জলবায়ু পরিবর্তন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: প্রতিশ্রুতির আলোয় শঙ্কার ছায়া
তারিক ইসলাম
বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের সংকট ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে। এই সংকট মোকাবিলায় নতুন হাতিয়ার হিসেবে সামনে আনা হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিকে। আগামী কপ৩১ (সিওপি৩১) সম্মেলনের আয়োজক কর্তৃপক্ষ বিশ্ব পরিবেশ রক্ষায় এআইয়ের কার্যকর ব্যবহারের লক্ষ্যে একটি বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে ‘আনতালিয়া এআই অঙ্গীকার’। এতে পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং দায়িত্বশীল ও টেকসই উপায়ে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—এআই খাতের লাগামহীন সম্প্রসারণের মুখে পরিবেশ সুরক্ষার ভারসাম্য রক্ষা করা কতটা বাস্তবসম্মত? নাকি এই উদ্যোগও কেবল আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে?
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিপুল পরিমাণ পরিবেশগত তথ্য বিশ্লেষণ, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার পূর্বাভাস, স্মার্ট বিদ্যুৎ ব্যবস্থার মাধ্যমে জ্বালানি সাশ্রয় এবং কৃষি খাতে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার কৌশল নির্ধারণে এ প্রযুক্তি কার্যকর ভূমিকা রাখছে। সঠিক পরিকল্পনা ও ব্যবহারের মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং পরিবেশগত ঝুঁকি মোকাবিলায় এআই নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে।
তবে এর বিপরীত দিকটিও উদ্বেগজনক। উন্নত এআই মডেল প্রশিক্ষণ ও পরিচালনার জন্য প্রয়োজন হয় বিশাল তথ্যকেন্দ্র বা ডেটা সেন্টার। এসব কেন্দ্র পরিচালনায় বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ লাগে, যার একটি অংশ জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে আসে। একই সঙ্গে সার্ভার ঠান্ডা রাখতে প্রচুর পানির প্রয়োজন হয়। ফলে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রমবর্ধমান কার্বন নিঃসরণ ও জ্বালানি ব্যবহার জলবায়ু সুরক্ষার লক্ষ্য অর্জনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
কপ৩১ সম্মেলনকে সামনে রেখে ঘোষিত আনতালিয়া এআই অঙ্গীকারে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও নীতিনির্ধারকদের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—তথ্যকেন্দ্রে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, কম শক্তি খরচ করে কাজ করতে সক্ষম এআই মডেল তৈরি এবং এআই প্রযুক্তির কারণে সৃষ্ট কার্বন নিঃসরণের হিসাব প্রকাশের মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
উদ্যোগটি কাগজে-কলমে ইতিবাচক মনে হলেও এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। শিল্প খাতের বিশেষজ্ঞদের অন্যতম উদ্বেগ হলো, এ ধরনের অঙ্গীকার মূলত স্বেচ্ছামূলক। নীতিমালা অনুসরণ না করলে বাধ্যতামূলক আইনি ব্যবস্থা বা অর্থনৈতিক জরিমানার বিধান না থাকলে এর বাস্তবায়ন কতটা নিশ্চিত হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তীব্র বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার বাজারে পরিবেশের স্বার্থে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের সম্প্রসারণের গতি কমাবে—এমন প্রত্যাশাও বাস্তবতার নিরিখে প্রশ্নবিদ্ধ।
এ ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন ও সরবরাহ বৃদ্ধির তুলনায় এআই শিল্পের সম্প্রসারণ দ্রুত হলে বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে প্রচলিত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে। সবুজ জ্বালানির পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে নতুন তথ্যকেন্দ্রগুলো বিদ্যুৎ খাতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে। ফলে এআইয়ের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার স্বল্প মেয়াদে কার্বন নিঃসরণ বাড়িয়ে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন মোকাবিলার প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ও পরিবেশ সুরক্ষা—কোনোটিকেই উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তবে এআই যেন সবুজ পৃথিবীর স্বপ্নকে ম্লান করে না দেয়, সে জন্য প্রয়োজন কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ।
প্রথমত, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তথ্যকেন্দ্রের কার্বন নিঃসরণ পরিমাপ ও নিয়ন্ত্রণে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। প্রয়োজনে তা বাস্তবায়নে বাধ্যতামূলক আইনি কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
দ্বিতীয়ত, তথ্যকেন্দ্রে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট লক্ষ্যমাত্রা ও সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি বিদ্যুতের পাশাপাশি পানির ব্যবহার কমানো এবং সম্পদের দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাও জরুরি।
তৃতীয়ত, কম শক্তি খরচে কার্যকরভাবে কাজ করতে সক্ষম পরিবেশবান্ধব এআই বা ‘গ্রিন এআই’ প্রযুক্তির গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে এআই ব্যবহারের পরিবেশগত প্রভাব নিয়মিত মূল্যায়ন এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশের ব্যবস্থা করতে হবে।
প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করার পাশাপাশি যেন পৃথিবীর অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে না দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। আনতালিয়া এআই অঙ্গীকার যদি কেবল আলোচনার বিষয় হয়ে থাকে এবং বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে তা জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারবে না। প্রযুক্তিকে পৃথিবীর ধ্বংসের কারণ নয়, বরং মানবজাতি ও প্রকৃতির টিকে থাকার অন্যতম সহায়ক শক্তি হিসেবে গড়ে তোলাই হোক কপ৩১ সম্মেলনের মূল অঙ্গীকার।
লেখক: তারিক ইসলাম, সভাপতি, সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি












