মাঠে সোনালি ধান, তবুও কৃষকের মুখে দুশ্চিন্তার রেখা
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
বিস্তীর্ণ গ্রামীণ জনপদে এখন বোরো ধান কাটার মৌসুম। তালা, কলারোয়া, আশাশুনি, দেবহাটা, শ্যামনগর-সবখানেই একই দৃশ্য। মাঠজুড়ে সোনালি ধানের ঢেউ, উঠোনে মাড়াই, গোলায় নতুন ফসল তোলার প্রস্তুতি। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাস্তের শব্দে মুখর গ্রামবাংলা। প্রথম দেখায় এটি প্রাচুরে্যর এক উজ্জ্বল ছবি-একটি সফল মৌসুমের প্রতিচ্ছবি। কিন্তু এই দৃশ্যের আড়ালে রয়েছে এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা-বাম্পার ফলনের মাঝেও কৃষকের মুখে স্বস্তির হাসি নেই। এই বৈপরীত্য-উৎপাদন বাড়লেও আয় না বাড়া-বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির একটি দীর্ঘদিনের সমস্যার প্রতিফলন। সাতক্ষীরার মতো উপকূলীয় জেলায় এই সমস্যা আরও প্রকট হয়ে ওঠে, কারণ এখানে প্রাকৃতিক ঝুঁকি ও বাজারব্যবস্থার দুর্বলতা একসঙ্গে কাজ করে। সাতক্ষীরা মূলত একটি উপকূলীয় জেলা। এখানে কৃষি শুধু পেশা নয়, জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা-এই সব প্রতিকূলতা মোকাবিলা করেই কৃষকেরা প্রতিবছর ফসল ফলান। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আবহাওয়া তুলনামূলক অনুকূলে থাকায় বোরো ধানের ফলন ভালো হয়েছে। উন্নত জাতের বীজ, সেচব্যবস্থা এবং কৃষি সম্প্রসারণ কার্যক্রমের কারণে উৎপাদন বেড়েছে। অনেক কৃষক জানিয়েছেন, গত বছরের তুলনায় ফলন বেশি হয়েছে। কিন্তু এই সাফল্য কৃষকের জীবনে প্রত্যাশিত স্বস্তি এনে দিতে পারছে না। কারণ, উৎপাদনের পরবর্তী ধাপ-বাজার-এখনো তাদের জন্য অনিশ্চিত ও প্রতিকূল। উৎপাদন খরচের চাপ: লাভের সীমা সংকুচিত, গত কয়েক বছরে কৃষি উপকরণের দাম ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি সারের দাম বৃদ্ধি, ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি, যার প্রভাব সেচে, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্য, শ্রমিক সংকট ও মজুরি বৃদ্ধি,এসব কারণে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। সাতক্ষীরার মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে-প্রতি মণ ধান উৎপাদনে খরচ: ৭৫০-৯০০ টাকা, অনেক ক্ষেত্রে বিক্রি: ৭০০-৯৫০ টাকার মধ্যে অর্থাৎ, লাভের পরিসর অত্যন্ত সীমিত, অনেক সময় শূন্যের কাছাকাছি। ফলে কৃষকের পরিশ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে না। সাতক্ষীরার কৃষকদের একটি বড় অংশ দাদন বা আগাম ঋণের ওপর নির্ভরশীল। মৌসুম শুরুর আগে তাদের হাতে পর্যাপ্ত মূলধন থাকে না। ফলে তারা মহাজন, এনজিও বা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ঋণ নেন। এই ঋণের বিনিময়ে অনেক সময় অঘোষিত শর্ত থাকে-ফসল উঠলে নির্দিষ্ট দামে সেই ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করতে হবে। ফলে কৃষক বাজারে ভালো দাম পেলেও সেই সুবিধা নিতে পারেন না। তিনি হয়ে পড়েন ‘বাধ্য বিক্রেতা’। এই কাঠামো কৃষকের দরকষাকষির ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে। মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব: বৈষম্যমূলক মূল্য শৃঙ্খলধান উৎপাদন থেকে ভোক্তার প্লেটে পৌঁছানো পর্যন্ত একটি দীর্ঘ সরবরাহ শৃঙ্খল রয়েছে। এতে ফড়িয়া, আড়তদার, মিলার, পাইকার-অনেকেই যুক্ত। সমস্যা হলো, এই শৃঙ্খলে সবচেয়ে কম লাভ পান উৎপাদক কৃষক। ফড়িয়ারা মাঠ থেকে কম দামে ধান কিনে-সংরক্ষণ করে বা দ্রুত বাজারে বিক্রি করেপরে সেই ধান মিল হয়ে চাল হিসেবে উচ্চমূল্যে বিক্রি হয়। এই ব্যবস্থায়-ঝুঁকি নেয় কৃষকলাভ পায় মধ্যস্বত্বভোগী, ফলে কৃষি অর্থনীতিতে একটি বৈষম্য তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। গ্রামীণ সাতক্ষীরায় আধুনিক সংরক্ষণ অবকাঠামোর অভাব রয়েছে। ধান কাটার পর কৃষকের সামনে দুটি পথ- সংরক্ষণ করা, দ্রুত বিক্রি করা, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা দ্বিতীয় পথটি বেছে নেন, কারণ-নগদ অর্থের প্রয়োজন, ঋণ পরিশোধের চাপ, সংরক্ষণের সুবিধার অভাব, ফলে মৌসুমের শুরুতেই বাজারে সরবরাহ বেড়ে গিয়ে দাম কমে যায়। সাতক্ষীরার বিশেষ বাস্তবতা হলো এর জলবায়ু ঝুঁকি। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা কৃষিকে অনিশ্চিত করে তোলে। এই অনিশ্চয়তা কৃষকের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। তিনি নিশ্চিত কম দামে বিক্রি করাকে অনেক সময় বেশি নিরাপদ মনে করেন। এটি একটি ‘ঝুঁকি এড়ানোর অর্থনীতি’, যা বাজারের স্বাভাবিক গতিকে প্রভাবিত করে। সরকারি ক্রয়নীতি: সীমাবদ্ধতা ও বাস্তবতা-সরকারি ধান সংগ্রহ কর্মসূচি কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। কিন্তু সাতক্ষীরার বাস্তবতায় এটি পুরোপুরি কার্যকর নয়। সমস্যাগুলো হলো-ক্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা কম, প্রক্রিয়া জটিল, প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ, ফলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকেরা এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। কৃষকের মনস্তত্ত্ব: তাৎক্ষণিক প্রয়োজনের অগ্রাধিকার-কৃষকের সিদ্ধান্ত শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিকও। পরিবারের খরচ-ঋণের চাপ, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা-এই সবকিছু মিলিয়ে তিনি দ্রুত নগদ অর্থকে অগ্রাধিকার দেন। ফলে সম্ভাব্য বেশি দামের অপেক্ষা না করে কম দামে বিক্রি করাই বাস্তবসম্মত মনে হয়। সমাধানের পথ: কাঠামোগত পরিবর্তন জরুরি-এই সমস্যার সমাধানে কিছু মৌলিক পদক্ষেপ প্রয়োজন-সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ক্রয়, সরকারি ক্রয়কেন্দ্র বাড়াতে হবে, প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। সংরক্ষণ অবকাঠামো উন্নয়ন-গ্রাম পর্যায়ে আধুনিক গুদাম স্থাপন করতে হবে। সমবায়ের মাধ্যমে বাজারে দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব। মধ্যস্বত্বভোগীদের অনিয়ন্ত্রিত প্রভাব কমাতে হবে। কৃষককে বাজারদরের তথ্য সহজলভ্য করতে হবে। সাতক্ষীরার মাঠে আজ যে সোনালি ধান দুলছে, তা শুধু খাদ্য উৎপাদনের প্রতীক নয়-এটি কৃষকের পরিশ্রম, সংগ্রাম ও আশার প্রতিচ্ছবি। কিন্তু যদি সেই ফসলের ন্যায্যমূল্য কৃষকের ঘরে না পৌঁছায়, তাহলে এই সাফল্য অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। বাম্পার ফলন তখনই সত্যিকার অর্থে সাফল্য হবে, যখন কৃষকের ঘরেও স্বস্তি, নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত হবে। সাতক্ষীরার এই বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়-কৃষির সাফল্য শুধু উৎপাদনের অঙ্কে নয়,কৃষকের জীবনের মানে তার প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয়। লেখক: সংবাদ কর্মী












