আন্তর্জাতিক গৃহহীন প্রাণি দিবস: সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ ও সহাবস্থানের আহ্বান
সাকিবুর রহমান বাবলা
প্রতি বছর আগস্ট মাসের তৃতীয় শনিবার পালিত হয় আন্তর্জাতিক গৃহহীন প্রাণি দিবস। ১৯৯২ সালে ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর অ্যানিমাল রাইটস এই দিবসের সূচনা করে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিনটি পালন করা হয় রাস্তায় ও আশ্রয়হীন প্রাণিদের দুর্দশা সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, প্রাণিকল্যাণ নিশ্চিতকরণ এবং দায়িত্বশীল আচরণ গড়ে তোলার লক্ষ্যে।
গৃহহীন প্রাণি বলতে কোনো নির্দিষ্ট প্রজাতিকে বোঝায় না। বরং যেসব প্রাণি মানুষের মালিকানা, পরিচর্যা বা স্থায়ী আশ্রয় থেকে বিভিন্ন কারণে সেই আশ্রয় বিচ্যুতি হয়ে জীবনযাপন করে, তাদের গৃহহীন প্রাণি বলা হয়। এর মধ্যে কুকুর ও বিড়াল সবচেয়ে বেশি দেখা গেলেও খরগোশ, ঘোড়া, পাখি, গিনিপিগসহ বিভিন্ন পোষা প্রাণিও পরিত্যক্ত হয়ে গৃহহীন অবস্থায় পড়তে পারে। তবে বিশ্বব্যাপী গৃহহীন প্রাণির সংখ্যার সবচেয়ে বড় অংশই কুকুর ও বিড়াল।
বর্তমান বিশ্বে গৃহহীন প্রাণির সংখ্যা উদ্বেগজনক। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, কোটি কোটি কুকুর ও বিড়াল রাস্তায় বা অস্থায়ী আশ্রয়ে জীবনযাপন করছে। অতিরিক্ত বংশবৃদ্ধি, মালিকের অবহেলা, প্রাণি পরিত্যাগ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্রের অভাব এই সমস্যার প্রধান কারণ। ফলে প্রাণিগুলো খাদ্য, পানি, চিকিৎসা ও নিরাপত্তার সংকটে ভোগে এবং অনেক সময় রোগ, দুর্ঘটনা কিংবা নির্যাতনের শিকার হয়।
এই দিবসের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো প্রাণির অতিরিক্ত বৃদ্ধিসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে বন্ধ্যাকরণ কার্যক্রমের গুরুত্ব তুলে ধরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পিত বন্ধ্যাকরণ গৃহহীন প্রাণির সংখ্যা কমাতে সবচেয়ে কার্যকর ও মানবিক উপায়। একই সঙ্গে “কিনবেন না, দত্তক নিন” বার্তার মাধ্যমে মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্র বা রাস্তা থেকে প্রাণি দত্তক নিতে উৎসাহিত করা হয়। এতে একদিকে যেমন একটি প্রাণি নতুন জীবন পায়, অন্যদিকে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর ওপর চাপও কমে।
গৃহহীন প্রাণিদের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। তারা মানুষের সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ ও সামাজিক সচেতনতার প্রতিফলন ঘটায়। অনেক এলাকায় পথকুকুর অপরিচিত ব্যক্তির উপস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক সংকেত দেয় এবং পরিবেশে ফেলে দেওয়া খাদ্যবর্জ্য অপসারণেও ভূমিকা রাখে। তবে যথাযথ টিকাদান ও পরিচর্যার অভাবে কিছু প্রাণি জলাতঙ্কসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। তাই প্রাণিদের প্রতি নিষ্ঠুরতা নয়, বরং বিজ্ঞানসম্মত ও মানবিক ব্যবস্থাপনাই হতে পারে টেকসই সমাধান।
বাস্তুসংস্থান ও পরিবেশের ক্ষেত্রেও গৃহহীন প্রাণিদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিছু প্রাণি ইঁদুর ও অন্যান্য ক্ষুদ্র প্রাণির সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। আবার মৃত প্রাণি বা খাদ্যবর্জ্য খেয়ে পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতেও অবদান রাখে। কিন্তু তাদের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে জীববৈচিত্র্য ও খাদ্যশৃঙ্খলে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে অবাধে বিচরণকারী বিড়াল অনেক অঞ্চলে স্থানীয় পাখি ও ছোট বন্যপ্রাণির জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই প্রাণিকল্যাণ এবং পরিবেশগত ভারসাম্য-দুই দিক বিবেচনায় রেখেই কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে প্রাণিকল্যাণ আইন, ২০১৯ অনুযায়ী গৃহহীন বা পথপ্রাণী হত্যা, নির্যাতন কিংবা অযৌক্তিকভাবে আটকে রাখার অপরাধে সর্বোচ্চ ৬ মাসের কারাদন্ড, ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ড হতে পারে। এছাড়া দন্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৪২৯ ধারায় পশু হত্যা বা ক্ষতির জন্য আরও কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। যদিও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এ আইনের বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে, তবুও দেশে পথপ্রাণীদের জন্য সরকারি আশ্রয় ও পুনর্বাসন ব্যবস্থা এখনও সীমিত; ফলে এ ক্ষেত্রে বেসরকারি সংস্থা ও স্বেচ্ছাসেবীরাই প্রধান ভূমিকা পালন করছে, যেমন অভয়ারণ্য, পেটস কেয়ার।
এই দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, গৃহহীন প্রাণিরা কোনো বোঝা নয়; তারা আমাদের পরিবেশ ও সমাজেরই অংশ। তাদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ, টিকাদান, বন্ধ্যাকরণ, আশ্রয় ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং প্রাণি নির্যাতনের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা আমাদের সবার কর্তব্য। সহমর্মিতা, সচেতনতা ও সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমেই মানুষ ও প্রাণীর নিরাপদ সহাবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব। তাই মানুষের মধ্যে প্রাণিদের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তুলে একটি সহানুভূতিশীল সমাজ নির্মাণে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানাই।












