হারিয়ে যাচ্ছে আশাশুনির ঐতিহ্যবাহী কুয়া-ইন্দারা
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
একসময় আশাশুনির গ্রামাঞ্চলে সুপেয় পানির অন্যতম প্রধান উৎস ছিল কুয়া বা ইন্দারা। বাড়ির আঙিনায়, পুকুরপাড়ে কিংবা পুরোনো বসতভিটার পাশে ইট দিয়ে বাঁধানো গভীর কুয়া ছিল গ্রামীণ জীবনের পরিচিত দৃশ্য। বিকেল কিংবা সন্ধ্যায় কলসি নিয়ে নারীদের কুয়া থেকে পানি সংগ্রহের দৃশ্য ছিল নিত্যদিনের। সময়ের পরিবর্তনে সেই দৃশ্য এখন প্রায় হারিয়ে গেছে। আশাশুনির বিভিন্ন পুরোনো বাড়িতে এখনো কোথাও কোথাও দেখা যায় মজে যাওয়া কুয়া বা ইন্দারার অস্তিত্ব।
কোনোটি আগাছায় ঢেকে গেছে, কোনোটি মাটি দিয়ে ভরাট হয়ে গেছে। আবার কোনো কোনো বাড়িতে কুয়ার জায়গায় স্থাপন করা হয়েছে নলকূপ। অনেক পরিবার এখন বৈদ্যুতিক মোটরের সাহায্যে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করছে। স্থানীয় প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আশির দশক পর্যন্ত অনেক এলাকায় কুয়া বা ইন্দারার পানি পান ও রান্নার কাজে ব্যবহার করা হতো। খাল-বিল, নদী-নালা ও পুকুরের পানি ব্যবহার করা হলেও পান করার জন্য তুলনামূলক নিরাপদ উৎস হিসেবে কুয়ার পানির ওপর নির্ভরতা ছিল বেশি।
স্থানীয়ভাবে কুয়াকে ‘ইন্দারা’ বলা হতো। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, সংস্কৃত ‘ইন্দ্রাগার’ শব্দ থেকে ইন্দারা শব্দের উৎপত্তি। প্রাচীনকালে মাটির গভীরে খনন করে কূপ তৈরি করা হতো। অনেক কূপের নিচ থেকে ভূগর্ভস্থ পানি উঠে আসত। কুয়ার দেয়াল ইট কিংবা পরবর্তীকালে সিমেন্টের রিং দিয়ে বাঁধানো হতো। বাঁধানো কূপকে অনেক এলাকায় ইন্দারা এবং বাঁধানো না থাকলে পাতকুয়া বলা হতো। আশাশুনির এক প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, “ছোটবেলায় বাড়ির কুয়া থেকেই পানি উঠত। বিকেলে কলসি নিয়ে কুয়ায় যেতে হতো।
কুয়াপাড়ে কয়েক বাড়ির নারীদের দেখা হতো, গল্প হতো। এখন টিউবওয়েল ও মোটরের কারণে সেই দৃশ্য আর নেই।” আরেক প্রবীণ নারী বলেন, “কুয়াটা বাড়ির খুব প্রয়োজনীয় জিনিস ছিল। কুয়ার পানি দিয়ে রান্না থেকে শুরু করে পান করার কাজও চলত। এখন পুরোনো কুয়াগুলো অনেক জায়গায় মাটি দিয়ে ভরাট করে দেওয়া হয়েছে।” স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পুরোনো জমিদার ও বিত্তবানদের বাড়িতেও কুয়ার ব্যবহার ছিল।
এসব কুয়ার পানি তোলার জন্য কোথাও পাইপ ও বিশেষ ব্যবস্থার ব্যবহার করা হতো। ফলে পুরোনো বাড়ি বা জমিদারবাড়ির আশপাশে এখনো অনেক কুয়ার চিহ্ন পাওয়া যায়। তবে আশাশুনির মতো উপকূলীয় এলাকায় সুপেয় পানির সংকটের কারণে পুরোনো জলাধারগুলোর গুরুত্ব নতুন করে আলোচনায় এসেছে। লবণাক্ততা, জলবায়ু পরিবর্তন ও শুষ্ক মৌসুমে নিরাপদ পানির সংকট বাড়ায় স্থানীয়ভাবে পানি সংরক্ষণের বিকল্প উৎস নিয়ে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। আশাশুনির একজন শিক্ষক বলেন, “পুরোনো কুয়াগুলো সব ব্যবহার করার মতো নয়। তবে যেগুলো এখনো রয়েছে, সেগুলো পরীক্ষা করে নিরাপদ হলে সংরক্ষণ করা যেতে পারে।
অন্তত ঐতিহ্য হিসেবে এগুলোর অস্তিত্ব ধরে রাখা দরকার।” স্থানীয় পরিবেশকর্মীরা মনে করেন, পুরোনো কুয়া বা ইন্দারাগুলো চিহ্নিত করে তালিকা করা যেতে পারে। যেসব কূপ ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলো সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। আর কোনো কূপ পুনর্ব্যবহারের সম্ভাবনা থাকলে পানি পরীক্ষা করে আধুনিক নিরাপত্তা ও বিশুদ্ধকরণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
প্রবীণদের স্মৃতিতে এখনো ভেসে ওঠে কুয়াপাড়ের সেই দিনগুলোÑকলসির শব্দ, পানি তোলার ব্যস্ততা আর প্রতিবেশীদের গল্প। আধুনিকতার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবন সহজ হয়েছে, কিন্তু হারিয়ে গেছে গ্রামীণ জীবনের সেই পরিচিত দৃশ্য। আশাশুনির পুরোনো কুয়া-ইন্দারা এখন শুধু পানির উৎস নয়; এগুলো গ্রামীণ জনজীবন ও হারিয়ে যাওয়া জলসংস্কৃতির স্মারক। বিলীন হওয়ার আগে এসব ঐতিহ্য সংরক্ষণের দাবি স্থানীয়দের।
সচ্চিদানন্দ দে সদয়, আশাশুনি, সাতক্ষীরা












