সম্পাদকীয়/সাতক্ষীরার জলাবদ্ধতা ও স্থায়ী সমাধানের তাগিদ
সাতক্ষীরায় স্বাভাবিক বর্ষণ ও জলাবদ্ধতার কারণে জেলার ৩৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং আউশ ধান ও মৎস্য খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার খবরটি অত্যন্ত উদ্বেগের। রোববার জেলা প্রশাসনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত আইন-শৃঙ্খলা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির মাসিক সভায় জানানো হয়েছে, অতিবৃষ্টির কারণে ৬ হাজার হেক্টর জমির আউশ ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ভেসে গেছে ১২৭টি মাছের ঘের। এতে প্রাথমিকভাবে মৎস্য খাতেই প্রায় অর্ধকোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। জেলা প্রশাসন যদিও আশ্বস্ত করেছে যে এই মুহূর্তে বড় ধরনের কোনো বন্যার আশঙ্কা নেই এবং তারা যেকোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুত, তাও মাঠপর্যায়ের এই ক্ষয়ক্ষতি ও জনদুর্ভোগকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই।
একটি জেলায় একসঙ্গে ৩৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ থাকার অর্থ হলো হাজার হাজার শিশুর নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হওয়া। এমনিতেই নানাবিধ কারণে প্রাথমিক শিক্ষায় যে ক্ষতি হয়, তা পুষিয়ে নেওয়া কঠিন; তার ওপর যদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা জলাবদ্ধতার কারণে দিনের পর দিন বিদ্যালয় বন্ধ রাখতে হয়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অন্যদিকে আউশ ধান ও মাছের ঘের ভেসে যাওয়ার ঘটনাটি সরাসরি স্থানীয় অর্থনীতি এবং কৃষকের জীবিকার ওপর বড় আঘাত। সাতক্ষীরার মতো উপকূলীয় ও অর্থনৈতিকভাবে সংবেদনশীল এলাকায় এই ধরনের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে কৃষকদের দীর্ঘ সময় লড়াই করতে হয়।
এই সংকটের মূল কারণটি কিন্তু নতুন নয়। সাতক্ষীরা অঞ্চলে অপরিকল্পিত মৎস্য ঘের তৈরি, নদী-নালার নাব্যতা হ্রাস এবং পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথগুলো ভরাট বা দখল হয়ে যাওয়ার কারণেই সামান্য অতিবর্ষণে এমন তীব্র জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম এলেই এই অঞ্চলের মানুষকে একই ধরণের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় জলাবদ্ধতা নিরসন এবং ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ সংস্কারের মতো বিষয়ে যে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা ইতিবাচক। তবে আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, এই ধরণের সিদ্ধান্ত অনেক সময়ই কেবল সভার কার্যবিবরণীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, মাঠপর্যায়ে তার বাস্তব প্রতিফলন খুব কমই দেখা যায়।
আমরা মনে করি, সাতক্ষীরার এই জলাবদ্ধতা ও ফসলি জমির ক্ষতি থেকে স্থায়ী মুক্তি পেতে হলে শুধু জরুরি ত্রাণ বা সাময়িক প্রস্তুতি যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা। কপোতাক্ষসহ স্থানীয় নদী ও খালগুলোর খনন কাজ দ্রুত শেষ করা, পানি নিষ্কাশনের অবৈধ প্রতিবন্ধকতা ও স্লুইসগেটগুলোর দখলদারিত্ব দূর করা এবং টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ নিশ্চিত করতে হবে।
জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কেবল ‘প্রস্তুত আছি’ বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, বন্ধ হওয়া বিদ্যালয়গুলো যাতে দ্রুত চালু করা যায় এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও খামারিরা যেন প্রয়োজনীয় সরকারি প্রণোদনা পান, তা নিশ্চিত করতে হবে। উপকূলের মানুষের জীবন ও জীবিকাকে প্রতিবছর প্রকৃতির দয়ার ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। দুর্যোগের এই দুষ্টচক্র ভাঙতে টেকসই ও কার্যকর পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।









