জ্বরে আক্রান্ত দেশ- মরছে মানুষ-সমাধান কোথায় ?
এম. এম হায়দার আলী
একটি জ্বর, একটি অসুস্থ শরীর, হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা একজন রোগী, উদ্বিগ্ন স্বজনদের ছোটাছুটি আর চিকিৎসকের দরজায় অসহায় অপেক্ষা,এ যেন আজ বহু পরিবারের চেনা দৃশ্য। ঘরে ঘরে জ্বর, হাসপাতালে রোগীর ভিড়, অভিভাবকদের চোখেমুখে আতঙ্ক। কখনো হামের সংক্রমণ, কখনো ডেঙ্গুর ভয়, আবার কখনো মৌসুমি ভাইরাসজনিত জ্বর। অসুস্থতার ধরন আলাদা, সংক্রমণের পথ আলাদা, চিকিৎসাপদ্ধতিও এক নয়; কিন্তু সাধারণ মানুষের উৎকণ্ঠা যেন একই সুতোয় বাঁধা। প্রশ্ন জাগে, জ্বরের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে মানুষকে আর কতটা অসহায় হতে হবে? প্রতিরোধযোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়ে মানুষ অসুস্থ হবে, চিকিৎসার অভাবে কিংবা সময়মতো সঠিক ব্যবস্থা না পাওয়ায় প্রাণ হারাবে—এ বাস্তবতা কি মেনে নেওয়ার মতো ?
বাংলাদেশের মানুষের কাছে জ্বর নতুন কোনো অভিজ্ঞতা নয়। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সর্দি-কাশি, গলাব্যথা কিংবা সাধারণ ভাইরাসজনিত জ্বরের প্রকোপ দেখা যায়। বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে ডেঙ্গুর ঝুঁকিও বাড়তে পারে। অন্যদিকে হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা বিশেষ করে টিকাবিহীন শিশুদের জন্য মারাত্মক বিপদের কারণ হতে পারে। কিন্তু যখন এসব রোগ নিয়ে মানুষের উদ্বেগ বাড়ে, হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ তৈরি হয় এবং মৃত্যুর খবর পরিবারগুলোকে শোকাহত করে, তখন বিষয়টিকে শুধু ঋতুর পরিবর্তন কিংবা প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
তখন প্রয়োজন রোগের প্রকৃতি বুঝে প্রতিরোধ, দ্রুত শনাক্তকরণ, মানসম্মত চিকিৎসা এবং কার্যকর জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা। হাম শুধু সাধারণ জ্বর বা কয়েকটি লালচে দাগের নাম নয়। এটি অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশি ও শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে ছড়াতে পারে। প্রথমে জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং চোখ লাল হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। পরে শরীরে ফুসকুড়ি ওঠে। কিছু ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, তীব্র ডায়রিয়া, পানিশূন্যতা কিংবা মস্তিষ্কের জটিলতা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে অপুষ্ট শিশু, অল্পবয়সী শিশু এবং যাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল, তাদের ঝুঁকি বেশি। সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, হামের বিরুদ্ধে কার্যকর টিকা রয়েছে। নিয়মিত টিকাদান এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে সংক্রমণ ও গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
তারপরও কোনো শিশু হামে আক্রান্ত হলে আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো খতিয়ে দেখা জরুরি। কোথাও কি টিকাদানের আওতার বাইরে শিশু রয়ে গেছে? কোনো এলাকায় কি টিকাদানের হার কমেছে? দুর্গম অঞ্চলে কি টিকা পৌঁছাচ্ছে না ? অভিভাবকদের মধ্যে কি ভুল তথ্য কিংবা অসচেতনতা রয়েছে? টিকাদান কর্মসূচিতে কোনো ঘাটতি থাকলে তা দ্রুত চিহ্নিত করে সমাধান করতে হবে। হামের সংক্রমণ দেখা দিলে আক্রান্ত শিশুকে অন্যদের থেকে যথাযথভাবে আলাদা রাখা, দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, পুষ্টি ও পানিশূন্যতার দিকে নজর দেওয়া এবং জটিলতার লক্ষণ দেখা দিলে হাসপাতালে নেওয়া জরুরি। হামের নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা সাধারণভাবে ব্যবহৃত হয় না, চিকিৎসা মূলত উপসর্গ ও জটিলতা সামলানোর ওপর নির্ভর করে। চিকিৎসকের নির্দেশে ভিটামিন এ দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তবে নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ বা উচ্চমাত্রার ভিটামিন দেওয়া উচিত নয়। স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে জোরালো দাবি—নিয়মিত টিকাদানের আওতা যাচাই করতে হবে, বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত করতে হবে এবং প্রয়োজনে দ্রুত বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম নিতে হবে। পাশাপাশি আক্রান্ত শিশুর চিকিৎসায় হাসপাতালগুলো প্রস্তুত কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। একটি শিশুর মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি নয়; এটি আমাদের প্রতিরোধব্যবস্থা ও চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা পর্যালোচনারও তাগিদ। ডেঙ্গু এখন বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় উদ্বেগ। এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ানো এই ভাইরাসজনিত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি প্রথম দিকে সাধারণ জ্বর, মাথাব্যথা, শরীরব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা কিংবা বমিভাব অনুভব করতে পারেন। অনেকেই একে মৌসুমি জ্বর ভেবে ঘরে বসে থাকেন। কেউ কেউ নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ খেয়ে জ্বর কমানোর চেষ্টা করেন।
কিন্তু ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে এ ধরনের অবহেলা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। ডেঙ্গুর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হলো, জ্বর কমে গেলেই রোগী বিপদমুক্ত,এমন ধারণা সঠিক নয়। অনেক ক্ষেত্রে জ্বর কমার সময় বা পরবর্তী সময়ে রোগীর অবস্থা গুরুতর হতে পারে। তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, নাক-মাড়ি দিয়ে রক্তপাত, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, অস্থিরতা, শ্বাসকষ্ট কিংবা হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং আগে থেকে অন্য রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু মশার ওষুধ ছিটিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যায় না। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, পরিত্যক্ত টায়ার, ডাবের খোসা, পানির পাত্র, নির্মাণাধীন ভবন এবং আশপাশের যেসব স্থানে পানি জমে থাকে, সেগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। পানির পাত্র ঢেকে রাখতে হবে, জমে থাকা পানি অপসারণ করতে হবে এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ও স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মশা নিধনের কার্যক্রম অনেক সময় লোকদেখানো কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ থাকে বলে অভিযোগ ওঠে। কোথাও অভিযান হয়, কোথাও হয় না; কোথাও ওষুধ ছিটানো হয়, কিন্তু তার কার্যকারিতা যাচাই করা হয় না। শুধু কর্মসূচির ছবি তুলে প্রচার করলেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ হবে না।
কোন এলাকায় মশার প্রজনন বেশি, কোথায় রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, কোন পদক্ষেপে ফল পাওয়া যাচ্ছে—এসব তথ্যের ভিত্তিতে নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত ওষুধের কার্যকারিতাও যাচাই করা জরুরি। এখানে নাগরিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। বাড়ির সামনে পানি জমিয়ে রেখে, ছাদে পরিত্যক্ত পাত্র ফেলে রেখে কিংবা পাশের জমিতে আবর্জনা জমতে দিয়ে শুধু প্রশাসনকে দোষারোপ করলে চলবে না। তবে নাগরিকদের দায়িত্বের কথা বলে প্রশাসনের জবাবদিহি এড়ানোরও সুযোগ নেই। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা, বর্জ্য অপসারণ, নালা পরিষ্কার এবং নিয়মিত মশা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকরভাবে পালন করতে হবে। ঋতু পরিবর্তনের সময় বিভিন্ন ভাইরাসের সংক্রমণে জ্বর, সর্দি, কাশি, গলাব্যথা ও শরীরব্যথা দেখা দিতে পারে। অধিকাংশ সাধারণ ভাইরাসজনিত জ্বর সময়ের সঙ্গে সেরে উঠলেও সব জ্বরকে এক ধরনের ধরে নেওয়া বিপজ্জনক।
ডেঙ্গু, হাম, ইনফ্লুয়েঞ্জা, অন্যান্য ভাইরাসজনিত সংক্রমণ কিংবা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ,সব রোগের চিকিৎসা এক নয়। জ্বর হলেই অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া কোনো সমাধান নয়। অ্যান্টিবায়োটিক ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করে না; অপ্রয়োজনীয় ব্যবহারে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণুর ঝুঁকি বাড়ে। আবার ডেঙ্গুর সম্ভাবনা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেনজাতীয় ওষুধ খাওয়া বিপজ্জনক হতে পারে, কারণ রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়তে পারে। জ্বর কমানোর জন্য প্যারাসিটামলও বয়স, ওজন ও শারীরিক অবস্থার উপযোগী মাত্রায় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী গ্রহণ করা উচিত। পর্যাপ্ত বিশ্রাম, নিরাপদ পানি পান এবং শরীরে পানিশূন্যতা প্রতিরোধ করা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শ্বাসকষ্ট, অচেতনতা, খিঁচুনি, তীব্র দুর্বলতা, অবিরাম বমি, প্রস্রাব কমে যাওয়া কিংবা রোগীর অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে ঘরে বসে অপেক্ষা করা যাবে না।
শিশু, বিশেষ করে অল্পবয়সী শিশুর জ্বরের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। এখানে আরেকটি বড় সমস্যা হলো, অনেক মানুষ জ্বর হলে প্রথমে ফার্মেসিতে যান, নিজেরাই ওষুধ কিনে খান কিংবা পরিচিত কারও পরামর্শে চিকিৎসা শুরু করেন। এর পেছনে সচেতনতার অভাব যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার খরচ, দূরত্ব এবং সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সেবার সীমাবদ্ধতা। ফলে জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি সহজলভ্য ও নির্ভরযোগ্য চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাও জরুরি। রোগীর চাপ বাড়লে হাসপাতালের প্রকৃত সক্ষমতা পরীক্ষা হয়। তখন শুধু ভবন, সাইনবোর্ড কিংবা শয্যার সংখ্যা দিয়ে চিকিৎসাব্যবস্থার সাফল্য বিচার করা যায় না।
প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স, প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী, পরীক্ষাগার, অক্সিজেন, জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ এবং রোগী পর্যবেক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকতে হবে। জেলা সদর হাসপাতাল থেকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স,সব পর্যায়ে জ্বরের রোগীদের প্রাথমিক মূল্যায়ন ও জরুরি ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ডেঙ্গু ও হামের মতো রোগের সম্ভাব্য জটিলতা শনাক্ত করার প্রশিক্ষণ স্বাস্থ্যকর্মীদের দিতে হবে। কোন রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে, কাকে পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে এবং কাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠাতে হবে,এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা ও কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
অনেক সময় রোগীর স্বজনেরা এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটে বেড়ান। কোথাও পরীক্ষা করাতে দেরি হয়, কোথাও শয্যা পাওয়া যায় না, কোথাও আবার রোগের প্রকৃতি বুঝতে সময় লেগে যায়। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে তা পর্যালোচনা করতে হবে। জরুরি রোগীর চিকিৎসা যেন অর্থ, পরিচয় কিংবা প্রভাবের ওপর নির্ভর না করে। সরকারি হাসপাতালের সেবার মান বাড়াতে হবে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরীক্ষার খরচ যেন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে না যায়, সে ব্যবস্থাও করতে হবে। একই সঙ্গে চিকিৎসকদের ওপর অতিরিক্ত রোগীর চাপ, স্বাস্থ্যকর্মীর সংকট এবং সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতাও বিবেচনায় নিতে হবে। চিকিৎসকদের দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাঁদের কাজের উপযোগী পরিবেশ, জনবল ও সরঞ্জাম সরবরাহ করতে হবে। স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা শুধু ব্যক্তিকে দোষারোপ করে দূর করা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার দরকার।
জ্বরের প্রকোপ মোকাবিলায় প্রথম কাজ হলো তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ। কোন জেলায় কতজন হামে আক্রান্ত হচ্ছেন, কোথায় ডেঙ্গু বাড়ছে, মৌসুমি জ্বরে হাসপাতালে রোগীর চাপ কতটা,এসব তথ্য দ্রুত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করতে হবে। রোগের প্রকোপ বাড়লে সেই অনুযায়ী চিকিৎসক, ওষুধ, পরীক্ষার সরঞ্জাম এবং জরুরি সেবা প্রস্তুত রাখতে হবে। রোগের তথ্য শুধু দপ্তরের ফাইলে আটকে থাকলে চলবে না; জনসাধারণকে নির্ভরযোগ্য তথ্যও জানাতে হবে।
দ্বিতীয়ত, টিকাদান কর্মসূচিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে হামের ক্ষেত্রে শিশুদের নিয়মিত টিকা গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো শিশু টিকা থেকে বাদ পড়েছে কি না, টিকাদান কেন্দ্রে টিকার সরবরাহ ঠিক আছে কি না এবং দুর্গম এলাকায় কর্মসূচি পৌঁছাচ্ছে কি না,নিয়মিত তদারকি করতে হবে। প্রয়োজনে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। তৃতীয়ত, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বছরজুড়ে কার্যক্রম চালাতে হবে। শুধু বর্ষা শুরু হলে তৎপরতা দেখিয়ে লাভ নেই। মশার প্রজননস্থল শনাক্তকরণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নালা পরিষ্কার, জমে থাকা পানি অপসারণ এবং কার্যকর মশা নিয়ন্ত্রণকে নিয়মিত নাগরিক সেবার অংশ করতে হবে।
প্রতিটি এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা ও কর্মকর্তাদের কাজের মূল্যায়ন করতে হবে। চতুর্থত, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। জরুরি ওষুধ, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, প্রশিক্ষিত জনবল এবং গুরুতর রোগীর দ্রুত স্থানান্তরের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। রোগীর অবস্থা গুরুতর হওয়ার পর চিকিৎসা শুরু করলে ঝুঁকি বেড়ে যায়; তাই প্রাথমিক পর্যায়েই সঠিক মূল্যায়ন ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি। পঞ্চমত, জনসচেতনতা কার্যক্রমকে বাস্তবমুখী করতে হবে। শুধু পোস্টার, মাইকিং কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বার্তা প্রকাশ যথেষ্ট নয়। বিদ্যালয়, মসজিদ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং গণমাধ্যমকে যুক্ত করে মানুষকে জানাতে হবে—কীভাবে হাম প্রতিরোধ করা যায়, ডেঙ্গুর বিপদসংকেত কী, কখন হাসপাতালে যেতে হবে এবং কোন ওষুধ নিজের সিদ্ধান্তে খাওয়া উচিত নয়। ষষ্ঠত, গুজব ও ভুল চিকিৎসার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো প্রতিটি স্বাস্থ্যপরামর্শ সত্য নয়। রোগের লক্ষণ দেখে নিজেরাই নিশ্চিত রোগ নির্ণয় করা কিংবা প্রমাণহীন চিকিৎসায় নির্ভর করা বিপদ ডেকে আনতে পারে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের উচিত সহজ ভাষায় নিয়মিত নির্ভরযোগ্য নির্দেশনা প্রকাশ করা। সপ্তমত, প্রতিটি মৃত্যুর তথ্য যথাযথভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। সব জ্বরজনিত মৃত্যু একই কারণে ঘটে না। কোথায় দেরিতে চিকিৎসা নেওয়া হয়েছে, কোথায় রোগ শনাক্ত করতে সমস্যা হয়েছে, কোথায় চিকিৎসার সক্ষমতা অপর্যাপ্ত ছিল এবং কোথায় প্রতিরোধের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও রোগ ছড়িয়েছে,এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে অনুমাননির্ভর বক্তব্য নয়, প্রমাণভিত্তিক তদন্ত ও বিশ্লেষণ দরকার। রাষ্ট্রের দায়িত্বের পাশাপাশি প্রত্যেক পরিবারকেও সচেতন হতে হবে।
শিশুদের টিকাদান সম্পন্ন হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। জ্বর হলে রোগের ধরন না জেনে নিজে নিজে অ্যান্টিবায়োটিক কিংবা ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া যাবে না। ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে এবং বিপদসংকেত দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। বাড়ির আশপাশে পানি জমতে দেওয়া যাবে না। অসুস্থ ব্যক্তির পরিচর্যায় পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হবে এবং সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী অন্যদের সংক্রমণ থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা নিতে হবে। অভিভাবকদের বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে, শিশুর জ্বরকে অবহেলা করা যেমন বিপজ্জনক, তেমনি অযথা আতঙ্কিত হয়ে ভুল চিকিৎসা করাও ক্ষতিকর। শিশুর শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি, অস্বাভাবিক নিস্তেজতা, পানি পান করতে না পারা কিংবা অন্য কোনো গুরুতর লক্ষণ দেখা দিলে দেরি করা যাবে না। দ্রুত চিকিৎসা নেওয়াই হতে পারে জীবন রক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। একটি দেশের উন্নয়ন শুধু সড়ক, সেতু, ভবন কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ নয়।
উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড হলো—সেই দেশের একজন সাধারণ মানুষ অসুস্থ হলে কত দ্রুত চিকিৎসা পান, একটি শিশু প্রতিরোধযোগ্য রোগ থেকে কতটা সুরক্ষিত থাকে এবং দরিদ্র পরিবারের কেউ গুরুতর অসুস্থ হলে চিকিৎসার অভাবে তাকে মৃত্যুর মুখে পড়তে হয় কি না। হাম প্রতিরোধে টিকা, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং মৌসুমি জ্বরের ক্ষেত্রে সঠিক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা, এসবই কার্যকর জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু পরিকল্পনা কাগজে থাকলে হবে না; তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি হাসপাতালকে প্রস্তুত রাখতে হবে, স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে, টিকাদানের ঘাটতি দূর করতে হবে এবং স্থানীয় প্রশাসনকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। দেশের মানুষ অসুস্থ হলে শুধু তাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হতে পারে না।
মানুষকে সচেতন হতে হবে, কিন্তু সেই সচেতনতার সঙ্গে রাষ্ট্রকে দিতে হবে কার্যকর চিকিৎসা, প্রতিরোধের সুযোগ এবং নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্যসেবা। কারণ প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে রয়েছে একটি পরিবারের কান্না, একটি শিশুর অসমাপ্ত শৈশব, একজন মায়ের বুকভাঙা আর্তনাদ কিংবা প্রিয়জন হারানো মানুষের দীর্ঘশ্বাস। জ্বরের কাছে মানুষ পরাজিত হবে, নাকি বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা, সচেতনতা ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জীবন রক্ষা করা সম্ভব হবে,তার উত্তর নির্ভর করছে আমাদের সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর। এখনই সময় আতঙ্ক নয়, কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার,দোষারোপ নয়, জবাবদিহি নিশ্চিত করার, আর প্রতিশ্রুতি নয়, মানুষের দোরগোড়ায় চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার। সর্বোপরি, মানুষ বাঁচুক, শিশু নিরাপদ থাকুক, চিকিৎসা হোক সবার অধিকার,জ্বরের প্রকোপ মোকাবিলায় এটাই হোক রাষ্ট্র ও সমাজের অঙ্গীকার।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট












