সম্পাদকীয়: প্রসঙ্গ: বিচারকশূন্য ট্রাইব্যুনাল
একটি জেলার কয়েক হাজার মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার একমাত্র আশ্রয়স্থল যখন দীর্ঘ ছয় মাস ধরে বিচারকশূন্য থাকে, তখন তাকে কেবল প্রশাসনিক অবহেলা বললে ভুল হবে; বরং এটি বিচারপ্রক্রিয়ার একটি বড় অন্তরায়। সাতক্ষীরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বর্তমান চিত্র সেই রূঢ় বাস্তবতাকে আমাদের সামনে নিয়ে এসেছে। ৪ হাজার ৩৪২টি মামলার স্তূপ আর কয়েক হাজার বিচারপ্রার্থীর অন্তহীন প্রতীক্ষা আমাদের বিচারিক কাঠামোর এক বড় দুর্বলতার দিকে আঙুল তুলছে।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাতক্ষীরার এই ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। যার মধ্যে আড়াই হাজারের বেশি নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত মামলা, যা অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং দ্রুত নিষ্পত্তির দাবি রাখে। অথচ ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাস থেকে আদালতটি কার্যত অভিভাবকহীন। এর আগে একজন বিচারক যোগদান করলেও মাত্র মাস দেড়েকের মাথায় তার বদলি হয়ে যাওয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বর্তমানে জেলা ও দায়রা জজ ভারপ্রাপ্ত হিসেবে কিছু জরুরি কাজ করলেও মূল বিচারিক কার্যক্রমÑযেমন নতুন মামলা গ্রহণ, অভিযোগ গঠন বা সাক্ষ্যগ্রহণ প্রায় বন্ধ হয়ে আছে।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মূল উদ্দেশ্যই হলো ভুক্তভোগীদের দ্রুততম সময়ে আইনি সুরক্ষা ও প্রতিকার দেওয়া। কিন্তু যখন মামলার জট ৪ হাজার ছাড়িয়ে যায় এবং বিচারক না থাকায় প্রতিদিন মানুষ কেবল নতুন তারিখ নিয়ে আদালত থেকে ফিরে যান, তখন আইনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা টলে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। দূর-দূরান্ত থেকে আসা এই মানুষগুলো কেবল সময় এবং অর্থই ব্যয় করছেন না, তারা মানসিকভাবেও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছেন। বিশেষ করে মানবপাচার বা শিশুবিষয়ক স্পর্শকাতর মামলাগুলোর ক্ষেত্রে বিলম্ব হওয়া মানেই অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ বেড়ে যাওয়া এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হওয়া।
আমরা মনে করি, একটি জেলার একমাত্র ট্রাইব্যুনালকে এভাবে ছয় মাস ধরে অচল রাখা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব দিয়ে রুটিন কাজ চালানো গেলেও হাজার হাজার মামলার জট কমানো অসম্ভব। মামলার সংখ্যা অনুযায়ী যেখানে আরও ট্রাইব্যুনাল বাড়ানো প্রয়োজন, সেখানে বিদ্যমান একটি আদালতকে বিচারকশূন্য রাখা চরম উদাসীনতার বহিঃপ্রকাশ।
আইন মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের দাবি, বিচারপ্রার্থীদের এই চরম ভোগান্তি লাঘবে সাতক্ষীরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল অবিলম্বে একজন স্থায়ী ও দক্ষ বিচারক নিয়োগ দেওয়া হোক। ন্যায়বিচারের পথ সুগম করা কেবল আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকারের অংশ। সাতক্ষীরার বিচারপ্রার্থীদের এই দীর্ঘশ্বাস আর কতকাল দীর্ঘ হবে, সে প্রশ্নটি আমরা প্রশাসনের নিকট রাখতে চাই।












