সুন্দরবনে বাঘিনীর প্রত্যাবর্তন ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণের নতুন আশাবাদ
সম্পাদকীয়
আমাদের বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় রচিত হতে যাচ্ছে। প্রায় ছয় মাস মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে লড়াই করার পর, নিবিড় চিকিৎসা ও পরিচর্যায় সুস্থ হয়ে অবশেষে সুন্দরবনে ফিরছে গুরুতর আহত একটি রয়েল বেঙ্গল বাঘিনী। রোববার বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে বাঘিনীটিকে তার চিরচেনা প্রাকৃতিক আবাসস্থলে অবমুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশে এই প্রথম কোনো গুরুতর আহত বাঘকে উদ্ধার করে, দীর্ঘমেয়াদি ও আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে সম্পূর্ণ সুস্থ করে বনে ফিরিয়ে দেওয়ার এমন সফল উদ্যোগ নেওয়া হলো। এই ঘটনাটি নিঃসন্দেহে দেশের বন্য প্রাণী সুরক্ষায় নিয়োজিত সংশ্লিষ্ট সবার জন্য এক বিরাট সাফল্য এবং বড় অনুপ্রেরণা।
গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জ এলাকায় হরিণ শিকারিদের পেতে রাখা অবৈধ ছিটকা ফাঁদে আটকে পড়েছিল প্রায় ১০ বছর বয়সী এই বাঘিনীটি। দীর্ঘ সময় আটকে থাকায় তার সামনের বাঁ পায়ের চামড়া, মাংসপেশি ও শিরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বন বিভাগ সময়মতো উদ্ধার না করলে হয়তো সুন্দরবনের এই অমূল্য সম্পদটি আমাদের হারাতে হতো। উদ্ধার পরবর্তী সময়ে খুলনার বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঁচ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ মেডিকেল বোর্ডের তত্ত্বাবধানে চলে তার জীবন বাঁচানোর লড়াই। অস্ত্রোপচার, নিয়মিত ড্রেসিং ও নিবিড় পর্যবেক্ষণের পর বাঘিনীটি এখন পুরোপুরি সুস্থ এবং প্রাকৃতিকভাবে শিকার করতে সক্ষম।
এই পুরো প্রক্রিয়াটি প্রমাণ করে যে সঠিক সময়ে উদ্ধার, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সমন্বয় এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও লজিস্টিক সহায়তা থাকলে সংকটাপন্ন বন্য প্রাণীকেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এই ঐতিহাসিক ঘটনা আমাদের ভেটেরিনারি চিকিৎসকদের দক্ষতা ও বন বিভাগের আন্তরিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। সুন্দরবনের মতো একটি সংবেদনশীল ও স্পর্শকাতর প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় রয়েল বেঙ্গল টাইগারের ভূমিকা অপরিসীম। একটি বাঘিনীকে সুস্থ করে বনে ফিরিয়ে দেওয়া মানে কেবল একটি প্রাণীর জীবন রক্ষা করা নয়, বরং সুন্দরবনের বংশবৃদ্ধির ধারা ও বাস্তুতন্ত্রকে আরও সুসংহত করা।
তবে এই আনন্দের খবরের সমান্তরালে যে অন্ধকার দিকটি আমাদের ভাবিয়ে তোলে, তা হলো সুন্দরবনে শিকারিদের পেতে রাখা অবৈধ ছিটকা ফাঁদ। জাতীয় পশু হিসেবে বাঘ যেখানে আমাদের গর্ব, সেখানে বনের ভেতরে অবাধে ফাঁদ পেতে বাঘ বা হরিণ শিকারের এই অপচেষ্টা অত্যন্ত উদ্বেগের। আজ বন বিভাগের আন্তরিকতায় এই বাঘিনীটি রক্ষা পেলেও, নজরদারির অভাবে কত বন্য প্রাণী নীরবে-নিভৃতে প্রাণ হারাচ্ছে, তার হিসাব আমাদের জানা নেই।
আমরা বাঘিনীটির এই রাজকীয় প্রত্যাবর্তনকে স্বাগত জানাই এবং আশা করি বন বিভাগ তার অবমুক্তির পর উপযুক্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। একই সঙ্গে এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে সুন্দরবনের ভেতরে টহল ব্যবস্থা জোরদার, অবৈধ শিকারিদের দমন এবং বনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। বন্য প্রাণী রক্ষায় এই ধরনের সফল চিকিৎসার অবকাঠামো আরও জোরদার করা প্রয়োজন। সুন্দরবনকে বন্য প্রাণীদের জন্য একটি নিরাপদ ও শঙ্কাহীন অভয়ারণ্য হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে তবেই এই ধরনের সাফল্যের প্রকৃত সার্থকতা আসবে।











