ইসলামের দৃষ্টিতে কৃত্রিম লিঙ্গ পরিবর্তন ও ট্রান্সজেন্ডারবাদ: শরিয়তভিত্তিক পর্যালোচনা
প্রভাষক মুহাদ্দিস ওবায়দুল্লাহ
সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে ট্রান্সজেন্ডারবাদ ও চিকিৎসার মাধ্যমে লিঙ্গ পরিবর্তন অন্যতম। এ নিয়ে সামাজিক, পারিবারিক ও ধর্মীয় পরিসরে নানা বিতর্ক রয়েছে। মুসলিম সমাজেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। ইসলামী শরিয়তের আলোকে জন্মগত লিঙ্গ পরিচয় ও শারীরিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তনের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে জন্মগত শারীরিক জটিলতা এবং স্বেচ্ছায় লিঙ্গ পরিবর্তনের বিষয়কে আলাদাভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
আল্লাহর সৃষ্টিতে পরিবর্তন ও কোরআনের নির্দেশনা
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘এবং তিনিই যুগল সৃষ্টি করেছেনÑনর ও নারী, এক ফোঁটা শুক্র থেকে, যখন তা স্খলিত করা হয়।’ (সুরা আন-নাজম, আয়াত ৪৫-৪৬)।
সুরা আন-নিসার ১১৯ নম্বর আয়াতে শয়তানের প্ররোচনার কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ‘আমি অবশ্যই তাদের পথভ্রষ্ট করব… এবং তাদের আদেশ করব, ফলে তারা আল্লাহর সৃষ্টি পরিবর্তন করে দেবে।’ ইসলামী চিন্তাবিদদের অনেকে এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লাহর সৃষ্টির স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য অপ্রয়োজনে পরিবর্তনের বিষয়টিকে নিষেধের অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
হাদিসের আলোকে লিঙ্গ পরিবর্তনের বিধান
হাদিসে পুরুষের নারীর সাদৃশ্য এবং নারীর পুরুষের সাদৃশ্য গ্রহণের বিষয়ে কঠোর সতর্কতা এসেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ ধরনের আচরণকারীদের অভিসম্পাত করেছেন বলে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।
ইমাম শামসুদ্দীন আয-জাহাবি (রহ.) তাঁর ‘কিতাবুল কাবায়ির’ গ্রন্থেও এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। ইসলামী ফিকহের প্রচলিত ব্যাখ্যা অনুযায়ী, স্বাভাবিক ও সুস্পষ্ট লিঙ্গ বৈশিষ্ট্য থাকা সত্ত্বেও কেবল ইচ্ছার ভিত্তিতে অস্ত্রোপচার বা অন্য পদ্ধতিতে বিপরীত লিঙ্গে রূপান্তর করা নাজায়েজ বলে বিবেচিত।
আধুনিক ফতোয়া ও ফিকহের মূলনীতি
সমসাময়িক বিভিন্ন ইসলামি ফতোয়া প্রতিষ্ঠান ও আলেমের মতেও, শরিয়তসম্মত প্রয়োজন ছাড়া অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জন্মগত লিঙ্গ পরিবর্তন অনুমোদিত নয়। ফিকহের একটি সাধারণ নীতি হলো, শরিয়তসম্মত প্রয়োজন ছাড়া আল্লাহর সৃষ্টিতে পরিবর্তন আনা নিষিদ্ধ। তবে চিকিৎসাগত প্রয়োজন ও জন্মগত ত্রুটির ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম রয়েছে।
জন্মগত শারীরিক জটিলতা ও ইন্টারসেক্সের বিধান
ইসলামী শরিয়তে জন্মগতভাবে নারী-পুরুষ উভয় লিঙ্গের বৈশিষ্ট্য থাকা বা প্রকৃত লিঙ্গ নির্ধারণে জটিলতার বিষয়টি আলাদাভাবে বিবেচনা করা হয়েছে। ফিকহে এ ধরনের অবস্থাকে ‘খুনসা’ বলা হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও শরিয়তের নীতিমালা অনুসরণ করে প্রকৃত লিঙ্গ নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচার করা জায়েজ বলে অনেক আলেম মত দিয়েছেন। এটি স্বেচ্ছায় লিঙ্গ পরিবর্তনের সমতুল্য নয়; বরং জন্মগত শারীরিক জটিলতা নিরসনের চিকিৎসা।
পরিশেষে বলা যায়, কৃত্রিম লিঙ্গ পরিবর্তন, জন্মগত শারীরিক বৈশিষ্ট্য এবং লিঙ্গ পরিচয়সংক্রান্ত মানসিক বা মনস্তাত্ত্বিক জটিলতাÑএগুলোকে এক করে দেখা উচিত নয়। ইসলামী শরিয়তের বিধান ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে কোরআন-সুন্নাহ, ফিকহের মূলনীতি এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য বিবেচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে এ ধরনের জটিলতায় থাকা মানুষের প্রতি মানবিক আচরণ, যথাযথ চিকিৎসা ও পরামর্শের সুযোগ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। লেখক: প্রভাষক, কামিল হাদিস বিভাগ, সাতক্ষীরা আলিয়া কামিল মাদ্রাসা












