সচ্চিদানন্দ দে সদয়
মানুষ নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী মনে করে। জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সভ্যতার অগ্রগতি তার সেই দাবিকে অনেকটাই প্রতিষ্ঠিত করেছে। মানুষ মহাকাশে পৌঁছেছে, সমুদ্রের গভীরতা মেপেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি করেছে। কিন্তু এত অর্জনের পরও একটি প্রশ্ন থেকেই যায়Ñনিজেকে বোঝার ক্ষেত্রে মানুষ কতটা এগিয়েছে?আমরা জানি কোনটি ভালো, কোনটি মন্দ। জানি সত্য বলা উচিত, অন্যায় করা উচিত নয়। জানি কাউকে অপমান করা ঠিক নয়, দুর্বল মানুষের সুযোগ নেওয়া অন্যায়। তারপরও বাস্তব জীবনে আমরা প্রায়ই জেনেশুনে তার বিপরীত কাজ করি। এখানেই মানুষের সবচেয়ে বড় স্ববিরোধিতা।অন্যের নিন্দা করার সময় আমরা প্রায়ই ভুলে যাই, যার সমালোচনা করছি তিনিও একজন মানুষ। তারও অনুভূতি আছে, সম্মান আছে, দুর্বলতা আছে। অথচ তার অনুপস্থিতিতে তাকে নিয়ে কথা বলতে আমাদের অনেকেরই দ্বিধা হয় না। সামনে প্রশংসা, পেছনে সমালোচনাÑএই দ্বৈত আচরণ এখন সামাজিক জীবনের পরিচিত চিত্র।কারও ভালো কাজের প্রশংসা করতে আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু সেই মানুষটি যখন আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেন, তখন তার ভালো কাজও চোখে পড়ে না। ব্যক্তিগত স্বার্থ সামনে এলে বিচারবোধ বদলে যায়। যে গুণ অন্যের ক্ষেত্রে প্রশংসনীয়, নিজের পছন্দের মানুষের ক্ষেত্রে সেটিই হয়ে যায় স্বাভাবিক; আবার অপছন্দের মানুষের একই কাজ হয়ে যায় অপরাধ।এভাবে আমরা ন্যায় বোধকেও অনেক সময় ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও স্বার্থের সঙ্গে মিলিয়ে দেখি।মানুষের এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ক্ষমতা ও অর্থের ক্ষেত্রে। আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলি, কিন্তু নিজের সুবিধার জন্য নিয়ম ভাঙতে অনেক সময় দ্বিধা করি না। অন্যের অনিয়মে ক্ষুব্ধ হই, কিন্তু নিজের অনিয়মকে ‘ছোট ব্যাপার’ বলে এড়িয়ে যাই। অন্যের ঘুষ নেওয়া অপরাধ, অথচ নিজের পরিচিত কেউ কাজ সহজ করতে কিছু দিলে সেটিকে অনেক সময় ‘উপহার’ হিসেবে দেখার চেষ্টা করি।এখানেই বিবেকের সঙ্গে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়।একজন মানুষ যখন কোনো অন্যায় করে, তখন সে সবসময় জানে না যে সে অন্যায় করছেÑএমন নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রেই সে জানে কাজটি ঠিক নয়। কিন্তু নিজের কাজকে বৈধ প্রমাণ করার জন্য যুক্তি তৈরি করে। ‘সবাই করে’, ‘আমি না করলে অন্য কেউ করবে’, ‘পরিস্থিতির কারণে করতে হয়েছে’Ñএ ধরনের যুক্তি দিয়ে মানুষ নিজের বিবেককে শান্ত করার চেষ্টা করে।কিন্তু অন্যায়কে যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়, ন্যায়সঙ্গত করা যায় না।আজকের সমাজে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই স্ববিরোধিতাকে আরও দৃশ্যমান করেছে। আমরা সেখানে খুব সহজেই নৈতিকতার কথা বলি। অন্যের ভুল নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করি, অন্যায়ের প্রতিবাদ করি, মানবিকতার বাণী লিখি। কিন্তু নিজের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলার প্রবণতা তুলনা মূলকভাবে কম। অন্যের চরিত্র বিশ্লেষণ করা যেন আমাদের সহজ; নিজের চরিত্র বিশ্লেষণ করা কঠিন।অথচ সমাজ পরিবর্তনের প্রথম শর্ত অন্যকে পরিবর্তন করা নয়, নিজেকে পরিবর্তন করা।মানুষের চরিত্রের প্রকৃত পরীক্ষা হয় তখন, যখন তাকে কেউ দেখছে না। সবার সামনে ভালো থাকা খুব কঠিন নয়। প্রশংসা পাওয়ার সময় বিনয়ী হওয়া সহজ। কিন্তু কোনো সুযোগে অন্যের ক্ষতি করা সম্ভব হলেও তা না করা, ক্ষমতা হাতে থাকলেও দুর্বলকে দমন না করা, প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ পেয়েও সংযত থাকাÑএসবই প্রকৃত চরিত্রের পরিচয়।একজন মানুষ কতটা শিক্ষিত, তা তার সনদে বোঝা যায়। কিন্তু সে কতটা মানুষ, তা বোঝা যায় তার আচরণে।আমরা সন্তানদের ভালো ফলাফল করতে শেখাই, বড় চাকরি করতে শেখাই, প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে শেখাই। কিন্তু তাদের কতটা শেখাই যে জয়ী হওয়ার পাশাপাশি সৎ থাকাও জরুরি? কতটা শেখাই যে অন্যকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়া আর অন্যের অধিকার কেড়ে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া এক বিষয় নয়? শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু কর্মসংস্থান নয়; মানুষ তৈরি করাও শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য। তাই পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষার গুরুত্ব নতুন করে ভাবা প্রয়োজন।সমাজে একটি বিপজ্জনক প্রবণতা হলোÑসৎ মানুষকে অনেক সময় বাস্তব জ্ঞানহীন বা বোকা হিসেবে দেখা। যে ব্যক্তি ঘুষ নেয় না, প্রতারণা করে না, অন্যের অধিকার নষ্ট করে না, তাকে অনেকে ‘সুবিধা নিতে জানে না’ বলে মন্তব্য করেন। অন্যদিকে অসৎ ভাবে দ্রুত অর্থ বা ক্ষমতা অর্জনকারীকে অনেক সময় সফল মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এই মূল্যবোধের পরিবর্তন দরকার। সাফল্য যদি শুধু অর্থ, পদ ও ক্ষমতার মাপকাঠিতে বিচার করা হয়, তাহলে সমাজে নৈতিকতার জায়গা সংকুচিত হবেই। প্রকৃত সাফল্য হলো এমনভাবে এগিয়ে যাওয়া, যেখানে নিজের উন্নতির সঙ্গে অন্যের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।মানবিকতা বড় কোনো তত্ত্ব নয়। এটি ছোট ছোট আচরণের মধ্যেই প্রকাশ পায়। রাস্তায় অসহায় মানুষকে সাহায্য করা, কর্মস্থলে অধীনস্থকে সম্মান করা, ভুল করলে ক্ষমা চাওয়া, অন্যের কথা মন দিয়ে শোনা, নিজের প্রাপ্যের বাইরে কিছু না নেওয়াÑএসব ছোট কাজই একটি বড় মানবিক সমাজ তৈরি করতে পারে।কিন্তু আমরা অনেক সময় বড় বড় কথা বলি, ছোট ছোট দায়িত্ব ভুলে যাই। কারও প্রতি অন্যায় আচরণ করার আগে যদি একবার ভাবিÑআমার সঙ্গে এমন আচরণ করা হলে কেমন লাগত, তাহলে অনেক অন্যায় থেমে যেতে পারে। কারও সম্মান নষ্ট করার আগে যদি মনে রাখিÑআমারও সম্মান আছে, তাহলে অনেক অপমানের ঘটনা ঘটত না। অন্যের অধিকার হরণ করার আগে যদি বুঝিÑঅধিকার হারানোর কষ্ট কেমন, তাহলে হয়তো নিজের স্বার্থকে একটু সংযত করা সম্ভব হতো।বিবেক আসলে মানুষের ভেতরের সেই নীরব কণ্ঠ, যা ভালো-মন্দের পার্থক্য মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু সেই কণ্ঠকে আমরা যত বেশি উপেক্ষা করি, তা তত দুর্বল হয়ে যায়। একসময় অন্যায়ও স্বাভাবিক মনে হতে শুরু করে।তাই সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আত্মজিজ্ঞাসার। প্রতিদিন নিজেকে প্রশ্ন করাÑআমি কি সত্যিই সেই মানুষ, যাকে অন্যের সামনে তুলে ধরতে চাই? আমি অন্যের কাছে যে নৈতিকতা প্রত্যাশা করি, নিজে কি তা পালন করি? যে আচরণ অন্যের কাছ থেকে পেলে আমি কষ্ট পাই, সেই আচরণ কি আমি অন্যের সঙ্গে করি না?এই প্রশ্নগুলোর উত্তর অন্য কাউকে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। নিজের কাছেই সৎভাবে উত্তর দেওয়াই যথেষ্ট।মানুষের বুদ্ধিমত্তার প্রকৃত পরিচয় শুধু নতুন কিছু আবিষ্কার করার ক্ষমতায় নয়; নিজের ভুল স্বীকার করার সাহসেও। নিজের স্বার্থের বাইরে অন্যের কথা ভাবতে পারায়। ক্ষমতা থাকলেও সংযত থাকতে পারায়। সুযোগ থাকলেও অন্যায় না করার শক্তিতে।সমাজে আইন থাকবে, প্রতিষ্ঠান থাকবে, শাস্তির ব্যবস্থা থাকবেÑএসব প্রয়োজনীয়। কিন্তু কোনো আইনই মানুষের বিবেকের বিকল্প হতে পারে না। একজন পুলিশ বা প্রশাসনের কর্মকর্তা সবসময় পাশে থাকতে পারেন না। একজন বিচারক প্রতিটি কাজের সাক্ষী হতে পারেন না। কিন্তু একজন মানুষের বিবেক সবসময় তার সঙ্গে থাকে।সেই বিবেককে জাগ্রত রাখাই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। আমরা যদি সত্যিই নিজেদের বুদ্ধিমান মনে করি, তাহলে সেই বুদ্ধিমত্তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হওয়া উচিত আমাদের আচরণে। কথায় নয়, কাজে; প্রদর্শনে নয়, চরিত্রে; অন্যকে বিচার করার মধ্যে নয়, নিজেকে বিচার করার সাহসে।শেষ পর্যন্ত মানুষ অন্যের চোখে যতটা ভালো, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সে নিজের চোখে কতটা সৎ। কারণ অন্য সবাইকে কিছু সময়ের জন্য বোঝানো সম্ভব, কিন্তু নিজের বিবেককে দীর্ঘদিন ফাঁকি দেওয়া যায় না।তাই সময় এসেছে অন্যকে প্রশ্ন করার আগে নিজেকে প্রশ্ন করারÑবিবেক যা বলছে, আমি কি সত্যিই তা শুনছি। লেখক: সংবাদকর্মী