সাতক্ষীরার আম: প্রকৃতির আশীর্বাদ বনাম অবহেলার আখ্যান
আখলাকুর রহমান
গাছের কচি পাতার আড়ালে যখন বৈশাখের রোদ্দুর এসে পড়ে, তখন সাতক্ষীরার বাগানগুলোতে হলদেটে আভা দেখা দেয়। প্রকৃতি যেন একটু বেশিই সদয় এ অঞ্চলের প্রতি; ভৌগোলিক আশীর্বাদে দেশের অন্য সব অঞ্চলের আগেই এখানে আমের গায়ে সোনালী রঙ ধরে। কিন্তু এই রূপের আড়ালে যে গভীর এক বিষাদের গল্প লুকিয়ে আছে, তা ক’জন খবর রাখে? যখন রাজশাহী কিংবা সাপাহারের দিকে তাকাই, মনে হয় ওখানকার মানুষের ধমনীতে বুঝি রক্তের বদলে আমের রস বয়ে চলে। তাদের ধ্যান, জ্ঞান, ঘুম আর জাগরণ—সবকিছু আবর্তিত হয় ওই একটি ফলকে ঘিরেই। সন্তানের মতো প্রতিটি মুকুলের যতœ নেয় তারা, প্রতিটি আমের গায়ে লেগে থাকে পরম মমতার স্পর্শ। সেই তুলনায় আমাদের সাতক্ষীরার বাগানগুলোর দিকে তাকালে বুকটা হাহাকার করে ওঠে। এক অদ্ভুত উদাসীনতা যেন গ্রাস করেছে এ অঞ্চলের আম চাষীদের।
অথচ সাতক্ষীরার হিমসাগরের চেয়ে সুস্বাদু আম এ দেশে আর দ্বিতীয়টি আছে কি? ওই একটি আমের বোঁটা ছিঁড়লে যে সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়ায়, তার সঙ্গে পৃথিবীর কোনো সুগন্ধির তুলনা চলে না। চাঁপাইনবাবগঞ্জের খিরসাপাত কিংবা সাপাহারের আম্রপালি আমদুনিয়ায় নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছে সত্য, কিন্তু আমাদের হিমসাগরও তো স্বাদে-গন্ধে কোনো অংশে কম ছিল না। তবে কেন আজ সাতক্ষীরার আম নিয়ে এত অবহেলা? শুধু ভৌগোলিক কারণে আমাদের আম বাজারে আগে আসে বলেই কি চাষীদের সব দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়? বাজারে আগে নামানোর এক অন্ধ প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছেন তারা। গাছের গোড়ায় মাটির স্বাস্থ্য ফেরানো কিংবা
পরম যতেœ পোকা মাকড় তাড়ানোর চেয়ে, তাদের সমস্ত মনোযোগ গিয়ে ঠেকেছে হরমোন আর রাসায়নিক স্প্রে করার আধুনিক গোলকধাঁধায়।
কৃষিশাস্ত্রের নিয়মে হয়তো হরমোনের ব্যবহার আছে, কিন্তু মায়াহীন কৃত্রিমতায় কি আর ফলের আসল মাধুর্য বাঁচে? সরকার থেকে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, আধুনিক চাষাবাদের হরেক রকম উপকরণও পৌঁছে যাচ্ছে চাষীদের দুয়ারে। কিন্তু দিনশেষে সেই জ্ঞান আর খেরোখাতায় বন্দি উপাদানের কতটুকু আলো দেখছে মাঠপর্যায়ে? অধিকাংশ কৃষকই সেই পুরনো, সহজ অথচ ক্ষতিকর অভ্যাসের বৃত্ত থেকে বের হতে পারছেন না। সাতক্ষীরার আমের যে ঐতিহ্য, যে গৌরবময় ইতিহাস, তা এভাবে কেবল উদাসীনতার রাসায়নিকে ম্লান হয়ে যেতে পারে না। শুধু একটু মনোযোগ, একটুখানি গভীর ভালোবাসা আর বৈজ্ঞানিক যতেœর ছোঁয়া পেলেই কিন্তু সাতক্ষীরার আম আবার তার হারানো সিংহাসন ফিরে পেতে পারে। আমাদের চাষীরা যেদিন হরমোনের বোতল সরিয়ে রেখে মাটির সুধায় আমকে বড় করতে শিখবেন, সেদিনই সাতক্ষীরার হিমসাগর আবার স্বমহিমায় বাংলার সেরা আম হিসেবে সমাদৃত হবে।












