শেখ সিদ্দিকুর রহমান
বাংলা ভাষায় ‘বাঁশ’ শব্দটির একটি অদ্ভুত দ্বৈত জীবন আছে। একদিকে বাঁশ আমাদের গ্রামীণ জীবন, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও প্রকৃতির অত্যন্ত পরিচিত এবং প্রয়োজনীয় একটি উদ্ভিদ; অন্যদিকে কথার ফাঁকে আমরা প্রায়ই বলে থাকি-‘লোকটা আমাকে বাঁশ দিয়ে গেছে।’ অর্থাৎ কেউ প্রতারণা করেছে, ক্ষতি করেছে কিংবা বিপদে ফেলে চলে গেছে। কারও কোনো কাজে বড় ধরনের বিপত্তি ঘটলে হাসতে হাসতে বলা হয়, ‘ভালোই বাঁশ খেয়েছ!’ আবার কেউ কাউকে বিপদে ফেললে বলা হয়, ‘বাঁশ দিয়ে দিয়েছে।’ বাংলা কথ্যভাষায় বাঁশ যেন প্রতারণা ও বিপদেরও প্রতীক।
কিন্তু বাস্তবের বাঁশ মানুষের বিপদে ফেলে না; বরং বহু যুগ ধরে মানুষের বিপদ সামলেছে। ঘর বানিয়েছে, বেড়া দিয়েছে, সাঁকো তৈরি করেছে, কৃষিকাজে সহায়তা করেছে, মাছ ধরার সরঞ্জাম হয়েছে, আসবাব তৈরি হয়েছে, বাদ্যযন্ত্র হয়েছে, হস্তশিল্পের উপকরণ হয়েছে। একসময় বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনে বাঁশ ছাড়া একটি সংসার কল্পনা করাই কঠিন ছিল। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা-এফএওর তথ্যেও বাঁশকে দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ অ-কাঠজাত বনজ সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে; এর ব্যবহার ঘরবাড়ি থেকে শুরু করে আসবাব, কাগজ, হস্তশিল্প, খাদ্য ও নানা সামগ্রী পর্যন্ত বিস্তৃত।
তাহলে বাঁশের জন্য আলাদা একটি ‘বিশ্ব দিবস’ কেন?
প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে ফিরে যেতে হয় ২০০৯ সালে। থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠিত হয় অষ্টম ওয়ার্ল্ড ব্যাম্বো কংগ্রেস। বিশ্বের শতাধিক দেশের প্রতিনিধিরা সেখানে অংশ নেন। ১৮ সেপ্টেম্বর সম্মেলনের শেষ দিনে বাঁশের পরিবেশগত, অর্থনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্ব তুলে ধরতে দিনটিকে ওয়ার্ল্ড ব্যাম্বো দিবস বা বিশ্ব বাঁশ দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। দিনটি থাইল্যান্ডের রাজকীয় থাই বনজ দিবস -এর সঙ্গেও মিলে যায়। পরদিন বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে বাঁশ রোপণের আয়োজনও করা হয়েছিল।
অর্থাৎ বিশ্ব বাঁশ দিবস কোনো নিছক উৎসবের দিন নয়। এর পেছনে রয়েছে বাঁশকে নতুন করে দেখার একটি বৈশ্বিক উদ্যোগ। যে উদ্ভিদকে একসময় অনেক জায়গায় দরিদ্র মানুষের সস্তা উপকরণ বলে দেখা হতো, আধুনিক বিশ্বে সেটিই এখন টেকসই উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং জলবায়ু মোকাবিলার সম্ভাবনাময় সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বাঁশের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য তার দ্রুত বৃদ্ধি। অন্য অনেক কাঠগাছের তুলনায় এটি দ্রুত বেড়ে ওঠে এবং ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বারবার সংগ্রহ করা যায়। এ কারণে কাঠের কিছু ব্যবহারের বিকল্প হিসেবেও বাঁশের সম্ভাবনা রয়েছে। এফএও বলছে, বাঁশ ভূমিক্ষয় কমাতে, অবক্ষয়িত জমি পুনরুদ্ধারে, পানি ধরে রাখতে এবং ভূমির গুণগত মান উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। বাঁশের ব্যবহার যদি ধীরগতিতে বেড়ে ওঠা কাঠের বিকল্প হিসেবে করা যায়, তাহলে বনসম্পদের ওপর চাপ কমানোরও সুযোগ তৈরি হতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে বাঁশের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। বাঁশ দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় এর কার্বন ধারণের সক্ষমতা নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। বাংলাদেশেও এ বিষয়ে গবেষণা হয়েছে। লাউয়াছড়া বনাঞ্চলে পাঁচ বছর বয়সী বামবুসা ভালগারিস প্রজাতির একটি বাঁশবাগান নিয়ে পরিচালিত গবেষণায় মাটি ও উদ্ভিদের বিভিন্ন অংশ মিলিয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কার্বন সঞ্চয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। গবেষণাটিতে মোট কার্বন সঞ্চয় প্রায় ৭৭.৬৭ টন কার্বন প্রতি হেক্টর হিসেবে হিসাব করা হয়েছিল।
তবে বাঁশকে নিয়ে অতিরঞ্জিত দাবিও করা ঠিক হবে না। সব বাঁশবাগান একই রকম পরিবেশগত সুবিধা দেয় না। একক প্রজাতির বিশাল বাঁশবাগান জীববৈচিত্র্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে-এফএওও এ বিষয়ে সতর্ক করেছে। তাই বাঁশকে শুধু বেশি বেশি লাগানোর বিষয় হিসেবে নয়, বরং সঠিক প্রজাতি নির্বাচন, বৈচিত্র্য রক্ষা, টেকসই ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় পরিবেশ বিবেচনায় নিয়ে দেখতে হবে।
বাংলাদেশের সঙ্গে বাঁশের সম্পর্ক আরও গভীর। আমাদের গ্রামবাংলার উঠান, পুকুরপাড়, ক্ষেতের আল, ঘরের বেড়া, মাচা, চালা-কতকিছুর সঙ্গে বাঁশ জড়িয়ে আছে! বাঁশের তৈরি ডালি, কুলা, ঝুড়ি, চাটাই, মাছ ধরার সরঞ্জাম কিংবা গৃহস্থালির নানা উপকরণ একসময় গ্রামীণ অর্থনীতির অপরিহার্য অংশ ছিল। এখন প্লাস্টিক ও শিল্পজাত পণ্যের বিস্তারে এসব ব্যবহার কমেছে, কিন্তু বাঁশের সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়নি।
বরং নতুন প্রযুক্তি বাঁশকে আরও নতুন বাজারে নিয়ে যাচ্ছে। বাঁশ থেকে এখন শুধু কঞ্চি, বেড়া কিংবা ঝুড়ি নয়-বোর্ড, প্যানেল, ফার্নিচার, কাগজ, কাপড়ের তন্তু, নির্মাণসামগ্রী এবং নানা মূল্যসংযোজিত পণ্য তৈরি হচ্ছে। এফএওর গবেষণায়ও বাঁশের ব্যবহারকে নিম্নমূল্যের হস্তশিল্প থেকে উচ্চমূল্যের শিল্পপণ্যে রূপান্তরের প্রবণতার কথা বলা হয়েছে।
বাংলাদেশে বাঁশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কথাও একেবারে নতুন নয়। এফএওর পুরোনো বনসম্পদ মূল্যায়নে গ্রামীণ বাঁশসম্পদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি পাওয়া যায়। সাম্প্রতিক গবেষণাতেও দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বাঁশের বাজারে বাঁশ ব্যবসা উদ্যোক্তা ও স্বল্পদক্ষ গ্রামীণ শ্রমিকদের আয় ও কর্মসংস্থানে ভূমিকা রাখার তথ্য পাওয়া গেছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-বাঁশের অর্থনীতি শুধু বাঁশ বিক্রির অর্থনীতি নয়। একটি বাঁশঝাড়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে পারে কৃষক, বাঁশকাটা শ্রমিক, পরিবহনকারী, কারিগর, ঝুড়ি বা আসবাব নির্মাতা, ব্যবসায়ী এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তা। অর্থাৎ বাঁশকে ঘিরে একটি সম্পূর্ণ মূল্যশৃঙ্খল তৈরি করা সম্ভব। বাংলাদেশে গ্রামীণ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য এখানেই রয়েছে বড় সম্ভাবনা।
কিন্তু আমাদের সমস্যা হলো, সম্ভাবনাকে আমরা অনেক সময় সম্পদে পরিণত করতে পারি না।
বাঁশ আছে, বাঁশের কারিগর আছে, বাঁশের ব্যবহার সম্পর্কে মানুষের অভিজ্ঞতা আছে; কিন্তু আধুনিক নকশা, প্রক্রিয়াজাতকরণ, মাননিয়ন্ত্রণ, বাজারজাতকরণ ও রপ্তানির সঙ্গে সেই ঐতিহ্যকে যথেষ্টভাবে যুক্ত করা যায়নি। ফলে বাঁশ এখনও অনেক ক্ষেত্রে ‘গরিবের উপকরণ’ হিসেবেই পড়ে থাকে, যখন পৃথিবীর অন্য কোথাও সেটিই হয়ে উঠছে পরিবেশবান্ধব শিল্পের কাঁচামাল।
এখানে বিশ্ব বাঁশ দিবসের প্রকৃত তাৎপর্য। দিবসটি আমাদের শুধু বাঁশ লাগাতে বলে না; বাঁশকে নতুন চোখে দেখতে শেখায়। বাঁশকে অবহেলিত ঝোপঝাড় হিসেবে না দেখে সম্পদ হিসেবে দেখতে বলে। গ্রামীণ কারিগরের হাতে থাকা দক্ষতাকে শিল্পে রূপ দেওয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়। পরিবেশ রক্ষার সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে কীভাবে যুক্ত করা যায়, সেই প্রশ্ন সামনে আনে।
আর আমাদের ভাষার সেই ‘বাঁশ দেওয়া’ কথাটিও তখন নতুনভাবে ভাবা যায়। যে বাঁশ মানুষের ঘরকে আশ্রয় দেয়, কৃষকের কাজে লাগে, নদীর পাড় রক্ষা করতে পারে, মাটিকে আঁকড়ে ধরে, কারিগরের হাতে শিল্প হয়ে ওঠে-সেই বাঁশকে আমরা মানুষের ক্ষতি করার উপমা বানিয়ে ফেলেছি! ভাষার রসিকতায় অবশ্য এতে কোনো ক্ষতি নেই। ‘বাঁশ খাওয়া’ বা ‘বাঁশ দেওয়া’ বাংলা কথ্যভাষার মজার প্রকাশ হিসেবেই থাকুক। কিন্তু বাস্তবের বাঁশ যেন আর অবহেলায় না পড়ে থাকে।
বিশ্ব বাঁশ দিবসে তাই আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত-বাংলাদেশের বাঁশ কি শুধু বাঁশঝাড়েই থাকবে, নাকি তা আধুনিক শিল্প, পরিবেশবান্ধব নির্মাণ, গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও রপ্তানি পণ্যের অংশ হয়ে উঠবে?
বাঁশ আমাদের কাছে নতুন কিছু নয়। নতুন হওয়া দরকার বাঁশকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি।
যে বাঁশকে আমরা কথার ছলে ‘বাঁশ দেওয়া’র প্রতীক বানিয়েছি, সেই বাঁশই হয়তো সঠিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ পেলে বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিকে নতুনভাবে দাঁড় করানোর একটি শক্ত খুঁটি হয়ে উঠতে পারে।
লেখক: কবি, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকর্মী