বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬, ১৭ আষাঢ় ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬, ১৭ আষাঢ় ১৪৩৩

ইরান-মার্কিন চুক্তিতে কী পেলেন ইসরায়েলের নেতানিয়াহু

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬, ১০:৫৩ অপরাহ্ণ
ইরান-মার্কিন চুক্তিতে কী পেলেন ইসরায়েলের নেতানিয়াহু

 

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যে চুক্তি প্রকাশ ও স্বাক্ষর করেছেন, তাকে কৌশলগত এবং রাজনৈতিক বিপর্যয় হিসেবে দেখছেন ইসরায়েলি কর্মকর্তারা। তবে বুধবার এই চুক্তি স্বাক্ষরের পর খোদ ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ছিলেন সম্পূর্ণ নীরব।

ট্রাম্পের সঙ্গে চুক্তি করে যেভাবে লাভবান হলো ইরানট্রাম্পের সঙ্গে চুক্তি করে যেভাবে লাভবান হলো ইরান
নেতানিয়াহু ইসরায়েলের জনগণকে ইরানের বিরুদ্ধে ‘পূর্ণাঙ্গ বিজয়’-এর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু চার মাস পর দেশটির নির্বাচনের ঠিক আগে শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের সমঝোতা স্মারক মেনেই তাকে শান্ত থাকতে হচ্ছে; সেই সঙ্গে হজম করতে হচ্ছে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ঘন ঘন সমালোচনা।

আন্তর্জাতিক মহলে নেতানিয়াহু এখন প্রায় একা, যিনি বিশ্বাস করেন এই চুক্তি একটি ভুল এবং যুদ্ধ আরও চালিয়ে যাওয়া উচিত ছিল। এমনকি উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কট্টরপন্থি সংযুক্ত আরব আমিরাতও এই চুক্তির পক্ষে আঞ্চলিক ঐকমত্যে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ওয়াশিংটনেও নেতানিয়াহুর রিপাবলিকান মিত্র এবং গণমাধ্যমগুলো ট্রাম্পের স্বাক্ষর করা এই চুক্তির পুরোপুরি সমালোচনা করতে দ্বিধাবোধ করছে। ২০১৫ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ইরান চুক্তির বিরোধিতা করতে নেতানিয়াহু যেভাবে মার্কিন কংগ্রেসে ভাষণ দিয়েছিলেন, এবার আর তেমন কিছুর পুনরাবৃত্তি ঘটার সুযোগ নেই। ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি বিরোধে জড়াতে না চাইলে নেতানিয়াহু এখন কেবল টেলিভিশনগুলোতে গিয়ে এই চুক্তির সোজাসুজি বিরোধিতাও করতে পারছেন না।

চুক্তির পরও ইরান-মার্কিন শান্তির পথে বাধা কীচুক্তির পরও ইরান-মার্কিন শান্তির পথে বাধা কী
প্রকাশ্যে নিন্দা না জানালেও ইসরায়েলি কর্মকর্তারা সাংবাদিকদের সঙ্গে ঘরোয়া ব্রিফিংয়ে এই চুক্তি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। অন্যদিকে নেতানিয়াহুপন্থি গণমাধ্যমগুলো—যার বেশির ভাগই এতদিন কট্টর ট্রাম্প-ভক্ত ছিল—তারা এখন ট্রাম্প ও তার টিমের ওপর আক্রমণ শুরু করেছে। নেতানিয়াহুপন্থি চ্যানেল ১৪-এর প্রাইম টাইম শো-এর এক সঞ্চালক মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে ‘লম্পট’ বলে গালি দিয়েছেন। একই সঙ্গে ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনার আর্থিক সুবিধার জন্য ইসরায়েলকে ‘বিক্রি’ করে দিয়েছেন বলে একটি ইহুদিবিদ্বেষী মন্তব্য ব্যবহার করে অভিযোগ তুলেছেন।

বুধবার জি-৭ সম্মেলনে ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধকালীন সহযোগিতার জন্য নেতানিয়াহুকে ধন্যবাদ জানানোর পাশাপাশি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর ওপর কিছু খোঁচাও মেরেছেন। নেতানিয়াহুর ডাকনাম উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, ‘বিবি একজন ভালো মানুষ। তিনি মাঝে মাঝে একটু বেশি উত্তেজিত হয়ে পড়েন। তবে আমাদের অংশীদারত্ব চমৎকার। আমরা হলাম বড় অংশীদার, আর তিনি হলেন খুবই ছোট অংশীদার।’

এর কয়েক দিন আগে ট্রাম্প বলেছিলেন যে বৈরুতে একটি হামলার নির্দেশ দিয়ে নেতানিয়াহু এই চুক্তিটি প্রায় ভেস্তেই দিয়েছিলেন, তার আসলে কোনও ‘বিচারবুদ্ধি নেই’।

যেভাবে সাজানো হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের ১৪ দফা সমঝোতাযেভাবে সাজানো হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের ১৪ দফা সমঝোতা
রবিবার ট্রাম্প যখন এই চুক্তির ঘোষণা দেন, তখন নেতানিয়াহু বেশ চমকে যান। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা গত মঙ্গলবার পর্যন্ত দাবি করেছিলেন যে ইসরায়েলকে এই সমঝোতা স্মারকটি পর্যালোচনার সুযোগ দেওয়া হয়নি। তবে বুধবার সাংবাদিকদের এক ব্রিফিংয়ে মার্কিন এক কর্মকর্তা স্বীকার করেন, নেতানিয়াহু হয়তো চূড়ান্ত দফাগুলো দেখেননি, তবে ইসরায়েলিরা কখনোই তা দেখতে চায়নি এবং পুরো আলোচনাকালীন হোয়াইট হাউস নেতানিয়াহুকে বিস্তারিত অবহিত করেছিল।

বুধবারের সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্পও বলেন, তিনি একটি কপি পাঠিয়েছেন। ওই মার্কিন কর্মকর্তা আরও দাবি করেন, নেতানিয়াহুর সংশয় থাকা সত্ত্বেও তিনি ভ্যান্স, কুশনার ও উইটকফকে বলেছিলেন যে ইরান যদি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে রাজি হওয়া পারমাণবিক ছাড়গুলো মেনে চলে, তবে এটি হবে একটি দারুণ চুক্তি।

নেতানিয়াহুর জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো লেবানন। সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, এই যুদ্ধবিরতির আওতায় ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যকার লড়াইও অন্তর্ভুক্ত এবং যেকোনও চূড়ান্ত চুক্তির অধীনে ইসরায়েলকে লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে হবে। তবে নেতানিয়াহুর এক উপদেষ্টা জানিয়েছেন, ইসরায়েল এই সমঝোতা স্মারকের লেবানন অংশটি মানতে বাধ্য নয়। তিনি উল্লেখ করেন, নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে স্পষ্ট বলেছেন যে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র না করা পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবানন থেকে সরবে না। বুধবার ট্রাম্পও স্বীকার করে বলেন, ‘লেবানন নিয়ে আমাদের মধ্যে কিছুটা বিরোধ রয়েছে।’

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে হামাসের তৎপরতার অভিযোগ ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূতেরবাংলাদেশ ও পাকিস্তানে হামাসের তৎপরতার অভিযোগ ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূতের
হোয়াইট হাউস অবশ্য বলছে, এটি কোনও ‘একপেশে যুদ্ধবিরতি’ হবে না এবং হিজবুল্লাহ হামলা চালালে ইসরায়েলের পাল্টা জবাব দেওয়ার ক্ষমতা থাকবে। মার্কিন কর্মকর্তারা আশা করছেন, ইসরায়েল আগামী ৬০ দিন লেবাননের সঙ্গে একটি রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানোর কাজে লাগাবে এবং এই আলোচনার মাধ্যমেই ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার হতে পারে, ইরানের পারমাণবিক চুক্তির কারণে নয়। বুধবার লেবাননে ইসরায়েলের যুদ্ধকৌশলের আবারও সমালোচনা করে ট্রাম্প বলেন, ‘কাউকে খোঁজার জন্য প্রতিবার একটি আস্ত অ্যাপার্টমেন্ট ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’

মূল বিষয় হলো, যেসব মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে অতীতে নেতানিয়াহুর প্রায়ই ঝগড়া হতো, তারাও ইসরায়েলের বিষয়ে এতটা সরাসরি ও কঠোর সমালোচনা করেননি। নিজের সবচেয়ে অপরিহার্য মিত্রের কাছ থেকে এমন আঘাত হজম করা নেতানিয়াহুর জন্য আরেকটি বড় ধাক্কা।

সূত্র: অ্যাক্সিওস

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

Ads small one

শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়তে প্রয়োজন পরিকল্পিত কর্মসংস্থান

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬, ৪:৫৫ অপরাহ্ণ
শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়তে প্রয়োজন পরিকল্পিত কর্মসংস্থান

এম.এম হায়দার আলী

বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলেছে। বিগত সরকারের আমলে দৃষ্টিনন্দন ব্রিজ, কালভার্ট, সড়ক-মহাড়ক, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ নানা অবকাঠামোগত উন্নয়ন দেশের অগ্রগতির সাক্ষ্য বহন করছে। কিন্তু এই অগ্রযাত্রার মাঝেও একটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে, আর সেটা হলো বেকারত্ব। কর্মক্ষম হয়েও যখন একজন মানুষ কাজের সুযোগ পান না, তখন তা শুধু একটি ব্যক্তিগত সংকট নয়; এটি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্যও গভীর উদ্বেগের বিষয়।

 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে বেকারের সংখ্যা আনুমানিক ২৭ থেকে ২৮ লাখ। এর মধ্যে পুরুষ প্রায় ১৭ থেকে ১৮ লাখ এবং নারী প্রায় ১০ লাখ। উচ্চশিক্ষা অর্জনের পরও অসংখ্য তরুণ-তরুণী বছরের পর বছর চাকরির অপেক্ষায় রয়েছেন। অন্যদিকে অনেকে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও উপযুক্ত কাজ না পেয়ে হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন। বেকারত্ব কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি সামাজিক অবক্ষয়েরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। দীর্ঘদিন কর্মহীন থাকলে অনেকেই হতাশা, মানসিক চাপ ও অনিশ্চয়তায় ভুগতে থাকেন।

 

এই পরিস্থিতিতে কিছু মানুষ মাদকাসক্তি, জুয়া, অনৈতিক কর্মকান্ড কিংবা অন্যান্য সমাজ বিরোধী কাজে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকেন। যদিও এসব অপরাধের পেছনে নানা সামাজিক ও ব্যক্তিগত কারণও থাকে। তবুও কর্মসংস্থানের অভাব একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়। আমাদের সমাজে প্রচলিত প্রবাদ আছে, অলস মস্তিষ্ক শয়তানের বাসা, এই বাস্তবতারই প্রতিফলন। তাই দেশের প্রতিটি জেলায় শিল্পকারখানা, কৃষিভিত্তিক শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, তথ্যপ্রযুক্তি খাত এবং দক্ষতা উন্নয়ন ভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা এখন সময়ের দাবি।

 

রাজধানী কেন্দ্রিক উন্নয়নের পরিবর্তে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে স্থানীয় পর্যায়েই লাখো মানুষের কর্মসংস্থান সম্ভব হবে। এতে শহরমুখী জনগ্রোতও কমবে এবং আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাস পাবে। বিশেষ করে নারীদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ, সহজ ঋণ এবং কারিগরি প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে তরুণদের আধুনিক প্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কৃষি উদ্যোক্তা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় প্রশিক্ষণ দিয়ে আত্মকর্মসংস্থানে উৎসাহিত করতে হবে।

 

সরকার, বেসরকারি খাত এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সমন্বিত উদ্যোগ নিলে বেকারত্ব উল্লেখযোগ্য ভাবে কমানো সম্ভব। পরিকল্পিত শিল্পায়ন, স্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থা, বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলাই হতে পারে এই সংকট উত্তরণের কার্যকর পথ। একটি কর্মসংস্থান শুধু একজন মানুষের আয়ের পথ খুলে দেয় না; এটি একটি পরিবারের মুখে হাসি ফোটায়, সমাজে স্থিতিশীলতা আনে এবং অপরাধপ্রবণতা কমাতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। যেমন, মাদক, জুয়া, চুরি-ছিনতাই, ডাকাতিসহ বিভিন্ন সমাজ বিরোধী কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও অনেক ক্ষেত্রে হ্রাস পেতে পারে।

 

এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচার ব্যবস্থার ওপরও, মামলার চাপ কমলে তারা আরও দক্ষতার সঙ্গে জনগণের সেবা দিতে পারবেন। ফলে দেশের প্রতিটি জেলায় সন্তোষজনক কর্মসংস্থানের পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারলেই সত্যিকার অর্থে শান্তির সুবাতাস বইবে। সমৃদ্ধ, নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হতে পারে সবার জন্য মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান। সর্বোপরি মনে রাখতে হবে, বেকারত্ব দূর করা শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রশ্ন নয়, এটি একটি মানবিক, নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ার অন্যতম পূর্বশর্ত। একটি চাকরি শুধু একজন মানুষের জীবন বদলে দেয় না,বদলে দেয় একটি পরিবার, একটি সমাজ, এমনকি একটি জাতির ভবিষ্যৎ ও…।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

একটি বীজের ভবিষ্যৎ, একটি বনের অস্তিত্ব

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬, ৪:৫১ অপরাহ্ণ
একটি বীজের ভবিষ্যৎ, একটি বনের অস্তিত্ব

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলজুড়ে বিস্তৃত সুন্দরবন শুধু একটি বনভূমি নয়Ñএটি একটি জীবন্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, একটি প্রাকৃতিক ঢাল এবং উপকূলীয় মানুষের জীবনরেখা। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে সুন্দরবন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হলেও, এর প্রকৃত গুরুত্ব নিহিত আছে এর প্রাকৃতিক পুনর্জন্মের ক্ষমতায়।

 

নদী, জোয়ার-ভাটা এবং কাদা-চরের জটিল সমন্বয়ে এই বন নিজেকে প্রতিনিয়ত পুনর্গঠন করে, টিকিয়ে রাখে হাজারো প্রাণ ও মানুষের অস্তিত্ব। সম্প্রতি সাতক্ষীরার শ্যামনগরে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর উদ্যোগে “লংমার্চ ফর ফরেস্ট” কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। নদীর চরে ভেসে আসা বনজ বীজ সংগ্রহ বন্ধের দাবিতে আয়োজিত এই কর্মসূচি কেবল একটি প্রতিবাদ নয়; এটি সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ রক্ষায় একটি গভীর সতর্ক সংকেত।

 

কারণ, যেটি একসময় প্রাকৃতিকভাবে বন সৃষ্টি করত, সেই প্রক্রিয়াই আজ মানুষের হস্তক্ষেপে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সুন্দরবনের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো এর স্বয়ংক্রিয় পুনর্জন্ম ব্যবস্থা। সুন্দরী, গেওয়া, গরান, কেওড়া, পশুরসহ বিভিন্ন ম্যানগ্রোভ গাছের ফল ও বীজ জোয়ারের পানিতে ভেসে নদী, খাল ও চরের কাদায় পৌঁছে যায়। সেখানে উপযুক্ত পরিবেশ পেলে সেগুলো অঙ্কুরিত হয়ে নতুন গাছের জন্ম দেয়।

 

এই প্রক্রিয়ায় মানুষের কোনো পরিকল্পনা বা হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হয় না। প্রকৃতি নিজেই নির্ধারণ করে কোথায় কোন গাছ জন্মাবে। ফলে যে গাছ জন্মায়, তা সেই পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজিত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জন করে। কিন্তু গত কয়েক দশকে এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটছে। নদীর চরে ভেসে আসা বনজ বীজ স্থানীয় কিছু মানুষ জ্বালানি বা অন্যান্য প্রয়োজনে সংগ্রহ করছেন। এটি ব্যক্তিগত পর্যায়ে ক্ষুদ্র ঘটনা মনে হলেও, সমষ্টিগতভাবে এর প্রভাব ভয়াবহ।

অনেকে মনে করতে পারেন, কয়েকটি বীজ সংগ্রহ করলে কী এমন ক্ষতি হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রতিটি বীজ একটি সম্ভাব্য গাছ, আর প্রতিটি গাছ একটি সম্ভাব্য বাস্তুতন্ত্র। একটি পরিপূর্ণ ম্যানগ্রোভ গাছ শুধু কাঠ বা ছায়া নয়Ñএটি শতাধিক প্রজাতির প্রাণীর আবাসস্থল, নদীর তীর সংরক্ষণের প্রাকৃতিক দেয়াল এবং কার্বন শোষণের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। অর্থাৎ একটি গাছ হারানো মানে একটি পুরো ক্ষুদ্র জীবনচক্রের সম্ভাবনা হারানো। যখন হাজার হাজার বীজ সংগ্রহ করা হয়, তখন ভবিষ্যতের বন গঠনের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে।

 

এই ক্ষতি তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান না হলেও, দুই বা তিন দশক পরে এর প্রভাব ভয়াবহভাবে প্রকাশ পায়। বর্তমান বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের চরম বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ তার অন্যতম ভুক্তভোগী দেশ। ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা, আম্পান, ইয়াস কিংবা রেমালের মতো দুর্যোগ সুন্দরবনের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে। এমন পরিস্থিতিতে সুন্দরবনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার পুনর্জন্ম ক্ষমতা। পুরোনো গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও নতুন গাছ জন্ম নিয়ে সেই ক্ষতি পূরণ করে। কিন্তু যদি সেই প্রাকৃতিক পুনর্জন্ম প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়, তবে বন ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়বে।

 

সুতরাং বনজ বীজ সংগ্রহ বন্ধের বিষয়টি কেবল বন সংরক্ষণের প্রশ্ন নয়; এটি জলবায়ু অভিযোজনেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সুন্দরবনকে বলা হয় বাংলাদেশের সবুজ ঢাল। ঘূর্ণিঝড়ের সময় এই বন বাতাসের গতি কমায়, জলোচ্ছ্বাসের শক্তি হ্রাস করে এবং নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণ করে। অর্থাৎ প্রতিটি নতুন গাছ ভবিষ্যতের একটি প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা স্তম্ভ। একটি বীজ আজ রক্ষা পেলে তা ভবিষ্যতে একটি পূর্ণবয়স্ক গাছে পরিণত হবে, যা হয়তো কোনো এক দুর্যোগে হাজার মানুষের জীবন বাঁচাবে।

 

তাই একটি বীজের গুরুত্ব কেবল পরিবেশগত নয়, এটি মানবিক নিরাপত্তার সঙ্গেও যুক্ত। তবে সমস্যাটিকে একমাত্র পরিবেশগত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যাবে না। শ্যামনগর, আশাশুনি, কয়রা কিংবা মোংলা অঞ্চলের বহু মানুষ চরম দারিদ্র্েযর মধ্যে বসবাস করেন। বিকল্প জ্বালানি, কর্মসংস্থান ও আয়বর্ধক সুযোগের অভাবে তাঁরা প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। নদীতে ভেসে আসা বনজ বীজ সংগ্রহ তাঁদের কাছে সহজ ও সস্তা জ্বালানির উৎস। তাই শুধু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে তা বাস্তবসম্মত হবে না। বরং এতে সামাজিক অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। এখানে রাষ্ট্রের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

পরিবেশ সংরক্ষণ করতে হলে আগে মানুষের জীবন-জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমান বন আইন বন ধ্বংসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেও “প্রাকৃতিকভাবে ভেসে আসা বীজ সংগ্রহ” বিষয়ে স্পষ্ট বিধান নেই। ফলে এটি এক ধরনের ধূসর এলাকায় থেকে যায়, যেখানে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ কঠিন। বন বিভাগের জনবল সীমিত, নদী ও চরের বিস্তৃতি বিশাল, আর স্থানীয় অর্থনৈতিক চাপ অত্যন্ত বেশি।

 

এই বাস্তবতায় শুধু প্রশাসনিক উদ্যোগ দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি আধুনিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক নীতিমালা, যেখানে পুনর্জন্ম প্রক্রিয়া আলাদা করে সুরক্ষিত থাকবে। সুন্দরবনের কোন এলাকায় কত বীজ স্বাভাবিকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, কোথায় পুনর্জন্ম বেশি হচ্ছেÑএ ধরনের তথ্য এখনো সম্পূর্ণভাবে সংগৃহীত নয়। ফলে পরিকল্পনা অনেকাংশে অনুমাননির্ভর। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বন বিভাগের সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ “ম্যানগ্রোভ পুনর্জন্ম মানচিত্র” তৈরি করা জরুরি। এতে করে সংরক্ষণ কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে। ইন্দোনেশিয়া, ভারত ও থাইল্যান্ডে ম্যানগ্রোভ সংরক্ষণে স্থানীয় জনগণকে সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে।

 

সেখানে “কমিউনিটি ফরেস্ট ম্যানেজমেন্ট” পদ্ধতিতে মানুষকে বন রক্ষার অংশীদার করা হয়। বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়ায় স্থানীয় জনগণকে আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে বীজ সংরক্ষণে উৎসাহিত করা হয়। ফলে বন ধ্বংসের প্রবণতা কমেছে এবং পুনর্জন্ম বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশেও এই ধরনের অংশীদারিত্বভিত্তিক মডেল গ্রহণ করা যেতে পারে। সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পুনর্জন্ম রক্ষায় কয়েকটি কার্যকর পদক্ষেপ জরুরিÑপ্রথমত, নদীতে ভেসে আসা বনজ বীজ সংগ্রহ নিয়ন্ত্রণে স্পষ্ট আইন প্রণয়ন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জন্য বিকল্প জ্বালানি ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে।

তৃতীয়ত, স্থানীয় জনগণকে বন সংরক্ষণের অংশীদার করতে হবে। চতুর্থত, গবেষণাভিত্তিক পুনর্জন্ম মানচিত্র তৈরি করতে হবে।পঞ্চমত, ব্যাপক জনসচেতনতা কর্মসূচি চালাতে হবে। সুন্দরবন কেবল একটি বন নয়Ñএটি বাংলাদেশের জলবায়ু নিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি।

 

এই বনের প্রতিটি বীজ ভবিষ্যতের একটি গাছ, প্রতিটি গাছ ভবিষ্যতের একটি ঢাল। আজ যে বীজ নদীতে ভেসে আসে, সেটি যদি রক্ষা করা যায়, তবে সেটিই একদিন উপকূলকে রক্ষা করবে। আর যদি সেই বীজ হারিয়ে যায়, তবে হারিয়ে যাবে ভবিষ্যতের বন, ভবিষ্যতের নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা। অতএব, প্রশ্নটি এখন আর শুধু বন রক্ষার নয়Ñপ্রশ্নটি হলো আমরা কীভাবে আমাদের ভবিষ্যৎকে রক্ষা করব।

একটি ছোট বীজ হয়তো চোখে তুচ্ছ, কিন্তু সেই বীজের মধ্যেই লুকিয়ে আছে একটি বন, একটি উপকূল এবং একটি জাতির টিকে থাকার সম্ভাবনা।
লেখক: সংবাদকর্মী

কলারোয়ায় ভ্রাম্যমান আদালতে দুই হোটেল মালিককে জরিমানা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬, ৪:৪৫ অপরাহ্ণ
কলারোয়ায় ভ্রাম্যমান আদালতে দুই হোটেল মালিককে জরিমানা

নিজস্ব প্রতিনিধি: কলারোয়ায় দুই হোটেল মালিককে জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমান আদালত।

 

বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে উপজেলা মোড়স্থ রাজ হোটেলের মালিককে ৩ হাজার টাকা ও দুলাল হোটেলের মালিককে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মেহেদী হাসান তানভীর।

 

তিনি জানান, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে ও ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় এ ধরণেরর অভিযান অব্যাহত থাকবে।