নদী ভাঙছে আশাশুনিতে: ভিটে হারিয়ে বাড়ছে প্রান্তিক মানুষের হাহাকার
আশাশুনি সংবাদদাতা: সাতক্ষীরার উপকূলীয় উপজেলা আশাশুনির ওপর দিয়ে বয়ে চলা কপোতাক্ষ, খোলপেটুয়া আর বেতনা নদীর করাল গ্রাসে মানচিত্র থেকে ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে জনপদ। একদিকে সর্বনাশা নদী ভাঙন, অন্যদিকে জোয়ারের লোনা পানিতে সয়লাব—এই দুই সংকটে পড়ে এখানকার মানুষের জীবন এখন বিপন্ন। ভাঙনের ফলে প্রতি বছর শত শত মানুষ ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী দারিদ্র্যের ছাপ ফেলছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার প্রতাপনগর, শ্রীউলা, আনুলিয়া, বড়দল ও খাজরা ইউনিয়নের অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়। ভাঙনের তীব্রতায় বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গ্রামীণ সড়ক ও ধর্মীয় উপাসনালয় এখন অস্তিত্ব সংকটে। কোথাও কোথাও বেড়িবাঁধ এতটাই সরু হয়ে পড়েছে যে, জোয়ারের সামান্য চাপেই তা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
প্রতাপনগর ইউনিয়নের বাসিন্দা আব্দুল মালেক আক্ষেপ করে বলেন, “বাপ-দাদার ভিটে সব নদী গিলে খেয়েছে। এখন অন্যের জমিতে আশ্রিত হয়ে আছি। বর্ষা এলে চোখের পাতা এক করতে পারি না।” নদী শুধু ঘরই ভাঙছে না, কেড়ে নিচ্ছে মানুষের কর্মসংস্থানও। কৃষিজমি নদীগর্ভে চলে যাওয়ায় এবং লোনা পানি ঢুকে আবাদি জমি নষ্ট হওয়ায় চাষিরা এখন দিশেহারা।
অনেক কৃষক এখন বাধ্য হয়ে দিনমজুরি বা শহরের বস্তিতে গিয়ে শ্রম বিক্রি করছেন। বেড়িবাঁধ চুইয়ে লোনা পানি ঢোকায় সুপেয় পানির সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। উপকূলীয় নারী ও শিশুদের জীবনে নেমে এসেছে চরম মানবিক বিপর্যয়।
শ্রীউলার গৃহবধূ রাশিদা খাতুন বলেন, “রাতে যখন নদী গর্জন করে, তখন সন্তানদের নিয়ে খাটের ওপর বসে থাকি। মনে হয় এই বুঝি সব ভেসে গেল।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাঙন দেখা দিলে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) নামমাত্র বালুর বস্তা বা ‘জিও ব্যাগ’ ফেলে দায় সারে। কিন্তু টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদী কোনো সমাধান আজও মেলেনি।
পরিবেশবিদদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও নদ-নদীর নাব্যতা হ্রাস পাওয়া এই দুর্যোগের অন্যতম কারণ। তারা বলছেন, কেবল বাঁধ নির্মাণ নয়, বরং নদী শাসন ও নিয়মিত খনন ছাড়া এই জনপদ রক্ষা করা সম্ভব নয়।
আশাশুনি উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে কিছু এলাকায় জরুরি মেরামতের কাজ চলছে। তবে স্থায়ী সমাধানের জন্য একটি মেগা প্রকল্প প্রস্তাব আকারে পাঠানো হয়েছে। সেটি অনুমোদিত হলে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হবে। উপকূলীয় এই জনপদকে বিলীন হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে হলে এখনই কার্যকর ও টেকসই উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট সবাই।










