জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত: পূর্বাভাসের বন্দিদশা থেকে মুক্ত হোক প্রান্তিক কৃষক
তারিক ইসলাম
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব আজ আর কোনো দূরবর্তী হুমকি নয়; এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের কঠিন বাস্তবতা। প্রতি বছর জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন (কপ) ঘিরে বৈশ্বিক পরাশক্তি ও নীতিনির্ধারকদের নানা আশ্বাস ও প্রতিশ্রুতি শোনা যায়। কিন্তু এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। আসন্ন কপ-৩১ সম্মেলনকে সামনে রেখে বৈশ্বিক জলবায়ু অর্থায়নের আলোচনায় একটি দাবি স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে—জলবায়ু অর্থায়নের কেন্দ্রে রাখতে হবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের।
বাংলাদেশের মতো কৃষিপ্রধান উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানেই লাখ লাখ কৃষকের বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা স্বপ্ন ও পরিশ্রম মুহূর্তেই ধূলিসাৎ হয়ে যাওয়া। খরা, বন্যা কিংবা ঘূর্ণিঝড়ের আগাম পূর্বাভাস দিয়েই দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। পূর্বাভাসের তথ্য জানা এক বিষয়, আর সেই তথ্য কাজে লাগিয়ে ফসল ও খামার রক্ষা করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। আবহাওয়ার বার্তা সময়মতো কৃষকের কাছে পৌঁছানোর পর সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা তাঁর আছে কি না, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
কোনো কৃষক যদি পূর্বাভাস থেকে জানতে পারেন যে পাঁচ দিন পর বন্যা হতে পারে, তাহলে এই সময়ের মধ্যে দ্রুত ফসল কাটার যন্ত্রপাতি সংগ্রহ, বীজ সংরক্ষণ কিংবা গবাদিপশুকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় সম্পদ তাঁর হাতে থাকতে হবে। কিন্তু আর্থিক সামর্থ্য, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও নিরাপদ অবকাঠামোর অভাবে অনেক কৃষকের পক্ষে আগাম সতর্কবার্তা পেয়েও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না। তাই শুধু তথ্য সরবরাহ নয়, সেই তথ্য কাজে লাগানোর মতো অবকাঠামো ও অভিযোজন সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য জলবায়ু তহবিলের অর্থ ক্ষুদ্র কৃষকদের কাছে কার্যকরভাবে পৌঁছানো জরুরি।
বর্তমানে কৃষিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। এসব প্রযুক্তি কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং জলবায়ুজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার হতে হবে পরিকল্পিত, সহজলভ্য ও কৃষকবান্ধব। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেন ক্ষুদ্র কৃষকের ঐতিহ্যগত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে উপেক্ষা করে তাঁকে সম্পূর্ণ প্রযুক্তি বা করপোরেট প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল করে না তোলে, সেদিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। প্রযুক্তির সুবিধা যেন শুধু বড় বাণিজ্যিক খামারগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। বরং ক্ষুদ্র কৃষকের আর্থিক সামর্থ্য ও বাস্তব প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে প্রযুক্তিসেবা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপে তাঁরা আরও প্রান্তিক হয়ে না পড়েন।
কপ-৩১ সম্মেলনকে শুধু আলোচনা ও প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ ও জনগোষ্ঠীর সহায়তায় গঠিত ক্ষয়ক্ষতি তহবিল এবং অভিযোজন অর্থায়ন যেন উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের সক্ষমতা বাড়াতে কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হয়, সে বিষয়ে জোরালো কূটনৈতিক অবস্থান নিতে হবে। একই সঙ্গে অর্থায়নের প্রক্রিয়া সহজ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা জরুরি, যাতে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা সহায়তা পেতে অযথা জটিলতার মুখে না পড়েন।
জলবায়ু অর্থায়নকে কেবল দয়া বা অনুদান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা বাড়ানো এবং তাদের জীবন-জীবিকা সুরক্ষিত রাখা বৈশ্বিক দায়িত্বের অংশ। তাই আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের উল্লেখযোগ্য অংশ কৃষি খাতের অভিযোজন, স্থানীয় উপযোগী প্রযুক্তির প্রসার এবং ক্ষুদ্র কৃষকের সুরক্ষায় বিনিয়োগ করা এখন সময়ের দাবি। কৃষকের হাতে প্রয়োজনীয় সম্পদ, প্রযুক্তি ও সহায়তা পৌঁছাতে পারলেই আগাম পূর্বাভাস বাস্তব সুরক্ষায় রূপ নেবে। আর প্রান্তিক কৃষকের ঘরে খাদ্যের নিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠিত হলেই শক্তিশালী হবে বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা।
লেখক: সভাপতি, সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি












