বৃদ্ধাশ্রম নয়Ñপ্রবীণ জীবনের নতুন দর্শন: প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ
শেখ সিদ্দিকুর রহমান
বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় একসময় বার্ধক্য মানেই ছিল সংসারের কেন্দ্রস্থলে অবস্থান। পরিবারের প্রবীণ সদস্যরা ছিলেন সিদ্ধান্তের অভিভাবক, অভিজ্ঞতার ভা-ার এবং পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারক। যৌথ পরিবারের সেই দীর্ঘ সংস্কৃতিতে বাবা-মা বা দাদা-দাদিকে আলাদা কোথাও রেখে আসার ধারণা শুধু অচিন্তনীয়ই নয়, অনেক ক্ষেত্রে সামাজিকভাবে অসম্মানের বলেও বিবেচিত হতো।
কিন্তু সময় বদলেছে। নগরায়ণ, কর্মব্যস্ত জীবন, বিদেশমুখী প্রজন্ম, ছোট পরিবার, আর্থিক চাপ ও সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের প্রবীণ জীবনের বাস্তবতাও বদলে গেছে। আজ অনেক প্রবীণ মানুষ শারীরিক অসুস্থতা, একাকিত্ব, মানসিক অবসাদ ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। সেই বাস্তবতা থেকেই দেশে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে “বৃদ্ধাশ্রম”, “প্রবীণ নিবাস”, “রিটায়ারমেন্ট হোম” কিংবা “সিনিয়র লিভিং কমিউনিটি”।
তবে আধুনিক সময়ে “বৃদ্ধাশ্রম” শব্দটির অর্থও বদলাচ্ছে। এটি আর কেবল অসহায় মানুষের আশ্রয় নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি হয়ে উঠছে স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা, সঙ্গ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের বিকল্প আবাস।
বাংলাদেশে সংগঠিতভাবে বৃদ্ধাশ্রম চালুর ইতিহাস খুব বেশি পুরোনো নয়। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন দাতব্য ও সমাজকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান অসহায় বৃদ্ধদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়। ধারণা করা হয়, ১৯৮০-এর দশকে ঢাকায় এবং কিছু জেলা শহরে প্রথম দিকের বৃদ্ধাশ্রম কার্যক্রম শুরু হয়। পরবর্তীতে সরকারি সমাজসেবা অধিদপ্তর, বেসরকারি সংগঠন, ধর্মীয় ট্রাস্ট ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রবীণ নিবাসের সংখ্যা বাড়তে থাকে।
বাংলাদেশে বৃদ্ধাশ্রম ধারণার প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশে কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সমাজসেবকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকার আগারগাঁও, মিরপুর, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রবীণদের জন্য নিবাস গড়ে ওঠে। পরে “প্রবীণ হিতৈষী সংঘ”, “চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এজ কেয়ার”, “আপন নিবাস”, “বিরাম”, “প্রবীণ নিবাস” ইত্যাদি নামের প্রতিষ্ঠান আলোচনায় আসে।
বর্তমানে বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে কয়েক ডজন বৃদ্ধাশ্রম বা প্রবীণ নিবাস রয়েছে বলে বিভিন্ন সামাজিক সংস্থার তথ্যে জানা যায়। তবে সঠিক সংখ্যা প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে, কারণ নতুন নতুন নিবাস গড়ে উঠছে। এর মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠান শুধু অসহায় ও নিঃস্ব মানুষের জন্য, আবার কিছু উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত প্রবীণদের জন্য আধুনিক চিকিৎসা ও আবাস সুবিধাসম্পন্ন।
একসময় সমাজে ধারণা ছিল-যারা পরিবার থেকে বিতাড়িত বা একেবারে নিঃস্ব, তারাই বৃদ্ধাশ্রমে থাকেন। কিন্তু আধুনিক বাস্তবতা সেই ধারণাকে ভেঙে দিয়েছে। এখন অনেক বিত্তশালী, শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত মানুষও স্বেচ্ছায় প্রবীণ নিবাসে বসবাস করছেন। কারণ সেখানে রয়েছে নিয়মিত চিকিৎসা, নিরাপত্তা, সঙ্গ, মানসিক সহায়তা ও পেশাদার পরিচর্যা।
সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে প্রতিষ্ঠিত “জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ রিটায়ারমেন্ট হোমস অ্যান্ড হাসপাতাল” নতুন করে আলোচনায় এসেছে। শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে প্রায় পাঁচ একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা এই আধুনিক প্রবীণ নিবাসে রয়েছে আন্তর্জাতিক মানের অ্যাপার্টমেন্ট, হাসপাতাল, কেয়ারগিভার, ফিজিওথেরাপি, লাইব্রেরি, হাঁটার জায়গা, এমনকি মানসিক প্রশান্তির ব্যবস্থাও।
এখানে শুধু অসহায় মানুষ নন, সাবেক রাষ্ট্রদূত, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসক, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও বিদেশফেরত নাগরিকরাও বসবাস করছেন। অনেকেই বলছেন, এটি “বৃদ্ধাশ্রম” নয়; বরং বার্ধক্যের জন্য একটি মর্যাদাপূর্ণ জীবনব্যবস্থা।
বাংলাদেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠী দ্রুত বাড়ছে। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, দেশে ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা দেড় কোটিরও বেশি। জাতিসংঘের প্রক্ষেপণ বলছে, ২০৫০ সালের মধ্যে দেশের প্রতি পাঁচজনের একজন প্রবীণ হবেন। ফলে প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষা আগামী দিনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হতে যাচ্ছে।
প্রবীণদের বড় সমস্যা শুধু শারীরিক অসুস্থতা নয়; একাকিত্বও একটি ভয়াবহ বাস্তবতা। অনেক সন্তানেরা বিদেশে থাকেন, কেউ কর্মসূত্রে অন্য শহরে, আবার কেউ নিজ নিজ ব্যস্ততায় আবদ্ধ। ফলে বাড়িতে থেকেও অনেক প্রবীণ নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করেন। আধুনিক প্রবীণ নিবাসগুলো এই একাকিত্ব কমাতে সামাজিক যোগাযোগ, সঙ্গ, মানসিক সহায়তা ও সক্রিয় জীবনযাপনের পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছে।
সাতক্ষীরাতেও প্রবীণদের জন্য কিছু উদ্যোগ রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে “বৃদ্ধাশ্রম”, “প্রবীণ সেবা কেন্দ্র” বা “প্রবীণ নিবাস” ধরনের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোগের কথা স্থানীয়ভাবে জানা যায়। এর মধ্যে কিছু সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহায়তায় পরিচালিত, আবার কিছু ব্যক্তিগত ও দাতব্য উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত। সাতক্ষীরা শহর ও আশপাশে বয়স্কদের জন্য আশ্রয় ও সেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে এমন কয়েকটি সংগঠনের নাম স্থানীয়ভাবে শোনা যায়, যদিও এদের সবগুলো পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বৃদ্ধাশ্রম নয়।
তবে বাস্তবতা হলো, সাতক্ষীরার মতো জেলায় প্রবীণ নিবাসের প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই বাড়ছে। কারণ এখান থেকেও বিপুলসংখ্যক মানুষ কর্মসংস্থানের জন্য ঢাকা বা বিদেশে চলে যাচ্ছেন। ফলে গ্রামে একা পড়ে থাকছেন অনেক বৃদ্ধ বাবা-মা।
এই পরিস্থিতিতে শুধু বৃদ্ধাশ্রম নির্মাণ করলেই হবে না; প্রয়োজন প্রবীণবান্ধব সমাজ গড়ে তোলা। পরিবার, রাষ্ট্র, সমাজ ও ব্যক্তিগত দায়িত্ব—সবকিছুর সমন্বয়েই একজন প্রবীণ মানুষ সম্মানজনক জীবন পেতে পারেন।
বার্ধক্য কোনো অভিশাপ নয়; এটি জীবনের স্বাভাবিক অধ্যায়। যারা একদিন পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র গড়তে শ্রম দিয়েছেন, তাদের শেষ বয়স যেন অবহেলা, নিঃসঙ্গতা বা অনিশ্চয়তায় না কাটেÑসেটিই হওয়া উচিত সভ্য সমাজের অঙ্গীকার।
আজকের আধুনিক প্রবীণ নিবাসগুলো হয়তো সেই নতুন বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি, যেখানে মানুষ শুধু আশ্রয় নয়, খুঁজছেন সম্মান, যতœ, নিরাপত্তা ও একটু মানবিক সঙ্গ। লেখক: সভাপতি, উদীচী, সাতক্ষীরা জেলা শাখা












