মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬, ৯ আষাঢ় ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬, ৯ আষাঢ় ১৪৩৩

কেন্দ্রীয় নির্দেশনায় সাতক্ষীরায় যুবদলের উদ্যোগে প্রতিবাদ মিছিল

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬, ৭:১২ অপরাহ্ণ
কেন্দ্রীয় নির্দেশনায় সাতক্ষীরায় যুবদলের উদ্যোগে প্রতিবাদ মিছিল

নিজস্ব প্রতিনিধি: সংগঠনিক সপ্তাহ উপলক্ষে অপপ্রচার শিষ্টাচার বহির্ভূত রাজনীতির বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় যুবদলের নির্দেশনায় সাতক্ষীরায় যুবদলের উদ্যোগে প্রতিবাদ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার (২৩ জুন) বিকালে শহরের একটি চায়নিজ রেস্টুরেন্টের সামনে থেকে সাতক্ষীরা জেলা, সদর উপজেলা ও পৌর যুবদলের আয়োজনে একটি প্রতিবাদ মিছিল বের হয়। প্রতিবাদ মিছিলটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে পলাশপোল স্কুলের সামনে গিয়ে সমাবেশ করে।

 

সমাবেশে জেলা যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাফিজুর রহমান মুকুলের সভাপতিত্বে প্রতিবাদ মিছিল ও সমাবেশে বক্তব্য রাখেন সাতক্ষীরা জেলা যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক শফিকুল আলম বাবু, সদর উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক মোঃ নজরুল ইসলাম, পৌর যুব দলের আহ্বায়ক আলী শাহিন, সদস্য সচিব মাসুম রানা সবুজ, তরিকুল ইসলাম কল্লোল, পৌর যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক দেবাশীষ চৌধুরী, সাবেক সহসাংগঠনিক সম্পাদক কাজী রাসিউল করিম রোমান, অ্যাডভোকেট হাসিব, সাবেক সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক এসআই আশা প্রমুখ।

 

প্রতিবাদ মিছিল ও সমাবেশে সাতক্ষীরা জেলা, সদর উপজেলা ও পৌর যুবদলের নেতা কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

Ads small one

মাদকের ভয়াবহতা রোধে পারিবারিক সচেতনতা বৃদ্ধি প্রয়োজন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬, ১১:১৭ অপরাহ্ণ
মাদকের ভয়াবহতা রোধে পারিবারিক সচেতনতা বৃদ্ধি প্রয়োজন

প্রকাশ ঘোষ বিধান

মাদকের ভয়াবহতা রোধে পারিবারিক সচেতনতা বৃদ্ধি, মাদকের সহজলভ্যতা বন্ধ করা এবং সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিরোধ গড়ে তোলা সবচেয়ে জরুরি। মাদকের ভয়াবহতা রোধে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সম্মিলিতভাবে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সচেতনতা বৃদ্ধি, পারিবারিক সুদৃঢ় বন্ধন, সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা এবং সহজলভ্যতা রোধের মাধ্যমে মাদকের বিস্তার ও এর কুফল থেকে সমাজকে রক্ষা করা সম্ভব।

২৬ জুন আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবস। মাদকের অপব্যবহার রোধ, অবৈধ পাচার দমন এবং তরুণ সমাজকে মাদকের ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা করা। ১৯৮৭ সালের ৭ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২৬ জুনকে আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর থেকে প্রতি বছর সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচার রোধে দিবসটি গুরুত্ব সহকারে পালিত হয়ে আসছে।

সারা পৃথিবীতে তরুন প্রজন্মের জন্য ক্ষতিকর বিষয়গুলোর মধ্যে মাদকাসক্তি অন্যতম। অসংখ্য কারণে একজন মানুষ মাদকের প্রতি আসক্ত হতে পারে। মাদক সেবনের ফলে মানুষের মাঝে এক ধরনের ভালো লাগা তৈরি হয়। ডিপ্রেশন, মানসিক চাপ, বিষণœতা কমাতে মাদক গ্রহণ করে। মাদকাসক্তের বড় অংশ মানসিক চাপে পড়ে মাদক গ্রহণ শুরু করে। আমাদের দেশে সিগারেট, গাঁজা, হেরোইন, মদ, ফেন্সিডিলের মতো মাদকগুলো খুব সহজেই খুঁজে পাওয়া যায়। আমাদের চারপাশে অনেকটা হাতের নাগালে মাদক পাওয়া যায়। যার কারণে শিক্ষার্থীরাও এগুলোর প্রতি সহজেই আসক্ত হয়ে পড়ছে। অনেক সময় নিছক আনন্দ ও কৌতুহলবসত মাদক গ্রহণ করে। আবার অনেকে নিজের স্মার্টনেশ দেখাতে মাদক ব্যবহার করে। আর এভাবে কিশোর কিশোরীসহ নানা বয়সের মানুষ মাদকের দূর্ভেদ্য জালে আটকে পড়ে। পরে আর মাদক থেকে বের হওয়া সম্ভব হয় না।

পরিবার হলো যেকোনো নৈতিক শিক্ষার প্রথম পাঠশালা। সন্তানদের মাদকমুক্ত রাখতে পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। সন্তান কোথায় যায়, কার সাথে মিশে এবং তাদের আচরণে কোনো পরিবর্তন আসছে কি না সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা। সন্তানের দেরিতে বাড়ি ফেরা, মেজাজ খিটখিটে হওয়া, বা হঠাৎ অতিরিক্ত টাকার চাহিদা বাড়ার মতো লক্ষণগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করুন। পারিবারিক কলহ ও অশান্তি এড়িয়ে চলুন, কারণ পারিবারিক অশান্তি অনেক সময় তরুণদের মাদকের দিকে ঠেলে দেয়। সন্তানের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা, যাতে তারা কোনো মানসিক চাপে থাকলে বা হতাশায় ভুগলে তা পরিবারের সাথে শেয়ার করতে পারে। ছোটবেলা থেকেই সন্তানকে ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধ শিক্ষা দেওয়া।

তরুণদের একটি বড় অংশ দিনের বেশী সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাটায়, তাই শিক্ষকদের ভূমিকা এখানে অপরিসীম। স্কুল, কলেজ ও কর্মক্ষেত্রে মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সেমিনার ও সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইনের আয়োজন করা। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ধর্মীয় অনুশাসন ও নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষা দেওয়া। তরুণ ও কিশোরদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকা- এবং সমাজসেবামূলক কাজে যুক্ত রাখা।

কোনো ব্যক্তি মাদকাসক্ত হয়ে পড়লে তাকে অপরাধী না ভেবে একজন রোগী হিসেবে বিবেচনা করা এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। আসক্ত ব্যক্তিকে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় কাউন্সেলিং এবং ভালো কোনো পুনর্বাসন কেন্দ্রে ভর্তির উদ্যোগ নেওয়া।

মাদকের সরবরাহ বন্ধ করতে না পারলে এর অপব্যবহার রোধ করা অসম্ভব। মাদক চোরাচালান ও উৎপাদন কঠোরভাবে দমন করা এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নজরদারি বাড়ানো। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা নির্দিষ্ট এলাকার আশেপাশে মাদকের দোকান ও সহজলভ্যতা কঠোর হাতে বন্ধ করা। পাড়া-মহল্লায় মাদকবিরোধী কমিটি গঠন করে মাদকের কেনাবেচা রুখে দেওয়া। মাদক চোরাচালান ও ব্যবসার সাথে জড়িতদের দ্রুত কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা।

মাদকাসক্তি নিরাময় করতে সরকারি উদ্যোগে পর্যাপ্ত এবং মানসম্মত মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে, যেন আসক্ত ব্যক্তিরা সহজে চিকিৎসা পেতে পারে। টেলিভিশন, সংবাদপত্র ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মাদকের বিরুদ্ধে নিয়মিত তথ্যচিত্র ও শিক্ষণীয় বিজ্ঞাপন প্রচার করতে হবে।

মাদকের ভয়াবহতা রোধে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। এর মূল চাবিকাঠি হলো সচেতনতা বৃদ্ধি, পারিবারিক সুদৃঢ় বন্ধন, মাদকের সহজলভ্যতা কমানো এবং আক্রান্ত ব্যক্তিদের সঠিক চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা।প্রতিটি স্তরে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে মাদকের বিস্তার ও এর ক্ষতিকর প্রভাব কমিয়ে আনা সম্ভব।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

 

 

 

 

 

উদ্ধার না হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ কি স্থানীয় নির্বাচনে ঝুঁকি বাড়াবে?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬, ১১:১৪ অপরাহ্ণ
উদ্ধার না হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ কি স্থানীয় নির্বাচনে ঝুঁকি বাড়াবে?

এম শফিকুল ইসলাম

বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামীলীগ সরকারের পতন হয়। ঐদিনই দেশের বেশিরভাগ থানা ও পুলিশ ক্যাম্পগুলোতে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ করা হয়। লুট হয়ে যায় বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ। যার একটি বড় অংশ আইন শৃঙ্খলা বাহিনী এখনো উদ্ধার করতে সক্ষম হয়নি।

 

লুঠ হওয়া ওই সব অস্ত্র দিয়ে দুর্বৃত্তরা ছিনতাই ও ডাকাতিসহ নানা অপরাধ কর্মকা- চালিয়ে যাচ্ছে। সব সন্ত্রাস ও এখনো সম্পূর্ণ বন্ধ হয়নি। এমন পরিস্থিতি আগামী স্থানীয় নির্বাচনের সময় উদ্ধার না হওয়া এসব মারণাস্ত্র গোলাবারুদ সহিংসতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, আগামী স্থানীয় নির্বাচনে অবাধ সুষ্ঠ সুন্দর ও নিরপেক্ষ ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠানে তারা সম্পূর্ণ প্রস্তুত থাকবে।

 

পুলিশের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারে ইন্টেলিজেন্স ভিত্তিক অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সুদৃষ্টভাবে অভিযান চালিয়ে সন্ত্রাসী ও দুর্বৃত্তদের গ্রেপ্তার ও অস্ত্র উদ্ধারে জোর দেওয়া আরো কঠোর হবে। অস্ত্র উদ্ধারে দেওয়া হয়েছিল পুরস্কার ঘোষণা। একটা শর্ট গান কিংবা পিস্তল উদ্ধার করে দিতে পারলে পঞ্চাশ হাজার টাকা এবং চায়না রাইফেল ও এসএমজি উদ্ধার করে দিতে পারলে এক লাখ করে পুরস্কার দেওয়া হবে।

 

এলএমজির ক্ষেত্রে এই পুরস্কারের টাকা বাহিনীর সদস্য সহ সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে অনলাইন ও অফলাইনে। তারপরও উদ্ধার না হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ নির্বাচনী প্রচারণা ও ভোটকেন্দ্রে ভয় তৈরিতে ব্যবহার করা হতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। সন্ত্রাসীরা এসব অস্ত্র গোলাবারুদ নিয়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় লিপ্ত হলে তা রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়াতে পারে। ব্যবহৃত যেসব অস্ত্র এখনো উদ্ধার করা হয়নি, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য সেটা উদ্বেগজনক।

 

আসন্ন নির্বাচনে এসব অস্ত্র ও গোলাবারুদ ব্যবহার হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। যত দূরত্ব সম্ভব আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীগুলোকে এসব অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করতে সক্রিয় প্রচেষ্টা থাকতে হবে। তা না হলে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ২০২৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন থানা, গণভবনের স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএস) ৫ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৬ লাখ ৫২ হাজার ৮ রাউন্ড গোলাবারুদ লুঠ হয়েছিল। এর মধ্যে ৪হাজর ৪১০টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি আরো ১হাজার ৩৫৩ টি অস্ত্র। ৩ লাখ ৯৪ হাজার ৩৭৯টি গোলাবারুদ উদ্ধার করা সম্ভব হলেও উদ্ধার হয়নি ২ লাখ ৫৭ হাজার ৬৫৯টি ।

 

পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, বাকি লুঠ হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে কাজ করছে পুলিশসহ আইন শৃঙ্খলা বাহিনী। কিছু অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি। বাইরে রয়ে গেছে। তবে অস্ত্র উদ্ধারে রয়েছে, চলমান প্রক্রিয়া। তাছাড়া আসন্ন স্থানীয় নির্বাচন সামনে রেখে বাইরের দেশে থেকেও যাতে কোন অস্ত্র ঢুকতে না পারে সে পদক্ষেপ ও প্রত্যাশায় রয়েছে দেশের মানুষ। থাকবে না অস্ত্রের ঝনঝনানি, গড়াবে না রক্তের স্রোতধরা। রাজনৈতিক দলগুলোর জন প্রত্যাশাকে মূল্য দিয়ে সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে স্থানীয় নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাবে।

 

 

 

 

 

 

মফস্বল সাংবাদিক ও সরকারি কর্মকর্তা: দূরত্ব নয়, জনস্বার্থে হোক সহযাত্রা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬, ১১:১২ অপরাহ্ণ
মফস্বল সাংবাদিক ও সরকারি কর্মকর্তা: দূরত্ব নয়, জনস্বার্থে হোক সহযাত্রা

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো ও গণমাধ্যম ব্যবস্থার দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো সরকারি কর্মকর্তা এবং সাংবাদিক সমাজ। রাজধানীর বাইরে উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রামবাংলার বাস্তবতায় এই দুই পক্ষের ভূমিকা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ রাষ্ট্রের সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব যেমন সরকারি কর্মকর্তাদের, তেমনি সেই সেবার মান, সীমাবদ্ধতা, সাফল্য ও ব্যর্থতার চিত্র জনগণ এবং রাষ্ট্রের সামনে তুলে ধরার দায়িত্ব সাংবাদিকদের।

 

এক অর্থে উভয়েই জনস্বার্থের কর্মী। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, মফস্বল এলাকায় এই দুই পেশাজীবী গোষ্ঠীর সম্পর্ক প্রায়ই অবিশ্বাস, সন্দেহ ও দূরত্বের আবরণে ঢেকে যায়। একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সহকারী কমিশনার (ভূমি), প্রকৌশলী, কৃষি কর্মকর্তা বা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা যখন সরকারি দায়িত্ব পালন করেন, তখন তার প্রতিটি সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনে। অন্যদিকে একজন মফস্বল সাংবাদিক প্রতিদিন মাঠে ঘুরে মানুষের সুখ-দুঃখ, সমস্যা-সম্ভাবনা, দুর্ভোগ ও প্রত্যাশার গল্প সংগ্রহ করেন। তিনি সমাজের চোখ ও কান হিসেবে কাজ করেন।

 

ফলে তাদের পথ আলাদা হলেও গন্তব্য একটাইÑজনকল্যাণ।কিন্তু প্রশ্ন হলো, একই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করার পরও কেন অনেক ক্ষেত্রে সাংবাদিক ও সরকারি কর্মকর্তার সম্পর্ক অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে? এর উত্তর খুঁজতে হলে মফস্বল সাংবাদিকতার বাস্তবতায় ফিরে যেতে হবে। রাজধানীর বাইরে কর্মরত অধিকাংশ সাংবাদিক সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে দায়িত্ব পালন করেন।

 

ঝড়, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, সড়ক দুর্ঘটনা, দুর্নীতি কিংবা প্রশাসনিক অনিয়মÑসব খবরের জন্য তাকেই সবার আগে ছুটতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে জীবনঝুঁকি নিয়েও তথ্য সংগ্রহ করতে হয়। অথচ তার হাতে থাকে না পর্যাপ্ত প্রযুক্তি, পরিবহন কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা।অন্যদিকে সরকারি কর্মকর্তাদেরও রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। রাজনৈতিক চাপ, জনবল সংকট, প্রশাসনিক জটিলতা এবং বিধিবিধানের বেড়াজালে অনেক সময় তাদের কাক্সিক্ষত সেবা প্রদান কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে কোনো সমস্যার সংবাদ প্রকাশিত হলে তারা অনেক সময় সেটিকে ব্যক্তিগত সমালোচনা হিসেবে দেখেন।

 

এখানেই শুরু হয় দূরত্বের।প্রকৃতপক্ষে সাংবাদিকের কাজ কোনো কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়। সাংবাদিকের দায়িত্ব সত্য তুলে ধরা। যদি কোনো হাসপাতালের চিকিৎসক অনুপস্থিত থাকেন, কোনো ভূমি অফিসে ঘুষের অভিযোগ ওঠে, কোনো উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম হয় অথবা কোনো সরকারি সেবা থেকে জনগণ বঞ্চিত হয়, তাহলে সেই বিষয়টি সংবাদমাধ্যমে আসবেই। কারণ সংবাদপত্র জনগণের পক্ষের ভাষা।কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক কর্মকর্তা সংবাদ প্রকাশকে ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে গ্রহণ করেন। কেউ কেউ সাংবাদিকের ফোন ধরতে চান না, তথ্য দিতে অনীহা দেখান কিংবা সংবাদ প্রকাশের পর বিরূপ মনোভাব পোষণ করেন।

 

এটি কেবল পেশাগত দুর্বলতার পরিচয় নয়, বরং গণতান্ত্রিক চর্চার জন্যও অশনিসংকেত।একটি সভ্য রাষ্ট্রে সমালোচনা ভয় পাওয়ার বিষয় নয়। বরং সমালোচনা উন্নতির পথ দেখায়। একজন সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তা জানেন, কোনো সংবাদে যদি প্রকৃত সমস্যা উঠে আসে, তাহলে সেটি সমাধানের উদ্যোগ নেওয়াই তার দায়িত্ব। সংবাদপত্র শত্রু নয়; বরং প্রশাসনের আয়না।

তবে সব দায় যে শুধু সরকারি কর্মকর্তাদের, এমনটিও বলা যাবে না। সাংবাদিকতার জগতেও নানা সংকট ও বিচ্যুতি রয়েছে। কিছু ব্যক্তি সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করেন। কোথাও কোথাও তথ্য যাচাই ছাড়া সংবাদ প্রকাশ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক অপপ্রচার কিংবা অযৌক্তিক চাপ প্রয়োগের ঘটনাও ঘটে। এসব কর্মকা- পুরো সাংবাদিক সমাজের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে।ফলে প্রকৃত সাংবাদিকরা যেমন বিব্রত হন, তেমনি সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যেও নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। একজন কর্মকর্তার কাছে যখন একাধিক ব্যক্তি সাংবাদিক পরিচয়ে গিয়ে ভিন্ন ভিন্ন আচরণ করেন, তখন তিনি বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। এই বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

তবে কিছু ব্যতিক্রমের কারণে পুরো পেশাকে বিচার করা উচিত নয়। যেমন কোনো দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তার কারণে পুরো প্রশাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা যায় না, তেমনি কয়েকজন অপেশাদার ব্যক্তির কারণে পুরো সাংবাদিক সমাজকেও দোষারোপ করা অন্যায়।বর্তমান সময়ে তথ্যপ্রাপ্তির বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। তথ্য অধিকার আইন প্রণয়নের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল প্রশাসনের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং জনগণের তথ্য জানার অধিকার নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে অনেক দপ্তরে এখনো তথ্যপ্রদানের সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। সাংবাদিকরা কোনো তথ্য চাইলে নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করা হয়। কখনো বলা হয় ফাইল নেই, কখনো বলা হয় অনুমতি লাগবে, আবার কখনো সরাসরি তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানানো হয়।

 

এই প্রবণতা শুধু সাংবাদিকতার পথে বাধা সৃষ্টি করে না, বরং জনগণের অধিকারও ক্ষুণœ করে। কারণ সরকারি দপ্তরের তথ্য মূলত জনগণেরই তথ্য। সরকারি কর্মকর্তা সেই তথ্যের মালিক নন, বরং রক্ষক ও ব্যবস্থাপক মাত্র। মফস্বল অঞ্চলে ভূমি অফিস, তহশিল অফিস, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নানা অনিয়মের অভিযোগ প্রায়ই সামনে আসে। কোথাও সেবা পেতে ঘুষ লাগে, কোথাও দালালচক্রের দৌরাত্ম্য, কোথাও দায়িত্বে অবহেলা। এসব বিষয় যখন সংবাদমাধ্যমে আসে, তখন সাধারণ মানুষ আশার আলো দেখতে পান। কারণ সংবাদ প্রকাশের পর প্রশাসনের নড়াচড়া শুরু হয়, তদন্ত হয়, কখনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

 

এ কারণেই গণমাধ্যমকে গণতন্ত্রের প্রহরী বলা হয়।কিন্তু গণমাধ্যমের শক্তি তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা দায়িত্বশীল থাকে। সাংবাদিকের কলম যেমন মানুষের অধিকার রক্ষা করতে পারে, তেমনি অসতর্ক ব্যবহারে কারও সম্মানহানির কারণও হতে পারে। তাই সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই, একাধিক সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া এবং অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।বস্তুনিষ্ঠতা সাংবাদিকতার প্রাণ। সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা ছাড়া সাংবাদিকতা কেবল প্রচারণায় পরিণত হয়।একইভাবে সরকারি কর্মকর্তাদেরও মনে রাখতে হবে, তারা জনগণের টাকায় পরিচালিত রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিনিধি। জনগণের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, গণমাধ্যমকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করা এবং নিজের কর্মকা-ের জবাবদিহি করা তাদের দায়িত্বের অংশ। ক্ষমতা কখনো জবাবদিহির বিকল্প হতে পারে না।

 

বিশ্বের উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে প্রশাসন ও গণমাধ্যমের সম্পর্ককে প্রতিদ্বন্দ্বিতার নয়, বরং পারস্পরিক ভারসাম্যের সম্পর্ক হিসেবে দেখা হয়। গণমাধ্যম প্রশাসনের ভুল তুলে ধরে, আবার প্রশাসনও সঠিক তথ্য দিয়ে জনগণকে অবহিত করে। এর ফলে রাষ্ট্র আরও কার্যকর ও স্বচ্ছ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশেও সেই সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন। বিশেষ করে মফস্বল অঞ্চলে সাংবাদিক ও সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে নিয়মিত মতবিনিময়, তথ্য বিনিময় এবং পেশাগত সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। বিভিন্ন দপ্তরে নির্ধারিত তথ্য কর্মকর্তা সক্রিয় থাকলে তথ্যপ্রাপ্তি সহজ হবে। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের জন্য তথ্য অধিকার আইন, নৈতিক সাংবাদিকতা এবং অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের বিষয়ে প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো দরকার।

 

আজকের ডিজিটাল যুগে গুজব, অপতথ্য এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি অসত্য তথ্য মুহূর্তের মধ্যে হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। এই পরিস্থিতিতে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা এবং তথ্যসমৃদ্ধ প্রশাসনিক যোগাযোগ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন।একজন মফস্বল সাংবাদিক যখন কোনো প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষের কষ্টের কথা তুলে ধরেন, তখন তিনি শুধু একটি সংবাদ লেখেন না; তিনি রাষ্ট্রের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

 

আবার একজন সরকারি কর্মকর্তা যখন আন্তরিকভাবে সেই সমস্যার সমাধানে কাজ করেন, তখন তিনি শুধু দায়িত্ব পালন করেন না; তিনি জনগণের আস্থা অর্জন করেন। অতএব, সাংবাদিক ও সরকারি কর্মকর্তার সম্পর্ক হওয়া উচিত পারস্পরিক সম্মান, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির ভিত্তিতে। এখানে অহংকারের স্থান নেই, প্রতিপক্ষ ভাবার সুযোগ নেই। কারণ উভয়ের কাজই শেষ পর্যন্ত মানুষের জন্য। মফস্বলের ধুলোমাখা পথ, নদীভাঙা জনপদ, উপকূলের ঝড়বিধ্বস্ত গ্রাম কিংবা কৃষকের ঘামে ভেজা মাঠÑএসব জায়গায় রাষ্ট্রের উপস্থিতি দৃশ্যমান হয় সরকারি কর্মকর্তার মাধ্যমে, আর সেই বাস্তবতার কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন সাংবাদিক। একজন কাজ করেন প্রশাসনের শক্তি নিয়ে, অন্যজন কাজ করেন কলমের শক্তি নিয়ে। কিন্তু উভয়ের লক্ষ্য যদি জনস্বার্থ হয়, তাহলে দ্বন্দ্বের নয়, সহযোগিতার সম্পর্কই হওয়া উচিত স্বাভাবিক।

 

আজ প্রয়োজন এমন একটি সংস্কৃতি, যেখানে সমালোচনাকে শত্রুতা হিসেবে দেখা হবে না, প্রশ্নকে অবাধ্যতা মনে করা হবে না এবং সংবাদকে ভয় পাওয়া হবে না। কারণ একটি স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও সাহসী গণমাধ্যম যেমন রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে, তেমনি দক্ষ, সৎ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনও গণতন্ত্রকে সুসংহত করে।জনগণের স্বার্থে, সুশাসনের স্বার্থে এবং একটি মানবিক রাষ্ট্র গঠনের স্বার্থে মফস্বল সাংবাদিক ও সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে দূরত্ব নয়, বরং আস্থা ও সহযোগিতার সেতুবন্ধন গড়ে উঠুক। সেটিই হবে গণতন্ত্রের জন্য শুভ, প্রশাসনের জন্য কল্যাণকর এবং সাধারণ মানুষের জন্য আশাব্যঞ্জক।

লেখক: সংবাদকর্মী