি প্রায় দুই ডজন চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। সম্প্রতি স্যাটেলাইট চ্যানেল সমূহের কল্যাণে বাংলাদেশের নাটক ও যাত্রার উন্নতির হাওয়া বইছে। নাটক যাত্রার ক্ষেত্র যথেষ্ট প্রসার লাভ করছে। সারাদেশে অসংখ্য নাট্যগোষ্ঠী ও যাত্রা অপেরা গড়ে উঠেছে নিয়মিত মঞ্চস্থ ও চিত্রিত হচ্ছে। রেডিও টিভিতে নাটক যাত্রাপালা প্রচারিত হচ্ছে। বাংলা একাডেমী প্রতিবছর নাট্যকার ও পালাকারকে পুরস্কৃত করছে।

 

এছাড়া শিল্পকলা একাডেমী নাট্য উৎসবের আয়োজন করছে। দিন দিন নাটক ও যাত্রার দর্শক সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই বর্তমান সময়ের নাট্যচর্চার আশিব্যঞ্জক অনুকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। বাংলার লোকনাট্য ও লোক যাত্রা পালা মানুষের বিবেক জাগ্রত করার এক অনন্য শক্তিশালী ভূমিকা পালন করছে।

লেখক : সাংবাদিক ও নাট্যকার