বিশ্ব সিংহ দিবস: অরণ্যের রাজাকে রক্ষায় বৈশ্বিক অঙ্গীকার
সাকিবুর রহমান বাবলা
প্রতি বছর ১০ আগস্ট বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব সিংহ দিবস। এই দিনটি কেবল একটি বন্যপ্রাণীকে স্মরণ করার উপলক্ষ নয়; বরং পৃথিবীর অন্যতম প্রতীকী প্রাণী, সাহস, শক্তি ও নেতৃত্বের প্রতীক সিংহকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষার জন্য মানবজাতির এক সম্মিলিত অঙ্গীকারের দিন। হাজার বছর ধরে সিংহ মানবসভ্যতার ইতিহাস, সংস্কৃতি, সাহিত্য, ধর্মীয় প্রতীক, শিল্পকলা এবং লোককাহিনীর অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু আজ সেই ‘অরণ্যের রাজা’ নিজেই অস্তিত্ব সংকটে।
বিশ্ব সিংহ দিবসের সূচনা হয় ২০১৩ সালে। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণবাদী ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্র নির্মাতা দম্পতি ডেরেক জুবার্ট ও বেভারলি জুবার্ট এই দিবসের প্রবর্তন করেন। তারা দীর্ঘদিন ধরে আফ্রিকার সিংহ ও অন্যান্য বড় বিড়ালজাতীয় প্রাণীর জীবন নিয়ে গবেষণা ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন। সিংহের দ্রুত হ্রাসমান সংখ্যা দেখে তারা ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক-এর সহযোগিতায় বিগ ক্যাট ইনিশিয়েটিভ গড়ে তোলেন এবং সেখান থেকেই বিশ্ব সিংহ দিবসের যাত্রা শুরু হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো সিংহ সংরক্ষণ, তাদের আবাসস্থল রক্ষা, চোরা শিকার প্রতিরোধ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি।
একসময় আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে সিংহ বিচরণ করত। বর্তমানে তাদের বিস্তৃতি অনেক সংকুচিত হয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ সিংহকে ঝুঁকিপূর্ণ প্রজাতি হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী বর্তমানে পৃথিবীতে বন্য পরিবেশে মাত্র ২৩ হাজার থেকে ৩৯ হাজার সিংহ অবশিষ্ট রয়েছে। গত শতাব্দীতে সিংহের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে ২০৫০ সালের মধ্যে আফ্রিকার বন্য সিংহ প্রকৃতি থেকে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।
সিংহ শুধু একটি প্রাণী নয়; এটি একটি সম্পূর্ণ বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্যের রক্ষক। খাদ্যশৃঙ্খলের শীর্ষ স্তরের শিকারি হিসেবে সিংহ তৃণভোজী প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে এবং পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সিংহের উপস্থিতি একটি সুস্থ ও কার্যকর বাস্তুতন্ত্রের নির্দেশক। তাই সিংহ হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি প্রজাতির বিলুপ্তি নয়, বরং সমগ্র পরিবেশব্যবস্থার জন্য গভীর সংকট।
বর্তমান সময়ে সিংহের প্রধান হুমকিগুলোর মধ্যে রয়েছে আবাসস্থল ধ্বংস, বন উজাড়, কৃষি ও মানববসতির সম্প্রসারণ, জলবায়ু পরিবর্তন, অবৈধ শিকার এবং মানুষ-প্রাণীর সংঘাত। আফ্রিকার বহু অঞ্চলে মানুষের বসতি ও কৃষিজমি সম্প্রসারণের ফলে সিংহ তাদের ঐতিহ্যবাহী বিচরণক্ষেত্র হারাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে গবাদিপশুর ওপর আক্রমণের প্রতিশোধ হিসেবে সিংহকে হত্যা করা হয়। এছাড়া চামড়া, হাড়, দাঁত ও অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অবৈধ বাণিজ্যও তাদের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
বৈজ্ঞানিক গবেষণার অগ্রগতির ফলে বর্তমানে সিংহকে প্রধানত দুটি উপপ্রজাতিতে ভাগ করা হয়েছে। প্রথমটি প্যান্থেরা লিও লিও, যার মধ্যে পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকার সিংহ এবং ভারতের গুজরাটের গির অরণ্যের বিখ্যাত এশীয় সিংহ অন্তর্ভুক্ত। দ্বিতীয়টি প্যান্থেরা লিও মেলানোচাইটা, যা দক্ষিণ ও পূর্ব আফ্রিকার সিংহদের প্রতিনিধিত্ব করে। অতীতে বার্বারি সিংহ ও কেপ সিংহের মতো বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক উপপ্রজাতি পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
তবে সব খবরই হতাশার নয়। ভারতের গুজরাটের গির জাতীয় উদ্যান এশীয় সিংহ সংরক্ষণের একটি বিশ্বস্বীকৃত সফল উদাহরণ। একসময় বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাওয়া এশীয় সিংহের সংখ্যা ধারাবাহিক সংরক্ষণ প্রচেষ্টার ফলে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বর্তমানে তা প্রায় এক হাজারের কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে বিভিন্ন সাম্প্রতিক জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে একটি মাত্র অঞ্চলে তাদের কেন্দ্রীভূত উপস্থিতি রোগব্যাধি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্য কোনো বড় বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে বিকল্প আবাসস্থল গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
সিংহ সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আইন ও চুক্তি কার্যকর রয়েছে। সাইটিস চুক্তির আওতায় এশীয় সিংহের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং আফ্রিকান সিংহের বাণিজ্য কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। এছাড়া কনভেনশন অন মাইগ্রেটরি স্পিসিস আফ্রিকার দেশগুলোকে সীমান্ত অতিক্রমকারী সংরক্ষণ কার্যক্রমে সহযোগিতা করতে উৎসাহিত করে।
বাংলাদেশে প্রাকৃতিকভাবে কোনো বন্য সিংহ না থাকলেও সিংহ সংরক্ষণের বৈশ্বিক প্রচেষ্টার সঙ্গে দেশের সম্পর্ক রয়েছে। আন্তর্জাতিক পাচারচক্র প্রায়ই বিভিন্ন দেশকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করে। ফলে বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অনুযায়ী সিংহ বা অন্যান্য সংরক্ষিত বন্যপ্রাণী হত্যা, পাচার, ক্রয়-বিক্রয় কিংবা তাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পরিবহন গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক চুক্তির সদস্য হওয়ায় সীমান্ত ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষও এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।
সিংহ নিয়ে মানুষের আগ্রহ কতটা গভীর, তার একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ পাওয়া যায় তথাকথিত ঞৎরষষরড়হ খরড়হং জবংবধৎপয-এ। সেখানে হিসাব করে দেখানো হয়েছে, যদি এক ট্রিলিয়ন পূর্ণবয়স্ক পুরুষ সিংহকে একত্র করা হয়, তবে তাদের মোট ভর হবে প্রায় ১.৮৭৫ দ্ধ ১০¹⁴ কিলোগ্রামÑ যা বিখ্যাত ধূমকেতু ৬৭পি-এর ভরের প্রায় ২০গুণ। যদিও এটি একটি তাত্ত্বিক ও কৌতূহলোদ্দীপক বৈজ্ঞানিক আলোচনা, তবুও এটি সিংহের প্রতি মানুষের দীর্ঘদিনের বিস্ময় ও আকর্ষণের প্রতিফলন।
বিশ্ব সিংহ দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণীর মতো সিংহেরও এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। সিংহ রক্ষা মানে বন রক্ষা, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ পৃথিবী নিশ্চিত করা। আজকের এই দিনে আমাদের প্রত্যেকের অঙ্গীকার হওয়া উচিত—চোরা শিকার ও অবৈধ বন্যপ্রাণী বাণিজ্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া, পরিবেশবান্ধব নীতি সমর্থন করা এবং বিশ্বব্যাপী সংরক্ষণ কার্যক্রমকে শক্তিশালী করা। কারণ সিংহ শুধু অরণ্যের রাজা নয়; সে প্রকৃতির শক্তি, সৌন্দর্য ও ভারসাম্যের এক অনন্য প্রতীক। অরণ্যের এই গর্জন যদি একদিন স্তব্ধ হয়ে যায়, তবে তা হবে মানবসভ্যতার জন্যও এক অপূরণীয় ক্ষতি।












