জবেহ ও কুরবানীর নামে মরা গরু খাচ্ছেন না তো?
কামারুজ্জামান
“তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, প্রবাহিত রক্ত, শূকরের গোস্ত এবং যা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে জবেহ করা হয়েছে”Ñ সূরা মায়েদা, আয়াত নং ৩। একই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে একই কথা বলা হয়েছে সূরা বাক্বারার ১৭৩, আনয়া’মের ১৪৫ ও নাহালের ১১৫ নং আয়াতে। অর্থাৎ একই কথা আল্লাহ কুরআনে চার জায়গায় চারবার বলেছেন। তাহলে এর গুরুত্ব কত বেশী!! এখানে প্রথম তিনটি মানবদেহের জন্য এবং শেষেরটা মানবাত্মা বা ঈমানের জন্য ক্ষতিকর ও ধ্বংসাত্মক এবং ধারাবাহিকতা বিচারে অনুমেয়, আল্লাহর কাছে মৃত প্রাণী সবচে’ খারাপ, অতঃপর প্রবাহিত রক্ত শূকরের গোস্তের চেয়েও খারাপ। হাঁ, প্রবাহিত রক্ত শূকরের গোস্তের চেয়েও খারাপ।
এই রক্তকেই আমরা প্রবাহিত হতে না দিয়ে গোস্তের মধ্যে আটকে রেখে প্রতিনিয়ত খাচ্ছি। আমরা প্রকৃতপক্ষে জবাই ও কুরবানীর নামে ব্রেন-স্ট্রোক ও শকে মরা পশুর গোস্ত খাচ্ছি। কিভাবে?
জবেহ সহী হওয়ার জন্য চারটি রগ কাটতে হয়Ñ খাদ্যনালী, শ্বাসনালী ও দুটি রক্তনালী। ভুলক্রমে তিনটি কাটা হলেও জবেহ হয়ে যাবে, শুদ্ধ হবে। কিন্তু তিনটি কাজ কখনোই করা যাবে না, হারাম ও কঠোরভাবে নিষেধ। (১) মেরুরজ্জু, শাহরগ বা স্পাইনাল কর্ডে আঘাত করা বা ছুরির খোঁচা মারা যাবে না। (২) জবেহ হওয়ার সাথে সাথে পশুর হাত-পায়ের বাঁধন খুলে দিতে হবে, যাতে পেশী-শিথিল অবস্থায় পড়ে থাকে ও ছটফট করতে পারে। (৩) মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত হাত-পায়ের নলা কাটা বা চামড়া ছাড়ানো শুরু করা যাবে না। কারণ মরার আগ পর্যন্ত প্রাণী ব্যথা পায়। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা নয়।
প্রথমটি করলে পশু জবাইয়ের চাইতে বেশী কষ্ট পায়। কারণ মেরুরজ্জুই অনুভূতি গ্রহণের প্রধান মাধ্যম। তাই জবাইয়ের ৩/৫ মিনিট পর ওখানে ছুরির খোঁচা দিলে বেহুঁশ হয়ে থাকা পশুও লাফিয়ে ওঠে। ৫/৭ মিনিটের মধ্যে পশু মরে না, কোষও মরে না। মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অজ্ঞান হয়ে থাকে। ঐ সময় কৃত্রিমভাবে রক্ত সরবরাহ শুরু করলে বিজ্ঞানমতে আবার জেগে উঠবে। পশু মারা যাওয়ার কথা আরো কিছুক্ষণ পর। কিন্তু ঐ সময় মেরুরজ্জুতে ছুরির খোঁচা দিলে পশু কেঁপে উঠে মারা যায়। অতএব এই মৃত্যু জবাইয়ের কারণে নয়, ব্রেন-স্ট্রোক ও শকের কারণে।
আর আমরা জবাইকৃত পশুর গোস্ত খাচ্ছি না, খাচ্ছি অপঘাতে-মরা প্রাণীর গোস্ত (প্রকারান্তরে কুরআনে বর্ণিত ১ নং হারামটা)! পরন্তু খোঁচা মারার সাথে সাথে মস্তিষ্ক থেকে দেহের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, মুহূর্তে দেহ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে এবং রক্ত প্রবাহিত হয়ে বের না হয়ে মাংসের মধ্যে জমাট বেঁধে রন্ধ্রে রন্ধ্রে আটকে যায়, ঠিক যেভাবে ফাঁসিতে, আঘাতে বা পানিতে-ডুবে মরা লাশ কাটলে আর রক্ত বের হয় না। অথচ তার শরীরে রক্ত ছিল। এই জন্য ব্যক্তিগত পর্যায়ে সঠিকভাবে কুরবানী করা পশুর গোস্ত সাধারণত সাদাটে ও হাঁসাটে হয়, কিন্তু কসাইয়ের দোকানের গোস্ত হয় টকটকে লাল। পাবলিক গরু কেটে লাভ করতে না পারলেও কসাইরা ঠিকই লাভ বের করে আনে।
প্রথমত, ওদের হাতে যাদু আছে, কী করে গোস্তের সাথে হাড়-ছড় কুপিয়ে দিতে হয়, খুব ভাল জানে। দ্বিতীয়ত, একটা গরুতে অন্যূন বার লিটার রক্ত গোস্তের মধ্যে আটকে দিতে পারলে দশ হাজার টাকা নগদ লাভ। অতিলোভী এই চেঙ্গিস কসাইরা সবচে’ ভয়ঙ্কর যে কাজটি করে, জবাই করার সাথে সাথে বুকের চামড়া ফেড়ে ফেলে চোখা ছুরির আগা দিয়ে হৃদপি- খুঁচিয়ে দেয়। এতে হৃদপি- বিকল হয়ে রক্ত পাম্প করতে পারে না এবং মাংসে রক্ত প্রায় পুরোটাই থেকে যায়।
এই আটকে-থাকা (প্রবাহিত) রক্তে থাকে প্রচুর পরিমাণে টক্সিন, ইউরিয়া ও বিপাকীয় জৈবরাসায়নিক বর্জ্য, যা প্রাথমিকভাবে বদহজম ও এলার্জির কারণ হয় এবং পরে ডেকে আনে প্রাণঘাতী মারাত্মক রোগ। এই কারণে অনেকেই বলে, কুরবানীর গোস্ত খেলে সমস্যা হয় না, কিন্তু দোকানের গোস্ত খেলেই সমস্যা হয়। বিশেষ করে গরুর গোস্ত। আসলে গরুর গোস্ত মানুষের জন্য ক্ষতিকর হলে নাবী মুহাম্মাদ (সঃ)-এর শারীয়া’ অবশ্যই একে অন্তত মাকরূহ ঘোষণা করত, পূর্ণ হালাল করত না।
গরুর দেহে প্রতি কেজি বডি ওয়েটের জন্য ৫৫<মিলি রক্ত থাকে। রক্ত ও রক্তে-থাকা ব্যাকটেরিয়া গোস্তের দ্রুত পচন ঘটায়।
উল্লিখিত দ্বিতীয় কাজটি করলে রক্ত সহজভাবে বের হয়ে যাবে। অপরপক্ষে জবেহর পরও হাত-পা বেঁধে রাখা পিশাচের কাজ এবং এমনটি করলে পেশী খিঁচ ধরে ওয়ার্কিং অবস্থায় থাকে। তখন সব রক্ত বের হয় না। এরপর তৃতীয় কাজটি করলে যে স্নায়ুগুলো কাটা পড়বে, সেগুলো দেহের যতটুকু অংশ নিয়ন্ত্রণ করত, সেসব অংশের রক্তও আর বের হবে না। এছাড়া আরো একটি কাজ ঃ পশু ঝুলিয়ে চামড়া ছাড়ানো উত্তম (সম্ভব হলে ভারী পশুর ক্ষেত্রেও)। এতে অবশিষ্ট রক্তটুকু বের হয়ে যাবে।
গভীরভাবে বোঝার বিষয় এই যে, সূরা মায়েদার ৩ নং আয়াতে আরো হারাম করা হয়েছে *গলা চিপে মারা জন্তু, *প্রহারে মরা জন্তু, *উঁচু থেকে পড়ে মরা জন্তু, *অন্য প্রাণীর শিঙের আঘাতে মরা জন্তু এবং *যে জন্তুকে হিংস্্রস্্র প্রাণী খেয়েছে এবং জবেহ করে নেওয়া হয়নি। এখানে লক্ষণীয় এমন জন্তু, যার দেহ থেকে রক্ত প্রবাহিত না হয়ে মারা পড়েছে। ‘প্রবাহিত রক্ত’!
আসুন, আমরা মরা গরুর সাথে প্রবাহিত রক্ত খাওয়ার বিরুদ্ধে সোচ্চার হই! নিজেরা বাঁচি, দেশবাসীকে বাঁচাই! লেখক: কামারুজ্জামান, রতেœশ্বরপুর, দেবহাটা












