শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩
শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩

বিষে বিপন্ন কৃষি/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:৫১ অপরাহ্ণ
বিষে বিপন্ন কৃষি/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি কৃষি। অথচ সেই কৃষিই আজ এক গভীর বৈপরীত্যের মুখোমুখি। বাংলাদেশ বিশ্বের ১৬০টির বেশি দেশে ওষুধ রপ্তানি করে। হাজার হাজার কোটি টাকার ওষুধ বিদেশে পাঠিয়ে আমাদের ওষুধশিল্প আন্তর্জাতিক সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে। অথচ কৃষির অপরিহার্য উপকরণ কীটনাশকের চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশই পূরণ করতে হয় আমদানির মাধ্যমে। রোগ সারানোর ওষুধ তৈরিতে আমরা সক্ষমতা অর্জন করলেও খাদ্য উৎপাদনের রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় উপকরণ তৈরিতে সেই সক্ষমতা কেন গড়ে উঠল নাÑএ প্রশ্ন এখন গুরুত্বের সঙ্গে ভাবার সময় এসেছে।তবে সংকট শুধু আমদানিনির্ভরতার নয়।

 

এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষি উৎপাদন, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও নিরাপদ খাদ্যের প্রশ্ন। ফসল রক্ষায় কীটনাশক প্রয়োজনীয় হাতিয়ার হলেও অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার কৃষিকে এমন এক রাসায়নিকনির্ভর ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যার ক্ষতি বহন করতে হচ্ছে কৃষক, ভোক্তা ও পরিবেশÑতিন পক্ষকেই।গত কয়েক দশকে দেশে কীটনাশকের ব্যবহার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।

 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭২ সালে দেশে বালাইনাশকের ব্যবহার ছিল প্রায় ৪ হাজার টন। ১৯৮০ সালে তা বেড়ে ৫ হাজার টন এবং ২০০০ সালে প্রায় ৮ হাজার টনে দাঁড়ায়। ২০২২ সালে ব্যবহার বেড়ে হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার টন। অর্থাৎ কয়েক দশকে কীটনাশকের ব্যবহার বেড়েছে প্রায় ১০ গুণ।কৃষি উৎপাদন বাড়লে রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে কীটনাশকের ব্যবহার কিছুটা বাড়তেই পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি প্রয়োজন অনুযায়ী তা ব্যবহার করছি? নাকি কৃষির রোগবালাই মোকাবিলায় রাসায়নিকই হয়ে উঠছে প্রথম ও প্রধান সমাধান?এর পেছনে কৃষকের বাস্তবতাও রয়েছে। রোগবালাইয়ের আক্রমণে একবার ফসল নষ্ট হলে পুরো মৌসুমের শ্রম, সময় ও বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়ে। তাই ফসল বাঁচাতে কৃষক দ্রুত কীটনাশকের আশ্রয় নেন।

 

কিন্তু কোন রোগে কোন ওষুধ, কত মাত্রায় এবং কতবার প্রয়োগ করতে হবেÑএসব বিষয়ে অনেক কৃষকের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নেই। ফসল সংগ্রহের কতদিন আগে কীটনাশক প্রয়োগ বন্ধ করতে হবে, সে বিষয়েও অনেক সময় যথেষ্ট সচেতনতা থাকে না।ফলে কোথাও কোথাও কৃষি কর্মকর্তার পরিবর্তে কীটনাশক বিক্রেতাই হয়ে ওঠেন কৃষকের পরামর্শদাতা। এখানেই তৈরি হয় স্বার্থের সংঘাত। কৃষকের প্রয়োজন আর বিক্রেতার ব্যবসায়িক স্বার্থ এক নয়। এর ফলে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি কীটনাশক ব্যবহার এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হয়।

কীটনাশকের বাজারও ছোট নয়। সংশ্লিষ্ট সংগঠনের হিসাবে, দেশে বর্তমানে কীটনাশকের বাজার প্রায় সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকার। এর প্রায় ৫৫ শতাংশ, অর্থাৎ ৪ হাজার ১২৫ কোটি টাকার বাজার সাতটি বহুজাতিক কোম্পানির হাতে। স্থানীয় আমদানিকারকেরা চাহিদার প্রায় ৪১ শতাংশ বা ৩ হাজার ৭৫ কোটি টাকার কীটনাশক আমদানি করেন। আর দেশীয় উৎপাদনকারীদের হিস্যা মাত্র ৪ শতাংশ, প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। এই পরিসংখ্যান শুধু একটি বড় ব্যবসায়িক বাজারের চিত্র নয়; এর সঙ্গে কৃষিনীতি ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জড়িত।

 

কৃষির এত গুরুত্বপূর্ণ উপকরণের বাজারে দেশীয় উৎপাদনের অংশ এত কম কেন? আমাদের ওষুধশিল্প যদি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারে, তাহলে কৃষির জন্য নিরাপদ ও মানসম্পন্ন বালাইনাশক তৈরিতে গবেষণা ও উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলার উদ্যোগ আরও জোরালো হবে না কেন?অবশ্য কীটনাশক উৎপাদন ও ওষুধ উৎপাদন এক বিষয় নয়। বালাইনাশকের কার্যকারিতা, রাসায়নিক উপাদান, পরিবেশগত প্রভাব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর গবেষণা ও মাননিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। তাই দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি মান ও নিরাপত্তার বিষয়টিকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

 

সবচেয়ে বড় উদ্বেগ জনস্বাস্থ্য নিয়ে। কৃষকের জমিতে প্রয়োগ করা কীটনাশক শুধু জমিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর অবশিষ্টাংশ ফসল, মাটি ও পানির মাধ্যমে খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করতে পারে। অতিরিক্ত বা ভুলভাবে ব্যবহৃত কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ফলে নিরাপদ খাদ্যের প্রশ্নটি এখন কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।আমাদের তাই প্রশ্ন করতে হবেÑআমরা কি শুধু বেশি খাদ্য উৎপাদন করতে চাই, নাকি নিরাপদ খাদ্যও উৎপাদন করতে চাই?খাদ্যনিরাপত্তার অর্থ শুধু দেশের মানুষের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য নিশ্চিত করা নয়; সেই খাদ্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর হওয়াও জরুরি।

 

মাঠে ফলন বাড়ল, বাজারে সবজি ও ফলের সরবরাহ বাড়লÑকিন্তু সেই খাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিকের অবশিষ্টাংশ থাকলে উৎপাদনের সাফল্যকে পূর্ণাঙ্গ সাফল্য বলা যায় না।পরিবেশের ওপর কীটনাশকের প্রভাবও কম নয়। অতিরিক্ত কীটনাশক মাটির উপকারী জীবাণু ও পোকামাকড়ের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। জলাশয়ে রাসায়নিক মিশলে মাছ ও জলজ জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ক্ষতিকর পোকার পাশাপাশি উপকারী পোকা ধ্বংস হওয়ায় প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে কীটপতঙ্গের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে এবং ভবিষ্যতে আরও বেশি কীটনাশকের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।

 

এই বিপজ্জনক চক্র থেকে বের হওয়ার অন্যতম পথ হলো সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা। কীটনাশক পুরোপুরি বাদ দেওয়ার কথা নয়; বরং যেখানে প্রয়োজন, সেখানে সঠিক ওষুধ সঠিক মাত্রায় ব্যবহার করতে হবে। পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধী জাত, জৈবিক নিয়ন্ত্রণ, ফেরোমোন ফাঁদ, আলোক ফাঁদ ও যান্ত্রিক পদ্ধতির মতো পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইংয়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বালাইনাশক নিবন্ধন, লাইসেন্স প্রদান, মান নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদন-বিক্রয়-ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষকদের কারিগরি পরামর্শ দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

 

মানহীন কীটনাশকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথাও বলা হয়েছে। তবে শুধু নীতি ঘোষণা করলেই হবে না, মাঠপর্যায়ে তার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাজারগুলোতে নিয়মিত তদারকি বাড়াতে হবে। কোনো কীটনাশক নিবন্ধিত কি না, মেয়াদ আছে কি না, প্যাকেটের নির্দেশনা সঠিক কি না এবং নির্ধারিত মান বজায় রাখা হয়েছে কি নাÑএসব পরীক্ষা করা জরুরি। ভেজাল বা মানহীন পণ্য বিক্রির প্রমাণ পাওয়া গেলে কার্যকর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।একই সঙ্গে কৃষককে দায়ী করার আগে তাকে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও বিকল্প দিতে হবে। কোনো কৃষক যদি না জানেন কোন রোগে কতটুকু কীটনাশক ব্যবহার করতে হয়, তাহলে শুধু তাঁর ওপর দায় চাপানো ন্যায় সংগত নয়।

 

ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং মাঠপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের সক্রিয় উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। কৃষিপণ্যে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ পরীক্ষার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। শুধু আমদানিকৃত কীটনাশকের মান পরীক্ষা করলেই হবে না; বাজারে আসা কৃষিপণ্যও নিয়মিত পরীক্ষার আওতায় আনতে হবে। কোন অঞ্চলে কোন ফসলে কী ধরনের রাসায়নিক বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে, কোথায় ঝুঁকি বেশিÑএসব তথ্যের ভিত্তিতে নজরদারি গড়ে তুলতে হবে। দেশের সামনে একটি বড় সুযোগও রয়েছে।

 

জলবায়ু পরিবর্তন, মাটির স্বাস্থ্য, নিরাপদ খাদ্য ও টেকসই কৃষির গুরুত্ব বিশ্বজুড়ে বাড়ছে। কম রাসায়নিক ব্যবহার, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন এবং আধুনিক সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমার পাশাপাশি কৃষিপণ্যের বাজারও সম্প্রসারিত হতে পারে।টেকসই কৃষি মানে শুধু বেশি ফলন নয়। কৃষকের আয় বাড়ানো, উৎপাদন ব্যয় কমানো, মাটির উর্বরতা রক্ষা, পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং ভোক্তার জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করাই টেকসই কৃষির মূল লক্ষ্য। তাই এখন সময় এসেছে কীটনাশক ব্যবহারের পুরো ব্যবস্থাকে নতুন করে দেখার।

 

কোন কোম্পানি কী আমদানি করছে, কী উৎপাদন করছে, কীভাবে বাজারজাত করছে, কৃষককে কী পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত সেই রাসায়নিকের প্রভাব কোথায় গিয়ে পড়ছেÑসবকিছুকে সমন্বিত নজরদারির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে দেশীয় গবেষণা ও উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আমাদের ওষুধশিল্প বিশ্বের বহু দেশে পণ্য রপ্তানি করতে পারলে কৃষির জন্য নিরাপদ ও মানসম্পন্ন বালাইনাশক তৈরির সক্ষমতা গড়ে তোলাও অসম্ভব নয়। তবে সেই উদ্যোগ হতে হবে গবেষণাভিত্তিক, পরিবেশসম্মত ও কৃষকবান্ধব। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কৃষককে কৃষিনীতি ও সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে রাখা। কারণ কীটনাশকের দাম কৃষক দেন, অতিরিক্ত ব্যবহারের ক্ষতি কৃষক বহন করেন, খাদ্যে অবশিষ্টাংশের ঝুঁকি ভোক্তা বহন করেন এবং পরিবেশগত ক্ষতির বোঝা বহন করে পুরো সমাজ।

 

তাই কীটনাশকের সংকট কোনো একটি মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর কিংবা কৃষকের একার সমস্যা নয়। এটি অর্থনীতি, কৃষি, পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও খাদ্যনিরাপত্তার সম্মিলিত সংকট। মনে রাখতে হবেÑকৃষকের জমিতে যে রাসায়নিকের যাত্রা শুরু হয়, তার শেষ হতে পারে মানুষের খাবারের টেবিলে। তাই কৃষি উৎপাদনের সাফল্য তখনই অর্থবহ হবে, যখন সেই উৎপাদন হবে নিরাপদ, টেকসই এবং কৃষকের জন্য লাভজনক। কীটনাশক হবে প্রয়োজনের উপকরণÑকৃষির নিয়ন্ত্রক নয়। এই নীতিই হতে পারে নিরাপদ খাদ্য ও টেকসই কৃষির পথে বাংলাদেশের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

লেখক: সাংবাদকর্মী

Ads small one

সম্পাদকীয়/ বাল্যবিবাহের অভিশাপ ও আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:১৮ অপরাহ্ণ
সম্পাদকীয়/ বাল্যবিবাহের অভিশাপ ও আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা

কিশোরী বয়সে যখন হাত বাড়ানোর কথা নতুন বইয়ের পাতার দিকে, যখন শ্রেণিকক্ষে সহপাঠীদের সঙ্গে স্বপ্ন ও চিন্তার বিস্তার ঘটার কথা, ঠিক সেই বয়সে সংসার জীবনের ভারী দায়িত্ব চেপে বসা এক কঠিন ও নির্মম বাস্তবতা। সাতক্ষীরার তালার ইসলামকাটি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের নবম ও দশম শ্রেণির ১৩ জন ছাত্রীর বাল্যবিবাহের সাম্প্রতিক ঘটনাটি আমাদের সমাজের এক গভীর ক্ষতকে আবার উন্মোচিত করেছে। একই প্রতিষ্ঠানের এত বিপুলসংখ্যক অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীর বিয়ে হয়ে যাওয়া কেবল শিক্ষার পথকে রুদ্ধ করে না, বরং দেশের প্রচলিত আইন ও সামাজিক অগ্রগতির সামনে এক বড় প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করে।

একটি মেয়েশিশুর অপরিণত বয়সে বিয়ে তার মানসিক ও শারীরিক বিকাশের পথকে চিরতরে রুদ্ধ করে দেয়। পুষ্টিহীনতা, স্বাস্থ্যঝুঁকি, পারিবারিক সহিংসতা এবং সর্বোপরি অকাল মাতৃত্বের কারণে তাঁদের ভবিষ্যৎ জীবন চরম ঝুঁকির মুখে পড়ে। তাছাড়া এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; আমাদের গ্রামীণ জনপদে বাল্যবিবাহের এই প্রবণতা প্রকাশ করে যে আইন ও সচেতনতা সৃষ্টির প্রচার চালানো সত্ত্বেও সামাজিক মনোভাবের পরিবর্তন পুরোপুরি ঘটেনি। দারিদ্র্য, কুসংস্কার কিংবা সামাজিক নিরাপত্তার অভাবের অজুহাতে অভিভাবকদের এই সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

ঘটনাটি নজরে আসার পর উপজেলা প্রশাসনের প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। স্থানীয় নির্বাহী কর্মকর্তার উদ্যোগে অভিভাবকদের ডেকে সতর্ক করা, বাল্যবিবাহে নিষেধাজ্ঞা জারি করা এবং শিক্ষার্থীদের পুনরায় বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া কেবল সময়োপযোগী নয়, বরং এটি একটি জোরালো প্রশাসনিক বার্তাও বহন করে। তবে প্রশাসনিক কঠোরতা ও নজরদারিই যে এ ব্যাধি নির্মূলে একমাত্র সমাধান নয়, তা-ও স্মরণে রাখা জরুরি।

বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় সুশীল সমাজকে প্রহরীর ভূমিকা পালন করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কোনো শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকলে তার কারণ অনুসন্ধানে নজরদারি বাড়ানো দরকার। একই সঙ্গে অভিভাবকদের মধ্যে সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত সচেতনতা তৈরিতে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। তালার ঘটনাটিকে কেবল একটি সংবাদের শিরোনামে সীমাবদ্ধ না রেখে শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে সচেতনতার প্রদীপ জ্বালানোর তাগিদ হিসেবে দেখতে হবে। তবেই একটি সুস্থ, সচেতন ও বাল্যবিবাহমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

মন্ত্রী আসছেন সাতক্ষীরায়: চাই বঞ্চনার অবসান

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:১৪ অপরাহ্ণ
মন্ত্রী আসছেন সাতক্ষীরায়: চাই বঞ্চনার অবসান

এম. এম হায়দার আলী

দেশের একবারে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা সাতক্ষীরা, সম্ভাবনার এক বিশাল জনপদ। সুন্দরবনের কোলঘেঁষা এই জেলা দেশের অর্থনীতি, কৃষি, মৎস্য, সীমান্ত বাণিজ্য ও পর্যটনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। অথচ দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নের প্রশ্নে সাতক্ষীরার মানুষ যেন বার-বারই থেকেছেন উপেক্ষিত। প্রতিশ্রুতি এসেছে, আশ্বাস এসেছে, প্রকল্পের কথা শোনা গেছে,কিন্তু কাক্সিক্ষত উন্নয়ন অনেক ক্ষেত্রেই অধরাই থেকে গেছে। এবার সেই বঞ্চনার বৃত্ত ভাঙার প্রত্যাশা জেগেছে সাতক্ষীরাবাসীর মনে।

আগামী ১৩ সেপ্টেম্বর আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী জনাব মোঃ আসাদুজ্জামান মহোদয়ের সাতক্ষীরা সফরকে ঘিরে তাই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। শুধু আনুষ্ঠানিক সফর নয়,সাতক্ষীরার বাস্তব সমস্যা, মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি এবং উন্নয়নের সম্ভাবনাকে সামনে রেখে একটি কার্যকর রোডম্যাপ তৈরি হবে,এমন প্রত্যাশাই এখন জনমনে। এদিন

সকাল ৯টায় সাতক্ষীরা জেলা জজ আদালতের সম্মেলনকক্ষে জেলা পর্যায়ের বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন মন্ত্রী। এরপর সকাল ১০টায় জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে জেলার সংসদ সদস্য, সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসক, বিজিবির সিও, র‌্যাবের সিও, পুলিশ সুপার, বিভিন্ন দপ্তরের প্রধান, জেলা পরিষদ প্রশাসক, পৌর প্রশাসক, সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ, আইনজীবী সমিতির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক, জিপি-পিপি, প্রেসক্লাবের সভাপতি, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন তিনি। আর বিকেল ৩টায় বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্য, সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য, জেলা ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় যোগ দেবেন মন্ত্রী।

 

এই তিনটি পর্বের মতবিনিময়কে নিছক সৌজন্য সাক্ষাৎ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। সাতক্ষীরার উন্নয়নের জন্য এসব মতবিনিময় হতে পারে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্ল্যাটফর্ম। কারণ উন্নয়ন শুধু রাস্তা-ঘাট নির্মাণের নাম নয়; উন্নয়ন মানে মানুষের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, যোগাযোগ, বন্দর, নদী-খাল, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং সর্বোপরি মানুষের জীবনমানের পরিবর্তন। প্রশ্ন হলো,সাতক্ষীরা এত সম্ভাবনাময় হয়েও পিছিয়ে থাকবে কেন ?

সীমান্তবর্তী জেলা হিসেবে সাতক্ষীরার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ভোমরা স্থলবন্দর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্র। সুন্দরবনকে ঘিরে রয়েছে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা। কৃষি ও মৎস্য খাতেও সাতক্ষীরার অবদান কম নয়। চিংড়ি ও কাঁকড়া রপ্তানি, সবজি উৎপাদন, কৃষিপণ্য, মৎস্য সম্পদ,সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক ভাবে সাতক্ষীরা একটি সম্ভাবনাময় জেলা। কিন্তু অবকাঠামোগত দুর্বলতা, যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা, জলাবদ্ধতা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি এবং শিল্প-কারখানার অপ্রতুলতা সেই সম্ভাবনার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

সাতক্ষীরার মানুষ উন্নয়নের গল্প শুনতে, শুনতে ক্লান্ত। তারা এবার বাস্তব উন্নয়ন দেখতে চান। তারা চান, সড়ক হবে, সেতু হবে, নদী-খাল বাঁচবে, জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান হবে, কৃষক ন্যায্য দাম পাবেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নত হবে, হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা বাড়বে, তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। সবচেয়ে বড় কথা, সাতক্ষীরাকে আর ‘অবহেলিত জেলা’ হিসেবে দেখতে চান না এখানকার মানুষ।

মন্ত্রী যদি সত্যিই সাতক্ষীরার মানুষের কথা শুনতে চান, তাহলে মতবিনিময় সভাগুলোতে শুধু বক্তব্যের ফুলঝুরি নয়,মানুষের বাস্তব অভিযোগ ও দীর্ঘদিনের দাবিগুলোও শুনতে হবে। কোন প্রকল্প আটকে আছে, কোথায় বরাদ্দের অভাবে কাজ থেমে আছে, কোন সড়ক বছরের পর বছর সংস্কার হয়নি, কোন নদী দখল-দূষণে মৃতপ্রায়, কোন এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা ভেঙে পড়েছে, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।

রাজনীতিরও একটি বড় দায়িত্ব আছে। দল-মত নির্বিশেষে সাতক্ষীরার উন্নয়নের প্রশ্নে সবাইকে এক টেবিলে বসতে হবে। উন্নয়ন কোনো একক দলের সম্পত্তি নয়। আজ যে রাস্তা নির্মিত হবে, সেটি শুধু একটি দলের মানুষ ব্যবহার করবেন না, হাসপাতাল, সেতু, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা কর্মসংস্থানের সুযোগও দল দেখে মানুষের কাছে পৌঁছাবে না। তাই সাতক্ষীরার স্বার্থে রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে একটি অভিন্ন উন্নয়ন দাবি তৈরি করা সময়ের প্রয়োজন।

 

বর্তমান বিএনপি সরকারের মন্ত্রী মহোদয়কে সাতক্ষীরাবাসীর পক্ষ থেকে প্রাণঢালা অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি একটি কথাই বলা দরকার, আমরা প্রতিশ্রুতি নয়, দৃশ্যমান পরিবর্তন চাই। মতবিনিময় সভা শেষে যেন ফাইলের স্তূপে মানুষের দাবিগুলো চাপা পড়ে না যায়। সভায় উত্থাপিত দাবিগুলোর অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে সময়সীমাবদ্ধ বাস্তবায়ন পরিকল্পনা প্রয়োজন। কোন কাজ কখন শুরু হবে, কোন কাজ কতদিনে শেষ হবে,তার একটি সুস্পষ্ট কর্ম-পরিকল্পনা থাকা দরকার।

সাতক্ষীরার মানুষ উন্নয়ন চায়, কিন্তু সেই উন্নয়ন হতে হবে টেকসই। এমন উন্নয়ন নয়, বর্ষা এলেই যে রাস্তা ভেঙে যাবে; এমন বাঁধ নয়, সামান্য জলোচ্ছ্বাসেই যে মানুষকে সর্বস্বান্ত করবে; এমন প্রকল্প নয়, যার সুফল জনগণের বদলে কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে। সাতক্ষীরা দীর্ঘকাল ধরে পিছিয়ে আছে, এ কথা শুধু অভিযোগ হিসেবে উচ্চারণ করলেই হবে না। কেন পিছিয়ে আছে, কারা দায়ী, কোথায় প্রশাসনিক দুর্বলতা, কোথায় পরিকল্পনার ঘাটতি এবং কোথায় বাস্তবায়নের ব্যর্থতা, সেসবও খুঁজে বের করতে হবে। ১৩ সেপ্টেম্বরের সফর তাই সাতক্ষীরার জন্য একটি সুযোগ। এই সুযোগকে কাজে লাগাতে পারলে জেলার উন্নয়ন-ভাবনায় নতুন গতি আসতে পারে।

 

তাইতো সাতক্ষীরাবাসী এখন তাকিয়ে আছেন মন্ত্রীর দিকে। তারা আশা করছেন,আইন ও বিচার অঙ্গনের দায়িত্বের পাশাপাশি সাতক্ষীরার উন্নয়ন-সম্ভাবনাকেও তিনি গুরুত্বের সঙ্গে দেখবেন। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে অবহেলিত এই জনপদকে উন্নয়নের মূল গ্রোতে ফিরিয়ে আনতে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন। সাতক্ষীরা আর পেছনে পড়ে থাকতে চায় না।

 

ভোমরা বন্দর থেকে সুন্দরবন, কৃষকের মাঠ থেকে মৎস্যঘের, শহরের সড়ক থেকে প্রত্যন্ত গ্রামের জনপদ, সবখানেই উন্নয়নের ছোঁয়া পৌঁছাতে হবে। মানুষের চোখে-মুখে ফুটিয়ে তুলতে হবে পরিবর্তনের স্বপ্ন। সময় এসেছে সাতক্ষীরার বঞ্চনার হিসাব চুকিয়ে দেওয়ার। এবার চাই উন্নয়নের জোয়ার, থায় নয়, কাজে।

সাতক্ষীরাবাসীর প্রত্যাশা, মন্ত্রীর ১৩ সেপ্টেম্বরের সফর যেন সেই নতুন যাত্রার সূচনা করে। একই সাথে অবহেলা, বৈষম্য ও উন্নয়ন-ঘাটতির পুরোনো অধ্যায় পেছনে ফেলে সাতক্ষীরা এগিয়ে যাক সমৃদ্ধি, নিরাপত্তা ও সম্ভাবনার পথে,এই হোক আমাদের এবারের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

জীবনের অভিধানে ‘প’-এর কারসাজি!

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:০৭ অপরাহ্ণ
জীবনের অভিধানে ‘প’-এর কারসাজি!

গাজী হাবিব

জীবনে যত ঝামেলা, যত প্যাঁচ, যত প্যারা- সবকিছুর শুরুতেই যেন এক রহস্যময় অক্ষর বিস্ময়করভাবে ধরা পড়েচে! সেই অক্ষরটি হলো ‘প’। অবশ্য বাংলা বর্ণমালার ‘প’-এর কোনো দোষ নেই। সে তো নিরীহ একটি বর্ণ। কিন্তু মানুষের জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, ‘প’ দিয়ে শুরু হওয়া অনেক শব্দই জীবনে কখনো সুখ, কখনো দুঃখ, আবার কখনো মহাবিপদ ডেকে আনে। তাই মজা করে বলা যায়- ‘সব নষ্টের গোড়া হলো প!’
চলুন, ‘প’-এর প্যাঁচে জীবনের কয়েকটি পরিচিত অধ্যায় ঘুরে আসি।

পথ
প্রতিটি মানুষের জীবনে একটি পথ থাকে। কারও পথ শিক্ষার, কারও কর্মের, কারও ব্যবসার, কারও সেবার, আবার কারও পথ স্বপ্ন পূরণের। পথ কখনো আগে থেকে তৈরি থাকে না। অনেক সময় চলতে চলতেই মানুষ নিজের পথ খুঁজে নেয়। ছোটবেলায় যে স্বপ্ন দেখা হয়, বড় হতে হতে সেই স্বপ্নের রং বদলে যায়। মানুষ নতুন বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত হয়, নিজের সক্ষমতা বুঝতে শেখে এবং একসময় উপলব্ধি করেÑগন্তব্যের চেয়েও পথের অভিজ্ঞতা অনেক মূল্যবান। কিছু পথ আমাদের ধৈর্য শেখায়, কিছু পথ সাহস শেখায়, কিছু পথ মানুষ চিনতে শেখায়। আবার কিছু কঠিন পথ আমাদের নিজের শক্তির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।

প্রত্যয়
পথ খুঁজে পাওয়া গেলেই হয় না। সেই পথে হাঁটার জন্য দরকার প্রত্যয়। প্রত্যয় হলো নিজের ওপর বিশ্বাস। চারপাশের মানুষ যখন বলে, ‘তুমি পারবে না’, তখন ভেতর থেকে একটি কণ্ঠ যখন বলে-‘আমি চেষ্টা করব’- সেই কণ্ঠই প্রত্যয়। প্রত্যয় মানে অহংকার নয়। প্রত্যয় মানে নিজের সীমাবদ্ধতা জানা, ভুল থেকে শেখা এবং তারপরও এগিয়ে যাওয়ার সাহস রাখা। অনেকে প্রতিভাবান হয়েও ব্যর্থ হয়, কারণ তারা নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে পারে না। আবার অনেক সাধারণ মানুষ অসাধারণ হয়ে ওঠে শুধু এক কারণে- তারা হাল ছাড়ে না।

প্রচেষ্টা
স্বপ্ন দেখা সহজ। পরিকল্পনা করাও সহজ। কিন্তু স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য যে নিয়মিত কাজ করতে হয়, তার নাম প্রচেষ্টা। একজন শিক্ষার্থী ভালো ফল করতে চায়- এটি তার স্বপ্ন। ব্যবসায়ী সফল হতে চান- তাকে পরিশ্রম করতে হবে। খেলোয়াড় ভালো করতে চান-তাকে অনুশীলন করতে হবে। লেখক ভালো লিখতে চান- তাকে নিয়মিত লিখতে হবে। সাংবাদিক ভালো প্রতিবেদন করতে চান- তাকে পড়তে, জানতে, অনুসন্ধান করতে হবে। শুধু ইচ্ছা কখনো সাফল্য এনে দেয় না। ইচ্ছা পথ দেখায়, কিন্তু প্রচেষ্টা সেই পথে এগিয়ে নেয়।

প্রগতি
প্রত্যেক মানুষ একদিনে সফল হয় না। সফলতা আসলে ছোট ছোট অগ্রগতির সমষ্টি। সেই অগ্রগতির নাম প্রগতি। প্রগতি মানে সবসময় বড় কোনো অর্জন নয়। গতকালের চেয়ে আজ একটু ভালো হওয়াও প্রগতি। গতকাল যে বিষয়টি বুঝতে পারেননি, আজ সেটি বুঝতে পারাও প্রগতি। আগের ভুলটি আজ আর না করাও প্রগতি। গতকাল যেখানে ভয় পেয়েছিলেন, আজ সেখানে সাহস করে দাঁড়ানোও প্রগতি। আমরা অনেক সময় অন্যের সাফল্যের সঙ্গে নিজের জীবনকে তুলনা করি। তখন মনে হয়, অন্যরা অনেক এগিয়ে গেছে, আর আমি পিছিয়ে আছি।

প্ল্যানস
জীবনে প্ল্যান থাকতে হয়। কোথায় যাব, কী করব, কীভাবে ভবিষ্যৎ গড়ব- এসব নিয়ে পরিকল্পনা করা ভালো। কিন্তু শুধু প্ল্যান করলেই হবে না, সেটি বাস্তবায়নের কাজও করতে হবে। কারণ পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি অপূর্ণ জিনিসগুলোর একটি হলো- ‘দারুণ একটা প্ল্যান ছিল!’

পড়াশোনা
ছাত্রজীবনের সবচেয়ে বড় ‘প’- পড়াশোনা। কেউ পড়াশোনাকে ভালোবাসে, কেউ ভয় পায়, আবার কেউ পরীক্ষার আগের রাতে বই খুলে মনে করে- আজ থেকেই জীবন বদলে যাবে! আসলে পড়াশোনা শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য নয়; জ্ঞান, চিন্তা ও ভবিষ্যৎ গড়ার জন্যও জরুরি। তবে পড়াশোনাকে নিয়ে অতিরিক্ত চাপও ভালো নয়। নিয়মিত চেষ্টা আর ধৈর্যই আসল।

পরিশ্রম
সাফল্যের সঙ্গে ‘পরিশ্রম’-এর সম্পর্ক অনেক পুরোনো। ভাগ্য দরজায় কড়া নাড়তে পারে, কিন্তু দরজা খুলে দিতে হয় নিজের পরিশ্রমে। জীবনে শর্টকাটের সন্ধান করতে গিয়ে অনেকেই সময় হারায়। অথচ নিয়মিত পরিশ্রম ধীরে হলেও মানুষকে সামনে এগিয়ে দেয়।

পরীক্ষা
‘পরীক্ষা’ শব্দটি শুনলেই অনেকের বুক ধড়ফড় শুরু হয়। বই খুললে অনেকের ঘুম আসে, কিন্তু পরীক্ষা শেষ হলে মনে হয়- আরেকটু পড়লেই ভালো হতো! পরীক্ষা আসলে শুধু জ্ঞান যাচাইয়ের মাধ্যম নয়; এটি প্রস্তুতি, সময় ব্যবস্থাপনা ও মানসিক দৃঢ়তারও পরীক্ষা। তাই পরীক্ষাকে ভয় না পেয়ে প্রস্তুত হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

প্যারা
জীবনের সবচেয়ে পরিচিত শব্দগুলোর একটি- প্যারা। কখনো পড়াশোনার প্যারা, কখনো পরিবার, কখনো বন্ধু, কখনো টাকা-পয়সা, আবার কখনো নিজের চিন্তাই নিজের সবচেয়ে বড় প্যারা হয়ে দাঁড়ায়। তবে সব প্যারা খারাপ নয়। কিছু প্যারা মানুষকে দায়িত্বশীল করে, কিছু প্যারা মানুষকে বাস্তবতা শেখায়। আসল বিষয় হলো-প্যারার মধ্যে পড়ে যেন মানুষ নিজেকে হারিয়ে না ফেলে।

পয়সা
জীবনে পয়সা দরকার। পয়সা ছাড়া সংসার চলে না, পড়াশোনা চলে না, স্বপ্নও অনেক সময় বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়। কিন্তু পয়সা যখন প্রয়োজনের বদলে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, তখন মানুষ সম্পর্ক, নীতি ও বিবেকের মূল্য ভুলে যেতে পারে। অর্থাৎ পয়সা প্রয়োজনীয়- কিন্তু পয়সার পেছনে ছুটতে গিয়ে যেন মানুষ নিজেকেই হারিয়ে না ফেলে।

পকেটখালি
মাসের শুরুতে পকেট ভারী, মাঝামাঝি স্বাভাবিক, আর মাসের শেষে-পকেট যেন বাতাসে ভরা! পকেট খালি হলে তখন বোঝা যায়, ছোট ছোট খরচগুলো কত বড় হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই আয় যতই হোক, হিসাব করে চলার অভ্যাস থাকাটা জরুরি।

প্যাঁচ
কিছু মানুষ যেখানে সহজ রাস্তা আছে, সেখানেও প্যাঁচ খুঁজে বের করেন। সম্পর্কের প্যাঁচ, কথার প্যাঁচ, রাজনীতির প্যাঁচ, অফিসের প্যাঁচÑজীবন যেন প্যাঁচেরই আরেক নাম। তবে সব প্যাঁচ অন্যের তৈরি নয়। অনেক সময় আমরা নিজেরাই অপ্রয়োজনীয় চিন্তা করে সহজ বিষয়কে কঠিন বানিয়ে ফেলি।

প্রেশার
জীবনে প্রেশার থাকবেই। পড়াশোনার প্রেশার, কাজের প্রেশার, পরিবারের প্রত্যাশা- সব মিলিয়ে কখনো কখনো মনে হয়, জীবনটাই যেন একটা প্রেসার কুকার! তবে সব চাপ একা বহন করার দরকার নেই। প্রয়োজন হলে পরিবারের সদস্য, শিক্ষক বা বিশ্বস্ত কারও সঙ্গে কথা বলা উচিত। নিজের সামর্থ্য বুঝে এগিয়ে যাওয়াও জরুরি।

পেইন
‘পেইন’ মানে কষ্ট। জীবনে কষ্ট থাকবে- এটাই বাস্তবতা। কখনো সম্পর্কের কষ্ট, কখনো ব্যর্থতার কষ্ট, কখনো প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ার কষ্ট। তবে প্রতিটি কষ্টই মানুষকে কিছু না কিছু শেখায়। তাই পেইনকে শুধু দুর্ভাগ্য না ভেবে জীবনের শিক্ষক হিসেবেও দেখা যায়।

পাগলামি
জীবনে একটু পাগলামি না থাকলে জীবনও যেন পানসে। বন্ধুদের সঙ্গে হঠাৎ ঘুরতে যাওয়া, নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করা কিংবা নিজের স্বপ্নের পেছনে ছুটে চলা- এসবও এক ধরনের ভালো পাগলামি। তবে পাগলামি আর বেপরোয়া আচরণের মধ্যে পার্থক্য আছে। আনন্দ করতে গিয়ে নিজের বা অন্যের ক্ষতি করা কখনোই বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

প্রেম
জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অনুভূতিগুলোর একটি প্রেম। কিন্তু প্রেম যখন সুন্দর সম্পর্কের বদলে অতিরিক্ত আবেগ, ভুল সিদ্ধান্ত কিংবা অযথা প্রত্যাশার বোঝা হয়ে যায়, তখন শুরু হয় প্যারা। ঘুম কমে যায়, মন খারাপ বাড়ে, মোবাইলের দিকে তাকিয়ে থাকার সময় বাড়ে। ফলে প্রেম কখনো জীবনকে সুন্দর করে, আবার কখনো জীবনকে ‘প্যারা’ করে তোলে!

পরকীয়া
প্রেমের পরের ধাপ যদি হয় ‘পরকীয়া’, তাহলে ‘প্যারা’ অনেক গুণ বেড়ে যায়। একটি ভুল সিদ্ধান্ত শুধু একজনের নয়, একাধিক মানুষের জীবনকে অশান্ত করে তুলতে পারে। বিশ্বাস ভাঙে, সম্পর্ক নষ্ট হয়, পরিবারে অশান্তি তৈরি হয়। তাই পরকীয়ার শুরু যতটা গোপন, তার পরিণতি অনেক সময় ততটাই প্রকাশ্য।

প্রতারণা
প্রতারণা শুধু টাকা-পয়সার ক্ষেত্রে হয় না। মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, ভুয়া আশ্বাস কিংবা বিশ্বাসের সুযোগ নেওয়াও প্রতারণা। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় তখনই, যখন মানুষ শুধু টাকা নয়- কারও বিশ্বাসও হারিয়ে ফেলে। টাকা হারালে আবার উপার্জন করা যায়, কিন্তু হারানো বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা অনেক কঠিন।

পত্রিকা
পত্রিকা হলো এমন একটি গণমাধ্যম, যেখানে নির্দিষ্ট সময় পরপর দেশ-বিদেশের সংবাদ, সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, খেলাধুলা, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, মতামত ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশিত হয়। সাধারণত দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক বা মাসিক ভিত্তিতে পত্রিকা প্রকাশিত হয়ে থাকে। মানুষের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য পৌঁছে দেওয়া, জনমত গঠন করা এবং সমাজের বিভিন্ন অসঙ্গতি তুলে ধরা পত্রিকার অন্যতম প্রধান কাজ। সহজভাবে বলা যায়- পত্রিকা হলো সমাজ ও রাষ্ট্রের দর্পণ।

পেটের সমস্যা
মানুষের অনেক বড় বড় স্বপ্ন থাকে, কিন্তু পেটের সমস্যা হলে সেই স্বপ্ন কিছুক্ষণের জন্য স্থগিত! সুস্থ শরীর ছাড়া ভালোভাবে পড়াশোনা, কাজ কিংবা আনন্দ- কিছুই ঠিকমতো করা যায় না। তাই স্বাস্থ্যকর খাবার, পর্যাপ্ত পানি, ঘুম ও নিয়মিত জীবনযাপনকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

পাদ্য
‘পাদ্য’ শব্দটি শুনলেই অনেকে হাসতে শুরু করেন। কিন্তু জীবনের কিছু বিষয় এমনই- যেগুলো নিয়ে হাসাহাসি করা সহজ, অথচ বাস্তবতা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। শরীরের স্বাভাবিক বিষয়গুলো নিয়ে অযথা লজ্জা বা কুসংস্কার না রেখে স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে সচেতন হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
তাহলে কি সত্যিই সব নষ্টের গোড়া ‘প’? না, মোটেও নয়। ‘প’ দিয়ে যেমন প্রেম, পড়াশোনা, পরিশ্রম, পরিকল্পনা শুরু হয়, তেমনি প্যারা, প্রতারণা, পরকীয়া-ও শুরু হয়। অর্থাৎ ভালো-মন্দ দুটোই মানুষের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। একই ‘প’ কারও জীবনে প্রেম হয়ে আসে, কারও জীবনে প্যারা। কেউ পড়াশোনা করে ভবিষ্যৎ গড়ে, কেউ আবার পাগলামি করে সময় নষ্ট করে। কেউ পরিশ্রম করে সফল হয়, কেউ পয়সার পেছনে ছুটতে গিয়ে সম্পর্ক হারায়।

তাই আসল সমস্যা ‘প’-এ নয়- সমস্যা আমাদের পছন্দে। জীবনে ‘প’ অনেক আসবে। প্রেম আসবে, প্যারা আসবে, পরীক্ষা আসবে, প্রেশার আসবে।
কখনো পকেট খালি হবে, কখনো পরিকল্পনা ব্যর্থ হবে। তবুও জীবন থেমে থাকবে না। কারণ ‘প’ দিয়েই তো পথ, প্রত্যয়, প্রচেষ্টা, প্রগতি এবং শেষ পর্যন্ত পূর্ণতা-ও শুরু হয়!