বাল্যবিবাহ প্রসঙ্গে দুটি কথা
আজহারুল ইসলাম সাদী
বাংলাদেশের বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ অনুযায়ী, বিবাহের ক্ষেত্রে ১৮ বছর পূর্ণ হয়নি এমন নারী এবং ২১ বছর পূর্ণ হয়নি এমন পুরুষ অপ্রাপ্তবয়স্ক। বিয়ের কোনো এক পক্ষ বা উভয় পক্ষ অপ্রাপ্তবয়স্ক হলে তা বাল্যবিবাহ হিসেবে গণ্য হয়।
বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ একটি দীর্ঘদিনের সামাজিক সমস্যা। দারিদ্র্য, সামাজিক কুসংস্কার, যৌতুক, নিরাপত্তাহীনতা, সামাজিক চাপ ও শিক্ষার অভাব এর অন্যতম কারণ। এসব কারণে অনেক পরিবার অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেয়। কখনো আর্থিক অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি কিংবা ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার কথা ভেবে পরিবার এমন সিদ্ধান্ত নেয়। আবার সামাজিক প্রথা ও কুসংস্কারের কারণে কম বয়সে বিয়েকে স্বাভাবিক বলেও মনে করা হয়।
নিরাপত্তাহীনতা ও সামাজিক চাপও বাল্যবিবাহের অন্যতম কারণ। ইভটিজিং বা হয়রানির আশঙ্কায় অনেক পরিবার মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ করে বিয়ের ব্যবস্থা করে। ফলে শিক্ষাজীবন অসমাপ্ত থেকে যায় এবং মেয়েদের স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ সংকুচিত হয়।
বাল্যবিবাহের ক্ষতিকর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। অল্প বয়সে গর্ভধারণের ফলে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে। মাতৃস্বাস্থ্য ও পুষ্টির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে; প্রসবকালীন জটিলতার আশঙ্কাও বেড়ে যায়। পাশাপাশি অপ্রাপ্তবয়স্ক বয়সে বিয়ের ফলে শিক্ষা, মানসিক বিকাশ ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জনের সুযোগ বাধাগ্রস্ত হয়। অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক কলহ ও নির্যাতনের ঝুঁকিও তৈরি হয়।
বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে বাংলাদেশে আইন রয়েছে। বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ অনুযায়ী, কোনো প্রাপ্তবয়স্ক নারী বা পুরুষ বাল্যবিবাহ করলে অনধিক দুই বছরের কারাদণ্ড অথবা এক লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ড হতে পারে। অপ্রাপ্তবয়স্কের বিয়েতে সহায়তা বা অনুমতি দেওয়া অভিভাবক এবং বাল্যবিবাহ সম্পাদনকারী ব্যক্তির জন্যও শাস্তির বিধান রয়েছে। বাল্যবিবাহ নিবন্ধন করলে বিবাহ নিবন্ধকের শাস্তি এবং তাঁর লাইসেন্স বা নিয়োগ বাতিলের বিধানও আইনে উল্লেখ আছে।
আইনের ১৪ ধারায় বাল্যবিবাহ-সংক্রান্ত অপরাধকে আমলযোগ্য, জামিনযোগ্য ও আপস-অযোগ্য বলা হয়েছে। আর ১৭ ধারায় মোবাইল কোর্ট আইনের তফসিলভুক্ত হওয়া সাপেক্ষে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে দণ্ড দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
কোনো বাল্যবিবাহের আয়োজন বা এমন বিয়ের খবর পাওয়া গেলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিরা আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারেন। বিয়ে সম্পন্ন হয়ে যাওয়ার পরও অভিযোগের ভিত্তিতে ঘটনার সত্যতা যাচাই ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকে। বয়স যাচাইয়ের ক্ষেত্রে জন্মনিবন্ধন সনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ ও পাসপোর্ট আইনে স্বীকৃত দলিল।
তবে বাল্যবিবাহ সম্পন্ন হলেই বিয়েটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়—এমন ধারণা সঠিক নয়। আইনটির মূল উদ্দেশ্য বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, সংশ্লিষ্ট অপরাধের বিচার এবং অপ্রাপ্তবয়স্কের স্বার্থ ও নিরাপত্তা রক্ষা করা। আইনের ১৯ ধারায় বিশেষ পরিস্থিতিতে অপ্রাপ্তবয়স্কের সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনায় আদালতের নির্দেশ, অভিভাবকের সম্মতি ও বিধিতে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণের মাধ্যমে বিয়ের একটি ব্যতিক্রমী বিধান রাখা হয়েছে। তবে এটি সাধারণভাবে কম বয়সে বিয়ের অনুমোদন নয়।
আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও গণমাধ্যমকে একযোগে কাজ করতে হবে। মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা, নিরাপদ পরিবেশ তৈরি, দারিদ্র্য কমানো এবং সামাজিক কুসংস্কার দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে বাল্যবিবাহের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে পরিবার ও সমাজকে সচেতন করতে হবে।
বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে শুধু আইন প্রয়োগ করলেই হবে না; প্রয়োজন সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। অপ্রাপ্তবয়স্কদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক বিকাশের অধিকার নিশ্চিত করতে পরিবার ও সমাজকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। তাই আসুন, বাল্যবিবাহকে না বলি এবং শিশুর সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে সম্মিলিতভাবে কাজ করি।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। পত্রদূত অনলাইন এবং পত্রদূত- এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)












