বাহলুল আলম
বাংলাদেশে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেবল একটি পরিচ্ছন্নতা বিষয়ক সমস্যা নয়; এটি একটি গভীর পরিবেশগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটে পরিণত হয়েছে। দ্রুত নগরায়ন, শিল্পায়ন, অতিরিক্ত ভোগবাদ এবং ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার ফলে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে। এসব বর্জ্য যদি যথাযথভাবে সংগ্রহ, পৃথকীকরণ, পুনঃব্যবহার ও ব্যবস্থাপনা করা না হয়, তবে তা পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য এবং অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশে বর্জ্য সমস্যা দিন দিন আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। বিশেষ করে প্লাস্টিক বর্জ্য, হাসপাতাল বর্জ্য, ই-বর্জ্য এবং শিল্প বর্জ্য বর্তমানে বড় ধরনের পরিবেশগত হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। শহর ও গ্রামে অপরিকল্পিতভাবে বর্জ্য ফেলার কারণে নদী-খাল ভরাট হচ্ছে, ড্রেনেজ ব্যবস্থা নষ্ট হচ্ছে এবং জলাবদ্ধতা ও বন্যার ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বর্জ্য বলতে এমন সব অপ্রয়োজনীয় বা ব্যবহারের অযোগ্য পদার্থকে বোঝায়, যা মানুষ দৈনন্দিন জীবন, কৃষি, চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা কিংবা শিল্পকারখানার কার্যক্রম থেকে ফেলে দেয়। এই বর্জ্য যখন সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা হয় না, তখন তা পরিবেশ দূষণ সৃষ্টি করে, রোগব্যাধি ছড়ায়, জলবায়ু পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করে এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান কমিয়ে দেয়।
বর্জ্যের বিভিন্ন ধরন রয়েছে। জৈব বর্জ্যের মধ্যে রয়েছে খাদ্যের উচ্ছিষ্ট, শাকসবজির খোসা, গাছের পাতা ও কৃষিজ বর্জ্য, যা প্রাকৃতিকভাবে পচে যায় এবং কম্পোস্ট সার তৈরিতে ব্যবহার করা সম্ভব। অন্যদিকে প্লাস্টিক বর্জ্য পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর, কারণ এটি সহজে নষ্ট হয় না এবং দীর্ঘদিন মাটি, নদী ও সমুদ্রে থেকে যায়। প্লাস্টিক বোতল, পলিথিন ব্যাগ, চিপসের প্যাকেট ও প্লাস্টিক কাপ এর সাধারণ উদাহরণ। এছাড়া কাগজজাত বর্জ্য, ধাতু ও কাঁচের বর্জ্য পুনর্ব্যবহারযোগ্য হলেও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে এগুলোও দূষণের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিপজ্জনক বর্জ্যের মধ্যে ব্যাটারি, হাসপাতালের বর্জ্য, রাসায়নিক পদার্থ, ই-বর্জ্য ও কীটনাশক অন্তর্ভুক্ত, যা মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে পরিবেশ দূষণ মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অপরিকল্পিতভাবে বর্জ্য ফেলার ফলে বাতাস, পানি ও মাটি দূষিত হচ্ছে। নদী ও খালে বর্জ্য জমে জলপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং কৃষিজমির উর্বরতা কমে যাচ্ছে। একইসঙ্গে অপরিষ্কার বর্জ্য থেকে রোগজীবাণুর জন্ম হচ্ছে, যার ফলে ডায়রিয়া, ডেঙ্গু, চর্মরোগ, হাঁপানি ও শ্বাসকষ্টের মতো রোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বর্জ্য জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ল্যান্ডফিলে জমা জৈব বর্জ্য থেকে মিথেন গ্যাস নির্গত হয়, যা কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস। এছাড়া প্লাস্টিক ও রাসায়নিক বর্জ্য জলজ ও স্থলজ জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। অনেক প্রাণী প্লাস্টিক খেয়ে মারা যায় এবং সামুদ্রিক পরিবেশ ধ্বংসের মুখে পড়ে।
এই সংকট মোকাবিলায় বিশ্বব্যাপী ৫জ নীতিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে- জবভঁংব, জবফঁপব, জবঁংব, জবপুপষব এবং জড়ঃ/ঈড়সঢ়ড়ংঃ। অপ্রয়োজনীয় ও একবার ব্যবহারযোগ্য পণ্য প্রত্যাখ্যান করা, প্রয়োজন অনুযায়ী কম ব্যবহার করা, একই পণ্য পুনঃব্যবহার করা, পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য আলাদা করে রিসাইক্লিং করা এবং জৈব বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট তৈরি করা। এই নীতিগুলো টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মূল ভিত্তি।
ব্যক্তি পর্যায়ে আমরা ডাস্টবিন ব্যবহার, প্লাস্টিক কম ব্যবহার, বর্জ্য আলাদা করা এবং সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারি। পরিবার পর্যায়ে কম্পোস্ট তৈরি ও পুনঃব্যবহারযোগ্য পণ্য ব্যবহার করা যেতে পারে। শিল্প ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থা চালু করতে হবে এবং বর্জ্য শোধনাগার স্থাপন করতে হবে। অন্যদিকে সরকারের দায়িত্ব হলো কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতি বাস্তবায়ন, কঠোর পরিবেশ আইন প্রয়োগ এবং রিসাইক্লিং শিল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সাথেও সরাসরি সম্পর্কিত। সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে সহায়তা করে (এসডিজি-৩), পানি দূষণ কমিয়ে বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করে এসডিজি-৬, পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য শহর গঠনে ভূমিকা রাখে এসডিজি-১১, দায়িত্বশীল ভোগ ও উৎপাদন নিশ্চিত করে এসডিজি-১২, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমায় এসডিজি-১৩ এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সহায়তা করে (এসডিজি-১৪-১৫)।
বাংলাদেশে পরিবেশ সংরক্ষণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা রয়েছে। ১৯৯৫ সালের বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও শিল্প বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ভিত্তি স্থাপন করেছে। পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ১৯৯৭ শিল্প ও প্রকল্পভিত্তিক পরিবেশগত মানদ- নির্ধারণ করেছে। এছাড়া কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, পলিথিন শপিং ব্যাগ নিষিদ্ধকরণ এবং মেডিকেল ও ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতিমালাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
সবশেষে বলা যায়, বর্জ্য শুধু ময়লা নয়; এটি একটি গভীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সংকট। এই সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন জনসচেতনতা, আধুনিক প্রযুক্তি, কার্যকর আইন বাস্তবায়ন এবং সর্বস্তরের মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ। আমাদের প্রত্যেকের ছোট ছোট উদ্যোগই একটি পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারে। আমাদের পৃথিবী কোনো আবর্জনার ভাগাড় নয়Ñএটাই আমাদের একমাত্র বাসস্থান। আসুন, আমরা একে রক্ষা করি।