গণতন্ত্রের প্রাণ হোক নাগরিকের প্রশ্ন করার অধিকার
শেখ সিদ্দিকুর রহমান
প-িত জওহরলাল নেহরুকে ঘিরে একটি প্রচলিত উপাখ্যান রয়েছেÑসংসদ ভবন থেকে বের হওয়ার সময় এক বয়স্কার নারী তাঁর কলার ধরে স্বাধীন দেশের প্রাপ্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। জবাবে নেহরু বলেছিলেন, “পেয়েছেন তো! প্রধানমন্ত্রীর কলার ধরার স্বাধীনতা।” ঘটনাটি ইতিহাসের অকাট্য সত্য না হলেও উপাখ্যানটির ভেতরে লুকিয়ে আছে এক গভীর গণতান্ত্রিক দর্শন। গণতন্ত্র মানে শুধু ভূখ- বা পতাকার স্বাধীনতা কিংবা নির্দিষ্ট সময় পর ভোট দেওয়া নয়; এর মূল কথা হলো নাগরিকের মর্যাদা, অধিকার এবং নির্ভয়ে কথা বলার স্বাধীনতা।
গণতন্ত্রে রাষ্ট্র ক্ষমতার মূল উৎস জনগণ। এখানে সরকার জনগণের ওপর কর্তৃত্ব করতে নয়, বরং সেবা দিতে ক্ষমতা পায়। অথচ বাস্তবে গণতন্ত্রকে কেবল নির্বাচনকেন্দ্রিক করে ফেলা হয়। প্রকৃতপক্ষে প্রকৃত গণতন্ত্রের সূচনা হয় নির্বাচনের পর। একজন কৃষক উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য, শ্রমিক যথাযথ মজুরি, শিক্ষার্থী মানসম্মত শিক্ষা আর সাধারণ নাগরিক নাগরিক সুবিধার বিষয়ে প্রশ্ন তুলবেনÑএটাই গণতন্ত্রের প্রাণ। কোনো সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা মানেই রাষ্ট্রের শত্রু হওয়া নয়, বরং ভিন্নমত রাষ্ট্র ও সমাজকে সমৃদ্ধ করে।
একই সঙ্গে কলার ধরে টান দেওয়া বা আইন নিজের হাতে নেওয়াও গণতন্ত্র নয়। এর প্রকৃত শিক্ষা হলো ক্ষমতাবানকে প্রশ্ন করার সাহস এবং একই সঙ্গে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা। আইনের শাসন তখনই সার্থক হয়, যখন তা ক্ষমতাবান ও সাধারণ নাগরিকের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হয়।
গণতন্ত্রের অন্যতম অপরিহার্য শর্ত স্বাধীন সংবাদমাধ্যম। স্থানীয় পর্যায়ে খালের দখল, সরকারি সেবায় অনিয়ম বা মানুষের দুর্ভোগের কথা যখন সাংবাদিকরা তুলে ধরেন, তখন তাঁরা মূলত সাধারণ মানুষের হয়ে প্রশ্নগুলো রাষ্ট্রের দরজায় পৌঁছে দেন। তাই সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রকারান্তরে নাগরিকেরই অধিকার।
বর্তমানে প্রয়োজন এমন এক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কৃতি:
সেবামুখী প্রশাসন: রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক হবে সেবাদাতা ও সেবাগ্রহীতার, প্রভু ও প্রজার নয়।
জবাবদিহিতা: জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তাকে তাঁর কাজের কৈফিয়ত জনগণের কাছে দিতে হবে।
ভিন্নমতের শ্রদ্ধা: অন্যায়ের প্রতিবাদ বা ভিন্নমতকে অপরাধ হিসেবে না দেখে ভুল সংশোধনের সুযোগ হিসেবে নেওয়া।
দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োগ: ভাতা পাওয়া, সেচের পানি পাওয়া কিংবা নিরাপদ সড়কের মতো দৈনন্দিন মৌলিক অধিকার পাওয়ার মধ্য দিয়েই প্রতিষ্ঠিত হবে প্রকৃত গণতন্ত্র।
ক্ষমতার কেন্দ্র যত ওপরেই থাকুক, সাধারণ নাগরিকের কণ্ঠস্বর যেন চাপা না পড়ে। রাষ্ট্র ও নাগরিক পরস্পরের অধিকার, মর্যাদা ও দায়িত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলেই গণতন্ত্র ব্যালট পেপার ছাড়িয়ে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবে।












