সচ্চিদানন্দ দে সদয়
বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো ও গণমাধ্যম ব্যবস্থার দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো সরকারি কর্মকর্তা এবং সাংবাদিক সমাজ। রাজধানীর বাইরে উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রামবাংলার বাস্তবতায় এই দুই পক্ষের ভূমিকা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ রাষ্ট্রের সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব যেমন সরকারি কর্মকর্তাদের, তেমনি সেই সেবার মান, সীমাবদ্ধতা, সাফল্য ও ব্যর্থতার চিত্র জনগণ এবং রাষ্ট্রের সামনে তুলে ধরার দায়িত্ব সাংবাদিকদের।
এক অর্থে উভয়েই জনস্বার্থের কর্মী। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, মফস্বল এলাকায় এই দুই পেশাজীবী গোষ্ঠীর সম্পর্ক প্রায়ই অবিশ্বাস, সন্দেহ ও দূরত্বের আবরণে ঢেকে যায়। একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সহকারী কমিশনার (ভূমি), প্রকৌশলী, কৃষি কর্মকর্তা বা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা যখন সরকারি দায়িত্ব পালন করেন, তখন তার প্রতিটি সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনে। অন্যদিকে একজন মফস্বল সাংবাদিক প্রতিদিন মাঠে ঘুরে মানুষের সুখ-দুঃখ, সমস্যা-সম্ভাবনা, দুর্ভোগ ও প্রত্যাশার গল্প সংগ্রহ করেন। তিনি সমাজের চোখ ও কান হিসেবে কাজ করেন।
ফলে তাদের পথ আলাদা হলেও গন্তব্য একটাইÑজনকল্যাণ।কিন্তু প্রশ্ন হলো, একই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করার পরও কেন অনেক ক্ষেত্রে সাংবাদিক ও সরকারি কর্মকর্তার সম্পর্ক অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে? এর উত্তর খুঁজতে হলে মফস্বল সাংবাদিকতার বাস্তবতায় ফিরে যেতে হবে। রাজধানীর বাইরে কর্মরত অধিকাংশ সাংবাদিক সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে দায়িত্ব পালন করেন।
ঝড়, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, সড়ক দুর্ঘটনা, দুর্নীতি কিংবা প্রশাসনিক অনিয়মÑসব খবরের জন্য তাকেই সবার আগে ছুটতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে জীবনঝুঁকি নিয়েও তথ্য সংগ্রহ করতে হয়। অথচ তার হাতে থাকে না পর্যাপ্ত প্রযুক্তি, পরিবহন কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা।অন্যদিকে সরকারি কর্মকর্তাদেরও রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। রাজনৈতিক চাপ, জনবল সংকট, প্রশাসনিক জটিলতা এবং বিধিবিধানের বেড়াজালে অনেক সময় তাদের কাক্সিক্ষত সেবা প্রদান কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে কোনো সমস্যার সংবাদ প্রকাশিত হলে তারা অনেক সময় সেটিকে ব্যক্তিগত সমালোচনা হিসেবে দেখেন।
এখানেই শুরু হয় দূরত্বের।প্রকৃতপক্ষে সাংবাদিকের কাজ কোনো কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়। সাংবাদিকের দায়িত্ব সত্য তুলে ধরা। যদি কোনো হাসপাতালের চিকিৎসক অনুপস্থিত থাকেন, কোনো ভূমি অফিসে ঘুষের অভিযোগ ওঠে, কোনো উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম হয় অথবা কোনো সরকারি সেবা থেকে জনগণ বঞ্চিত হয়, তাহলে সেই বিষয়টি সংবাদমাধ্যমে আসবেই। কারণ সংবাদপত্র জনগণের পক্ষের ভাষা।কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক কর্মকর্তা সংবাদ প্রকাশকে ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে গ্রহণ করেন। কেউ কেউ সাংবাদিকের ফোন ধরতে চান না, তথ্য দিতে অনীহা দেখান কিংবা সংবাদ প্রকাশের পর বিরূপ মনোভাব পোষণ করেন।
এটি কেবল পেশাগত দুর্বলতার পরিচয় নয়, বরং গণতান্ত্রিক চর্চার জন্যও অশনিসংকেত।একটি সভ্য রাষ্ট্রে সমালোচনা ভয় পাওয়ার বিষয় নয়। বরং সমালোচনা উন্নতির পথ দেখায়। একজন সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তা জানেন, কোনো সংবাদে যদি প্রকৃত সমস্যা উঠে আসে, তাহলে সেটি সমাধানের উদ্যোগ নেওয়াই তার দায়িত্ব। সংবাদপত্র শত্রু নয়; বরং প্রশাসনের আয়না।
তবে সব দায় যে শুধু সরকারি কর্মকর্তাদের, এমনটিও বলা যাবে না। সাংবাদিকতার জগতেও নানা সংকট ও বিচ্যুতি রয়েছে। কিছু ব্যক্তি সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করেন। কোথাও কোথাও তথ্য যাচাই ছাড়া সংবাদ প্রকাশ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক অপপ্রচার কিংবা অযৌক্তিক চাপ প্রয়োগের ঘটনাও ঘটে। এসব কর্মকা- পুরো সাংবাদিক সমাজের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে।ফলে প্রকৃত সাংবাদিকরা যেমন বিব্রত হন, তেমনি সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যেও নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। একজন কর্মকর্তার কাছে যখন একাধিক ব্যক্তি সাংবাদিক পরিচয়ে গিয়ে ভিন্ন ভিন্ন আচরণ করেন, তখন তিনি বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। এই বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
তবে কিছু ব্যতিক্রমের কারণে পুরো পেশাকে বিচার করা উচিত নয়। যেমন কোনো দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তার কারণে পুরো প্রশাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা যায় না, তেমনি কয়েকজন অপেশাদার ব্যক্তির কারণে পুরো সাংবাদিক সমাজকেও দোষারোপ করা অন্যায়।বর্তমান সময়ে তথ্যপ্রাপ্তির বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। তথ্য অধিকার আইন প্রণয়নের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল প্রশাসনের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং জনগণের তথ্য জানার অধিকার নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে অনেক দপ্তরে এখনো তথ্যপ্রদানের সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। সাংবাদিকরা কোনো তথ্য চাইলে নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করা হয়। কখনো বলা হয় ফাইল নেই, কখনো বলা হয় অনুমতি লাগবে, আবার কখনো সরাসরি তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানানো হয়।
এই প্রবণতা শুধু সাংবাদিকতার পথে বাধা সৃষ্টি করে না, বরং জনগণের অধিকারও ক্ষুণœ করে। কারণ সরকারি দপ্তরের তথ্য মূলত জনগণেরই তথ্য। সরকারি কর্মকর্তা সেই তথ্যের মালিক নন, বরং রক্ষক ও ব্যবস্থাপক মাত্র। মফস্বল অঞ্চলে ভূমি অফিস, তহশিল অফিস, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নানা অনিয়মের অভিযোগ প্রায়ই সামনে আসে। কোথাও সেবা পেতে ঘুষ লাগে, কোথাও দালালচক্রের দৌরাত্ম্য, কোথাও দায়িত্বে অবহেলা। এসব বিষয় যখন সংবাদমাধ্যমে আসে, তখন সাধারণ মানুষ আশার আলো দেখতে পান। কারণ সংবাদ প্রকাশের পর প্রশাসনের নড়াচড়া শুরু হয়, তদন্ত হয়, কখনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
এ কারণেই গণমাধ্যমকে গণতন্ত্রের প্রহরী বলা হয়।কিন্তু গণমাধ্যমের শক্তি তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা দায়িত্বশীল থাকে। সাংবাদিকের কলম যেমন মানুষের অধিকার রক্ষা করতে পারে, তেমনি অসতর্ক ব্যবহারে কারও সম্মানহানির কারণও হতে পারে। তাই সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই, একাধিক সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া এবং অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।বস্তুনিষ্ঠতা সাংবাদিকতার প্রাণ। সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা ছাড়া সাংবাদিকতা কেবল প্রচারণায় পরিণত হয়।একইভাবে সরকারি কর্মকর্তাদেরও মনে রাখতে হবে, তারা জনগণের টাকায় পরিচালিত রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিনিধি। জনগণের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, গণমাধ্যমকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করা এবং নিজের কর্মকা-ের জবাবদিহি করা তাদের দায়িত্বের অংশ। ক্ষমতা কখনো জবাবদিহির বিকল্প হতে পারে না।
বিশ্বের উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে প্রশাসন ও গণমাধ্যমের সম্পর্ককে প্রতিদ্বন্দ্বিতার নয়, বরং পারস্পরিক ভারসাম্যের সম্পর্ক হিসেবে দেখা হয়। গণমাধ্যম প্রশাসনের ভুল তুলে ধরে, আবার প্রশাসনও সঠিক তথ্য দিয়ে জনগণকে অবহিত করে। এর ফলে রাষ্ট্র আরও কার্যকর ও স্বচ্ছ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশেও সেই সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন। বিশেষ করে মফস্বল অঞ্চলে সাংবাদিক ও সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে নিয়মিত মতবিনিময়, তথ্য বিনিময় এবং পেশাগত সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। বিভিন্ন দপ্তরে নির্ধারিত তথ্য কর্মকর্তা সক্রিয় থাকলে তথ্যপ্রাপ্তি সহজ হবে। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের জন্য তথ্য অধিকার আইন, নৈতিক সাংবাদিকতা এবং অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের বিষয়ে প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো দরকার।
আজকের ডিজিটাল যুগে গুজব, অপতথ্য এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি অসত্য তথ্য মুহূর্তের মধ্যে হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। এই পরিস্থিতিতে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা এবং তথ্যসমৃদ্ধ প্রশাসনিক যোগাযোগ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন।একজন মফস্বল সাংবাদিক যখন কোনো প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষের কষ্টের কথা তুলে ধরেন, তখন তিনি শুধু একটি সংবাদ লেখেন না; তিনি রাষ্ট্রের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
আবার একজন সরকারি কর্মকর্তা যখন আন্তরিকভাবে সেই সমস্যার সমাধানে কাজ করেন, তখন তিনি শুধু দায়িত্ব পালন করেন না; তিনি জনগণের আস্থা অর্জন করেন। অতএব, সাংবাদিক ও সরকারি কর্মকর্তার সম্পর্ক হওয়া উচিত পারস্পরিক সম্মান, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির ভিত্তিতে। এখানে অহংকারের স্থান নেই, প্রতিপক্ষ ভাবার সুযোগ নেই। কারণ উভয়ের কাজই শেষ পর্যন্ত মানুষের জন্য। মফস্বলের ধুলোমাখা পথ, নদীভাঙা জনপদ, উপকূলের ঝড়বিধ্বস্ত গ্রাম কিংবা কৃষকের ঘামে ভেজা মাঠÑএসব জায়গায় রাষ্ট্রের উপস্থিতি দৃশ্যমান হয় সরকারি কর্মকর্তার মাধ্যমে, আর সেই বাস্তবতার কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন সাংবাদিক। একজন কাজ করেন প্রশাসনের শক্তি নিয়ে, অন্যজন কাজ করেন কলমের শক্তি নিয়ে। কিন্তু উভয়ের লক্ষ্য যদি জনস্বার্থ হয়, তাহলে দ্বন্দ্বের নয়, সহযোগিতার সম্পর্কই হওয়া উচিত স্বাভাবিক।
আজ প্রয়োজন এমন একটি সংস্কৃতি, যেখানে সমালোচনাকে শত্রুতা হিসেবে দেখা হবে না, প্রশ্নকে অবাধ্যতা মনে করা হবে না এবং সংবাদকে ভয় পাওয়া হবে না। কারণ একটি স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও সাহসী গণমাধ্যম যেমন রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে, তেমনি দক্ষ, সৎ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনও গণতন্ত্রকে সুসংহত করে।জনগণের স্বার্থে, সুশাসনের স্বার্থে এবং একটি মানবিক রাষ্ট্র গঠনের স্বার্থে মফস্বল সাংবাদিক ও সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে দূরত্ব নয়, বরং আস্থা ও সহযোগিতার সেতুবন্ধন গড়ে উঠুক। সেটিই হবে গণতন্ত্রের জন্য শুভ, প্রশাসনের জন্য কল্যাণকর এবং সাধারণ মানুষের জন্য আশাব্যঞ্জক।
লেখক: সংবাদকর্মী