জনবল সংকটে আশাশুনির প্রাণিসম্পদ দপ্তর: সেবা থেকে বঞ্চিত প্রান্তিক খামারিরা
সচ্চিদানন্দ দে সদয়, আশাশুনি: আশাশুনি উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে দীর্ঘদিনের জনবল সংকট এখন প্রকট আকার ধারণ করেছে। ১৩টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র চারজন কর্মকর্তা-কর্মচারী। এতে করে উপজেলার প্রান্তিক, ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিরা প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
উপজেলা সদরের আশপাশের কিছু মানুষ ভেটেরিনারি হাসপাতালের সুবিধা পেলেও দূরবর্তী গ্রামের খামারিরা কার্যত এই সেবা থেকে বাইরে রয়ে যাচ্ছেন। ফলে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির রোগব্যাধি মোকাবিলায় তারা পড়ছেন চরম দুর্ভোগে।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার পদটি দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। ভেটেরিনারি সার্জন ডা. মো. আব্দুস সালাম অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে এই পদ সামলাচ্ছেন। ভেটেরিনারি ফিল্ড অ্যাসিস্ট্যান্টের তিনটি পদের মধ্যে কর্মরত আছেন মাত্র একজন। একইভাবে উপ-সহকারী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (প্রাণি স্বাস্থ্য) এস এম নুরুজ্জামান অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে কৃত্রিম প্রজনন কার্যক্রমও দেখভাল করছেন।
এ ছাড়া অফিস সহায়ক ও পরিচ্ছন্নতা কর্মীর পদ দুটি শূন্য থাকলেও একজন কম্পিউটার অপারেটর ও একজন ড্রেসার দিয়ে কোনোভাবে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
উপজেলার নয়টি ইউনিয়নে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নয়জন কৃত্রিম প্রজনন (এআই) টেকনেশিয়ান থাকলেও শ্রীউলা ও বুধহাটা ইউনিয়নে কোনো টেকনেশিয়ান নেই। ফলে এসব এলাকার খামারিরা প্রাথমিক চিকিৎসা ও সেবা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।
স্থানীয় খামারিদের অভিযোগ, জনবল সংকটের কারণে দ্রুত চিকিৎসা সেবা পাওয়া যায় না। অনেক ক্ষেত্রে রোগ ছড়িয়ে পড়ে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। প্রত্যন্ত অঞ্চলের খামারিরা তাই শিক্ষিত যুবক-যুবতীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে অন্তত প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা চালুর দাবি জানিয়েছেন।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় নিবন্ধিত গরুর খামার রয়েছে ৯টি এবং মুরগির খামার ৫টি। তবে নিবন্ধন ছাড়াই গ্রামে অসংখ্য পরিবার গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালন করছে। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে অনেকেই সরকারি ফি দিয়ে নিবন্ধনে আগ্রহ দেখান না।
ভেটেরিনারি সার্জন ডা. মো. আব্দুস সালাম বলেন, “জনবল সংকট থাকা সত্ত্বেও আমরা চিকিৎসা, পরামর্শ ও টিকাদানসহ বিভিন্ন সেবা দিয়ে যাচ্ছি। প্রত্যন্ত অঞ্চলে উঠান বৈঠক ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে খামারিদের সচেতন করার চেষ্টা চলছে।”
তিনি আরও জানান, সরকার নির্ধারিত স্বল্প মূল্যে গরুর বিভিন্ন রোগ যেমন তড়কা, বাদলা, ক্ষুরা ও এলএসডি রোগের টিকা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ছাগল-ভেড়ার পিপিআর ও গোট পক্স এবং হাঁস-মুরগির বিভিন্ন রোগের টিকাও সরবরাহ করা হচ্ছে। কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে উন্নত জাতের বীজও দেওয়া হচ্ছে নির্ধারিত মূল্যে।
তবে, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চলা প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্প শেষ হয়ে যাওয়ায় খামারিরা আগের মতো আর্থিক সহায়তা ও প্রযুক্তিগত সুবিধা পাচ্ছেন না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু কীটনাশকের দোকানে লাইসেন্স ছাড়া পশুখাদ্য বিক্রি হচ্ছে, যা প্রাণিসম্পদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে প্রাণিসম্পদ দপ্তর।
খামারি ও পশুপালকদের দাবি, ইউনিয়নভিত্তিক কৃত্রিম প্রজনন কর্মী বাড়ানো, নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার এবং দ্রুত শূন্য পদগুলো পূরণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে এই গুরুত্বপূর্ণ খাতটি বড় ধরনের সংকটে পড়বে। জনবল সংকট নিরসনে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন












