শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪ আশ্বিন ১৪৩৩
শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪ আশ্বিন ১৪৩৩

নির্বাচনী ইশতেহার জনগণের সঙ্গে একটি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তি: অনিন্দ্য ইসলাম অমিত

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:২৫ অপরাহ্ণ
নির্বাচনী ইশতেহার জনগণের সঙ্গে একটি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তি: অনিন্দ্য ইসলাম অমিত

যশোর জেলা তথ্য অফিসের আয়োজনে প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত অগ্রাধিকার কর্মসূচিসহ সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে উঠান বৈঠক আজ (শুক্রবার) বিকালে যশোর সদর উপজেলার চাঁচড়া ইউনিয়নের নদীয়ার মোড় বর্মনপাড়ায় অনুষ্ঠিত হয়। উঠান বৈঠকে প্রধান অতিথি ছিলেন বিদ্যুৎ, জ¦ালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর। দেশের অস্বচ্ছল প্রতিটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। কৃষকদের জন্য কৃষি কার্ডের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী ১০ হাজার টাকা করে কৃষিঋণ মওকুফ করেছে। তিনি বলেন, নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মসজিদের ইমাম ও মন্দিরের পুরোহিতদের ভাতার আওতায় আনার কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময় শুরু হওয়া খালকাটা কর্মসূচি বর্তমান সরকার পুনরায় চালু করেছে।

তিনি আরও বলেন, নির্বিচারে বনভূমি উজাড়ের ফলে দেশের পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছের চারা রোপণের মাধ্যমে ব্যাপক বনায়ন সৃষ্টির উদ্যোগ নিয়েছে। বিএনপি মনে করে, নির্বাচনী ইশতেহার শুধু রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির দলিল নয়; এটি জনগণের সঙ্গে একটি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তি। তাই ইশতেহারে দেওয়া প্রতিটি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা আমাদের দায়িত্ব এবং তা পালনে আমরা বাধ্য।

যশোর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহরিয়ার হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন যশোর জেলা পরিষদের প্রশাসক দেলোয়ার হোসেন খোকন, জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাড. সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু, চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মিজানুর রহমান খান, জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক রবিউল ইসলাম ও সদর উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যাপক আবদার খান। স্বাগত বক্তব্য রাখেন যশোর জেলা তথ্য অফিসের সিনিয়র তথ্য অফিসার মো: রেজাউল করিম। তথ্যবিবরণী

Ads small one

সম্পাদকীয়/ বসতি ও কৃষিজমিতে লবণাক্ততার থাবা: চাই পরিকল্পিত ও টেকসই রূপরেখা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:৩১ অপরাহ্ণ
সম্পাদকীয়/ বসতি ও কৃষিজমিতে লবণাক্ততার থাবা: চাই পরিকল্পিত ও টেকসই রূপরেখা

উপকূলীয় অঞ্চল পাইকগাছায় অব্যাহত লবণাক্ত পানির অনাকাক্সিক্ষত অনুপ্রবেশ কেবল কৃষিজমির উর্বরতাই নষ্ট করছে না, বরং বসতি এলাকা, সুপেয় পানির উৎস ও সামগ্রিক জনজীবনকে এক দীর্ঘমেয়াদি মানবিক ও পরিবেশগত সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট এই দুর্যোগ প্রতিরোধ এবং টেকসই সমাধানের লক্ষ্যে ১৭ সেপ্টেম্বর পাইকগাছা পৌর সদরে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকটি অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ।

উপকূলীয় এলাকাগুলোতে অপরিকল্পিত নোনা পানির চিংড়ি চাষ, বাঁধ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বসতি ও ফসলি জমিতে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করছে। ফলে একসময় যেখানে সোনালি ধান ও বৈচিত্র্যময় শাকসবজির ফলন হতো, আজ সেখানে মাটি ও পানি চরম লবণাক্ত হয়ে অনুৎপাদনশীল হয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতি শুধু কৃষক ও সাধারণ মানুষের জীবিকাকেই হুমকির মুখে ফেলেনি, বরং খাদ্য নিরাপত্তা ও সুপেয় পানির সংকটকে ত্বরান্বিত করে মানুষকে বাধ্য করছে ভিটেমাটি ছেড়ে বাস্তুচ্যুত হতে।

গোলটেবিল বৈঠকে প্রশাসনের প্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা, সুশীল সমাজ ও পরিবেশকর্মীরা যে বাস্তবসম্মত সমাধানের ওপর জোর দিয়েছেন, তা দ্রুত বাস্তবায়নে নজর দেওয়া প্রয়োজন। বসতি ও কৃষিজমি রক্ষায় প্রধান শর্ত হলো পরিকল্পিত ওয়াটার জোন তৈরি করাÑকোথায় নোনা পানির ঘের থাকবে এবং কোথায় কৃষিজমি ও বসতি সংরক্ষিত থাকবে, তা কঠোরভাবে নির্দিষ্ট করে দেওয়া দরকার। পাশাপাশি, উপকূলীয় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ, স্লুইসগেটগুলোর সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং বর্ষার পানি ধরে রাখার জলাধার সংস্কার নিশ্চিত করা জরুরি।

লবণাক্ততার বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ে কেবল সরকারি নীতি বা এনজিও উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিকূল পরিবেশের উপযোগী লবণাক্ততাসহিষ্ণু ফসলের জাত সম্প্রসারণেও কার্যকর ভূমিকা নেওয়া আবশ্যক। লবণাক্ততার অভিশাপ থেকে মুক্ত করে কৃষি ও পরিবেশের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে নীতিপ্রণেতাদের এখন দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের বিকল্প নেই।

গুড়পুকুর মেলা ফিরবে কবে-নাকি ইতিহাসের পাতাতেই থাকবে?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:২৪ অপরাহ্ণ
গুড়পুকুর মেলা ফিরবে কবে-নাকি ইতিহাসের পাতাতেই থাকবে?

মিলন বিশ্বাস

একটি মেলা কি শুধু কয়েক দিনের দোকানপাট, নাগরদোলা আর মানুষের ভিড়? একটি মেলা কি কেবল কেনাবেচার জায়গা? নাকি একটি মেলা হয়ে উঠতে পারে একটি জনপদের স্মৃতি, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও মানুষের মিলনের প্রতিচ্ছবি?
সাতক্ষীরার মানুষকে যদি এই প্রশ্ন করা হয়, তাহলে গুড়পুকুর মেলার কথা নিশ্চয়ই সামনে আসবে।

শুক্রবার পলাশপোলের গুড়পুকুরপাড়ে মনসা পূজা হয়েছে। সেখানে গিয়ে দেখা গেলÑভক্তরা আসছেন, পূজা দিচ্ছেন, প্রার্থনা করছেন। পূজার আনুষ্ঠানিকতা আছে, মানুষের উপস্থিতি আছেÑকিন্তু নেই সেই চেনা মেলার কোলাহল। নেই দূর-দূরান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ীদের সারি। নেই শিশুদের উচ্ছ্বাস, নেই সেই বিশাল লোকসমাগম। তাহলে কি গুড়পুকুর মেলার গল্প শেষ হয়ে যাচ্ছে? যে মেলা ছিল সাতক্ষীরার পরিচয়ের অংশ সাতক্ষীরার গুড়পুকুর মেলার উৎপত্তি নিয়ে রয়েছে নানা ইতিহাস ও জনশ্রুতি। এর সঠিক বয়স নিয়ে মতভেদ থাকলেও স্থানীয় ইতিহাসে মেলাটিকে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মনসা পূজাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই আয়োজন একসময় ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার গ-ি পেরিয়ে পরিণত হয়েছিল বৃহৎ সামাজিক ও বাণিজ্যিক মিলনমেলায়। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যবসায়ীরা আসতেন। বসত নানা ধরনের দোকান। মাটির সামগ্রী, বাঁশ-বেতের তৈরি পণ্য, খেলনা, গৃহস্থালির সামগ্রী, মিষ্টি, গাছের চারাÑকী ছিল না সেখানে!

মেলার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও কারুশিল্পীরা। সাধারণ মানুষের জন্য এটি ছিল কেনাকাটার জায়গা, শিশুদের জন্য আনন্দের জায়গা, আর সাতক্ষীরার মানুষের জন্য ছিল এক ধরনের বার্ষিক উৎসব। ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে যার সূচনা, সময়ের সঙ্গে সেটি হয়ে উঠেছিল মানুষে মানুষে মিলনের এক অসাম্প্রদায়িক লোকজ আয়োজন।

এক ভয়াবহ ঘটনায় থমকে যায় ঐতিহ্য
কিন্তু গুড়পুকুরের সেই উৎসবের পথ সবসময় মসৃণ ছিল না। ২০০২ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরা শহরের দুটি স্থানে বোমা হামলার ভয়াবহ ঘটনায় তিনজন নিহত এবং শতাধিক মানুষ আহত হন। সেই ঘটনার পর দীর্ঘ সময়ের জন্য গুড়পুকুর মেলার আয়োজন বন্ধ হয়ে যায়। পরে মানুষের দাবির মুখে আবারও মেলা শুরু হয়। কিন্তু আগের সেই বিশালতা আর পুরোপুরি ফিরে আসেনি। একটি ভয়াবহ ঘটনা একটি মেলার আয়োজন থামিয়ে দিতে পারেÑকিন্তু একটি ঐতিহ্যকে কি চিরদিনের জন্য থামিয়ে দেওয়া যায়?

সময় বদলেছে, মেলাও বদলাতে পারে
নিরাপত্তার বাস্তবতা বদলেছে। মানুষের বিনোদনের ধরন বদলেছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের ধরন বদলেছে। শহরও আগের মতো নেই। তাই বলে কি ঐতিহ্যও হারিয়ে যাবে? আমার মনে হয়, ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে তাকে সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। আগের মতো এক মাসব্যাপী বিশাল মেলা হয়তো এখন বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু সীমিত সময়ের, পরিকল্পিত ও নিরাপদ একটি মেলা কি আয়োজন করা যায় না? নির্দিষ্ট স্থান, নির্দিষ্ট সময়, নির্দিষ্ট সংখ্যক দোকান, কঠোর নিরাপত্তা, সিসিটিভি, অগ্নিনিরাপত্তা, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনের সার্বক্ষণিক নজরদারির মাধ্যমে একটি আধুনিক গুড়পুকুর মেলা আয়োজন করা সম্ভব কি নাÑসেটি ভেবে দেখা যেতে পারে।

মেলা বন্ধ হলে শুধু ব্যবসা বন্ধ হয় না
মেলা বন্ধ হলে কয়েকটি দোকান কম বসবেÑবিষয়টি এতটুকু নয়। মেলা বন্ধ হলে হারিয়ে যায় লোকজ সংস্কৃতির একটি মঞ্চ। হারিয়ে যায় স্থানীয় কারুশিল্পীর বাজার। হারিয়ে যায় ছোট ব্যবসায়ীর একটি মৌসুমি আয়ের সুযোগ। হারিয়ে যায় শিশুদের শৈশবের কিছু স্মৃতি। আর সবচেয়ে বড় কথাÑএকটি প্রজন্মের সঙ্গে পরবর্তী প্রজন্মের সাংস্কৃতিক যোগসূত্রটি দুর্বল হয়ে যায়।
আজকের শিশুটি যদি গুড়পুকুর মেলা না দেখে বড় হয়, আগামী প্রজন্মের কাছে গুড়পুকুর মেলা হয়তো শুধুই একটি পুরোনো গল্প হয়ে থাকবে।

প্রশাসনের কাছে একটি প্রশ্ন
প্রশাসনের দায়িত্ব শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষা নয়; একটি এলাকার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণেও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
তাই প্রশ্নটি অভিযোগের নয়, বরং বিবেচনারÑ সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী গুড়পুকুর মেলাকে কি নতুন আঙ্গিকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া যায় না? মেলা আয়োজনের ক্ষেত্রে যদি নিরাপত্তা বড় বিষয় হয়, তাহলে নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই আয়োজনের পরিকল্পনা করা হোক। যদি বড় পরিসর সমস্যা হয়, ছোট পরিসরে শুরু হোক। যদি দীর্ঘ সময়ের আয়োজন সম্ভব না হয়, কয়েক দিনের আয়োজন হোক। যদি পুরোনো মেলার সব আয়োজন ফিরিয়ে আনা সম্ভব না হয়, অন্তত ঐতিহ্যের মূল ধারাটুকু ফিরিয়ে আনা হোক। কারণ ঐতিহ্য সংরক্ষণ মানে অতীতকে হুবহু ফিরিয়ে আনা নয়; বরং অতীতের মূল্যবান অংশকে বর্তমানের সঙ্গে যুক্ত করে ভবিষ্যতের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

গুড়পুকুর শুধু পুকুরের নাম নয়
গুড়পুকুর আজ একটি জায়গার নাম। কিন্তু সাতক্ষীরার বহু মানুষের কাছে এটি তার চেয়েও বেশি কিছু। এটি শৈশবের স্মৃতি। এটি উৎসবের স্মৃতি। এটি পরিবারের সঙ্গে মেলায় যাওয়ার স্মৃতি। এটি দোকান সাজিয়ে বসা ব্যবসায়ীর স্মৃতি। এটি দূর গ্রাম থেকে আসা মানুষের স্মৃতি। এটি সাতক্ষীরার একটি সময়ের স্মৃতি। একটি পুকুর হয়তো ভরাট হয়ে যেতে পারে। একটি মাঠ হয়তো হারিয়ে যেতে পারে। একটি মেলাও হয়তো বন্ধ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু একটি জনপদের মানুষের স্মৃতি থেকে সেই ঐতিহ্যকে মুছে ফেলা যায় না।

ইতিহাসের কাছে আমাদের দায়
আমরা উন্নত শহর চাই। আধুনিক অবকাঠামো চাই। নিরাপদ নগর চাই। উন্নত বিনোদন চাই। কিন্তু উন্নয়নের পথে হাঁটতে গিয়ে যদি নিজেদের শিকড়টিই ভুলে যাই, তাহলে সেই উন্নয়নের সঙ্গে আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সম্পর্ক কোথায় থাকবে? সাতক্ষীরার অনেক ঐতিহ্য ইতিমধ্যে হারিয়ে গেছে বা হারিয়ে যাওয়ার পথে। গুড়পুকুর মেলাও যদি ধীরে ধীরে স্মৃতির পাতায় চলে যায়, তাহলে হয়তো একদিন আমরা আফসোস করবÑ “একসময় এখানে গুড়পুকুর মেলা বসত।” সেই আফসোস করার দিন আসার আগেই কি আমরা কিছু করতে পারি না?

প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, মন্দির কমিটি, ব্যবসায়ী সমাজ, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও নাগরিক সমাজÑসব পক্ষের সমন্বয়ে একটি নিরাপদ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ গুড়পুকুর মেলার সম্ভাবনা নতুন করে বিবেচনা করা যেতে পারে। কারণ এটি কোনো একক সম্প্রদায়ের বিষয় হিসেবে না দেখে সাতক্ষীরার সামগ্রিক লোকজ ঐতিহ্য হিসেবে দেখার সুযোগ রয়েছে। আজ মনসা পূজার দিনে গুড়পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে তাই একটি প্রশ্নই বারবার মনে আসেÑ গুড়পুকুর মেলার কোলাহল কি আবার ফিরবে? নাকি আগামী প্রজন্মকে আমরা শুধু ছবি দেখিয়ে বলবÑ “এই জায়গাতেই একসময় সাতক্ষীরার বিখ্যাত গুড়পুকুর মেলা বসতৃ” সিদ্ধান্ত আজকের মানুষের।

তবে ইতিহাস আমাদের কাছে একটি প্রশ্ন রেখে যায়Ñ একটি ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার পর তাকে স্মরণ করার চেয়ে, বেঁচে থাকতেই তাকে সংরক্ষণ করা কি বেশি জরুরি নয়?

(এটা লেখকের নিজস্ব মন্তব্য)। লেখক: সংবাদদকর্মী

সাতক্ষীরার চরাঞ্চলে শিক্ষা বঞ্চনার বহুমাত্রিক সংকট

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:২১ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরার চরাঞ্চলে শিক্ষা বঞ্চনার বহুমাত্রিক সংকট

মো. মামুন হাসান

একজন শিক্ষক হিসেবে যখন সাতক্ষীরার প্রত্যন্ত চরাঞ্চলের দিকে তাকাই, তখন প্রথমেই যে দৃশ্যটি চোখে ভাসে, তা হলো ভোরবেলা নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন শিশু, যাদের হাতে বই-খাতা, অথচ চোখে অনিশ্চয়তা। নৌকা আসবে কি না, নদী শান্ত থাকবে কি না, বাঁধ ভেঙে যাওয়া পথ পার হওয়া যাবে কি না এই প্রশ্নগুলো তাদের কাছে প্রতিদিনের বাস্তবতা। একজন শিক্ষকের কাজ শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দেওয়া নয়, বরং শিক্ষার্থীর সামগ্রিক পরিস্থিতি বোঝা এবং তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা। শ্যামনগর, গাবুরা, পদ্মপুকুর বা কৈখালীর মতো এলাকায় গেলে বোঝা যায়, শিক্ষা এখানে কেবল একটি অধিকার নয়, বরং প্রতিদিনের এক সংগ্রাম।

আমি যে প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করি, সেখানে কারিগরি শিক্ষা নিয়ে কাজ করার সুযোগ হয়। এই কাজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, একজন শিক্ষক হিসেবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো শিক্ষার্থীকে ধরে রাখা। শহরাঞ্চলে যেখানে ঝরে পড়ার হার তুলনামূলক কম, চরাঞ্চলে তা ভয়াবহ রকম বেশি। একজন শিক্ষার্থী সপ্তাহের তিন দিন আসে, দুই দিন আসে না কারণ পরিবারের সঙ্গে ঘেরে কাজ করতে হয়, অথবা ছোট ভাইবোনকে দেখে রাখতে হয়, অথবা নদী পার হওয়ার নৌকা পাওয়া যায়নি। শিক্ষক হিসেবে এই অনুপস্থিতিকে শুধু হাজিরার খাতায় দাগ কেটে রাখা যায় না; বুঝতে হয় এর পেছনের জীবনসংগ্রাম।

শিক্ষকতার পেশায় থেকে আরেকটি বাস্তবতা প্রতিনিয়ত সামনে আসে শিক্ষকরা নিজেই এই এলাকায় থাকতে চান না। প্রত্যন্ত চরে নিয়োগ পাওয়া অনেক সহকর্মী প্রথম সুযোগেই বদলির চেষ্টা করেন। এর পেছনে যুক্তিও আছে। বিদ্যুৎ নেই, বিশুদ্ধ পানি নেই, চিকিৎসাসেবা নেই বললেই চলে, সন্তানের জন্য ভালো স্কুলও নেই। একজন শিক্ষক যখন নিজের পরিবারের নিরাপত্তা আর সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে দ্বিধায় থাকেন, তখন তার কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদী প্রতিশ্রুতি আশা করা কঠিন। ফলে একটি বিদ্যালয়ে বছরের পর বছর শিক্ষক পরিবর্তন হতেই থাকে, আর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিক্ষার্থী, যাদের শেখার ধারাবাহিকতা বারবার ব্যাহত হয়।

তবে এই সংকটের মধ্যেও যে জিনিসটি আমাকে সবচেয়ে বেশি ভাবায়, তা হলো শিক্ষার সঙ্গে জীবিকার সংযোগহীনতা। একজন শিক্ষক পাঠ্যবই থেকে যা শেখান, তার সঙ্গে শিক্ষার্থীর বাস্তব জীবনের কোনো মিল থাকে না। একটি শিশু জানে কীভাবে চিংড়ির ঘের দেখাশোনা করতে হয়, কীভাবে সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ করতে হয়, অথচ বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে এসবের কোনো প্রতিফলন নেই। কারিগরি শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার কারণে আমি বিশ্বাস করি, যদি স্থানীয় বাস্তবতা ও জীবিকার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দক্ষতা প্রশিক্ষণ পাঠ্যক্রমে যুক্ত করা যায়, তাহলে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বাড়বে। সুন্দরবন-সংলগ্ন এই অঞ্চলে পর্যটন ও হসপিটালিটি বিষয়ক প্রাথমিক দক্ষতা প্রশিক্ষণ, নৌকা পরিচালনা, প্রাকৃতিক গাইডিং, স্থানীয় হস্তশিল্পের মতো বিষয়গুলো যদি শিক্ষার সঙ্গে সংযুক্ত করা যায়, তাহলে অভিভাবকরাও সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠাতে আগ্রহী হবেন, কারণ তারা দেখবেন শিক্ষা সরাসরি জীবিকার সঙ্গে সম্পর্কিত।

একজন শিক্ষকের দৃষ্টিকোণ থেকে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয় শ্রেণিকক্ষের বাইরে শিক্ষার্থীর মানসিক অবস্থা। ঘূর্ণিঝড়, নদী ভাঙন, লবণাক্ততার কারণে ফসল নষ্ট হওয়া এসব ঘটনা শিশুর মনে গভীর প্রভাব ফেলে। আয়লা বা আম্ফানের পর যে শিক্ষার্থীরা ঘরবাড়ি হারিয়েছে, তাদের কাছে পাঠ্যবইয়ের অক্ষরের চেয়ে বেঁচে থাকার লড়াই বড় হয়ে দাঁড়ায়। একজন শিক্ষক তখন কেবল শিক্ষক থাকেন না, হয়ে ওঠেন মানসিক সহায়তার একজন সঙ্গীও। কিন্তু এই বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ বা সহায়তা প্রায় নেই বললেই চলে।

তারপরও আশার জায়গা আছে। কিছু এলাকায় ভাসমান স্কুল বা নৌকাভিত্তিক শিক্ষা প্রকল্প শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এই উদ্যোগগুলো প্রমাণ করে, সদিচ্ছা থাকলে ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করা সম্ভব। একজন শিক্ষক হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, শুধু অবকাঠামো তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন শিক্ষকদের জন্য উপযুক্ত প্রণোদনা, প্রত্যন্ত এলাকায় কাজের জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধা এবং দীর্ঘমেয়াদী পদায়নের নিশ্চয়তা। একজন শিক্ষক যদি নিরাপদ থাকার নিশ্চয়তা পান, তাহলে তিনিও দীর্ঘমেয়াদী অঙ্গীকার নিয়ে কাজ করতে পারবেন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিক্ষাকে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সংযুক্ত করা। সাতক্ষীরার চরাঞ্চলের শিশুরা প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে বড় হয়। তাদের এই অভিজ্ঞতাকে শিক্ষার অংশ করে তোলা গেলে, শিক্ষা আর দূরের কোনো বিষয় থাকবে না, হয়ে উঠবে জীবনের অংশ। একজন শিক্ষক হিসেবে আমার বিশ্বাস, এই সংযোগ তৈরি করতে পারলেই চরাঞ্চলের শিশুদের কাছে শিক্ষার আলো সত্যিকার অর্থে পৌঁছাবে। তা না হলে প্রতিটি নতুন বর্ষা, প্রতিটি নতুন জলোচ্ছ্বাস এই শিশুদের স্বপ্নকেও একইসঙ্গে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে, এবং আমরা শিক্ষকরা কেবল দূর থেকে তা দেখে যাব।

লেখক: ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট