সাতক্ষীরার কৃষি প্রণোদনা বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ ও পাল্টা দাবির বিশ্লেষণ
গাজী ফারহাদ
সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় কৃষি বিভাগের বৃক্ষরোপণ ও কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচিতে অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে কয়েক দিন ধরে ব্যাপক আলোচনা চলছে। একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সরকারি বরাদ্দের তুলনায় কৃষকদের কম পরিমাণ জৈব সার এবং নি¤œমানের বাঁশের খুঁটি বিতরণ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন সদ্য যোগদান করা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আবু সাঈদ শুভ্র।
এঘটনায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইং থেকে পরিচালক ওবায়দুর রহমান মন্ডল স্বাক্ষরিত পত্রে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু সাঈদ শুভ্রকে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করা হয়। পৃথকভাবে খুলনা আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে তিন সদস্যের তদন্ত টিম গঠণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন খুলনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর আঞ্চলিক কার্যালয় প্রধান রফিকুল ইসলাম।
কী নিয়ে অভিযোগ?
গত ২৯ জুন সাতক্ষীরা সদর উপজেলা মিলনায়তনে কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। কর্মসূচির আওতায় রোপা আমন ধানের বীজ ও সার, বিভিন্ন সবজির বীজ, নারিকেলের চারা, বাঁশের খুঁটি ও জৈব সার কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। এর কয়েক দিন পর গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, সরকারি নির্দেশনায় প্রতিজন কৃষকের জন্য ১৫০ কেজি গোবর সার বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে মাত্র ৪০ কেজি সার দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতি খুঁটির সরকারি মূল্য ৫০ টাকা ধরা হলেও কৃষকদের নি¤œমানের বাঁশ সরবরাহ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, কৃষকদের কাছ থেকে ১৫০ কেজি সার গ্রহণের স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে এবং এতে সরকারি অর্থ অপচয়ের অভিযোগ ওঠে।
কী বলছে কৃষি বিভাগ?
অভিযোগের পর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আবু সাঈদ শুভ্র বলেন, তার বিরুদ্ধে আনা সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়মের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও মানহানিকর।
তিনি জানান, তিনি ১৬ জুন ২০২৬ সালে সাতক্ষীরা সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। যোগদানের পর সরকারি বিধি-বিধান ও আর্থিক নিয়ম মেনেই সব কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।
তার ভাষ্য, কৃষি উপকরণ সংগ্রহ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিতরণের প্রতিটি ধাপ সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছে। অভিযোগ প্রকাশের আগে তার বক্তব্য যথাযথভাবে উপস্থাপনের সুযোগও দেওয়া হয়নি। এমন ক্রয়ের ব্যাপারে বরাদ্দের ১০ শতাংশ ঠিকাদার পাবেন, এছাড়া ভ্যাটও রয়েছে। তবে সে সব ব্যয় আড়াল করে প্রতিবেদনে অনুমান নির্ভর ব্যয় উপস্থাপন করা হয়েছে।
১৫০ কেজি গোবর না-কি ৪০ কেজি কম্পোস্ট?
অভিযোগের অন্যতম বিষয় ছিল জৈব সার বিতরণ। কৃষি বিভাগের দাবি, প্রকল্পে বরাদ্দকৃত অর্থমূল্যের সমপরিমাণ কৃষি উপকরণই বিতরণ করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে খোলা গোবর সার সহজলভ্য না থাকায় সমমূল্যের ৪০ কেজির এসিআই কোম্পানির জৈব সার (ট্রাইকো কম্পোস্ট) সরবরাহ করা হয়েছে। কৃষি বিভাগের দাবি অনুযায়ী, এটি আর্থিক মূল্যের দিক থেকে সরকারি বরাদ্দের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
অন্যদিকে অভিযোগকারীদের বক্তব্য, সরকারি নথিতে যদি নির্দিষ্টভাবে ১৫০ কেজি গোবরের কথা উল্লেখ থাকে, তাহলে তা পরিবর্তনের অনুমোদন ছিল কিনা। তবে কৃষি অফিস বলছে, গোবর না পাওয়া যাওয়ায় সেই পরিমাণ অর্ধ ব্যয় করে অন্য সার দেওয়া হয়েছে এবং উপজেলা কৃষি প্রণোদনা কমিটির রেজুল্যেশনে তা অনুমোদিত হয়েছে।
বাঁশের খুঁটি নিয়ে বিতর্ক
প্রতিবেদনে নি¤œমানের বাঁশ সরবরাহের অভিযোগ তোলা হলেও কৃষি বিভাগের দাবি, দরপত্র ও ক্রয় প্রক্রিয়া এককভাবে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সম্পন্ন করেননি। তাদের তথ্য অনুযায়ী, ক্রয় কমিটিতে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও), অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা, পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তাসহ একাধিক সদস্য ছিলেন। ফলে কোনো ক্রয়সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এককভাবে নেওয়ার সুযোগ ছিল না।
সদ্য যোগদান করা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ
কৃষি বিভাগের একটি অংশের দাবি, বর্তমান উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাত্র কয়েক দিনের জন্য দায়িত্বে ছিলেন। এর আগে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেন পূর্ববর্তী কর্মকর্তা মনির হোসেন। স্থানীয় কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনেও দাবি করা হয়েছে, নতুন কর্মকর্তাকে ঘিরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে।
বর্তমান উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেন, তিনি যোগদানের মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছেন। তার দাবি, তিনি কোনো অনিয়মের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন এবং বিষয়টি তদন্তেই স্পষ্ট হবে।
প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি প্রকল্পে কোনো উপকরণ পরিবর্তন করা হলে তার লিখিত অনুমোদন, কারিগরি যুক্তি এবং আর্থিক সমন্বয়ের নথি থাকতে হবে। আবার অনিয়মের অভিযোগও কেবল সংবাদ বা সামাজিক আলোচনার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয় না। নিরপেক্ষ তদন্তই প্রকৃত সত্য নির্ধারণ করতে পারে।
গাজী ফারহাদ: সাংবাদিক








